 অবৈধ অর্থায়ন

রাজনীতিকে স্বচ্ছ রাখতেই হবে

বহুমাত্রিক ও প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, রাজনীতি ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ বিপরীত বিষয়, ‘একটি ব্যাধি অপরটি স্বাস্থ্য’। আর অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ও কোচ পল উইলসন বলেছেন, ‘রাজনীতিতে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, একটি হলো টাকা আর অন্যটি কী তা আমি মনে করতে পারছি না’। এই দুই খ্যাতিমানের  উক্তিগুলো আমরা যে দৃষ্টিকোণ থেকে, যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই বিশ্লেষণ করি না কেন তাতে রাজনীতির কদর্য দিকটিই সামনে আসে। অথচ দেশে দেশে ‘জনকল্যাণের ওপর নামই রাজনীতি’ এই বাক্যবন্ধটিই বহুল প্রচলিত-শ্রুত। রাজনীতি নিয়ে এই অন্তহীন তর্ক যুগ-যুগান্তরের। এর মধ্যে উঠে আসে আরও নতুন নতুন উপসর্গ, যেমনটি প্রতিফলিত হয়েছে ২ নভেম্বর দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত খবরে দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর (টিআইবি) প্রতিবেদনে। টিআইবির মনে করছে, রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে অবৈধ অর্থায়ন হচ্ছে। দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে মনোনয়ন বাণিজ্যের তথ্যের কথা জানিয়ে টিআইবি আরও বলছে, মাঠপর্যায়ে একটি নির্বাচনী আসনে প্রার্থীর ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের তথ্য দলগুলোর নেতাদের কাছ থেকেই পেয়েছে সংস্থাটি। সংস্থাটির অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ ক্ষীণ। ১ নভেম্বর রাজধানীর ধানম-ির মাইডাস সেন্টারে সংস্থাটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তা প্রীতিকর নয়। আমরা জানি, ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’র অভিযোগ নতুন কিছু নয়। দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহির ক্ষেত্রে ঘাটতির বিষয়গুলো পুরনো। অনেক রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে সমাজবিরোধীদের আস্ফালন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, কু-নজির আছে এরও। আমাদের আরও তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সংঘাতের পাশাপাশি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলও কখনো কখনো সহিংসতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং এ রকম অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা বেশি ঘটে বড় দলগুলোর ক্ষেত্রে। অনস্বীকার্য, গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাদের রাজনীতির অর্জন কম নয়, কিন্তু এর সমান্তরালে বিসর্জনের তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। দলের ভেতর যদি সুশাসনের আলো না ছড়ায় তাহলে রাষ্ট্র-সমাজে অন্ধকারের ছায়া ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অমূলক নয় এবং স্বাধীনতা অর্জনের পাঁচ দশক পরও তা অনভিপ্রেতভাবে রাজনীতি ও এর নীতিনির্ধারকদের ইতিমধ্যে বহুবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর দায় তারা এড়াতে পারেন না।

রাজনৈতিক দলগুলোর আয়ের উৎস, ব্যয়ের ক্ষেত্রগুলোর ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি সচেতন মহল থেকে ইতিমধ্যে কম ওঠেনি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এই দাবি উপেক্ষা-অবজ্ঞার স্রোতে বারবার ভেসে গেছে। জবাবদিহির সংস্কৃতিই যেখানে গড়ে ওঠেনি সেখানে অনাচার-দুরাচার-কদাচারের ছায়ার পরিসর বাড়তেই থাকবে এটাই স্বাভাবিক এবং অনেক ক্ষেত্রে হয়েছেও তাই। নাগরিক সমাজের কাছে রাজনীতিকদের জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ও বহুবিদ্যাবিশারদ অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থায় সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে’। অনেক গণতান্ত্রিক দেশের শাসনতন্ত্রে তা অন্তর্ভুক্তও হয়েছে  এবং এর বাইরে আমরাও নই। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব, নীতি-আদর্শ, কর্মকাণ্ড যদি হয় জনগণের প্রতিকূল তাহলে রাজনীতি নিয়ে জনকল্যাণের ওই আপ্তবাক্য নিরর্থক হয়ে দাঁড়ায়। আমরা মনে করি, রাজনীতিবিহীন সমাজ বদ্ধ জলাশয়ের মতো। কিন্তু রাজনীতিতে সর্বাগ্রে নিশ্চিত হওয়া জরুরি স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি। আমরা চাই রাজনীতি বিকশিত হোক। একই সঙ্গে রাজনীতির নামে গজানো বিষবৃক্ষের মূলোৎপাটন হোক। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, প্রতিবাদ যখন নিজেদের স্বার্থের জন্য না হয়ে সাধারণ মানুষের জন্য হয় তখন সেই প্রতিবাদ থেকে গণপ্রতিরোধ গড়ে ওঠে এবং এর নজির এই ভূখণ্ডে  স্বাধীনতা-পূর্ব তো বটেই, স্বাধীনতা-উত্তরও কম নেই। রাজনীতির নীতিসূত্রে দেশ-জাতির স্বার্থ অগ্রগণ্য থাকতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলার মূল চালিকাশক্তি হলো রাজনৈতিক স্বচ্ছতা এবং সুশাসন। অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাবের বৈরী ছায়া সরিয়ে, কোনো দলে অপরাধে জড়িতদের যাতে আশ্রয় না হয় তা নিশ্চিত করে সুস্থ রাজনীতির পথ সুগম করা রাজনীতিকদের দায়। রাজনীতিকে স্বচ্ছ রাখতে পারে একটি মাত্র উদ্দেশ্য এবং তা হলো দেশ-জাতির জন্য ভালো কিছু করা।