নয়ন মরিচে শফিক বিপ্লবের বাজিমাত

বাজারে মরিচের দাম বাড়লে দুশ্চিন্তা বাড়ে গৃহস্থের। অথচ বাড়ির আঙিনা কিংবা ছাদবাগানের টবে মরিচ চাষ করেই মেটানো যেতে পারে পরিবারের চাহিদা। এমনই সম্ভাবনা দেখাচ্ছেন শফিকুর রহমান, যিনি শফিক বিপ্লব নামে পরিচিত। তার সংগ্রহ করা ‘নয়ন মরিচ’ সম্পর্কে দাবি, গাছটি ১২ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়, ১০-১২ বছর বাঁচে এবং সারা বছর ফল দেয়। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় আট হাজার চারা ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।

পেশায় কৃষি কর্মকর্তা নেশায় কৃষক

শফিক বিপ্লব পেশায় একজন ডিপ্লোমাধারী কৃষিবিদ ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি ছাদবাগানি, বাটারফ্লাই কালেক্টর, পাখিপ্রেমী ও উদ্যোক্তা হিসেবেও পরিচিত।

প্রায় ১৭-১৮ বছর আগে পাহাড়ি ও সমতল বন, পানবরজ এবং সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনি এক ধরনের বন্য মরিচের গাছ সংগ্রহ করেন। তবে তখন চেষ্টা করেও সেগুলোর চারা উৎপাদন করতে পারেননি। পরে ২০১৯ সালে তিনি চারা উৎপাদনে সফল হন। নিজের সংগ্রহ করা এই মরিচের নাম দেন ‘নয়ন মরিচ’।

শফিক বিপ্লবের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্য পাখির মাধ্যমে এই মরিচের বীজ ছড়িয়ে পড়তে পারে। মরিচটির প্রতি পাখির আকর্ষণও তার পর্যবেক্ষণে এসেছে। পাখি ও উদ্ভিদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের জন্যও বিষয়টি আগ্রহের হতে পারে।

নয়ন মরিচের বৈশিষ্ট্য

নয়ন মরিচের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শফিক বিপ্লব তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেন গাছের দীর্ঘ জীবনকাল, বছরজুড়ে ফলন এবং তুলনামূলক দ্রুত বৃদ্ধি। তার দাবি, অনুকূল পরিবেশে এই মরিচের গাছে চারা লাগানোর প্রায় তিন মাস পর থেকেই ফল আসতে শুরু করে। গাছটি সারা বছর মরিচ দেয় এবং ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। নিজের পর্যবেক্ষণে তিনি গাছটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ফুট পর্যন্ত পেয়েছেন। একটি গাছ থেকে মাসে আনুমানিক এক কেজি মরিচ পাওয়া যায় বলেও জানান তিনি। সেই হিসাবে, দুটি গাছ থেকে একটি পরিবার নিজেদের প্রয়োজনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মরিচ পেতে পারে।

তবে গাছের ১০-১২ বছর আয়ুষ্কাল, মাসে এক কেজি ফলন এবং সারা বছর উৎপাদনের বিষয়গুলো এখনো তার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও দাবি। বিভিন্ন পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষার মাধ্যমে ফলনের পরিমাণ ও স্থায়িত্ব যাচাই করা গেলে জাতটির সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যাবে।

নয়ন মরিচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে শফিক বিপ্লব উল্লেখ করেন এর রঙের পরিবর্তন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, কাঁচা অবস্থায় মরিচটি গাঢ় সবুজ থাকে। পাকলে ধারণ করে কমলা রঙ। স্বাদের দিক থেকেও মরিচটি তার কাছে বিশেষ। তিনি জানান, সাধারণ মরিচের তুলনায় এর ঝাল কিছুটা বেশি এবং স্বাদও ভালো। আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো গাছটির ছায়াযুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠার সক্ষমতা। শফিক বিপ্লবের অভিজ্ঞতায়, বাড়ির আঙিনার আধোছায়াযুক্ত ও কিছুটা স্যাঁতসেঁতে জায়গায়ও এই মরিচের গাছ ভালো হয়। যেসব জায়গায় সরাসরি রোদ কম পড়ে কিংবা অন্য ফসল চাষ করা কঠিন, সেসব স্থানেও এটি পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো যেতে পারে।

চাষ করা যাবে টবেও

শহরের বাসিন্দাদের জন্য নয়ন মরিচের একটি সম্ভাবনাময় দিক হলো এটি শুধু জমিতে নয়, বড় টবেও চাষ করা যায়। শফিক বিপ্লব জানান, তিনি কয়েকশ ছাদবাগানির কাছে এই মরিচের চারা দিয়েছেন। যাদের ছাদে বড় টব রয়েছে এবং আশপাশের ভবন থেকে কিছুটা ছায়া পড়ে, তাদের কয়েকজনের বাগানে গাছটি ভালো হয়েছে বলে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন।

ছাদবাগানে নয়ন মরিচ লাগাতে চাইলে পর্যাপ্ত জায়গাযুক্ত বড় টব নির্বাচন করা, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা এবং জৈব উপাদানসমৃদ্ধ মাটি ব্যবহার করার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। গাছের গোড়ায় যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

