বিমানের ব্যবসায় বিদেশিদের কোপ!

নানা নাটকীয় রূপ নিচ্ছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আলোচিত থার্ড টার্মিনাল। আওয়ামী লীগ আমল থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হয়ে বর্তমান সরকারের আমলেও টার্মিনালটি চালু নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শেষ হচ্ছে না। টার্মিনালটি পরিচালনায় একেক সময় একেক শর্ত জুড়ে দিচ্ছে জাপান। তাদেরকে খুশি রাখতে প্রায় সব শর্তই মেনে নেওয়া হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ লাভের চেয়ে লোকসানের মুখ দেখবে বেশি। বিশেষ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) অনেকটা ক্ষতির মধ্যেই পড়েছে। কারণ তাদের ব্যবসায় ‘কোপ’ পড়েছে। বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংও হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। তাছাড়া শুল্কের সুবিধা থেকেও পিছিয়ে যাচ্ছে বেবিচক। এই নিয়ে দুই সংস্থা নাখোশ হলেও কিছুই বলতে পারছে না। এমনকি দুই দিন আগে সংসদীয় কমিটিও এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘থার্ড টার্মিনাল’ প্রকল্প ঘিরে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। আছে নানা অনিয়মও। জাপানের সব শর্ত মেনেই টার্মিনাল চালুর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনালের কার্যক্রম চালু করতে সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে দর-কষাকষিতে তাদের চারটি ‘কঠিন শর্তেও’ সম্মতি দিয়েছে সরকার।

২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ ৯৯ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হওয়ার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে সীমিত পরিসরে এর উদ্বোধন করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলেও জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা চুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে জাপানি কনসোর্টিয়ামকে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলের আওতায় এই চুক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের সাথে জাপানি কনসোর্টিয়ামের চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি।

বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে কোপ : থার্ড টার্মিনালের মূল আকর্ষণ ও রাজস্ব আয়ের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং’ সেবা। এতদিন দেশের সবকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এককভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব পালন করে আসছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এই খাত থেকে সংস্থটি প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে। তবে জাপান বলে দিয়েছে থার্ড টার্মিনালের আপাতত গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং ৫০ শতাংশ করতে পারবে বিমান। বছরখানেক পর তা কমে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে আসবে। এ প্রসঙ্গে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চাচ্ছি দ্রুত সময়ের মধ্যে টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানের সাথে চুক্তি করতে। কিন্তু তারা আমাদের আয়ে কৌশলে ভাগ বসাতে সবকিছুই চূড়ান্ত করে এনেছে। জাপান অনেকটা ব্ল্যাকমেইল করে আমাদের ও বেবিচকের আয়ে ভাগ বসিয়েছে। তারা চতুরতার সাথে চুক্তিপত্র তৈরি করে দেশীয় বিমান সংস্থাকে কৌশলে ঠকিয়ে কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে।

চুক্তির দিনক্ষণ হয়নি চূড়ান্ত : বেবিচক সূত্র জানায়, থার্ড টার্মিনালের অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, আধুনিক যন্ত্রপাতিও স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি, রাজস্ব ভাগাভাগি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং অপারেশনাল প্রস্তুতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে দেশের বিমান খাতের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পটি চালু করতে গিয়ে একের পর এক জটিলতা সামনে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ায় সংশয় কাটছে না। জাপানের দেওয়া কঠিন চারটি শর্ত মেনে নিলেও কবে চুক্তি হবে, তা বলতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। জাপানের কনসোর্টিয়ামের সদস্যরা হচ্ছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিটোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন। মূলত তারাই টার্মিনাল পরিচালনা করবে।

