জোটে থেকেই জামায়াতকে চাপে রাখতে চায় এনসিপি

১১ দলীয় জোটে থেকেই বৃহত্তম দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে শরিক দলগুলো। শরিকরা স্থানীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে প্রার্থী দিতে চাইলেও জামায়াত সেদিকে হাঁটছে না। জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের একলা চলো নীতিতে নাখোশ। ইতিমধ্যেই এনসিপি নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে সেই আভাস পাওয়া গেছে। তবে এই বিরোধের বিষয়টি সরাসরি কেউ স্বীকার না করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রার্থী দেওয়ার পর দল দুটির মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ইস্যুতে জামায়াত-এনসিপির মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এমনকি ১১ দলীয় জোটের লংমার্চের পথসভায় জামায়াত আমিরকে সামনে বসিয়েই দলটির সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন এনসিপির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ, যা নিয়ে উভয় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া সর্বশেষ লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে এনসিপির অনুপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদিও দলটির নেতারা বলছেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা কিছু লেট করায় উদ্বোধনী সমাবেশে অংশ নিতে পারেননি।

এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কওমি ঘরানার সাত ইসলামি দলের জোট ঘোষণা হওয়ায় ১১ দলীয় জোটের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। হেফাজতে ইসলামসহ বেশ কয়েকটি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দলকে ১১ দলীয় জোট ছাড়তে চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, কোনো ষড়যন্ত্রে পা না দিয়ে জোটের ঐক্য অটুট রাখবেন।

সংসদ ও রাজপথে বিরোধীদলীয় ঐক্য অক্ষুন্ন রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দিলে এ জোটের মধ্যে ফাটল দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকেই। এ ক্ষেত্রে শরিকদের পক্ষ থেকে সমঝোতার চাপ থকলেও জামায়াত অনেকটাই একলা চল নীতি অবলম্বন করছে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী সমঝোতা নিয়ে নতুন করে দর-কষাকষির চেষ্টা করে যাচ্ছেন দলগুলোর নেতারা।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আমরা একসঙ্গে আছি, একসঙ্গে কাজ করছি। আমাদের ঐক্য অটুট আছে। এখনে কোনো ভুল বোঝাবোঝির সৃষ্টি হয়নি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে হয় না, তাই আমাদের সিদ্ধন্তই ছিল সব দল নিজেদের মতো করেই অংশ নেবে। কিন্তু সরকার এখনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারেনি। কোনো জায়াগায় জোটগতভাবে নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে কেন্দ্রীয় নেতারা বসে সিদ্ধান্ত নেবেন।

কথা হয় এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব সারজিস আলমের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট হয়েছিল এবং সংসদে বিরোধীদলীয় জোট হিসেবে দুই দল একসঙ্গে কাজ করছে। সেই জোট চলমান থাকবে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দুই দল আলাদাভাবে লড়বে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এনসিপির প্রার্থীরা কোনো সমঝোতা বা ছাড় দেওয়ার জন্য নয় শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

জোটের একাধিক সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আসন সমঝোতার আলোচনা থেকেই টানাপড়েনের সূত্রপাত। এনসিপির নেতাদের অভিযোগ, ঢাকার দুই মেয়র পদ ছাড়তে রাজি নয় জামায়াত। অন্যদিকে এনসিপিও গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতার প্রার্থিতা থেকে সরে আসতে চায় না। এনসিপি নেতারা স্থানীয় নির্বাচনকে নিজেদের নির্বাচনী সক্ষমতা যাচাই এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় নির্বাচনের জন্য ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি ও পোলিং এজেন্ট তৈরির সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

এরই মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। অন্যদিকে জামায়াত দক্ষিণে ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম এবং উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। দুই দলের এই পৃথক অবস্থান স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, শুরুতে আসিফ মাহমুদকে দক্ষিণে এবং উত্তরে আরিফুল ইসলাম আদীবকে প্রার্থী করার প্রথমিক চিন্তা করেছিল এনসিপি। সমঝোতার পরিবেশ ক্ষীণ হওয়ায় আসিফ মাহমুদকে উত্তরে প্রার্থী করা হয়, দক্ষিণে নিয়ে আসা হয় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে।

জামায়াতের মহানগর পর্যায়ের কয়েকটি সূত্র বলছে, ঢাকার মধ্যে একটি মেয়র পদসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে প্রার্থী নিয়ে সমঝোতার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূলে জনপ্রতিনিধি তৈরি ও নিজেদের দলের স্থানীয় সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য এবার একা লড়তে চায় জামায়াত। সেই লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশনের মেয়র পর্যন্ত একক প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে দলটি।

ঢাকা ছাড়াও কুমিল্লা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হয়নি বলে জানা গেছে। জোটের অন্যতম শরিক এনসিপি শুধু নির্বাচনে পৃথক প্রার্থী দেওয়াই নয়, জোটের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ কমিয়ে নিজস্ব সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনাও নিয়েছে এবং সেদিকেই তারা তাদের অবস্থান জোরদার করেছে।

এনসিপি জোটের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ সীমিত রেখে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচি বাড়াতে চায় দলটি। কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের পর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মহানগরসহ থানা পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠনের প্রস্তুতি চলছে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও বিভাগীয় শহরগুলোতেও সমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এনসিপির নেতাদের যুক্তি, দীর্ঘদিন জামায়াতের ওপর রাজনৈতিকভাবে নির্ভরশীল থাকলে বড় বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

গত ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগে জামায়াতকে ছাড়াই গণবিক্ষোভ সমাবেশ করে এনসিপি। এর পরদিন ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতি আলোচনায় আসে। তবে এনসিপির কয়েকজন নেতা কর্মসূচিতে অংশ নেন। স্থানীয় নির্বাচন ছাড়াও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এবং জামায়াতের প্রতিক্রিয়া নিয়ে এনসিপির মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। শাহবাগের সমাবেশে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বক্তব্যেও জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্বের ইঙ্গিতও স্পষ্ট হয়েছে। এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ লংমার্চের মঞ্চে দাঁড়িয়েও এই নির্বাচনের অবস্থান নিয়ে জামায়াতের সমালোচনা করেন।

আলাপকালে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নসহ মানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে ১১ দলীয় জোট কাজ করবে। এর বাইরে প্রত্যেকটা দলের সাংগঠনিক আলাদা কর্মসূচি থাকবে। এতে জোটে ভাঙনের কোনো করাণ নেই। এক প্রশ্নের জাবেবে তিনি বলেন, জোটগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েই এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। এটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। এখানে চাপের কিছু নেই। লংমার্চ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে আমার উপস্থিত থাকার কথা ছিল। ব্যক্তিগত ব্যস্ততার করণে থাকতে পারেনি। কিন্তু পরে পথসভাগুলোতে আমরা ছিলাম। পথসভাগুলোতে আমি ছাড়াও দলের কেন্দ্রীয় নেতা হান্নান মাসুদ, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সাইফ মোস্তাফিজ ও ফরিদুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন।’

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে জোটগত সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেই। তবে জেলা, উপজেলা বা কোনো এলাকায় শরিকেরা আলোচনা করে একক প্রার্থী ঠিক করলে কেন্দ্র বাধা দেবে না।

জামায়াতের যুক্তি, স্থানীয় নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক পদে কেন্দ্রীয়ভাবে সমঝোতা করা কঠিন। এককভাবে নির্বাচন করলে দলের সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থনও যাচাই করা যাবে। জামায়াতের এই অবস্থানে আপত্তি রয়েছে কয়েকটি শরিক দলের নেতার। তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে আসন সমঝোতা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনে একসঙ্গে থাকার পর স্থানীয় নির্বাচনেও সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।

এদিকে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমি ধারার সাতটি দল নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে একসঙ্গে কাজ করার আলোচনা চললেও পুরনো জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়নি।

আলাপকালে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইসলামি সাত দলের জোট থেকে আমাদের শর্ত দিয়েছিল ১১ দলীয় জোট ছাড়ার। কিন্তু আমরা সেই শর্তে রাজি হইনি। আমরা ১১ দলীয় জোটে আছি। ওই জোট সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, এটা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হবে কি না অরাজনৈতিক হবে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আগামী ডিসেম্বর মাসে একটি বৈঠক হওয়ার কথা, সেখানে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ১১ দলের ঐক্য আরও বাড়বে, কমবে না। তারা কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের ফাঁদে পা দেবেন না।

১১ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জোট ভাঙার কোনো কারণ দেখছি না। কোনো দল বের হয়ে চলে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি হয়নি। এই জোটের অনেক শরিক ‘অতি মূল্যায়িত’ হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতি বুঝলে কেউ এই জোট ছাড়ার কথা না। কারণ আমরা আগেও ২০ বছর একটা জোটে ছিলাম। তখনকার মূল্যায়ন দেখেছি, এখনো দেখছি।