রংপুর সরকারি সিটি কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী এবার এইচএসসি পাস করেছেন। আইসিটিতেও পাস করেছেন। তাঁদের নিজেদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবহারিক পরীক্ষার ২৫ নম্বরের মধ্যে কিছু নম্বর তাঁরা পেয়েছেন শুধু উপস্থিত থাকার কারণে। খাতায় প্রোগ্রামিং লিখে নয়, ল্যাবে কিছু বানিয়ে নয়।
একই দেশে, একই সময়ে, ঢাকার বাগানবাড়ী আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিয়া সুলতানা দুই বছর আইসিটি পড়েও কম্পিউটারের একটি কী-বোর্ড-ও চাপেননি। বিদ্যালয়টিতে কম্পিউটার আছে একটি, আর শিক্ষার্থীদের ঘরেও নেই।
এই দুই চিত্রই আমাদের আইসিটি শিক্ষার প্রকৃত অবস্থান বলে দেয়। আমরা যে বিষয়টিকে 'ভবিষ্যতের দক্ষতা' বলে চালু করেছি, সেটি আসলে পরিণত হয়েছে একটি আনুষ্ঠানিকতায়—যেখানে পাস করার হিসাব থাকে, শেখার হিসাব থাকে না।
পরীক্ষার ফল যা বলছে, ফল যা গোপন করছে
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছর এই হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেননি ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন।
বিষয়ভিত্তিক হিসাবে চিত্রটি আরও কড়া। ইংরেজিতে অকৃতকার্য ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন, আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। এই দুই বিষয় মিলিয়ে ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন—যা মোট অকৃতকার্যের প্রায় ৬৪ শতাংশ।
এইচএসসিতে আটটি সাধারণ বোর্ডের ফল বিশ্লেষণে আইসিটি পাসের হার ৭২ দশমিক ৪৬ শতাংশ, ইংরেজিতে প্রায় ৬৩ শতাংশের ঘরে। রাজশাহী বোর্ডে আইসিটি পাসের হার ৬৮ দশমিক ৭৪, বরিশালে ৬৬ দশমিক ৪২।
এখানেই প্রশ্নের শুরুটা। কারণ এই একই দেশে প্রায় তিন মাস আগে এসএসসিতে আইসিটিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৯৯ শতাংশ—ঢাকা বোর্ডে ৯৮ দশমিক ৬৬, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৯৯ দশমিক ৯৯।
একই বিষয়, একই শিক্ষা ব্যবস্থা, দুই স্তরে দুই রকম ফল। এই ব্যবধান শিক্ষার্থীদের বুদ্ধির ব্যবধান নয়। এটি আমাদের মাপার পদ্ধতির ব্যবধান। এসএসসিতে আইসিটি একটি সহজে পাওয়া বিষয়—বহুনির্বাচনি প্রশ্ন আর নিজের প্রতিষ্ঠানেই নেওয়া ব্যবহারিকের দীর্ঘ নম্বর। আর এইচএসসিতে হঠাৎ বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ কম্পিউটার বিজ্ঞানে পরিণত হয়—বুলিয়ান অ্যালজেব্রা, ডি মরগানের উপপাদ্য, নেটওয়ার্কিং, ডেটাবেজ, সি++। নাম একটাই, বিষয় দুইটা। শিক্ষার্থী তাই ১৩ বছরের 'আইসিটি শিক্ষা' শেষ করে বের হয়, অথচ প্রযুক্তির আসল জগতে তার পা পড়ে না।
প্রথম ভুল: বাস্তবতা দেখতে না পাওয়া পাঠ্যক্রম
আইসিটি বাধ্যতামূলক হয়েছে ২০১৩ সালে। কিন্তু যে দিন সিদ্ধান্তটি হলো, সেই দিনই কি হিসাব রাখা হয়েছিল কোথায় শিক্ষক আছেন, কোথায় ল্যাব আছে?
