ইতিহাস গড়ার পথে ১০ প্রার্থী

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ক্ষমতার লড়াই নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, ভেঙে দিতে পারে দেশটির কয়েকশ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে গড়ে ওঠা একাধিক অদৃশ্য দেয়াল। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার, প্রথম মুসলিম সিনেটর, প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ সিনেটর কিংবা প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর। এমন এক সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনসমর্থন ঐতিহাসিকভাবে নিম্নমুখী এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কিংবা পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে মরিয়া দুই প্রধান দল। ব্যয়ের দিক থেকেও এবারের নির্বাচন নজিরবিহীন। রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডইমপ্যাক্টের হিসাবে, নির্বাচনী প্রচারে ব্যয় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। শুধু অর্থের লড়াই নয়, ভোটের মানচিত্রেও চলছে বড় ধরনের পরিবর্তন। তবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনার সম্ভাবনা। রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর আমেরিকান উইমেন অ্যান্ড পলিটিকসের তথ্য অনুযায়ী, গভর্নর পদে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রেকর্ড ২৬ নারী। অন্যদিকে কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন প্রার্থী জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিচয়ভিত্তিক বাধা ভাঙতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার সুযোগ রয়েছে নিউ ইয়র্কের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিসের সামনে। নভেম্বরের নির্বাচনে প্রত্যাশিত ‘ব্লু ওয়েভ’ বা ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের বিজয় ঘটলে দলটি প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্পিকার হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বর্তমান সংখ্যালঘু নেতা জেফ্রিসের।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হলেও, দেশটির সিনেটে এখন পর্যন্ত কোনো মুসলিম নির্বাচিত হননি। এবার সেই ইতিহাস বদলানোর সুযোগ এসেছে মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের সামনে। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারাতে পারলে এল-সাইয়েদ হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে যৌন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ সিনেটর নির্বাচিত হননি। এবার সেই ইতিহাস গড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডেমোক্র্যাট নেতা ক্রিস পাপাসকে ঘিরে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এশীয়-আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্ব ধীরে ধীরে বাড়লেও কোরীয় বংশোদ্ভূত কোনো আমেরিকান এখন পর্যন্ত অঙ্গরাজ্যের গভর্নর হননি। ওকলাহোমার ডেমোক্র্যাট নেতা সিন্ডি মানসন এবার সেই ইতিহাস বদলে দিতে পারেন। মানসন এর আগেও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাধা ভেঙেছেন। ওকলাহোমার অঙ্গরাজ্য আইনসভায় নির্বাচিত প্রথম এশীয়-আমেরিকান নারী তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে নারীরা গভর্নর হয়েছেন। কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষরাও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু কোনো কৃষ্ণাঙ্গ নারী এখন পর্যন্ত গভর্নর নির্বাচিত হননি। এবার সেই দীর্ঘদিনের ইতিহাস বদলে যেতে পারে জর্জিয়ায়। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কেইশা ল্যান্স বটমস অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছেন।

জর্জিয়ার মতো একই ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মিনেসোটাও। তবে এখানকার রাজনৈতিক সমীকরণ কিছুটা ভিন্ন। মিনেসোটার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো নারী গভর্নর নির্বাচিত হননি। এবারের নির্বাচনে প্রধান দুই দলের প্রার্থীই নারী হওয়ায় সেই ইতিহাস বদলানো কার্যত নিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস দীর্ঘ বঞ্চনা ও সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত। সেই ইতিহাসে ২০১৮ সাল ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। ওই বছর ডেব হাল্যান্ড ও শারিস ডেভিডস কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম নেটিভ আমেরিকান নারীদের মধ্যে জায়গা করে নেন। এবার হাল্যান্ডের সামনে আরও বড় এক ইতিহাস গড়ার সুযোগ। নিউ মেক্সিকোর গভর্নর নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নেটিভ আমেরিকান নারী গভর্নর। গভর্নর পদে একই সুযোগ থাকছে আলাস্কার রিপাবলিকান প্রার্থী বার্নাডেট উইলসনের সামনেও।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে এর আগে অন্তত চারজন নেটিভ আমেরিকান পুরুষ দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু দেশটির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো নেটিভ আমেরিকান নারী সিনেটর নির্বাচিত হননি। এবার সেই ইতিহাস বদলানোর অন্যতম দাবিদার আলাস্কার ডেমোক্র্যাট নেতা মেরি পেলটোলা। প্রথম নেটিভ আমেরিকান নারী সিনেটর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট নেতা পেগি ফ্লানাগানেরও।