কয়রার পাউবো কর্মকর্তা থাকেন খুলনায়!

খুলনার কয়রায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আমাদী উপবিভাগীয় কার্যালয় থাকলেও সেখানে নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনজন কর্মকর্তা ও একজন গেট অপারেটরসহ মোট চারজনের জনবল থাকলেও অধিকাংশ সময় কার্যালয়টি তালাবদ্ধ থাকে।

একজন গেট অপারেটর ছাড়া অন্য কাউকে নিয়মিত অফিসে দেখা যায় না। এতে সরকারি সেবা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ১৭২ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত দুই মাসে অন্তত পাঁচবার বিভিন্ন সময়ে ওই কার্যালয়ে সরেজমিনে গিয়েও কোনো কর্মকর্তার দেখা পাওয়া যায়নি। এমনকি অফিসের একমাত্র কর্মচারী গেট অপারেটর গৌররন্দকেও নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত কার্যালয়ে পাওয়া যায় না। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কখনো আমাদী বাজারে, আবার কখনো ব্যক্তিগত কাজে বাইরে থাকার কথা জানান।

তবে স্থানীয়দের দাবি, গেট অপারেটর গৌররন্দকে প্রায়ই কার্যালয়ের ভেতরে কিংবা পাশের চায়ের দোকানে বসে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের ভাষ্য, মাঝেমধ্যে কর্মকর্তারা পাজেরো গাড়ি নিয়ে কার্যালয়ে আসেন, কিছুক্ষণ অবস্থান করেন, এরপর আবার চলে যান। ফলে কার্যালয়টি কার্যত নিয়মিত কর্মকর্তা-শূন্য অবস্থায় পড়ে থাকে।

উপবিভাগীয় কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) সুলতান মাহমুদ জানিয়েছেন, তিনি খুলনা অফিসে কাজ করেন। প্রয়োজনীয় কাজ থাকলে কয়রার কার্যালয়ে আসেন। একইভাবে উপসহকারী প্রকৌশলী সোলায়মান হোসেনও কাজ থাকলে খুলনা অফিস থেকে কয়রায় আসেন বলে জানিয়েছেন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, কয়রার জন্য পৃথক উপবিভাগীয় কার্যালয় থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তারা যদি নিয়মিত সেখানে অবস্থান না করেন, তাহলে স্থানীয় বাসিন্দারা জরুরি প্রয়োজনে কার কাছে যাবেন? বেড়িবাঁধের কোথাও ভাঙন দেখা দিলে কিংবা নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেবেন কে?

কয়রার উপকূলীয় জনপদের নিরাপত্তার সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি জড়িত। কারণ, উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশীসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা অনেকটাই নির্ভর করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের ওপর। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে থাকা এই জনপদ রক্ষায় বর্তমানে ১ হাজার ১৭২ কোটি ৩১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে পোল্ডার ১৪/১ পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ চলছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের খুলনা ও সাতক্ষীরা-২ বিভাগের অধীনে প্রকল্পটির কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীতীরবর্তী প্রায় ৩২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও টেকসই করার পাশাপাশি নদীতীর সংরক্ষণ, নিষ্কাশন খাল পুনঃখনন, রেগুলেটর প্রতিস্থাপন এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কাজ রয়েছে এতে।

কিন্তু হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, নির্ধারিত মানের বালুর পরিবর্তে লোনা বালু দিয়ে সিসি ব্লক তৈরি, ব্লক ও জিও ব্যাগ স্থাপনে অনিয়ম এবং বাঁধের বিভিন্ন স্থানে মাটি দেবে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া কোথাও কোথাও নির্ধারিত পরিমাণে মাটি না দেওয়া, বাঁধের ঢালে যথাযথভাবে মাটি ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার না করা, নির্মিত ব্লক সামান্য আঘাতেই ভেঙে যাওয়া এবং নদীতে ব্লক ও জিও ব্যাগ ফেলার কাজে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করার অভিযোগও উঠেছে। কিছু এলাকায় জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে বাঁধ নির্মাণের অভিযোগে জমির মালিকদের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের বিরোধের ঘটনাও ঘটেছে।

প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে কাজের ধীরগতি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় কাজ অসমাপ্ত থাকার বিষয়ও সামনে এসেছে। আবার নদীতীর সংরক্ষণের জন্য নির্মিত ব্লক ও জিও ব্যাগের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনায় প্রকল্পের কাজের মান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এসব অভিযোগের মধ্যে প্রকল্পের মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি ও তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সিসি ব্লক তৈরি, জিও ব্যাগ স্থাপন, নদীতীর সংরক্ষণ ও বাঁধের মাটির কাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের নিয়মিত পরিদর্শন প্রয়োজন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মিত কার্যালয়ে না থাকলে এবং মাঠপর্যায়ে যথাযথ তদারকি না করলে কাজের মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় আমাদী গ্রামের বাসিন্দা শাহ হিরো বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা মাঝে মধ্যে কয়রার কার্যালয়ে আসেন। তবে তাঁদের নিয়মিত অফিস করতে দেখা যায় না। কখনো গাড়ি নিয়ে কার্যালয়ে এসে কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবার চলে যান। অথচ উপকূলের বেড়িবাঁধের বিভিন্ন সমস্যা, নদীভাঙন ও নির্মাণকাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ে থাকা প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কয়রার বিভিন্ন স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে ভাঙন, মাটি ধস, সড়কের বেহাল অবস্থা ও নদীতীর সংরক্ষণের সমস্যা রয়েছে। কোথাও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা জরুরি মেরামতের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাওয়া যায় না। এতে সমস্যার দ্রুত সমাধান ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানি ও নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে জনপদ, কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও মৎস্যঘের।

খুলনা পানি উন্নয়ন বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশিদুর রহমান বলেন, কর্মকর্তাদের খুলনা কার্যালয়ে নিয়মিত রিপোর্টিং করতে হয়। এ কারণে তাঁরা খুলনা কার্যালয় থেকে সরাসরি কাজের সাইটে যান এবং কাজ শেষে আবার কার্যালয়ে ফিরে আসেন। বিভাগে তিনজন কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রতিদিন একজন করে কর্মকর্তা কাজের সাইটে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে বর্তমানে কাজের সাইটে কিংবা কয়রা কার্যালয়ে কোন কর্মকর্তা দায়িত্বে রয়েছেন, জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন বলে জানান তিনি।

এদিকে খুলনা শহর থেকে কয়রা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয় ও বিভিন্ন প্রকল্পের কাজের সাইটের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একজন কর্মকর্তা একই দিনে খুলনা থেকে কয়রায় এসে কার্যালয়ের দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন, প্রকল্প পরিদর্শন এবং আবার খুলনায় ফিরে যান কীভাবে—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রশ্ন, বাস্তবে কর্মকর্তারা নিয়মিত প্রকল্পের কাজ তদারকি করছেন, নাকি কেবল কাগজে-কলমেই দায়িত্ব পালন হচ্ছে?

উপকূলের মানুষের প্রশ্ন, যে অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই যদি নিয়মিত কার্যালয়ে না থাকেন, তাহলে প্রকল্পের সঠিক তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে? কয়রা উপজেলার আমাদী উপবিভাগীয় কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, হাজিরা ও দায়িত্ব পালনের তথ্য যাচাই এবং চলমান প্রকল্পের প্রতিটি কাজ নিয়মিত পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা, অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং কাজের অগ্রগতি স্বাধীনভাবে যাচাইয়েরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।