মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে: শফিকুর

জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী ঐতিহাসিক ঘটনাবলীতে দেশের যেসব বীর সেনানী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অবদানকে খাটো করে দেখার বা কোনো বিশেষ দল বা ব্যক্তির একক সম্পত্তি হিসেবে দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। 
 
তিনি বলেন, ১৯৭১ কিংবা ১৯৭৫ সালে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে থাকা অনেক দলের অস্তিত্বই ছিল না, তাই ইতিহাসের সত্যতাকে বিকৃত না করে যার যার ঐতিহাসিক অবদান ও আত্মত্যাগকে যথাযথ সম্মান জানাতে হবে।
 
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে দলের ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির এসব কথা বলেন। 
 
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে কৃতিত্বের লড়াই না করে যার যেখানে অবদান, তাকে সেখানে স্বীকৃতি দিতে হবে। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনসহ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অবদানও যথাযথভাবে স্মরণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও অবদানের স্বীকৃতি কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি হতে পারে না।
 
তিনি আরও বলেন, ৭ নভেম্বরের মূল চেতনা হলো স্বৈরশাসন, একনায়কতন্ত্র, শোষণ ও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে দেশের সাধারণ জনগণের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এই ঐতিহাসিক চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করেই বর্তমান ও ভবিষ্যতে দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র, সুশাসন, ইনসাফ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যারা অতীতের মতো আজও দেশের আপামর জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে পাশ কাটিয়ে এককেন্দ্রিক বা দলীয় স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত থাকবে, ইতিহাস তাদের কাউকে ক্ষমা করবে না।
 
তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের উদাহরণ টেনে তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯৭২ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তৎকালীন সরকার দেশে বিদ্যমান প্রায় সব কটি ইসলামী সংগঠনকে অন্যায়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল, অথচ এসব সংগঠনই তৎকালীন সময়ে দেশের মানুষের পক্ষে সোচ্চার ছিল। জনগণের বিপুল সমর্থন ও ম্যান্ডেট পাওয়ার পরও সরকার জনগণের আস্থা দ্রুত হারিয়ে ফেলে এবং নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য রক্ষীবাহিনীর মতো একটি বিশেষ ও জবাবদিহিহীন বাহিনী গঠন করে। অভিযোগ রয়েছে যে, সেই বাহিনীর যথেচ্ছ ক্ষমতার অপব্যবহারে সেসময় বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং দেশে একধরনের ভয়ের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্ম দেয়।

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে আরও বলেন যে, তৎকালীন সময়ে সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছিল এবং ভিন্নমত দমনের জন্য একের পর এক অগণতান্ত্রিক আইন ও বাকশাল কায়েম করা হয়েছিল। ১৫ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বরের ক্ষমতার পালাবদলের ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর সিপাহি ও জনতার ঐতিহাসিক অভূতপূর্ব ঐক্যের মাধ্যমে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
 
তিনি বলেন, সিপাহিরা রাস্তায় নেমেছিলেন আর ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ মসজিদ থেকে বের হয়ে তাকবির ধ্বনি দিয়ে তাদের স্বাগত জানিয়েছিল। সেই গণজাগরণ ও সংহতির কারণেই দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে স্থান করে নিয়েছে। পরে জিয়াউর রহমান প্রথমে সামরিক প্রশাসক ও পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও ১৯৭১ বা ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার বা ইতিহাসকে নিজেদের একক কৃতিত্ব হিসেবে প্রচার করার কোনো সুযোগ নেই।

বর্তমান রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন অধ্যাদেশ ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় কিছু অসঙ্গতি রয়ে গেছে, যা ফ্যাসিবাদকে পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে পারে।
 
শিক্ষাঙ্গন ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের পুরনো সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও চাকরি পাওয়ার দাবিতে যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তাদের সেই ত্যাগ ও দাবির সঙ্গে কোনো ধরনের উপহাস বা প্রহসন বরদাস্ত করা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল স্থানগুলোতে দলীয় ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের বসিয়ে কোনোভাবেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
 
র‌্যাব পুনর্গঠন বা সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, শুধুমাত্র নাম পরিবর্তন করে কিংবা আগের জনবল ও কাঠামো বহাল রেখে জনগণের কাঙ্ক্ষিত অধিকার বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না; বরং দেশকে আধিপত্যবাদের কালোছায়া থেকে মুক্ত করে একটি প্রকৃত জনকল্যাণমুখী, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য সব দেশপ্রেমিক শক্তিকে আজ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।
 
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এছাড়া ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমীর আব্দুর রহমান মূসা, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক ও ইয়াসিন আরাফাতসহ জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।