ব্যানবেইসের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন বলছে, দেশের ৪ হাজার ৮৭৬টি কলেজে মোট আইসিটি শিক্ষক ৫ হাজার ৫ জন। তবে ২০৭টি কলেজে কম্পিউটার সুবিধাই নেই। আর স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ১ হাজার ৮৬৩ জন আইসিটি শিক্ষকের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানে আছেন মাত্র ৬৩ জন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির হিসাবে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য, এমপিওভুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শূন্যতা ৭৭ হাজার ২২৭। সব মিলিয়ে ৮০ হাজারের বেশি। আর কোনো আইসিটি শিক্ষকই নেই এমন মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৬১।
অর্থাৎ বিষয়টি চালু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পদ সৃষ্টি হয়নি। ২০১৩ সালে বাধ্যতামূলক হওয়ার পর বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ শুরু হয় ২০২১ সালে, ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে—মাত্র ১৪৫ জন। এখনো কর্মরত ১৩২ জন।
যেখানে শিক্ষক আছেন, সেখানেও ছবিটা করুণ। ঢাকা কলেজে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী, অথচ বিসিএস ক্যাডারে একজনও আইসিটি শিক্ষক নেই—ক্লাস নিচ্ছেন পদার্থবিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যার শিক্ষকেরা। নেত্রকোনা সরকারি কলেজে ২ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন। নওগাঁ সরকারি কলেজে ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইআইআরের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমানের কথায়, বই পরিমার্জিত হয়েছে, কিন্তু শ্রেণিকক্ষে বিষয়-শিক্ষক না থাকলে সেই পরিমার্জন কাজে লাগবে না।
দ্বিতীয় ভুল: যেখানে সবাইকে প্রোগ্রামার বানানোর চেষ্টা
প্রখ্যাত কম্পিউটার বিজ্ঞানী মোহাম্মদ কায়কোবাদের প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত: আমরা কি দেশের সব শিক্ষার্থীকে প্রোগ্রামার বানাতে চাই? না হলে এই স্তরে এসব বিষয় পড়ানোর যৌক্তিকতা কী?
বাস্তবতা হলো, যাঁরা প্রোগ্রামিং শিখতে চাননি, তাঁদের ওপরও একই পাঠ্যক্রম চাপানো হয়েছে। অথচ যাঁরা আইসিটি পড়েছেন, তাঁদের অনেকেই এখনো ই-মেইল খোলা, ফাইল সাজানো বা হিসাবের শিট বানানো শেখেননি।
জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো—টাইপিং, স্প্রেডশিট, নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার, তথ্যের সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা—কোনোটি পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রে নেই।
তৃতীয় ভুল: মুখস্থ করে পাস, ব্যবহারিক ছাড়াই নম্বর
আইসিটি এমন একটি বিষয়, যা বোর্ডে লিখে শেখানো যায় না। প্রথম আলোর এক মতামতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন ঠিক এই কথাই বলেছেন।
কিন্তু বাস্তবে যা হচ্ছে, তা উল্টো। বাংলা, ইংরেজি, দর্শন কিংবা ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক কয়েক মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে আইসিটি পড়াচ্ছেন। কুমিল্লা বোর্ডের ৪৫৬টি কলেজের ৫৬টিতে আইসিটি শিক্ষকই নেই; বাকিগুলোর অনেক জায়গায় শিক্ষক আছেন ডিপ্লোমা বা অস্থায়ী সনদ নিয়ে।
এর ফল শুধু ফেল নয়, ভয়। মইনুল হোসেনের ভাষায়, এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষয়টির প্রতি আগ্রহ নয়, বরং ভীতি জন্মেছে।
সংকটটি শুধু শিক্ষকের সংখ্যায় নয়। এবার নিয়মিত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ৩৬ শতাংশই পরীক্ষায় বসেননি, আর ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের পাসের হার শূন্য। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল শিক্ষকের ঘাটতিতে শেষ হয় না, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী ধরে রাখার ব্যবস্থাপনাতেও।
