এলপিজি আমদানিতে সহায়তা দিবে বাংলাদেশ ব্যাংক

তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবসায়ীদের তারল্য সংকট মেটাতে এগিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি নিয়ে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়াতে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে দেশের বড় চারটি কোম্পানি তারল্য সংকটে এলপিজি আমদানি করতে পারছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে কি না জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান,  এলপিজি আমদানিকারকদের অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও বর্তমানে তারল্য সংকটে রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনে যে কোনো ধরনের নীতিগত সহায়তা দেওয়া যেতে পরে।  তবে আমরা মনে করি, এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তারা সবাই স্বাবলম্বী। তারা নিজেরা চেষ্টা করলেই এই সংকটের সমাধান করতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আমদানিকারকদের তারল্য সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় দেশে এলপিজির সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বসুন্ধরা এলপিজি গ্যাসসহ অন্তত ১২টি প্রতিষ্ঠানের আমদানি কমেছে। এ পরিস্থিতিতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি দামের চাপ এড়াতে জাতীয় ও বৃহত্তর স্বার্থে পাশে থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আমদানির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বসুন্ধরা এলপিজি গ্যাস লিমিটেড ৬৬ হাজার ৮৬৪ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করেছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২৭ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির আমদানি কমেছে ৫৬ হাজার ৮৩৭ মেট্রিক টন বা প্রায় ৮৫ শতাংশ। একই সময়ে জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস লিমিটেডের আমদানি ৮২ হাজার ৬৪৫ মেট্রিক টন থেকে কমে ৮ হাজার ৮০০ মেট্রিক টনে নেমেছে।

সারা দেশে এলপিজির বাজারের অন্তত ৪০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার ছিল এমন চারটি কোম্পানি এখন আর সেভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে না। বাজারে এদের ২ কোটির ওপর সিলিন্ডার রয়েছে, যা রিফিল হচ্ছে না। সম্প্রতি এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে ৩ বছরের যে হিসাব দিয়েছে, সেখানে দেখা যায় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান একেবারেই আমদানি করছে না। এতে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে।

(বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স নিয়েছে ৫২টি কোম্পানি। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানির সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার নিজস্ব প্ল্যান্ট রয়েছে। আমদানির সক্ষমতা আছে ২৩টি কোম্পানির। তবে নিয়মিত আমদানি করে মাত্র ৮ থেকে ৯টি প্রতিষ্ঠান।

এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলেছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের আমদানির চুক্তি রয়েছে, তারাও চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম সরবরাহ পাচ্ছে। খোলাবাজারেও সরবরাহ কমেছে। তাদের আশঙ্কা, আগামী মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এ কারণে বাজারে সরবরাহ ধরে রাখতে বাধ্য হয়ে পরিমাণ সীমিত করে গ্যাস সরবরাহ করতে হচ্ছে।

দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আওতাধীন এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল) দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া প্রায় ১ শতাংশ এলপিজি সরবরাহ করে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক বোতলজাতকরণ সক্ষমতা ২৫ হাজার মেট্রিক টন। তবে গত তিন অর্থবছরে তাদের সরবরাহের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৭২৩ থেকে ২০ হাজার ৬৭৯ মেট্রিক টনের মধ্যে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণের সময় প্রতি মেট্রিক টন আমদানি মূল্য ১৬০ ডলার ধরে হিসাব করেছিল। কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ২৬০ থেকে ৪০০ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি পরিচালন, পরিবহন ও অর্থায়ন ব্যয়ও বাড়ছে।  এসব ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে এলপিজির মূল্য নির্ধারণে বিভিন্ন খাতে চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি ও ডেলটা এলপিজি।

দেশে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের সুবিধা নেই এমন এলাকার বহু পরিবার রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও এ জ্বালানির ব্যবহার রয়েছে। ফলে সরবরাহ কমে গেলে কিংবা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হলে সাধারণ মানুষের খরচ বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী, এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ এড়াতে প্রয়োজনে আমদানিকারকদের সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে সহায়তার ধরন ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি। আমদানিকারকদের অর্থায়ন-সংকট দূর করার পাশাপাশি বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ ও নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ।