শুধু এলসি নয়, বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়নে চাই আরও বিকল্প

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমদানি-রপ্তানিতে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে আস্থা তৈরি এবং মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তা দিতে এলসির অবদান রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে ব্যবসার ধরন বদলেছে। বেড়েছে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, দ্রুত পণ্য সরবরাহের প্রয়োজন এবং ব্যবসায় অর্থের জোগান নিশ্চিত করার চাপ। তাই এখন শুধু এলসির ওপর নির্ভর না করে বাণিজ্য অর্থায়নের বিকল্প পদ্ধতিগুলো নিয়েও ভাবা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ছোট প্রতিষ্ঠানের ভালো ক্রেতা ও ব্যবসার সম্ভাবনা থাকলেও পর্যাপ্ত জামানত বা ব্যাংকঋণ পাওয়ার সক্ষমতা থাকে না। আবার প্রতিটি লেনদেনে এলসি খোলা ব্যয় ও সময়ের দিক থেকে সবার জন্য সুবিধাজনক নয়। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ থাকলে এসব প্রতিষ্ঠান উপকৃত হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ওপেন অ্যাকাউন্ট, ডকুমেন্টারি কালেকশন এবং সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ওপেন অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থায় পণ্য পাঠানোর পর নির্ধারিত সময়ে ক্রেতা মূল্য পরিশোধ করেন। ডকুমেন্টারি কালেকশনে ব্যাংক রপ্তানিকারকের পক্ষে ডকুমেন্ট (বিল অব এক্সচেঞ্জ, ইনভয়েস, বিল অব লেডিং) ক্রেতার ব্যাংকের মাধ্যমে উপস্থাপন করে। তবে এসব পদ্ধতিতে এলসির মতো ব্যাংকের নিজস্ব মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তা থাকে না। তাই ক্রেতার আর্থিক সক্ষমতা ও অর্থ আদায়ের ঝুঁকি যাচাই করা জরুরি।

সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সের একটি উদাহরণ হতে পারে রিভার্স ফ্যাক্টরিং। ধরা যাক, একটি ছোট প্রতিষ্ঠান বড় একটি রপ্তানিমুখী কারখানায় পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য সরবরাহ করে। চুক্তি অনুযায়ী কারখানাটি ৬০ দিন পর মূল্য পরিশোধ করবে। কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল কেনা ও শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার জন্য এখনই অর্থ প্রয়োজন। এ অবস্থায় বড় ক্রেতার অনুমোদিত চালানের বিপরীতে ব্যাংক বা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান সরবরাহকারীকে আগাম অর্থ দিতে পারে। পরে নির্ধারিত সময়ে ক্রেতা ব্যাংককে অর্থ পরিশোধ করবে। এতে ছোট সরবরাহকারী দ্রুত অর্থ পায়, আর বড় ক্রেতাও তার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী রপ্তানি সম্পন্ন করে এবং মূল্য পরিশোধ করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বিকল্প অর্থায়নের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েছে। ২০২৬ সালের ১১ জুন জারি করা FEPD-1 Circular No. 11-এ ওপেন অ্যাকাউন্ট, ডকুমেন্টারি কালেকশন, সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স, ফ্যাক্টরিং ও রিসিভেবলস ফাইন্যান্সিংয়ের মতো পদ্ধতি নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই বছরের ১ জুলাই FEPD-1 Circular No. 15-এর মাধ্যমে অনুমোদিত বাণিজ্য করিডরে এলসি ও ডকুমেন্টারি কালেকশনের আওতায় ডকুমেন্ট ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণের পাইলট কাঠামো চালু করা হয়েছে। ৩০ জুলাই FEPD-1 Circular No. 26-এর মাধ্যমে রপ্তানি বাণিজ্যসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রা নিয়মনীতি একীভূত ও হালনাগাদ করা হয়েছে।

তবে বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে। ক্রেতার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য, পণ্য সরবরাহ এবং অর্থ প্রত্যাবাসনের বিষয়গুলো যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে গ্রাহক যাচাই, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য ঘোষণাপত্র, টেরোরিস্ট ফাইন্যান্সিং প্রতিরোধ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।

ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহারও এ পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে। ই-ইনভয়েস, ইলেকট্রনিক বিল অব লেডিং এবং ডিজিটাল ট্রেড ডকুমেন্টের আদান-প্রদান দ্রুত করা সম্ভব। এতে সময় ও কাগজের ব্যবহার কমবে এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। তবে এর জন্য নিরাপদ প্রযুক্তি, ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং গ্রহণযোগ্য আইনি কাঠামো প্রয়োজন।

এলসি বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেই থাকবে। তবে সব ব্যবসার জন্য একই পদ্ধতি কার্যকর নয়। বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত উদ্যোগে বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়নের ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশের রপ্তানি খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। লক্ষ্য এলসিকে বাদ দেওয়া নয়; বরং ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক অর্থায়ন পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা।

লেখক: নুসরাত আলম, ট্রেড ফাইন্যান্স প্রফেশনাল