নয়ন মরিচের পরিচর্যা

নয়ন মরিচের পরিচর্যা সম্পর্কে শফিক বিপ্লবের অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন। তার দাবি, গাছটি রাসায়নিক সার ভালোভাবে সহ্য করতে পারে না; জৈব সার ব্যবহার করেই তিনি পরিচর্যা করেন।

তিনি আরও জানান, কড়া রোদে গাছের পাতা লালচে হয়ে যেতে পারে এবং বছরের কিছু সময়ে পাতায় ভাঁজ পড়তে দেখা যায়। এ কারণে গাছের পরিবেশ ও পাতার পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।

রোগবালাই সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা হলো, বড় গাছে সাধারণত রোগ ও পোকার আক্রমণ দেখা যায় না। তবে চারার ক্ষেত্রে মাইট দমনের জন্য তাকে ব্যবস্থা নিতে হয়। তার এই পর্যবেক্ষণকে সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য হিসেবে নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পরিবেশে গাছটির রোগবালাই নিয়ে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

নিজের সংগ্রহ করা মরিচটি শুধু নিজের বাগানে সীমাবদ্ধ রাখেননি শফিক বিপ্লব। অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার শৌখিন সংগ্রাহকদের কাছে তিনি চারা পাঠিয়েছেন।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় আট হাজার চারা কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়েছেন। সীমিত মূল্যে এসব চারা সংগ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। ছাদবাগানিদের পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায় গাছ লাগাতে আগ্রহী ব্যক্তিরাও তার কাছ থেকে চারা নিয়েছেন। শফিক বিপ্লব জানান, বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে তার নিজের ১৫টি মাতৃগাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে চারা উৎপাদন ও জাতটি সংরক্ষণের কাজ করছেন তিনি।

তার দাবি, নয়ন মরিচের চারা উৎপাদনের জন্য বিশেষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তার নিজের পাশাপাশি কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাছেও বর্তমানে চারা রয়েছে। মসলা গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানও তার কাছ থেকে চারা নিয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

নয়ন মরিচ এখনো বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে না। শফিক বিপ্লবের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি মূলত শৌখিন সংগ্রাহক ও ছাদবাগানিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে তার মতে, বাড়ির পাশে আধোছায়াযুক্ত জায়গা, ভবনের কারণে কম রোদ পড়ে এমন স্থান কিংবা অন্য ফসল চাষ করা কঠিন এমন জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে নয়ন মরিচ চাষ করা যেতে পারে। ক্ষুদ্র পরিসরে বাণিজ্যিক চাষেরও সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করার আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি। প্রতি গাছে প্রকৃত ফলন কত, বাজারে মরিচটির চাহিদা কেমন, উৎপাদন খরচ কত এবং দীর্ঘমেয়াদে গাছের ফলন বজায় থাকে কি না এসব তথ্যের ভিত্তিতেই লাভজনকতা নির্ধারণ করা সম্ভব। এখনো নয়ন মরিচের নির্দিষ্ট বাজারমূল্য বা বাণিজ্যিক উৎপাদনের হিসাব পাওয়া যায়নি। ফলে এই পর্যায়ে এটিকে নিশ্চিত লাভজনক ফসল না বলে সম্ভাবনাময় একটি মরিচ হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।

দিতে পারে সাধারণ ক্রেতাদের স্বস্তি

বাংলাদেশে কখনো কখনো মরিচের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে বাড়ির আঙিনা বা ছাদে মরিচ চাষের আগ্রহ বাড়ানো গেলে পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদার একটি অংশ নিজেরাই পূরণ করতে পারে।

শফিক বিপ্লবের ভাবনাও অনেকটা সে রকম। তার মতে, বাড়িতে এক বা একাধিক নয়ন মরিচের গাছ থাকলে দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের প্রয়োজনের মরিচ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি গাছের ফল পাখির খাদ্য হিসেবেও কাজে আসতে পারে।

বন্য মরিচের একটি সংগ্রহ করা গাছ থেকে চারা উৎপাদন, সেই চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংগ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ছাদবাগানে এর চাষের সুযোগ তৈরি এই ধারাবাহিক কাজের মধ্য দিয়ে নয়ন মরিচকে পরিচিত করে তুলছেন শফিক বিপ্লব।

তার দাবি করা দীর্ঘ আয়ুষ্কাল ও বছরজুড়ে ফলনের বিষয়গুলো বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা গেলে জাতটির সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হবে। সেই সঙ্গে পরীক্ষিত চাষপদ্ধতি তৈরি করা গেলে শখের বাগান থেকে ক্ষুদ্র পরিসরের উৎপাদন দুই ক্ষেত্রেই নয়ন মরিচ নতুন আগ্রহ তৈরি করতে পারে।

শফিক বিপ্লবের এই উদ্যোগের মূল আকর্ষণ তাই শুধু একটি নতুন নামে পরিচিত মরিচ নয়; বরং বাড়ির অব্যবহৃত জায়গা ও ছাদবাগানকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদে মরিচ উৎপাদনের সম্ভাবনা খুঁজে দেখা।