স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের আগে বাংলাদেশকে আরও তিন বছর প্রস্তুতির সময় দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়ে বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত এসেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তরণের সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) কাছে বাংলাদেশ সরকার ১৮ ফেব্রুয়ারি সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিল। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) সুপারিশের ভিত্তিতে সাধারণ পরিষদ এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। কিন্তু সময় বাড়লেই কি উত্তরণের ঝুঁকি কমবে, নাকি এটি প্রয়োজনীয় সংস্কার পিছিয়ে দেওয়ার আরেকটি অজুহাত হয়ে উঠবে?
জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের আবেদনে জি-৭৭ দেশগুলোর সমর্থন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতিবাচক অবস্থান কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আন্তর্জাতিক সমর্থন যতই থাকুক, দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা দূর করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই। তিন বছরের অতিরিক্ত সময়কে তাই শুধু আন্তর্জাতিক সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি হতে হবে অর্থনৈতিক প্রস্তুতি ও সংস্কারের সময়। এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। জাতিসংঘের ২০২৪ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের জন্য মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের নির্ধারিত সীমা ছিল ১ হাজার ৩০৬ ডলার, মানবসম্পদ সূচকের সীমা ৬৬ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকিপ্রবণতা সূচকের সর্বোচ্চ সীমা ৩২। বাংলাদেশের অর্জন ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৬৮৪ ডলার, ৭৭ দশমিক ৫ এবং ২১ দশমিক ৯। অর্থাৎ বাংলাদেশ তিনটি মানদণ্ডেই উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। কিন্তু যোগ্যতা অর্জন এবং উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি করা এক বিষয় নয়। এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজারসুবিধা কমে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নতুন চাপের মুখে পড়বে।
বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিকারকরা বর্তমানে ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্যিক জোটে এলডিসি-সংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকারমূলক সুবিধায় শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশের সুযোগ পান। সরকারি সূত্রের হিসাবে, দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ এসব বিশেষ সুবিধার আওতায় রয়েছে। তৈরি পোশাক খাত মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ জোগান দেয়। ফলে রপ্তানি আয় একটি খাত ও সীমিত কয়েকটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। বৈশ্বিক চাহিদা, উৎপাদন ব্যয় কিংবা বাণিজ্যনীতিতে পরিবর্তন এলেই এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। অতিরিক্ত তিন বছরকে তাই শুধু বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ওষুধ, চামড়া, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। এসব খাতে পণ্যের মান, প্রযুক্তি, গবেষণা, দক্ষ জনবল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অর্থনীতির দুর্বলতা সম্পর্কে সতর্ক করছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আগস্টে নীতি সুদহার কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নির্ধারণ করলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি একই মাসে নেমে আসে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে ওই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ২২ শতাংশ এবং শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ০ দশমিক ২৮ শতাংশ। এসব তথ্য বিনিয়োগের মন্থরতা, ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতি এবং উৎপাদন খাতের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে।
উত্তরণের প্রস্তুতিতে শুধু সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চমূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের প্রকৃত আয় কমিয়ে দেয়। জ্বালানি, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও পরিবহন সুবিধা এবং উৎপাদনমুখী ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ব্যাংকিং খাতের সংকট উত্তরণ-প্রস্তুতির অন্যতম বড় বাধা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি কেন্দ্রীভূত। এই বিপুল খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমায়, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করে এবং আর্থিক খাতের প্রতি আস্থা দুর্বল করে। শুধু নিয়ম শিথিল বা ঋণ পুনঃতফসিল করে এ সংকটের সমাধান হবে না। বড় ঋণখেলাপিদের দায় নির্ধারণ, অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার এবং ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পেশাগত দক্ষতা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায়ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা উন্নয়ন অর্থায়নের সক্ষমতাকে সীমিত করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের সাময়িক রাজস্ব আদায়ের ভিত্তিতে কর-জিডিপি অনুপাতের হিসাব দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। এই হিসাব পূর্ণাঙ্গ সরকারি রাজস্বের চূড়ান্ত অনুপাত নয়; তবে রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের জন্য রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ, অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি পর্যালোচনা এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আয়করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সম্পদ ও উচ্চ আয়ের ওপর ন্যায্য কর নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে রাজস্ব বাড়ানোর বোঝা যেন ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর না পড়ে। এলডিসি উত্তরণের পর উন্নয়ন অর্থায়নেও পরিবর্তন আসতে পারে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পাওয়া কিছু অনুদান, সহজ শর্তের ঋণ এবং বিশেষ সুবিধা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়নে চাপ বাড়তে পারে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি। ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিবর্তন এবং সাশ্রয়ী ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
শ্রমবাজারের প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বিদেশি ভাষাজ্ঞান এবং শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা টেকসই হবে না। নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো এবং দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রযুক্তি, বাজারসংযোগ এবং আন্তর্জাতিক মান সনদ পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। এই সংস্কারগুলো বিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়ন করলে কাক্সিক্ষত ফল আসবে না। বাণিজ্য, অর্থ, শিল্প, শ্রম, শিক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘এলডিসি উত্তরণ সংস্কার কাউন্সিল’ গঠন করা যেতে পারে। কাউন্সিলের দায়িত্ব হবে সংস্কারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রতি ছয় মাসে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা। জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশলের প্রতিটি লক্ষ্যের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য সূচক নির্ধারণ করতে হবে। শুধু পরিকল্পনা বা সভার সংখ্যা নয়; রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন কর্মসংস্থান, কর আহরণ, খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের বাস্তব অগ্রগতিই হবে সাফল্যের মাপকাঠি।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির বক্তব্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এলডিসি উত্তরণ শুধু আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জনগণের আকাক্সক্ষা ও জাতীয় অঙ্গীকার। এই বিষয়টি আমলে রাখা জরুরি , সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অতিরিক্ত তিন বছর কোনো অবকাশ বা সংস্কার স্থগিত রাখার অনুমতি নয়। বরং ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ২০২৯ সালের আগে এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করতে পারলে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য কেবল আন্তর্জাতিক মর্যাদার স্বীকৃতি হবে না; তা একটি প্রতিযোগিতামূলক, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ভিত্তিও শক্তিশালী করবে।
লেখক : অর্থনীতির বিশ্লেষক, গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।
matiurrahman588@gmail.com