চতুর্থ ভুল: নীতির বারবার বদল, শিক্ষার্থী পরীক্ষা-পাত্র
এইচএসসি ফল প্রকাশের পর অনেকে বলছেন, এবার কঠোর মূল্যায়ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিনের ভাষায়, কৃত্রিমভাবে পাসের হার বাড়ানোর সংস্কৃতি থেকে সরকার সরে এসেছে।
কিন্তু কঠোর মূল্যায়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন শ্রেণিকক্ষে শেখানোর সুযোগ সমান থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের কথায়, প্রস্তুতি ছাড়াই বিষয় চালু হয়েছে, আর শিক্ষার্থীরা বারবার পরীক্ষা-পাত্র হয়েছে।
এবারের পরীক্ষার্থীরা যে ১০ বছরের শিখন ঘাটতি নিয়ে এসেছে, তার একটা বড় কারণ পরিকল্পনাহীনতা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মঞ্জুর আহমেদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শিক্ষার নয়টি ক্ষেত্রে দেওয়া ১১৮টি সুপারিশে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
আর সবচেয়ে বড় সংকটটি হয়তো শ্রেণিকক্ষেই। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের ভাষায়, গড়ে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে আসে।
ভবিষ্যতে যা করা যেতে পারে
প্রথম কাজ, বিষয়টিকে দুই ভাগ করা। মৌলিক 'ডিজিটাল সাক্ষরতা' সবার জন্য বাধ্যতামূলক হোক—টাইপিং, স্প্রেডশিট, ইন্টারনেট অনুসন্ধান, নিরাপত্তা, তথ্য যাচাই। আর 'কম্পিউটার বিজ্ঞান' হোক নির্বাচনী, যেখানে প্রোগ্রামিং, অ্যালগরিদম আর নেটওয়ার্কিং পড়বে তারা, যাদের সত্যিই আগ্রহ আছে।
দ্বিতীয় কাজ, শিক্ষক। মাউশি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য যে ৮৭২টি পদ প্রস্তাব করেছে, সেটি দ্রুত অনুমোদন ও নিয়োগ করতে হবে। ২০১৮ বিধিমালায় সরকারিকৃত কলেজগুলোর নন-ক্যাডার পদগুলো ক্যাডারে আনার দাবি জোরালো হতে হবে। কারণ সেখানে ২৫টি পদের বিপরীতে আবেদন পড়ে ২২ হাজার ৫০০টি—আগ্রহের অভাব নেই, ব্যবস্থার অভাব আছে।
শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি দরকার একটি সরবরাহ লাইন। আইসিটি বিষয়ে বিএড ও ডিপিএড কোর্স চালু করা, কম্পিউটার বিজ্ঞানের স্নাতকদের ল্যাব-প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী মেন্টর হিসেবে ব্যবহার করা—বুয়েটের অধ্যাপক অনিন্দ্য ইকবালের পরামর্শও এটাই।
তৃতীয় কাজ, মূল্যায়ন। ব্যবহারিকের ২৫ নম্বর উপস্থিতিতে মিলবে না। শিক্ষার্থীকে একটি ছোট প্রকল্প জমা দিতে হবে—ফাইল সংগঠিত করা, একটি হিসাবের শিট, একটি সাধারণ ওয়েবপেজ। মূল্যায়ন হোক বাইরের পরীক্ষকের।
চতুর্থ কাজ, যেখানে ল্যাব নেই সেখানে ন্যায্যতা। কম্পিউটার নেই অথচ ফল ভালো হবে—এমন আশা করা যায় না। তাই ল্যাব নেই এমন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য নম্বরে সমন্বয় থাকা উচিত। পাশাপাশি মোবাইল-ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম গড়ে তোলা যায়, কারণ কম্পিউটারের চেয়ে স্মার্টফোন শিক্ষার্থীর হাতে বেশি পৌঁছেছে।
পঞ্চম কাজ, পাঠ্যক্রমে তথ্য-সাক্ষরতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। শিক্ষার্থী এখন যন্ত্রের উত্তর যাচাই করতে শিখুক, ডিপফেক চিনতে শিখুক, নিজের তথ্য সুরক্ষিত রাখতে শিখুক। এটিই এখন সবচেয়ে জরুরি দক্ষতা, আর পাঠ্যক্রমে এটির নামগন্ধ নেই।
শেষ প্রশ্ন
জাতিসংঘের হিসাবে বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৪ বছরের তরুণদের ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ মৌলিক ডিজিটাল দক্ষতার বাইরে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের হিসাবে দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।
আমরা যদি এই অবস্থায়ও শুধু নম্বর বাড়ানোর দিকে তাকাই, তাহলে একটি প্রজন্ম সনদ হাতে বের হবে, হাতে কোনো দক্ষতা থাকবে না। প্রশ্নটি তাই এখন আর 'শিক্ষক কোথায়' নয়। প্রশ্নটি হলো—আমরা কি শিক্ষার্থীদের সনদ বানাতে চাই, না নাগরিক বানাতে চাই?