জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিতে ৭ দফা প্রস্তাবনা

আসন্ন ৩১তম জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ-৩১) সামনে রেখে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সাত দফা জাতীয় নীতি-প্রস্তাবনা ও কৌশলগত সুপারিশমালা তুলে ধরেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ (আইডিএমভিএস)। এতে জলবায়ু অর্থায়ন, দুর্যোগকালীন সুরক্ষা, পুনর্বাসন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বেলা ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের ক্যাথেরিন অডিটোরিয়ামে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম অন ডিজঅ্যাবিলিটি-ইনক্লুসিভ ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাডাপটেশন (ডিআইডিআরআর অ্যান্ড সিসিএ) বাংলাদেশের উদ্যোগে এবং সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) কারিগরি সহায়তায় অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডিএমভিএসের পরিচালক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন, মো. জাহিদুল ইসলাম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সিসিইআর) ডেপুটি ডিরেক্টর এম এস রওফা খানম, সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) সমন্বয়ক সুবীর কুমার সাহা, সহকারী পরিচালক আনিকা রহমান লিপি, ফ্যাসিলিটেটর মলয় চাকী ও রাইসা ইমরান চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লিটন ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা।

অনুষ্ঠানে কপ-৩১-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিইআর-এর ডেপুটি ডিরেক্টর এম এস রওফা খানম। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও জেন্ডারভিত্তিক সংগঠনগুলোর জন্য গত বছর ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ-৩০ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওই সম্মেলনে ২০২৬ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান চালু করা হয়। এ পরিকল্পনার ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি ককাস গঠিত হয়েছে, যেখানে ১২৬টি সংগঠন যুক্ত রয়েছে। তবে বাংলাদেশ থেকে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো এখনো ওই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পেরেছে কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তিনি বলেন, এবারের কপ-৩১-এ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) স্বীকৃত ২৬টি সংগঠনের উদ্যোগে এবার প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাইড ইভেন্ট আয়োজন করা হচ্ছে। আগে এসব আলোচনায় জেন্ডার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেলেও এবার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

রওফা খানম বলেন, ইউএনএফসিসিসির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আগ্রহীরা সম্মেলনের সাইড ইভেন্টগুলোর তালিকা দেখতে পারবেন। এ জন্য নির্দিষ্ট অ্যাপ ডাউনলোড করে নিবন্ধন করতে হবে। ফলে সম্মেলনে সরাসরি উপস্থিত না থেকেও বিভিন্ন আলোচনা অনুসরণ এবং অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে।

সম্মেলনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এবারের আয়োজক দেশ অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের হোস্ট কান্ট্রি এগ্রিমেন্টে মানবাধিকার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়টিও আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ককাসের পক্ষ থেকে সম্মেলনে অংশ নিতে তাঁদের যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে হুইলচেয়ার এবং তাঁদের বোধগম্য ভাষায় যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার এ ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের জলবায়ুবিষয়ক অবস্থানপত্রেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো (সিএসও) বিভিন্ন অবস্থানপত্র তৈরি করেছে। এর মধ্যে একটি অবস্থানপত্রে জেন্ডার বিষয়টি আলাদাভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের অর্থায়নে সিসিইআর-এর পরিচালিত ‘গ্রিন বয়েজ’ প্রকল্পের আওতায় তাঁরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি পৃথক অবস্থানপত্র জমা দিয়েছেন। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা সব জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও অধিকার কীভাবে নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা তুলে ধরা হয়েছে। এবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক আলোচনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরবেন বলে তাঁরা আশা করছেন।

কপ-৩১-এ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরাসরি অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে রওফা খানম বলেন, যাঁরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাঁদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দাবিগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেরাই তুলে ধরতে হবে। এ জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাঁদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও সম্মেলনে অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। 

সমাপনী বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডিএমভিএসের পরিচালক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে কথা বলা এবং গণমাধ্যমে বিষয়গুলো তুলে ধরা জরুরি। সমাজের যেসব মানুষ অবহেলিত এবং যাঁদের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথভাবে পৌঁছায় না, তাঁদের বাস্তবতা সামনে আনতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রান্তিক করে রাখার পেছনে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতাও দায়ী। তাঁদের কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে না, কারণ অনেক ক্ষেত্রে সমাজ তাঁদের কথা শুনতে চায় না। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে গণমাধ্যমকে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে। 

সংবাদ সম্মেলনে কপ-৩১ সামনে রেখে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্প্রদায়, সম্মেলনের প্রেসিডেন্সি ও নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে সাত দফা নীতি-সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলো হলো-

১.প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষাকে বৈশ্বিক জলবায়ু সুবিচারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান।

২.আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল এবং ক্ষয়ক্ষতি (Loss and Damage) মোকাবিলায় বরাদ্দকৃত তহবিলে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট হিস্যা ও প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণ।

৩.দুর্যোগকালীন ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, উদ্ধার তৎপরতা এবং বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে শতভাগ প্রবেশগম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা।

৪.দুর্যোগ-পরবর্তী নতুন প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধে জরুরি চিকিৎসা, শারীরিক পুনর্বাসন, সহায়ক প্রযুক্তি ও উপকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা প্রদান।

৫.প্রতিবন্ধী নারীদের সুরক্ষায় জেন্ডার-সংবেদনশীল এবং টেকসই অভিযোজন ও জীবিকায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন।

৬.বৈশ্বিক ও জাতীয় জলবায়ু নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াসহ কপ-৩১-এর আলোচনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলোর (OPD) অর্থবহ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।

৭.কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জলবায়ু ঝুঁকিসংক্রান্ত প্রতিবন্ধিতা-বিভাজিত (Disaggregated) তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সুনির্দিষ্ট সূচক প্রণয়ন।