শিক্ষার্থীদের আকাক্সক্ষায় শিক্ষকের সার্থকতা

আমি শিশুদের বিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রতি দিন শত শত শিশুর কলকাকলিতে মুখরিত হয় আমার বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ। অভয়ারণ্যের কূজনের মতো আমার প্রাণে ঝঙ্কার তোলে নিষ্পাপ শিশুদের কণ্ঠ। এই অরণ্যের রক্ষক হিসেবে শিশুদের শুধু দেখেশুনে রাখি না এখানকার শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরে তারা কীভাবে তাদের জীবন পরিচালিত করবে সে পরামর্শও দিই। শিশুরা কাদামাটির মতো। তাদের যা বলি তাই করে, একটুও দেরি করে না। শিশুরা পুতুল বানায়। সেই পুতুল নিয়ে কল্পনার সংসার সাজায়। শিক্ষার্থীরা আমার কাছে পুতুলের মতো। আমি তাদের নিয়ে খেলি। তাদের সঙ্গে খেলতে পছন্দ করি। তাদের কল্পনার জগৎ সাজাতে সহযোগিতা করি। একজন সুরকার যেমন গীতিকবিতার কথাগুলো নিয়ে সুর ভাঁজেন আমিও তেমনি শিশুদের কল্পনার জগৎ ভাঁজি। শিক্ষার্থীদের মুখস্থ নির্ভরতা থেকে বের করে আনার জন্য আমার দুটো ডিজিটাল ইনোভেশন আছে। একটার শিরোনাম লিটল সেলিব্রিটি; অন্যটার শিরোনাম স্মার্ট লার্নার। দুটোর শুরু একই রকম। শ্রেণিকক্ষে অনুচ্ছেদ লেখাই যা পাঠ সংশ্লিষ্ট কিন্তু পাঠ্যবইয়ের অনুশীলনী অংশে দেওয়া নেই। অনুচ্ছেদের বিষয় আগে বলি না। যখন বলি তখনই লেখাই। তাতে তাদের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে। ভালো অনুচ্ছেদগুলো খবরের কাগজে পাঠাই। ছাপা হলে কাগজটা কিনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে দিই। তাদের বলি আমি লিটল সেলিব্রিটি। যুক্তবর্ণ শেখানোর জন্য শিক্ষার্থীদের আমি স্মার্ট লার্নার বানাই। তারা নিজের লেখা অনুচ্ছেদ ল্যাপটপে টাইপ করতে পারে। বড় বড় মানুষ বাংলা কিবোর্ড ব্যবহার করতে পারে না। আমার শিক্ষার্থীরা পারে। তাদের লেখা গল্প, কবিতা ও অনুচ্ছেদ এবং তাদের আঁকা ছবি বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত মাসিক শিশু এবং বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়। এই আনন্দের বিশালতা পরিমাপ করা যায় না।

পহেলা বৈশাখের আগে তাদের বলেছি, তোমরা কে কোন পেশায় যেতে চাও এবং কেন যেতে চাও সেগুলো আমরা পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে শুনব। মেয়েরা শাড়ি আর ছেলেরা বড়দের মতো যে কোনো পোশাক পরে আসবে। অবাক হয়ে গিয়েছি। তারা তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী অথচ কী সুন্দর করে সেজে এসেছে! গুছিয়ে কথা বলেছে। কেউ ডাক্তার, কেউ শিক্ষক; সবাইকে আমরা কাগজের ব্যাজ লাগিয়ে দিয়েছি। এক দিন তাদের চোখ বন্ধ করতে বলেছি। তাদের মনের পর্দায় সমুদ্রের একটা দৃশ্য কল্পনা করতে বলেছি। তারা জাহাজে করে চট্টগ্রাম যাচ্ছে। জাহাজের পেছনে শঙ্খচিল ওড়াউড়ি করছে। এ রকম কিছু কথা বলার পরে চোখ খুলতে বলেছি। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই তারা কয়েকজন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেছে, আমি দেখেছি! প্রথম পিরিয়ডে আমি তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বিষয়ের পাঠ পরিচালনা করি। শেষ পিরিয়ডেও তাদের সঙ্গে থাকি। কিছু দিন ধরে আদর্শ ছেলে কবিতাটা পড়াচ্ছি। তিনটা পাঠ চলে যাওয়ার পরে বললাম, তুমি যদি প্রধানমন্ত্রী হও তাহলে দেশের জন্য কী কী করবে সেগুলো লেখো। শিশুরা জানতে চাইল এই অনুচ্ছেদের শিরোনাম কী হবে। আমি বললাম, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি। বলার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে এমন একটা ভাব চলে এলো যা আমি লিখে প্রকাশ করতে পারব না। কী আর বয়স, আট কিংবা ৯ বছর। মনে হলো যেন তারা এক দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে। আমি এখন তাদের লেখা থেকে কয়েকটা বাক্য আপনাদের শোনাব। নাজিম লিখেছে, আমি এক জন প্রধানমন্ত্রী। আমার কিছু কর্তব্য রয়েছে। আমি সর্ব প্রথম জিনিসপত্র ও খাবারের দাম কমাতে চাই। কারও পা নেই, কেউ অসুস্থ, এ রকম মানুষকে দোকান খুলে দেব যাতে তারা দুই বেলা খেতে পারে।

