দেশকে এগিয়ে নিতে যুবসমাজের বিকল্প নেই: রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে যুব সমাজের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রবিবার (১ নভেম্বর) সকালে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় যুব দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের রাষ্ট্রপতি এই মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, 'আজকে এটা প্রমাণিত সত্য যে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদের যুব সমাজকে কর্মমুখী করতে হবে, তাদের হাতে উৎপাদনের চালিকা শক্তি দিতে হবে।'

'শুধুমাত্র আমরা রাজনৈতিক বিপ্লব করে, পরিবর্তন করে কিন্তু আমরা আমাদের দেশকে এগিয়ে যেতে পারবো না। একই সঙ্গে আমাদেরকে আমাদের দেশকে নির্মাণ করতে হবে।'

'আমরা এতদিন সংগ্রাম করেছি দেশে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবার জন্য এখন আমাদের সংগ্রামটা হচ্ছে এই দেশকে নির্মাণ করবার জন্য। বিল দিস কান্ট্রি, বিল দিস নেশন। এবার মনে পড়ে আমাদের নজরুল ইসলামের ইসলামের একটা কবিতা, কে আছো জোয়ান, হও আগুয়ান, হাকিছে ভবিষ্যৎ, এ তুফান ভারী দিতে হবে পারি নিতে হবে তরি পার… আমাদেরকে পার হতে হবে এবং এখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে, আমাদের উন্নয়নের দিকে।'

রাষ্ট্রপতি বলেন, 'আমাদের একটা অঙ্গীকার আছে কমিটমেন্ট আছে কমিটমেন্টটা করেছেন আমাদের বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বারবার করে বলছেন যে, যুবকদেরকে সামনে এগিয়ে আসতে হবে, তাদের দেশ গড়ার ক্ষেত্রে আমাদের দেশকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বক্ষেত্রে তাদেরকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেছেন, সবার আগে বাংলাদেশ সবার জন্য বাংলাদেশ।'

'এটাই সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত। এমন বাংলাদেশ গড়তে যুবকদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যুব সমাজের ভাগ্য পরিবর্তনের কোন বিকল্প নেই। যুব উন্নয়নে শিক্ষা, কর্মসংস্থান উদ্যোক্তাদের নেতৃত্বে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং তবেই সবার জন্য বাংলাদেশ দর্শন বাস্তবায়িত হবে এবং পাবে এর পূর্ণতা। আসুন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন, সহযোগী শিল্প-বাণিজ্যসহ সকল অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে তৈরি এক আত্মনির্ভরশীল, প্রযুক্তিতে পারদর্শী, কর্মমুখী দক্ষ এবং মানবিক যুব সমাজ। যেটা হবে আমাদের সবার জন্য আগামীর বাংলাদেশ।'

বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬, জব ফেয়ার ও যুব মেলা-২০২৬ এর উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি।  এবারে যুব দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। অনুষ্ঠানে জাতীয় যুব পুরস্কার ও ইউথ ভলেন্টিয়ার এওয়ার্ড প্রদান করা হয়।

রাষ্ট্রপতি যুব মেলা ঘুরে দেখেন এবং তরুন উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলেন।

 ‘যুব-যুবতীদের প্রতি আহ্বান’

রাষ্ট্রপতি বলেন, 'প্রিয় তরুণ তরুণী আত্মকর্মী যুব সংগঠন কাজে অসামান্য অর্জনের জন্য আজ যারা জাতীয় যুব পুরস্কার ও ইউথ ভলেন্টিয়ার এওয়ার্ড পেলে, আমি তোমাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আমার বিশ্বাস তোমাদের এই অর্জন ও সাফল্য অন্য সকল তরুণ যুবতীর জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।'

'আমি একটা কথা বিশ্বাস করি তা হচ্ছে নেভার গিভ আপ… কখনোই আমরা গিভ আপ করব না। আমরা লড়াই করব, আমরা এগিয়ে যাব, আমরা নিশ্চয়ই বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হব।'

‘রাজনীতির কচকচানি বাদ দিতে হবে’

রাষ্ট্রপতি বলেন, 'আমাদের সারাক্ষণ আপনার রাজনীতির যে কচকচানি এটা নিয়ে কিন্তু এগোনো যাবে না। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের গোটা জাতি ওই দিকেই চলে গেছে। এখান থেকে ফিরে আসতে হবে।'

'উন্নয়নের দিকে যেতে হবে। দেশকে গড়ে তোলার দিকে যেতে হবে এবং সেটা সম্ভব।'

‘পার্লামেন্ট কেন্দ্রিক রাজনীতি হওয়া উচিত’

রাষ্ট্রপতি বলেন, আজকে আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা আমাদের মানুষ আন্দোলন করে সংগ্রাম করে ফ্যাসিস্ট একটা শক্তিকে সরিয়ে দিয়ে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবার একটা সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে…এই সুযোগটা আমাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। আজকে পার্লামেন্ট হয়েছে, নির্বাচন হয়েছে।'

'আমার মনে হয় যে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে আমাদের যুবক সমাজ তারা এই বিষয়টা লক্ষ্য করবেন যে এখন পার্লামেন্ট কেন্দ্রিক রাজনীতি হওয়া উচিত। পার্লামেন্টের মধ্যে দিয়ে সমস্ত সমস্যার সমাধানগুলো হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।'

‘শিক্ষা ব্যবস্থা নীড বেইজড হতে হবে’

