সামরাজ ঘাটে পচা ইলিশের স্তূপ, যা জানা গেল

মা ইলিশ রক্ষায় টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে মাছ ধরতে নামার কথা জেলেদের। কিন্তু ভোলার চরফ্যাশনের সামরাজ মৎস্যঘাটে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। নিষেধাজ্ঞা শেষে গভীর সাগর থেকে ইলিশবোঝাই ট্রলার ফিরছে ঘাটে। এসব ট্রলারের মাছের বড় একটি অংশ পচে গেছে।

ঘাটজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে পচা ইলিশের দুর্গন্ধ। অভিযোগ উঠেছে, নিষেধাজ্ঞার পুরো সময় গভীর সাগরে অবস্থান করে মাছ শিকার করেছেন একাধিক ট্রলারের জেলেরা। দীর্ঘদিন বরফে সংরক্ষণ করায় নষ্ট হয়েছে বিপুল পরিমাণ ইলিশ। এতে একদিকে যেমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে পচা মাছের কারণে দূষিত হচ্ছে ঘাটের পরিবেশ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর তিন দিনের ব্যবধানে ইলিশবোঝাই শতাধিক ট্রলার সামরাজ ঘাটে ফিরেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সরেজমিনে ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই একের পর এক ট্রলার ঘাটে নোঙর করছে। ট্রলার থেকে ঝুড়িভর্তি ইলিশ নামিয়ে নেওয়া হচ্ছে আড়তে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় মাছ বেচাকেনা। কিছু মাছ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানোর জন্য গাড়িতে তোলা হচ্ছে। তবে ঘাটের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা পচা ইলিশ থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ।

ট্রলারভর্তি এসব ইলিশের উৎস জানতে চাইলে সাগর থেকে ফেরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে জানান, নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি মাথায় রেখেই ৮ অক্টোবরের আগে বরফ, জ্বালানি তেল ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে তাঁরা গভীর সাগরে মাছ শিকারে যান। এরপর নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন সাগরে অবস্থান করে মাছ ধরেছেন। দীর্ঘদিন বরফের মধ্যে সংরক্ষণ করায় তাঁদের ধরা মাছের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পচে গেছে।

সমুদ্রগামী একটি ট্রলারের মাঝি নুর মোহাম্মদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে সামরাজ মৎস্যঘাটের কয়েকজন আড়তদার জানান, এসব মাছ সাগর থেকে এসেছে। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেরা সাগরে মাছ শিকার করেছেন বলেও তাঁদের দাবি।

সামরাজ মৎস্যঘাটের সভাপতি আজিজ বলেন, প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে কিছু জেলে নিষেধাজ্ঞার সময় সমুদ্রে গিয়ে মাছ শিকার করেছেন। এ ব্যাপারে প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া দরকার ছিল।

এ বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, এ বিষয়ে তাঁকে একজন অবগত করেছেন।

অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে সাগরগামী ট্রলারগুলো ইলিশবোঝাই হয়ে ঘাটে ফিরে আসার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, কিছু অসাধু জেলে গোপনে সমুদ্রে যেতে পারেন। আর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় সমুদ্রে নজরদারির দায়িত্বে ছিল কোস্টগার্ড।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময় সাগরে মাছ শিকারের ঘটনা ঘটে থাকলে তা প্রতিরোধে নজরদারির ঘাটতি ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার পুরো সময় সাগরে অবস্থান করা ট্রলারগুলোর গতিবিধি এবং মাছ ধরার বিষয়টি তদন্তের দাবি উঠেছে।

নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ছিল প্রজননক্ষম মা ইলিশের নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ তৈরি করা। এ সময় মাছ শিকার বন্ধ থাকলে ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় সাগরে মাছ শিকারের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, ইলিশ সংরক্ষণের উদ্যোগকেও প্রশ্নের মুখে ফেলবে। একই সঙ্গে পচা মাছের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ না করা হলে সামরাজ মৎস্যঘাটের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।