ঋণ আর জলদস্যুর আতঙ্ক নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন জেলেরা

মাথায় মহাজনের ঋণ, সামনে উত্তাল সাগর। মাছ কম পাওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি রয়েছে জলদস্যুদের উৎপাত। এমন নানা দুশ্চিন্তা নিয়েই সুন্দরবনের দুবলার চরসহ বিভিন্ন শুঁটকিপল্লির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করছেন খুলনার কয়রাসহ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জেলেরা।

কয়রা উপজেলার গোবরা গ্রামের জেলে মহসিন সানা তাদের একজন। মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে নৌকা, জাল, খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছেন তিনি। এবারও সাগরে মাছ ধরে শুঁটকি তৈরির উদ্দেশ্যে দুবলার চরে যাচ্ছেন। তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকলেও এবার তার মনে স্বস্তি নেই। জলদস্যুদের চাঁদাবাজি এবং সাগরে মাছ কম পাওয়ার আশঙ্কা তাকে ভাবিয়ে তুলছে।

মহসিন সানা বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকিপল্লিতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। এবারও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে যাত্রা করছেন। কিন্তু সুন্দরবনে দস্যুদের আনাগোনা বেড়েছে। মাছ ধরতে গিয়ে চাঁদা দিতে হবে কি না, কিংবা কখন কী বিপদে পড়তে হয়, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। গত মৌসুমেও আশানুরূপ মাছ পাওয়া যায়নি। এবার কী পরিমাণ মাছ মিলবে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

1000333679

মহসিন সানার মতো কয়রা সদর, মহেশ্বরীপুর, বাগালী, আমাদী, দক্ষিণ বেদকাশী ও উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের দুই শতাধিক জেলে এবার সুন্দরবনের দুবলার চরসহ বিভিন্ন শুঁটকিপল্লিতে যাচ্ছেন। তাদের অনেকেই মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে মাছ ধরার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। পাঁচ মাসের এই মৌসুম তাদের কাছে শুধু মাছ আহরণের সময় নয়, বরং সারা বছরের সংসার চালানোর অন্যতম অবলম্বন।

তবে জেলেদের উদ্বেগের কারণ শুধু জলদস্যু নয়। সাগরে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়া, ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশ, বনদস্যুদের চাঁদাবাজি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও তাদের ভাবিয়ে তুলছে। মাছ ধরার পর আয়ের একটি অংশ যদি দস্যুদের দিতে হয়, তাহলে মহাজনের ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।

সুন্দরবনের দুবলার চরসহ বিভিন্ন চরে শুরু হচ্ছে শুঁটকি মৌসুমের কার্যক্রম। আগামী পাঁচ মাস অস্থায়ী ঘর ও মাছ শুকানোর মাচা তৈরি করে সেখানে চলবে মাছ আহরণ এবং শুঁটকি উৎপাদন। এরই মধ্যে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে খাবার, জ্বালানি, মাছ ধরার জালসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছেন জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা।

মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪১ হাজার ৬৪৫। তাদের মধ্যে পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ, রূপসা ও ডুমুরিয়া উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩১ হাজার জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করেন। অন্যদিকে, বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় প্রায় তিন লাখ জেলে বসবাস করেন।

কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশীর জেলে আল আমিন জানান, ১৯ জন জেলেকে নিয়ে তিনটি নৌকার বহরে সাগরে যাচ্ছেন তিনি। তাদের কেউ কেউ মহাজনের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছেন। তবে সাগরে ভারতীয় জেলেদের আধিক্য এবং বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

শুঁটকি মৌসুমকে ঘিরে নতুন নতুন বনদস্যু বাহিনী সংগঠিত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। ফলে ঋণ নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের কাছে মাছ আহরণের পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে বনদস্যুদের হাত থেকে জেলেদের সুরক্ষায় বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে বন বিভাগ। জেলেদের নৌকাগুলো পাশাপাশি রাখার পাশাপাশি গভীর সমুদ্র কিংবা বনের গহিনে একা না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাতে ১৫ থেকে ২০টি নৌকা একসঙ্গে অবস্থান করার নির্দেশনাও রয়েছে। এ ছাড়া সুন্দরবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বনরক্ষী মোতায়েন থাকবে।

খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সাগরে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তার জন্য বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাদের গভীর সমুদ্রে একা যেতে নিষেধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বনরক্ষী মোতায়েন থাকবে।

তিনি আরও জানান, জেলেদের ঘর, ডিপো ও মাছ শুকানোর মাচা তৈরিতে সুন্দরবনের কোনো বনজ সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী নিজ নিজ এলাকা থেকে নিয়ে যেতে হবে। ৩০ অক্টোবর থেকে শুঁটকিপল্লিতে ঘর তৈরির কাজ শুরুর কথা রয়েছে।

1000333682

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-৬-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, ইতোমধ্যে ছয়টি বনদস্যু বাহিনীর ৭৪ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন। শুঁটকির সবচেয়ে বড় মোকাম দুবলার চরে এসআরবির একটি অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে। সেখান থেকেই নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

কোস্ট গার্ডের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, আসন্ন শুঁটকি আহরণ মৌসুমে মৎস্যজীবীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোন বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

সব মিলিয়ে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সাগরে পাড়ি জমানো জেলেদের জন্য এবারের শুঁটকি মৌসুম কেবল মাছ ধরার মৌসুম নয়, বরং ঋণ পরিশোধ করে পরিবার নিয়ে টিকে থাকার লড়াইও। পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া এবং নিরাপদে ঘরে ফেরার প্রত্যাশা নিয়েই সুন্দরবনের পথে যাত্রা করছেন তারা।