রাষ্ট্রপতি  বলেন, 'একটা সমস্যা আছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। এটা আমি অনুরোধ করব যে শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে আমাদের আসলে নিড বেইজড হওয়া দরকার….প্রয়োজনের উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা হওয়া দরকার। বিএ, এমএ পাস করে কোন চাকরি পায় না। অথচ বাপ মায়ের জমি বিক্রি করে সবাই বিএ, এমএ পাস করে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে দেখবেন কলেজগুলো ইউনিভার্সিটি গুলো সব এটাই করছে… অথচ যে ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটস, টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটস, বৃত্তিমূলক যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান সেগুলোর সংখ্যা অনেক কম।'

'আমাদের দেশের একটা বিরাট অংশ বাইরে যায়। দেশের বাইরে রেমিটেন্স পাঠায় ওটা আমাদের আয়ের একটা বিরাট উৎস। যদি আমরা শিক্ষিত দক্ষ যুবকদের পাঠাতে পারি বাইরে …আমরা অনেক বেশি বাজারটাকে দখল করতে পারব, আমরা অনেক বেশি আয় করতে পারব… এই বিষয়গুলো আমার মনে হয় যে আমাদের বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তিনি দেখছেন এবং সরকার দেখছে এটাকে আরো গুরুত্ব সহকারে দেখে আমাদেরকে এই যে সমস্যাগুলো আছে এগুলোকে মিটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।'

‘মাদক থেকে যুবকদের বের করে আনতে হবে’

রাষ্ট্রপতি বলেন, 'আমরা কখনোই হতাশ হতে পারি না, আমরা হতাশ জাতি নই। আমরা লড়াই করি সবসময়... সংগ্রাম করি এই সংগ্রাম আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং বিশেষ করে যুবকদেরকে আমি সবচেয়ে বেশি আহবান জানাতে চাই, যে সমস্যা এখন আমাদের অনেকটা ক্ষতি করছে, সেটা হচ্ছে মাদক সমস্যা। আমাদের যুবকদের মধ্যে মাদকের যে আসক্তি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে একটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এটাকে বন্ধ করবার জন্য আমাদের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।'

'এটার একটা হতাশার একটা কারণ আছে… চাকরি পায় না, কাজ পায় না যার পরে তখন দেখা যায় যে সে হতাশ হয়ে যায়। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদেরকে কাজ করতে হবে, প্রচারণা চালাতে হবে। কিছুক্ষণ আগে আমরা কথা বলছিলাম যে আমাদের এই যুব অধিদপ্তরের কার্যক্রম গুলোর প্রচার অনেক বেশি দরকার। অনেকেই জানে না যে কোথায় কি আছে, কোন সুযোগ আছে কিভাবে কাজ করা যায়, প্রশিক্ষণ কোথায় হয় সেটা অনেকেই জানে না। সেই প্রচারের ব্যবস্থাটা আমাদেরকে আরো বেশি করে করতে মনে করি।'

‘নারীর প্রতি সহিংসতা প্রসঙ্গে’

রাষ্ট্রপতি বলেন, 'দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে যেটা কখনোই আমাদের কোন শিক্ষাই আমরা পাই না। সেটা হচ্ছে যে নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক, সব ধরনের বৈষম্যতার বিরুদ্ধে যুব সমাজকে সবার আগে রুখে দাঁড়াতে হবে।'

'আমি মনে করি যে, যুব সমাজে এই বিষয়ে আন্দোলন করা দরকার… তাদের নিজেদের এবং প্রতিটি অঞ্চলে সংগঠন গড়ে তোলা, জনমত গড়ে তোলা, একটা আন্দোলন গড়ে তোলা যাতে এই সমস্ত যে খারাপ বিষয়গুলো যেগুলো আমাদের সমাজকে নষ্ট করছে সেগুলোকে প্রতিরোধে করা যায়।'

‘উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করতে হবে’

একজন নারী উদ্যোক্তার নিজের স্বাবলম্বী হওয়ার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, 'আজকে আমাদের চ্যালেঞ্জটা কিন্তু এই জায়গায় যে আমরা এই শক্তিগুলোকে কিভাবে চ্যানেলাইজ করতে পারি। সরকারের দায়িত্ব এই জায়গায় যে সমস্ত উদ্যোক্তাদেরকে সাহায্য করা তাদেরকে যতটা সম্ভব ট্রেনিং দেওয়া এবং সেই সঙ্গে তাদেরকে আমার মিনিমাম একটা ক্যাপিটাল দেওয়া যাতে করে সে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে পারে এই কাজটা আমাদেরকে করা দরকার। আমার মনে হয় যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যারা আছেন যারা ঋণ দিচ্ছেন বা ঋণ দিচ্ছেন শুধু শুধু বড় বড় কোম্পানিগুলো আছে ঠিক আছে সেটাও প্রয়োজন কিন্তু একই সঙ্গে এই যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যারা আছে তাদেরকে যদি আমরা এইভাবে সাহায্য করতে পারি… ঋণ দিতে পারি সবচেয়ে উপকার তারা পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।'

'আমাদের যে বিরাট একটা ডেমোক্রেটিক ডিভিজন যেটা আমাদের আছে সুবিধাটা আছে এটা আমাদেরকে কাজে লাগাতে হবে কারণ এটা সবসময় সব দেশের কিন্তু চিরদিন থাকে না। কিছুদিন পরে দেখবেন বয়স্ক লোকের সংখ্যা বাড়ছে। তো সেই সময় কিন্তু কাজ করার ক্ষমতা কমে যাবে। আজকে যে যুব শক্তি আছে তাকে যদি আমরা ঠিকমত কাজে লাগাতে পারি তাহলে নিশ্চয়ই আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে।'

যুব ও ক্রীড়া প্রতি মন্ত্রী আমিনুল হকের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবুল খায়ের ভুঁইয়া সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান ও যুব উন্নয়ন অধিদফতরের মহাপরিচালক  মো. মোতাহার হোসেন বক্তব্য রাখেন।