নিষিদ্ধ আ.লীগ নাশকতায়

গত কয়েক মাস ধরে পোশাক খাতসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের নেপথ্যে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতামূলক কর্মকান্ডের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অসন্তোষ উসকে দেওয়া এবং তা সহিংসতায় রূপ দেওয়ার পেছনে কাজ করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ইতিমধ্যে একাধিক নেতাকর্মীর তালিকা করা হয়েছে। তা ছাড়া বেশ কয়েকজন গার্মেন্টস মালিকের সম্পৃক্ত থাকার তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মন্ত্রী-এমপিরাও বলছেন শ্রমিক বেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নাশকতা চালানোর পাঁয়তারা করছেন।

এদিকে সরকারবিরোধীদের তৎপরতা রোধে ঢাকা ও গাজীপুরে বিএনপি, শ্রমিক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মহড়া দিচ্ছেন। গত কয়েক দিন ধরে যেসব এলাকায় ভাঙচুর, লুটপাট, আগুন ও সংঘর্ষ হয়েছে, ওইসব এলাকার ভিডিও ফুটেজ ধরে হামলাকারীদের ধরার চেষ্টা করছে পুলিশ।

পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার শিল্পাঞ্চলগুলোতে একের পর এক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। পুলিশের তথ্য বলছে, শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনে বহিরাগতরা ঢুকে পড়ছে। তারা পরিকল্পিতভাবে শ্রমিকদের উত্তেজিত করছে এবং কারখানা ভাঙচুর ও মহাসড়ক অবরোধ করতে বাধ্য করছে। আবার বিভিন্ন কারখানার ঝুট ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করতেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। সরকার পরিবর্তনের পর তাদের প্রকাশ্যে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা না থাকলেও স্থানীয় প্রভাব বজায় রাখতে এবং সরকারকে বিপদে ফেলার কৌশল নিয়েছেন তারা।

ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যে গত রবিবার সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় ঢাকার মিরপুর ও গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের তিন শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। গতকালও কয়েকটি স্থানে শ্রমিক বিক্ষোভ হয়েছে।

অনুপ্রবেশ করে নাশকতা : কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ শ্রমিকদের আন্দোলনে ঢুকে তাণ্ডব চালাচ্ছে। তারা ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সহিংসতা কর্মকা- করছে। সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে দলটি। এমনকি ঢাকার বাইরে থেকে লোকজন জড়ো করে মিরপুরের বিভিন্ন মেসে ও আশপাশে রাখা হয়েছিল গত কয়েক দিন ধরে। তারাই শ্রমিকদের ঢাল বানিয়ে যানবাহনে হামলা ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর, ১১ নম্বর, কালশী ও আশুলিয়া, গাজীপুরসহ বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ করে সড়ক অবরোধ করছে। এমনকি পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছে। ভাঙচুরের পাশাপাশি লুটপাট হয়েছে শপিংমল ও কারখানার মালামাল। 

অন্তরালে থেকে অর্থ সরবরাহ : গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে আত্মগোপনে থাকা সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কিছু পদধারী নেতা অন্তরালে থেকে অর্থ সরবরাহ করছেন। তাদের অনুসারী এবং কারখানার অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। শ্রমিকদের অবাস্তব দাবিদাওয়া সামনে এনে হুটহাট কাজ বন্ধের প্ররোচনা দেওয়া হচ্ছে। একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, কারখানা মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ার পরও একটি বিশেষ গোষ্ঠী পর দিনই অন্য কোনো ইস্যু সামনে এনে আন্দোলন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত এক ডিআইজি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি মনে হলেও আমরা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের স্পষ্ট আলামত পেয়েছি। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেটওয়ার্কটি অত্যন্ত কৌশলে শ্রমিকদের ক্ষোভকে ব্যবহার করে শিল্পাঞ্চলে একটি স্থায়ী বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চাচ্ছে, যাতে সরকার ও অর্থনীতি উভয়েই চাপে পড়ে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নতুন উদ্বেগ : শিল্পাঞ্চলের এই ধারাবাহিক অস্থিরতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সাধারণত শ্রমিক আন্দোলন নির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ আন্দোলনের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাধারণ শ্রমিকরা কারখানা ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের মতো নাশকতায় সহজে জড়ান না। কিন্তু কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, আন্দোলন চলাকালে পেট্রোল বোমা, ইট-পাটকেল সংরক্ষণ করা এবং খুব দ্রুত কারখানা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বড় ধরনের ক্ষতি চালাচ্ছে। বিদেশি ক্রেতারা সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। শিল্পাঞ্চলে নিয়মিত বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে বিদেশিরা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার বাতিল করে অন্য দেশে স্থানান্তর করবে এমন আত্মঘাতী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে বলে আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

