সঞ্চয়ে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা

অর্থ-সম্পদ সঞ্চয়ের গুরুত্ব আছে। নিজের প্রয়োজন মেটানো, পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় মানুষ অর্থ সঞ্চয় করে থাকে। তবে সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। ইসলাম হালাল উপার্জন, পরিমিত ব্যয় ও ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ সংরক্ষণে উৎসাহিত করেছে। একই সঙ্গে কৃপণতা, অপচয়, সুদ ও অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

আধুনিক অর্থনীতিতে যেমন সঞ্চয় ব্যক্তিগত ও জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত, তেমনি ইসলামে সঞ্চয়কে দেখা হয় একটি আমানত হিসেবে। অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ নষ্ট না করে যথাযথভাবে ব্যবহার করা ও ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। তবে ইসলামে সঞ্চয় হতে হবে বৈধ উপায়ে, রিবা বা সুদের মাধ্যমে নয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ সুদ ধ্বংস করেন এবং দানকে বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা বাকারা ২৭৬) তাই ইসলাম সঞ্চয়কে উৎসাহিত করলেও নিষিদ্ধ করেছে সুদভিত্তিক মুনাফা। ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো ভারসাম্য। অতি ব্যয়বহুল জীবন যেমন নিরুৎসাহিত, তেমনি সম্পূর্ণভাবে সঞ্চয়ে আটকে রাখা অর্থও অনুৎসাহিত। ইসলাম চায়, মানুষ যেন প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করে, দান করে, ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করে এবং সমাজে অর্থের সুষম বণ্টন বজায় রাখে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা ভূমিতে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো, আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা জুমা ১০) এখানে অনুগ্রহ বলতে আল্লাহর দেওয়া রিজিক অর্থাৎ জীবিকার উপকরণকেই বোঝানো হয়েছে। ইসলাম মানুষকে পরিশ্রম করতে, হালাল উপায়ে উপার্জন করতে এবং ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে উৎসাহিত করেছে।

দৈনন্দিন খাদ্য-বস্ত্র ও ওষুধ-পথ্যের জোগান এবং বাসস্থান ব্যবস্থাপনাসহ নানা প্রয়োজনে অর্থ উপার্জন ও জীবিকা নির্বাহের বিভিন্ন পথ বেছে নিতে হয় মানুষকে। নিজ ও পরিবারের প্রয়োজন পূরণে অর্থ উপার্জন, ব্যয় এবং শরিয়তসম্মত উপায়ে অর্থ সঞ্চয়ে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম।

হজরত মিকদাদ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মানুষ যা স্বহস্তে উপার্জনের মাধ্যমে খায়, তার চেয়ে উত্তম খাদ্য আর নেই। নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। (সহিহ বুখারি)

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) বলেন, আমি বিদায় হজের বছর একটি কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য আসেন। তখন আমি বললাম, আমার রোগ চরমে পৌঁছেছে, আর আমি সম্পদশালী। একমাত্র কন্যা ছাড়া আমার কোনো উত্তরাধিকারী নেই। এ অবস্থায় আমি কি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ সদকা করতে পারি? নবীজি (সা.) বললেন, না। আমি আবার বললাম, তাহলে অর্ধেক। তিনি বললেন, না। অতঃপর আমি বললাম, এক-তৃতীয়াংশ। তিনি বললে, এক-তৃতীয়াংশও অনেক পরিমাণ অথবা অধিক। তোমাদের উত্তরাধিকারীদের অভাবমুক্ত রেখে যাওয়া, তাদের খালি হাতে পরমুখাপেক্ষী রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম। আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তুমি যেকোনো ব্যয় করো না কেন, তোমাকে তার বিনিময় প্রদান করা হবে। এমনকি তুমি যে খাবার তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দেবে।’ (সহিহ বুখারি)

ওপরের বর্ণনা থেকে অর্থ উপার্জন, ব্যয় ও সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বুঝে আসে। তবে অর্থ সঞ্চয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপন্থা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। কেউ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে অর্থ সঞ্চয় করে বিনিয়োগ করে। এতে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ও কর্মসংস্থানের নতুন পথ উন্মোচিত হয়। ফলে ব্যাপক জনগোষ্ঠী অর্থনীতির সুফল ভোগ করতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি আপনার পালনকর্তার রহমত বণ্টন করে? আমি পার্থিব জীবনে তাদের জীবিকা তাদের মধ্যে বণ্টন করেছি এবং মর্যাদায় একজনকে আরেকজনের ওপর উন্নত করেছি, যাতে তারা একে অন্যের দ্বারা কাজ নিতে পারে। তারা যা সঞ্চয় করে, আপনার পালনকর্তার রহমত তা অপেক্ষা উত্তম।’ (সুরা জুখরুফ ৩২)

তবে এ ক্ষেত্রে ইসলাম নির্দেশিত খাত নির্বাচন করতে হবে। যে বিনিয়োগে সুদ ও হারাম মিশ্রণের আশঙ্কা আছে, তা থেকে বিরত থাকতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা সুদ ভক্ষণ করে, কেয়ামতের দিন তারা ওই ব্যক্তির মতো দাঁড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলে, ক্রয়-বিক্রয় সুদের মতো। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয় হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। অতঃপর যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হয়, তাহলে আগে যা হয়ে গেছে (সুদের আদান-প্রদান) তা তার (অর্থাৎ সেটার জন্য তাকে পাকড়াও করা হবে না)। তার ব্যাপারটি আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। আর যারা আবার সুদের দিকে ধাবিত হয়, তারা জাহান্নামের অধিবাসী। চিরকাল তারা সেখানে অবস্থান করবে।’ (সুরা বাকারা ২৭৫)

তা ছাড়া জনকল্যাণ ও মানবসেবার বাসনা, ঘনিষ্ঠজন ও পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা এবং ভবিষ্যতের ভাবনায় অর্থ-সম্পদ সঞ্চয় করে থাকে অনেকে। নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে এটির বৈধতা ও স্বীকৃতি দিয়েছে ইসলাম। অর্থাৎ যে উদ্দেশ্যেই সম্পদ সঞ্চয় করা হোক না কেন, সঞ্চিত সম্পদ জাকাতের নেসাব পরিমাণ হয়ে পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে তাতে জাকাতের বিধান নিশ্চিত করতে হবে। মানবসেবা ও কল্যাণমূলক কাজে লৌকিকতা পরিহার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করতে হবে এবং নিজের ও পরবর্তীদের জন্য অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে সঞ্চয় থেকে বিরত থাকতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না এবং বিচারকের কাছে সে সম্পর্কে এই উদ্দেশে মামলা করো না যে, মানুষের সম্পদ থেকে কোনো অংশ জেনে-শুনে পাপের পথে গ্রাস করবে।’ (সুরা বাকারা ১৮৮)

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার