বাংলাদেশ প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার্স রেজিস্ট্রেশন বোর্ডের (বিপিইআরবি) গত দুই বছরে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম, প্রকৌশলী মূল্যায়ন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে বোর্ডটি ২৪৪ জন রেজিস্টার্ড ইঞ্জিনিয়ারের মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছে। যা মোটের উপর ৬৮ শতাংশ।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিপিইআরবির ভাইস চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইঞ্জি. মো. জাহাঙ্গীর আলমের প্রকাশিত ‘বিগত দুই বছরে বিপিইআরবি: অর্জন, রূপান্তর এবং সামনের পথ’ শীর্ষক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৬টি ব্যাচে মোট ৩৬১ জন রেজিস্টার্ড ইঞ্জিনিয়ারের মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছে বিপিইআরবি। এর মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৩৭টি ব্যাচে ২৪৪ জনের মূল্যায়ন করা হয়। বছরভিত্তিক হিসাবে ২০২৫ সালে ১৩টি ব্যাচে ৮০ জন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৪টি ব্যাচে ১৬৪ জন প্রকৌশলীর মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকৌশলকাজের ধরন অনুযায়ী, গত দুই বছরে মূল্যায়িতদের মধ্যে ১৮৬ জন স্ট্রাকচারাল, ৩৬ জন ইলেকট্রিক্যাল, সাতজন জিওটেকনিক্যাল, ছয়জন অগ্নিনিরাপত্তা, চারজন প্লাম্বিং, তিনজন ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল এবং দুজন নির্মাণ তদারকি শাখার প্রকৌশলী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই বছরে বোর্ডের কার্যক্রমে বড় ধরনের ডিজিটাল রূপান্তর এসেছে। আগে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা পেশাদার প্রকৌশলীদের নিবন্ধন পুনরায় সচল করা হয়েছে এবং হালনাগাদ নিবন্ধিত প্রকৌশলীদের তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও পেশাগত উন্নয়ন কার্যক্রমের (সিপিডি) রেকর্ড জমা দেওয়ার ব্যবস্থা অনলাইনে নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পেশাদার প্রকৌশলী (পি.ইঞ্জ.) ও মূল্যায়নকারীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন ম্যানুয়াল তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (বিএনবিসি) ২০২০-এর আলোকে রেজিস্টার্ড ইঞ্জিনিয়ার (আরই) নিবন্ধনের জন্যও প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ ম্যানুয়াল প্রণয়ন করেছে বোর্ড। আবেদন, ফি প্রদান, যাচাই-বাছাই, ফলাফল প্রকাশ ও নবায়নের মতো অধিকাংশ কার্যক্রম এখন একটি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
পেশাদার প্রকৌশলী নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও আগ্রহ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত দুই বছরে ৮০ জনের বেশি প্রকৌশলী পি.ইঞ্জ. নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন এবং ৪০ জনের বেশি আবেদনকারী সফল হয়েছেন। ২০২৬ সালের ২ নভেম্বর পর্যন্ত আটটি শাখায় মোট ৬১১ জন পেশাদার প্রকৌশলী নিবন্ধিত রয়েছেন।
প্রকৌশল পেশায় নিবন্ধনের গুরুত্ব বাড়াতে নিয়ন্ত্রক পর্যায়েও পরিবর্তন এসেছে। বিএনবিসি ২০২০ অনুযায়ী, ক্যাটাগরি ২, ৩ ও ৪-ভুক্ত ভবনের নকশা প্রণয়ন ও তদারকির জন্য প্রকৌশলীদের রেজিস্টার্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সনদ দেওয়ার দায়িত্ব বিপিইআরবিকে দেওয়া হয়েছে। বৃহত্তর ঢাকায় রাজউকের ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটিং সিস্টেমের (ইসিপিএস) মাধ্যমে ভবনের নকশা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে এ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে রেজিস্টার্ড ইঞ্জিনিয়ার নিবন্ধনের জন্য নতুন মূল্যায়ন কাঠামো চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে প্রথমবারের আবেদনকারীদের জন্য লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি আবেদনকারীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনটি পৃথক পথ বা পাথওয়ে চালুর কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, ২০২৬ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত দুই ধাপে দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করেছে বিপিইআরবি। প্রথম ধাপে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন, বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি এবং পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পোর্টাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ২০৩১ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাক্ট প্রণয়নের মাধ্যমে বোর্ডকে স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর, প্রকৌশল পেশার নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং নতুন বিশেষায়িত প্রকৌশল নিবন্ধন চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০৪১ সালের মধ্যে ২০ হাজার সক্রিয় পেশাদার প্রকৌশলী (পি.ইঞ্জ.) এবং ৩০ হাজার রেজিস্টার্ড ইঞ্জিনিয়ার (আরই) তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।
তবে অগ্রগতির পাশাপাশি কয়েকটি চ্যালেঞ্জও চিহ্নিত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে বিপিইআরবির নিজস্ব সংসদীয় আইনি ভিত্তির অনুপস্থিতি, প্রকৌশলের বিভিন্ন শাখায় নিবন্ধনের ভারসাম্যহীনতা, ঢাকাকেন্দ্রিক নিবন্ধন কার্যক্রম এবং নিবন্ধন নবায়ন ও পেশাগত উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়মিত রাখার চ্যালেঞ্জ। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার প্রকৌশলী নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।