তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনার তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এখন দুই আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ ও জেরিকা তাসনীম দিশা রিমান্ডে। ঘটনার রাতে তাদের দুজনের সঙ্গে তাহসিফের অবস্থান, টঙ্গীর মাজার ও বস্তিতে যাওয়ার কারণ এবং নদীতে কীভাবে তার মৃত্যু হলো এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা। বিশেষ করে দীপের বক্তব্যের সঙ্গে দিশার দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখাকে তদন্তের অন্যতম প্রধান কাজ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তাদের বক্তব্য ক্রস-চেক করার পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয়তার কথা তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন। মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এমন নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে তাদের দুজনের অবস্থান, উত্তরার বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত এবং টঙ্গীর মাজার ও বস্তি এলাকায় যাওয়ার বিষয়ে পাওয়া তথ্যের মধ্যে মিল-অমিল খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে দিশার বক্তব্য মিলিয়ে প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঘটনার পর থেকে দীপ বিভিন্ন সময়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যের কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, দিশার কাছ থেকেও ঘটনার রাতের বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে। দুই আসামির বক্তব্য যাচাই করে তারা কীভাবে, কখন এবং কোথায় আলাদা হয়েছিলেন, তা নিশ্চিত হতে চান তদন্তকারীরা।
গতকাল সোমবার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একই সঙ্গে দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনার কথা জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। নৌ-পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, দীপ ও ওই তরুণীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি পাওয়া গেছে। তাদের বক্তব্য মিলিয়ে ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
ঘটনার রাতের গতিবিধি নিয়ে প্রশ্ন : তদন্তে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফ, দীপ ও দিশাকে উত্তরার বিভিন্ন স্থানে একসঙ্গে দেখা গেছে। রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও দিশা উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর আরেকটি মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছান দীপ। পরে তিনজনকে একসঙ্গে রেস্টুরেন্টের ভেতরে যেতে দেখা গেছে।
রেস্টুরেন্টের আরেকটি ক্যামেরার ফুটেজে তাহসিফ ও দিশাকে লিফটের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে যান দীপ। এরপর তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। রাত ১১টা ৫১ মিনিটের দিকে তাদের রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেখা গেছে। পরে তারা মোটরসাইকেলে বিভিন্ন স্থানে যান। এ ছাড়া উত্তরার সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকস এবং একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজেও তাদের উপস্থিতির তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে দিশার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে আদালতে দেওয়া পুলিশের রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীপের বক্তব্যে অসংগতি : তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাহসিফের সঙ্গে টঙ্গীর মাজার ও বস্তি এলাকায় যাওয়ার কারণ সম্পর্কে দীপ বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। কখনো তিনি বলেছেন, সেখানে কয়েকজন তাদের ধাওয়া করেছিল। তাদের মধ্যে দুজন পুলিশের পোশাক পরা ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং তিনি নিজে পালিয়ে যান এমন বক্তব্যও দিয়েছেন দীপ। তবে তদন্তকারীরা এখনো তার এ বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেননি। ওই এলাকায় সত্যিই কেউ তাদের ধাওয়া করেছিল কি না, ধাওয়া করা ব্যক্তিরা কারা ছিলেন এবং তাহসিফ কীভাবে নদীতে পড়েছিলেন, তা যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফের সঙ্গে দীপের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। পরে টঙ্গীর মাজার ও বস্তি এলাকায় যাওয়ার পর দীপ একাই ফিরে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাহসিফের মোটরসাইকেলও উদ্ধার করা হয়েছে।
দিশার বক্তব্যেও খুঁজছেন সূত্র : তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে ১ নভেম্বর রাত ২টার দিকে রাজধানীর কাফরুলের বাসা থেকে দিশাকে গ্রেপ্তার করে নৌ পুলিশ। ওই দিন তাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে মহানগর হাকিম আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। এর আগে ৩১ অক্টোবর দীপেরও চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
পুলিশের রিমান্ড-আবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে দিশার বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের তথ্য পাওয়া গেছে। তার সঙ্গে তাহসিফের একাধিকবার ফোনে কথা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে দিশার বক্তব্য যাচাই করতে চায় পুলিশ। বিশেষ করে দীপের বক্তব্যের সঙ্গে দিশার বক্তব্যের মিল-অমিল খুঁজে বের করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ধারণা, দিশা কখন তাহসিফ ও দীপের সঙ্গে ছিলেন, কোথায় তারা আলাদা হন এবং এরপর দুই বন্ধু কোথায় যান এসব তথ্য নিশ্চিত করা গেলে ঘটনার ধারাবাহিকতা পরিষ্কার হতে পারে।