তাহারিন লিখেছে, ছোট ছোট শিশুদের দুধ দিতাম। গরিবদের ভালোভাবে সকালের নাশতা দিতাম। প্রধান শিক্ষকের জন্য বেশি বেশি টাকা দিতাম। হাসিবা লিখেছে, একশ টাকার বিরিয়ানি পঞ্চাশ টাকায় দিতাম। গ্যাসের দাম কমিয়ে দিতাম। আদর্শ শিক্ষক বানাতাম। বেশি বেশি বিদ্যুৎ দিতাম। তাকিয়া লিখেছে, আমি একটি বড় জেল বানাব যেখানে অনেক বড় বড় শাস্তি থাকবে। এই জেলটি হবে বড় বড় চোর, ডাকাত ও খুনিদের জন্য। চন্দন লিখেছে, যাদের অর্থ কম তাদের অল্প অর্থে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ করে দেব। ফারিয়া লিখেছে, যারা বাচ্চাদের ধরে নিয়ে মেরে ফেলে তাদের শাস্তি দেব। বাচ্চাদের চকলেট দেব। সোহানা লিখেছে, আমি যদি প্রধানমন্ত্রী হতাম তাহলে খারাপ কাজ করতে দিতাম না। শিমু লিখেছে, অনেক রাস্তা ভাঙা থাকে। আমি সেই রাস্তা ঠিক করাব যাতে কারও ক্ষতি ও সমস্যা না হয়। তাসফিয়া লিখেছে, গরিবদের কাপড় দেব; চাল-ডাল ইত্যাদি দেব। আরাফ লিখেছে, বৃদ্ধাশ্রমে যত মানুষ আছে তাদের দেখতে যাব। কে এম তামিম লিখেছে, স্কুলের যেসব শিক্ষক বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য বেশি চেষ্টা করেন তাদের উপহার দেব।

শিশুমনের ভাবনাগুলো আমার কাছে খুব ভালো লাগল। ভাবতে ভাবতেই তারা বড় হোক। মানবিক মানুষ হোক। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সবার সব কষ্ট দূর করা যায় কি না সেটাও তারা এক সময় বুঝবে। সমস্যা সৃষ্টি না করাই যে দেশের কল্যাণ তারা যদি সেটা বুঝতে পারে তা হলেই তাদের পড়াশোনা সার্থক। শিক্ষক হিসেবে চাকরি পাওয়া আমার জন্য খুব সহজ ছিল। পরে বুঝেছি, চাকরি পেলেই প্রকৃত শিক্ষক হয়ে ওঠা যায় না। এ জন্য সাধনা করতে হয়। একুশ বছরের বেশি সময় একজন প্রকৃত শিক্ষক হওয়ার জন্য সাধনা করে যাচ্ছি। আমার শিক্ষার্থীরা নিজেকে একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কল্পনা করছে। শিক্ষক হিসেবে আমি সফল।

লেখক : শিক্ষক