বেবিচক শুল্ক পাবে মাত্র ২৭ শতাংশ : টার্মিনাল পরিচালনায় বেবিচক ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে মূল বিরোধ রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে। আগের কাঠামোতে বাংলাদেশ ১৫ শতাংশ রাজস্ব পেত, আর জাপানি অংশীদারের অংশ ছিল ৮৫ শতাংশ। টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব যাচাইয়ের পর মাস দুয়েক আগে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এই প্রসঙ্গে বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) ও চুক্তি মূল্যায়ন কমিটির সহ-সভাপতি এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চুক্তিসংক্রান্ত আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং বিষয়টি সমাধানের পথেই রয়েছে। রাজস্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে বেবিচকের অংশ ২৭ শতাংশের কম হবে না বলে আশা করছি। নির্দিষ্ট সময়েই টার্মিনাল চালুর বিষয়ে আমরা আশাবাদী।

ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু : থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে জাপান সরকারের অর্থায়নকারী সংস্থা জাইকা প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। ২০২৩ সালে কিস্তির প্রথম পর্ব পরিশোধের কথা থাকলেও তা হয়নি। তবে চলতি বছরেই কিস্তির ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এই প্রসঙ্গে বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাবলুর রহমান বলেন, জাপানি ঋণের বিপরীতে গত জুনে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে আরও ১ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে। ২০৫৬ সাল পর্যন্ত ঋণের কিস্তি দিতে হবে। তবে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদের আশঙ্কা, নিয়মিত পরিচালন ব্যয় মেটাতে ‘বেবিচকের ফান্ডে’ হাত দিতে হতে পারে। এতে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরগুলোর জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সংগ্রহসহ অন্যান্য কার্যক্রম চাপের মুখে পড়তে পারে।

সব শর্ত মেনেই ১৬ ডিসেম্বর চালু হচ্ছে : জাপানের সব শর্ত মেনেই আগামী ১৬ ডিসেম্বর থার্ড টাার্মিনালের একাংশ চালু হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ও বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাবলুর রহমান বলেন, ‘মূল্যায়ন কমিটির সভা শেষ হয়েছে। যে কোনো সময় জাপানের সঙ্গে চুক্তি হবে। উদ্বোধনের দিন কয়টি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে, তা নিয়ে চলছে আলোচনা। তবে দুই পক্ষ এখনো একমত হতে পারেনি। বেবিচক চেষ্টা করছে দিনে অন্তত ১০টি নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার। তবে জাপান চাচ্ছে দিনে মাত্র চারটি। গত সেপ্টেম্বরে তৃতীয় টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছিলেন, উদ্বোধনের পর প্রাথমিকভাবে অন্তত ২০টি ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা হবে।

এককভাবে রাজত্ব করবে জাপান : চুক্তির চারটি বিষয় হলো রাজস্ব ভাগাভাগি, বাংলাদেশের আইনে পরিবর্তন এলে তার প্রভাব, ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের দায়কাল এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তিগত সম্পর্ক। এসব ধারার চূড়ান্ত ভাষা, আর্থিক হিসাব এবং সরকারের সম্মতির বিস্তারিত শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে সামগ্রিকভাবে টার্মিনাল থেকে লাভ করবে জাপান, আর ঝুঁকি বহন করতে হবে বাংলাদেশকে। বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় চারটি ধারায় সম্মতি দিয়েছে। ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৫ বছর প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দর চালু না করার শর্তেও বেবিচক রাজি হয়েছে।’

যাত্রীর ধারণক্ষমতা ২ কোটি ৪০ লাখ : প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বাজেট ও নকশাগত কিছু পরিবর্তন আনায় এর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পুনর্মূল্যায়ন করতে হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধিত ডিপিপির আওতায় রক্ষণাবেক্ষণ, পরামর্শক ফি এবং বিভিন্ন ধরনের ‘ভেরিয়েশন ওয়ার্ক’র জন্য অতিরিক্ত ৯০২ কোটি টাকার খরচের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিমানবন্দরের বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় থার্ড টার্মিনাল চালু হলে বাৎসরিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৮ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি ৪০ লাখে উন্নীত হবে। অত্যাধুনিক ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম, বোর্ডিং ব্রিজেস, মেকানিক্যাল সার্ভিস ও আধুনিক আইটি নেটওয়ার্ক সচল রাখার জন্য দক্ষ জনবল ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ হবে যে কোনো সময়।