ঘুষের জন্য ঠিকাদারের বিল আটকাল এলজিইডি!

ঘুষ না পাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া বিল পরিশোধ না করে উল্টো মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কার্যাদেশ বাতিল করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কক্সবাজার জেলা ও টেকনাফ উপজেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। ডোরিন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড কর্তৃপক্ষের দাবি, ঘুষের টাকা না দেওয়ায় তাদের পাওনা আটকে রেখে এলজিইডির কর্মকর্তারা নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে নানাভাবে হয়রানি করছেন।

তবে এলজিইডি কর্তৃপক্ষের দাবি, আগের প্রতিষ্ঠানটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় নিয়মতান্ত্রিকভাবেই নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে এবং আগের প্রতিষ্ঠান যতটুকু কাজ করেছে, সেই অনুযায়ী বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ইমার্জেন্সি মাল্টি-সেক্টর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস রেসপন্স’ প্রকল্পের আওতায় টেকনাফের কাটাখালী, ডাঙ্গারপাড়া, নোয়াপাড়া ও চান্দলীপাড়ায় চারটি স্কুল কাম সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণের জন্য ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কার্যাদেশ পায় ডোরিন ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা হলেও দরপত্রে ৮ শতাংশ কমে ১৬ কোটি ৭৬ লাখ ৪৪ হাজার ৪৩৩ টাকা ৮০ পয়সায় চুক্তি হয়। কাজের মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১২ মার্চ পর্যন্ত। কার্যাদেশের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের সোনারগাঁও জনপথ সড়ক শাখা থেকে ৮৩ লাখ ৮২ হাজার ২২১ টাকা ৬৯ পয়সার পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমা দেয়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন খানের চরম অসহযোগিতার মুখে পড়তে হয় তাদের। সাইট বুঝিয়ে দিতে বিলম্ব করা এবং ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানের নথিমতে, ২০২৪ সালের জুনে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকার কাজের বিল চাওয়া হলেও দেওয়া হয় মাত্র ৯৬ লাখ টাকা। এতে প্রায় ৩১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা কম পান তারা। এ ছাড়া পরবর্তী পর্যায়ের বিল হিসেবে ৬১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৫৯ টাকা এবং চূড়ান্ত বিল হিসেবে ৮৫ লাখ ৮০ হাজার ৮৭২ টাকার হিসাব উপজেলা প্রকৌশলীর অনুমোদন ও সুপারিশ পেলেও তা ছাড় করা হয়নি।

তাছাড়া, নোয়াপাড়া সাইটে কাজ শুরুর আগে গভীর গর্ত ও ময়লার স্তূপ পরিষ্কার এবং বালু ভরাটে নিজস্ব অর্থায়নে অতিরিক্ত ২৭ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। এই ব্যয় সংশোধিত বিলে অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে তা রাখা হয়নি। একপর্যায়ে চান্দলীপাড়ায় কাজ শুরুর পর বিলের আবেদনে জটিলতা তৈরি করে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে কাজ পুনরায় শুরু ও বকেয়া বিলের জন্য আবেদন করা হলেও এলজিইডি ২০২৪ সালের ১০ ও ১৮ ডিসেম্বরের চিঠিতে চুক্তির শর্ত ভঙ্গের কারণ দেখিয়ে কার্যাদেশ বাতিল করে। একই সঙ্গে ব্যাংকে জমা রাখা ৮৩ লাখ ৮২ হাজার ২২১ টাকার পারফরম্যান্স সিকিউরিটি নগদায়নের উদ্যোগ নিয়ে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়। তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন খানকে দুই দফা আইনি নোটিস পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি বলে জানায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

এসব অভিযোগের সুরাহা না করেই পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ও যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত আসাদ উল্লাহর মালিকানাধীন ‘আসাদ এন্টারপ্রাইজ’কে কাজ দেওয়া হয়েছে, যদিও নতুন প্রতিষ্ঠানটি এখনো কাজ শুরুই করেনি।

অভিযোগের বিষয়ে কক্সবাজারের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন খান ও প্রকল্প পরিচালক মো. ফায়সাল জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি এবং যতটুকু কাজ হয়েছে, সে অনুযায়ী বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

টেকনাফের সহকারী প্রকৌশলী আলাউদ্দিন বলেন, ‘পূর্বের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ না করে ফেলে রেখেছিল। এ কারণে তাদের বহুবার চিঠি দেওয়া হয়। এমনকি মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনরায় তাকে মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপরও কাজ না করায় চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। কাজের টেন্ডার ও চুক্তি জেলা কার্যালয়ের অধীনে হয়, আমরা শুধু তদারকি করি। যৌথ সার্ভে করে বিল জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল এবং আমাদের জানামতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। নতুন ঠিকাদারকে কাজ শুরুর জন্য আমরা ইতিমধ্যে দুই বার চিঠি দিয়েছি।’

এদিকে সহকারী প্রকৌশলী আলাউদ্দিনের এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি কামরুজ্জামান জুয়েল।

পাল্টা অভিযোগ করে কামরুজ্জামান জুয়েল বলেন, ‘উপজেলা প্রকৌশলী আলাউদ্দিন যে দাবি করেছেনআমাদেরকে সময় বাড়িয়ে দেওয়া সত্ত্বেও আমরা কাজ করিনি, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। প্রকৃতপক্ষে, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি আমাদের কাজ বাতিল করে দিয়েছিলেন। সময় বাড়ানোর ব্যাপারে আমাদের কোনো দাপ্তরিক চিঠি বা নোটিস দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া, ওনার জানামতে আমাদের কাজের বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে যে দাবি করেছেন, সেটিও সম্পূর্ণ বানোয়াট।’

বিলের একটি বড় অংশ ঘুষ হিসেবে দাবি করা হয়েছিল উল্লেখ করে জুয়েল আরও বলেন, ‘সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন ও টেকনাফ উপজেলা প্রকৌশলী আলাউদ্দিনসহ এলজিইডির একটি সিন্ডিকেট আমাদের কাছে বিশাল অঙ্কের উৎকোচ দাবি করেন। আমরা সেটি না দেওয়ায় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চুক্তি বাতিল এবং বিল না দিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকে জামানত হিসেবে রাখা টাকাও ফ্রিজ করে রেখেছে ওই সিন্ডিকেট।’

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে কক্সবাজার এলজিইডির বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হাসনাত মহিউদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা এবং হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।