পাকিস্তানের সঙ্গে 'হ্যান্ডশেক' এমনকি কোলাকুলি করতেও সমস্যা নেই ভারতের

রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় ক্রীড়া সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত। ভারত সফরে যায় না পাকিস্তান, আবার পাকিস্তানেও খেলতে যায় না ভারত। দুই দেশের ক্রিকেটের মতো হকিতেও তাই দেখা যায় নিরপেক্ষ ভেন্যুর ওপর নির্ভরতা। কদিন আগে এশিয়া চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তান ভারতে আসেনি বলে বাংলাদেশ খেলে এলো টুর্নামেন্টটি। এবার ফুটবল নিরপেক্ষ ভেন্যুতে মুখোমুখি হচ্ছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি দুই দেশ। কাল বিকেলে ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের উদ্বোধনী দিনের প্রথম ম্যাচেই একের অন্যের বিরুদ্ধে লড়বে দুই দল। 

টুর্নামেন্টের প্রথম দিনের প্রথম ম্যাচ ঘিরে তাই বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দুই দেশের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ম্যাচটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। দুই দলের সমর্থকদের চোখ থাকবে এই ম্যাচে, যেখানে জয় দিয়ে আসর শুরু করাই হবে উভয় পক্ষের লক্ষ্য।

সাফের ইতিহাসে ভারতের সাফল্য ঈর্ষণীয়। তারা এ পর্যন্ত নয়বার শিরোপা জিতেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের এখনো কোনো শিরোপা নেই। পরিসংখ্যান ও অতীত সাফল্যে ভারত এগিয়ে থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে পাকিস্তানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বড় ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ হিসেবে ম্যাচটিকে দেখবে তারাও।
ভারতের লক্ষ্য থাকবে শিরোপার দাবিদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া। টুর্নামেন্টের শুরুতেই জয় পেলে দলটির আত্মবিশ্বাস বাড়বে। অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য ভারতের বিপক্ষে জয় শুধু তিন পয়েন্ট বা একটি ম্যাচ জেতার বিষয় নয়; এটি হবে নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর বড় মঞ্চ। শিরোপা না জিতলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই উপহার দেওয়ার প্রত্যাশা থাকবে তাদের।

ক্রিকেটের মতো দুই দলের ফুটবলের লড়াইয়েও অনেক জয় রয়েছে ভারতের। ১৯৫৩ সালের পর থেকে দুই দল ২৫ বার মুখোমুখি হয় বিভিন্ন টুর্নামেন্টে। যার ম্েযধ ১৬ বার ভারত জেতে এবং পাকিস্তান জয় পায় দুটিতে। বাকি সাতটি ম্যাচ ছিল ড্র। এর মধ্যে নয়বার দুই দল মুখোমুখি লড়াই করে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। যার মধ্যে সাতবার জিতেছে ভারত, পাকিস্তান একবার ২০০৩ সালে। ড্র হয়েছিল ১৯৯৩ সালে সাফের তাদের প্রথম দেখায় অনুষ্ঠিত ম্যাচটি (১-১)। ধারে ভারে কোনভাবেই ভারতের সমতূল্য নয় পাকিস্তান। তারপরও প্রতিদ্বন্দ্বি দেশটিকে সমীহ করছে চ্যাম্পিয়ন ভারত। যদিও ভারতীয় সুপার লিগ চলায় এবং নিউজিল্যান্ড সফরে আলাদা দল পাঠানোর কারণে তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশেলে দ্বিতীয় সাঁরির একটি নিয়ে ঢাকায় এসেছেন কোচ নওশাদ মুসাকে। তারপরও দল নিয়ে আত্মবিশ্বাসী তিনি। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষকে সমীহ করলেও শিরোপা ধরে রাখার চাপ নিয়ে ভাবছেন না ভারত কোচ। ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে নওশাদ মুসা বলেন, প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাইনি আমরা। ভারতীয় সুপার লিগ চলায় পূর্ণাঙ্গ দলও পাইনি। তবে যে দল নিয়ে এসেছি, সেটি তরুণ, প্রতিভাবান ও শক্তিশালী।’ চাপকে বরং ইতিবাচকভাবেই দেখছেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য শিরোপা ধরে রাখার চিন্তার চেয়ে ভালো ফুটবল খেলা। কোচের বিশ্বাস, দল ভালো খেলতে পারলে ফলও তাদের পক্ষে আসবে।

পাকিস্তানকে নিয়েও সতর্ক ভারত কোচ। অতীতের ফল দিয়ে এবারের ম্যাচ বিচার করতে চান না তিনি। নওশাদ মুসার মতে, আগের পাকিস্তান দলের সঙ্গে বর্তমান দলের পার্থক্য রয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলা অনেক ফুটবলার আছে তাদের দলে। তাই এবারের পাকিস্তান শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। তাদের বিপক্ষে কঠিন ম্যাচের জন্য প্রস্তুত ভারত। ভারত অধিনায়ক নাতানও ম্যাচ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। তাঁর মতে, দলটি সংখ্যায় ছোট হলেও প্রস্তুত। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের বাড়তি উত্তেজনা চাপ হিসেবে দেখছেন না তিনি; বরং নিজেদের সেরাটা দেওয়ার প্রেরণা হিসেবে নিচ্ছেন। মাঠে সর্বোচ্চটা দিয়ে ভালো ফল পাওয়ার আশা তাঁর।

ম্যাচের আগে দুই দলের খেলোয়াড়দের হ্যান্ডশেক ও জার্সি বিনিময় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। উত্তরে ভারত অধিনায়ক জানান, 'পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে হ্যান্ডশেক বা জার্সি বিনিময়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই।' কোচ নওশাদ মুসাও বলেন, 'প্রয়োজন হলে তারা প্রতিপক্ষকে কোলাকুলি করতেও আগ্রহী।'

এদিকে প্রতিপক্ষের শক্তি নিয়ে সতর্ক থাকলেও ভারতকে কঠিন সময় দেওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন পাকিস্তান অধিনায়ক আলমগীর। তাঁর মতে, ম্যাচটি দুই দলের খেলোয়াড়দের জন্যই বিশেষ। নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলেই ভারতের বিপক্ষে লড়াই করতে চায় পাকিস্তান। ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তান কোচ টাইটাস ব্যাম্বল জানান, লজিস্টিক কিছু সমস্যার কারণে তাদের আসতে দেরি হয়েছে। তবে পাকিস্তানে ভালো প্রস্তুতি ক্যাম্প হয়েছে এবং দল মাঠে নামতে প্রস্তুত। অধিনায়ক আলমগীরও জানান, দল ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে। টুর্নামেন্টে ভালো ফুটবল খেলা এবং প্রতিটি ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। আলমগীর বলেন, ‘ভারতের দ্বিতীয় দলও ভালো। একই সঙ্গে পাকিস্তানও বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে পাচ্ছি না। তবে সেটিকে অজুহাত হিসেবে দেখছি না। মাঠে নিজেদের খেলা খেলেই ভারতের সঙ্গে ভালো লড়াই করতে চাই আমরা।’

২০০৩ সালে ঢাকায় সাফে ভারতকে হারানোর স্মৃতিও উঠে আসে সংবাদ সম্মেলনে। ওই প্রসঙ্গে আলমগীর জানান, এবারের টুর্নামেন্টে তাদের লক্ষ্য ভালো ফুটবল খেলা এবং আগের সাফ টুর্নামেন্টের মতো ভালো পারফরম্যান্স করা। শুধু ভারতের বিপক্ষে নয়, প্রতিটি দলের বিপক্ষেই লড়াই করে টুর্নামেন্ট জয়ের চেষ্টা করবে পাকিস্তান।’ তবে পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে সাফে নামতে পারছে না পাকিস্তান। অধিনায়ক জানিয়েছেন, প্রবাসী কয়েকজন খেলোয়াড় এখন দলের সঙ্গে নেই। পাকিস্তান সেমিফাইনালে উঠতে পারলে তারা যোগ দেবেন। কোচও নিশ্চিত করেছেন, সেমিফাইনালে না উঠলে ওই খেলোয়াড়দের আসার সুযোগ থাকছে না। সেমিফাইনালে ওঠার ব্যাপারে অবশ্য আত্মবিশ্বাসী দলটি।

বাংলাদেশের দর্শকদের সমর্থনও প্রত্যাশা করছেন আলমগীর। গত মৌসুমে ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বাংলাদেশে পাকিস্তান দল সমর্থন পাবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভারতের বিপক্ষেও বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানকে সমর্থন করুক, সেটি তাঁর প্রত্যাশা। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে হ্যান্ডশেক বা মাঠের বাইরের আচরণ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আলমগীরের অবস্থান স্পষ্ট। তাঁর ভাষায়, এটি ক্রিকেট নয়, ফুটবল। খেলাটির সৌন্দর্যই আলাদা। তাই মাঠে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সৌজন্য বজায় রাখতে পাকিস্তানও প্রস্তুত।