ছয় মাসে প্রাণিজ পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ২১৭%

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মানদ- অনুযায়ী দুধে খানিকটা পিছিয়ে থাকলেও মাংস ও ডিমের উৎপাদন দেশের একেকজন মানুষের গড় চাহিদার বেশি। যা ধারাবাহিকভাবেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পর্যায়ে স্থানীয় চহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি। ছয় মাসে (মার্চ থেকে আগস্ট) এই রপ্তানি বেড়েছে ২১৭ শতাশের বেশি। রপ্তানির পরিমাণ আরও বাড়াতে সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে জানা গেছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে এ খাতের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় এসেছে এক কোটি ৪ লাখ ৬৩ হাজার ডলারের। যা আগের ছয় মাসের তুলনায় ২১৭ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে গত আগস্টেও ৪৮ লাখ ৮২ হাজার ডলার।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রপ্তানির তালিকায় প্রাণিসম্পদ খাতের নানা পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে মাংস ও মাংসজাত পণ্য, বুল স্টিক, দধি, রসমালাই, মিষ্টি (দুগ্ধজাত পণ্য), হাঁসের পালক, জিলেটিন, গরুর লেজের লোম, কবুতর, ওম্যাজাম, মোগলাই পরোটা (ডিমজাত পণ্য), মহিষ/গরুর শিং, টুকরা চামড়া ও ভেটেরিনারি মেডিসিন সাপ্লিমেন্ট পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।

এসব পণ্যের রপ্তানি গন্তব্যের তালিকায় রয়েছে মালদ্বীপ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়া, মিসর, কুয়েত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং এবং নেপাল।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬২ ডলার। পরের ছয় মাসে রপ্তানি বেড়েছে ২১৭ শতাংশের বেশি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বলেন, আমিষের স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি বাড়ানোর জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, নিরাপদ প্রাণীজ খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পণ্যের গুণগত মান, খাদ্য নিরাপত্তা, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মানদ- মেনে পণ্য উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী নিরাপদ, মানসম্মত ও হালাল প্রাণিজাত পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই মান নিশ্চিত করতে তৈরি করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার এবং খোজা হচ্ছে নতুন রপ্তানি বাজার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত যেসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে তার পাশাপাশি নতুন করে হালাল পণ্যে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ বিশ^ব্যাপী হালাল পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। এই বাজার ধরতে হলে সার্টিফিকেশন, পণ্যের ট্রেসিবিলিটি গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে রয়েছে সরবরাহ চেইনের আধুনিকায়নের বিষয়। সরকার এই বিষয়গুলোতে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে যাতে করে হালাল পণ্যের রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করতে পারে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, রপ্তানির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনেও অগ্রগতি হয়েছে। গত অর্থবছরের ‘প্রাণিসম্পদ অর্থনীতির’ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে দুধ উৎপাদিত হয়েছে ১৫৭ দশমিক ৫৩ লাখ টন। আগের অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৫৫ দশমিক ৩৮ লাখ টন। তবে দুধের উৎপাদন এখনো দেশের মানুষের প্রতিদিনের গড় চাহিদার কম। এফওএ এর মানদ- অনুযায়ী দৈনিক ২৫০ এমএল দুধের চাহিদা থাকলেও দেশে উৎপাদন এখন প্রায় ২৪২ এমএল। তবে মাংসের দৈনিক ১২০ গ্রাম গড় চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন এখন ১৩৯ গ্রাম ছড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ডিমের উৎপাদন। মাথাপিছু বছরে ১০৪ টি ডিমের সরবরাহ ন্যূনতম সরবরাহের বিপরীতে দেশে এখন ১৪০টির বেশি ডিমের সরবরাহ রয়েছে।

এই অবস্থা থেকেই সরকার এখন স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানিও বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে নজর দিয়েছে হালাল পণ্যের বাজারে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও বাহরাইনে রয়েছে হালাল পণ্যের বড় বাজার। এই বাজার লক্ষ্য রেখে এখন রপ্তানি উপযোগী প্রাণীজ আমিষ উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে মন্ত্রণালয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত প্রাণিজাত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে প্রাণিজাত পণ্যের উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধি, নিরাপদ ও রোগমুক্ত উৎপাদনব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানদ- অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রাণিজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি খামারি ও উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান আরও বাড়বে।