উইন্ডিজের কাছে ৮ উইকেটে হারল বাংলাদেশ

সকালের আলো ফোটার পর নাঈম হাসানের লড়াকু ফিফটি কিছুটা আশা জাগালেও মিরপুর টেস্টের শেষ পরিণতি বদলাতে পারেনি। ১৪২ রানে বাংলাদেশ অলআউট হওয়ার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়িয়েছিল মাত্র ১৭০ রান। কিন্তু সেই মামুলি পুঁজি ডিফেন্ড করতে নেমে সাবলীল ব্যাটিংয়ে শেষ পর্যন্ত ৮ উইকেটের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ল সফরকারীরা।

ঘরের মাঠে টানা পাঁচ জয়ের পর হারল নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ২০২৫ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়েকে হারানোর পর দেশের মাটিতে আয়ারল্যান্ড ও পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চার টেস্ট জিতেছিল বাংলাদেশ। সেই স্মৃতি সাক্ষী করে মিরপুরে তাই এবার বড় ধাক্কাই খেলেন শান্ত-হৃদয়রা। 

এই হারের মধ্যে দিয়ে আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলার সমীকরণকেও জন্য বেশ কঠিন করে তুলেছে শান্তরা। ফাইনালের দৌড়ে টিকে থাকতে হলে এখন বাকি থাকা পাঁচ ম্যাচের মধ্যে অন্তত চারটিতে জয় তুলে নেওয়ার পাশাপাশি বাকি ম্যাচটি ড্র করার কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। এর মাঝে দুটি টেস্ট আছে চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাদের মাটিতেই। 

মিরপুরে আজ টেস্টের চতুর্থ দিনে সকালের শুরুতেই বাংলাদেশকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলার লড়াইয়ে নামেন নাঈম হাসান ও জাকের আলী অনিক। আগের দিন বিকেলে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ৬ উইকেটে ৭৯ রান তুলে দিন শেষ করা ইনিংস বড় করার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নেন নাঈম। তবে সকালে শুরুতেই জাকের (২২) ও হাসান মাহমুদ (৮) দ্রুত ফিরে গেলে চাপ আরও বাড়ে। 

এর মাঝে বৃষ্টির কারণে খেলা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধও থাকে। বৃষ্টি থামার পর ২২ গজে ফিরে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট ফিফটি তুলে নেন নাঈম। ৯১ বলে ৪টি চারের সাহায্যে ৫২ রানের এক দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে নাঈম আউট হলে ১৪২ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। উইন্ডিজের হয়ে রস্টন চেজ ৫টি এবং জোমেল ওয়ারিক্যান ৪ উইকেট শিকার করে শান্তদের ইনিংসে ধস নামান। দুই ইনিংসে ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হন ওয়ারিক্যান। তার আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৭০ রান।

ছোট এই লক্ষ্য তাড়ায় নামার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটারদের সামনে দাঁড়াতেই পারেননি বাংলাদেশের বোলাররা। অথচ একই উইকেটে কিছু সময় আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা (বিশেষ করে চেজ ও  ওয়ারিক্যান) দারুণ টার্ন ও ঘূর্ণি আদায় করে নিয়েছিলেন, যাকে দেখে মনে হচ্ছিল এটি রীতিমতো একটি স্পিনস্বর্গ। কিন্তু সেই একই উইকেটে বল করতে এসে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজরা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন এবং কোনো কার্যকর প্রভাবই ফেলতে পারেননি। 

ক্যারিবীয় ওপেনার ব্র্যান্ডন কিং ও জন ক্যাম্পবেল উদ্বোধনী জুটিতেই ১১২ রান তুলে ফেলেন। মাঝে আলোকস্বল্পতা, বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে খেলা কয়েক দফা বিঘ্নিত হলেও ম্যাচের ফলে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। এরপর শেষভাগে এসে শরীফুল ইসলাম ক্যাম্পবেলকে (৪৯) বোল্ড করে এবং হাসান বাউন্সারে তেজনারায়ন চন্দরপল আউট করলেও ততক্ষণে ম্যাচ সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত ব্রেন্ডন কিংয়ের অপরাজিত ৮১ এবং কাভেম হজের ঝোড়ো ৩১ রানের সুবাদে ৮ উইকেটের সহজ জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে উইন্ডিজ। এই জয়ে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল সফরকারীরা।

হারের পটভূমি অবশ্য তৈরি হয়েছিল গতকালই। এর আগে সাদমানের সেঞ্চুরিতে ভর করে প্রথম ইনিংসে ২৭২ রান তোলার পর নাঈম-মিরাজদের স্পিনে উইন্ডিজদের ২৪৫ রানেই থামিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে মিরপুর টেস্টের তৃতীয় দিন জুড়ে উইকেটের পতন, আলোকস্বল্পতার লুকোচুরি আর ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মিছিলে চালকের আসনে বসে গিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজই। যেন বাংলাদেশের স্পিন-পাঠ ব্যাটে-বলে উল্টো বাংলাদেশের ব্যাটার-বোলারদের পড়ান সফরকারীরা। 

সিরিজের পরের ও শেষ ম্যাচটা এবার সিলেটে। ৫ নভেম্বর থেকে শুরু হবে সেই ম্যাচটি।

সংক্ষিপ্ত স্কোর: (মিরপুর টেস্ট)

বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ২৭২ (৯৭.৪ ওভার) (সাদমান ১০৫, হৃদয় ৪২, লিটন ৩৪*, মুমিনুল ২৮, শান্ত ১৯; ওয়ারিক্যান ৫/৫৩, বিশপ ২/৬১, জোসেফ ২/৪১)।  

ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংস: ২৪৫ (৮২.৫ ওভার) (চন্দরপল ৫৬, ক্যাম্পবেল ৫৪, গ্রিভস ৪৬, চেজ ৪৩*; নাঈম ৪/৩৩, মিরাজ ২/৬৫, তাইজুল ২/৭৬)

বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ১৪২ (৪৮.৪ ওভার) (নাঈম ৫২, জাকের ২২; চেজ ৫/৩৬, ওয়ারিক্যান ৪/৬৩)

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ইনিংস: ১৭০/২ (৩৫.১ ওভার, লক্ষ্য: ১৭০) (কিং ৮১*, ক্যাম্পবেল ৪৯; হাসান ১/১৪, শরীফুল ১/২০)

ফলাফল: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮ উইকেটে জয়ী

ম্যাচসেরা: জোমেল ওয়ারিক্যান (দুই ইনিংসে ৯ উইকেট)