শ্রমিক বেশে বহিরাগত : ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, হামলার ঘটনায় আমরা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করছি। যারা এসব ঘটনায় সম্পৃক্ত, তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। শ্রমিক বেশে বহিরাগতরা হামলায় অংশ নিয়েছে। এতে জড়িতদের কঠোরভাবে দমন করা হবে।

শিল্পাঞ্চলে হামলা ও নাশকতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন  ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, নাশকতা ও ভাঙচুরের অভিযোগে ধৃত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অন্তত শতাধিক নেতাকর্মী শ্রমিক বেশে নাশকতা চালিয়েছে। গাজীপুর শিল্পপুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নাশকতার চেষ্টা চালানোর পাঁয়তারা করছে। গত দুই দিন তারা এসব অপকর্ম করেছে। ইতিমধ্যে আমরা তাদের পরিচয় উদ্ঘাটন করেছি। বর্তমানে গাজীপুরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।

গার্মেন্টস মালিকরাও সম্পৃক্ত : কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় বেশ কয়েকজন গার্মেন্টস মালিকের ইন্ধন থাকার তথ্য পেয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। ইতিমধ্যে তাদের নজরদারি করা হচ্ছে। ডিএমপি ও শিল্পপুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিল্পাঞ্চলে শান্তি বজায় রাখতে তারা মালিক-শ্রমিকের সঙ্গে বৈঠক করছেন। কিন্তু কিছু গার্মেন্টস মালিক রহস্যজনক আচরণ করছেন। তারা সহায়তা করছেন না।

সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ : নাশকতাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে তদন্ত সংস্থাগুলো। যেসব কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, সেসব এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন ক্যামেরা এবং ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে, আন্দোলনের সামনে থাকা বা ইট-পাটকেল নিক্ষেপে নেতৃত্ব দেওয়া অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিক ছিল না। তারা বহিরাগত এবং অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। ভিডিওর ঝাপসা ছবিগুলোকে আধুনিক ফেস রিকগনিশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে উন্নত করে পুরনো অপরাধী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ছবির ডেটাবেজের সঙ্গে মেলানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, অনেকের মোবাইলে সন্দেহজনক যোগাযোগ বা অর্থ লেনদেনের আলামত পাওয়া যাচ্ছে, তাদের ফোন ট্র্যাকিং এবং কল ডিটেইলস রেকর্ড পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

শিল্প সুরক্ষায় মাঠে বিএনপি : শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা রোধে রাজনৈতিকভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে বিএনপি। দলটির নেতারা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারিয়ে এখন পেছন থেকে অর্থনীতি ধ্বংস করার চক্রান্তে মেতেছে, যার বড় শিকার হচ্ছে পোশাক খাত। এই চক্রান্ত ব্যর্থ করতে এবং গার্মেন্টস খাতকে সুরক্ষিত রাখতে কেন্দ্রীয় নির্দেশে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমেছেন। তারা শান্তিপূর্ণ অবস্থান ও পাহারা দিচ্ছেন।

মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক : গতকাল সকাল ও বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গার্মেন্টস মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ছাড়াও শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ ঊর্ধ্বতনরা উপস্থিত ছিলেন। এই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যারা আন্দোলনের নামে সহিংসতা করছে, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো আন্দোলন এখন চলছে না। শ্রমিকদের দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠনের, সেটি গঠন করা হয়েছে। মজুরি বোর্ডের জন্য শ্রমিকরা কখনো সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেনি। আমরা দেখেছি, মুখোশধারী যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তারা ওখানে রাজনৈতিক স্লোগান দিয়েছে।

সীমান্তের ওপারের ইন্ধন : চলমান অস্থিরতার পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র চলছে। সরকার এ ধরনের অপতৎপরতা কঠোর হাতে মোকাবিলা করবে। আমাদের কাছে যেসব তথ্য আছে, বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। শ্রমিকদের ব্যবহার করে অনেকেই সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন জোগাচ্ছে। যাতে করে এখানে একটা অস্থিরতা সৃষ্টি করা যায়।

নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, শ্রমিকদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে অস্থিরতা সৃষ্টির তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। নাশকতায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা সফল হবে না। কারখানায় আক্রমণ, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, কিংবা যানবাহন ও স্থাপনায় হামলার মতো কর্মকাণ্ড শ্রমিকদের স্বার্থের পরিপন্থী। কোনো ধরনের উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না। পোশাকশিল্প আর পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় শ্রমিকদের যৌক্তিক ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার পাশে থাকবে।