জ্বালানি সংকটে মস্কোর ওপর নির্ভরতা বাড়ছে ইরানের

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে ইরানে। অথচ যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এবং বছরের পর বছর বিনিয়োগের অভাবে দেশটিতে জ্বালানি সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শীত আসার আগেই গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে এবার রাশিয়ার কাছ থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে তেহরান। খবর ইারন ইন্টারন্যাশনাল।

গত ৫ নভেম্বর মস্কোয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি। বৈঠক শেষে তিনি জানান, ইরানের গ্যাসের ঘাটতি মেটানো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে পাইপলাইন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এই উদ্যোগ সাময়িকভাবে ইরানের জ্বালানি সংকট কমাতে পারে। তবে বড় প্রশ্ন হলো, রাশিয়ার কাছ থেকে গ্যাস আমদানি করে ইরান কি নিজেদের দুর্বল জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠন করতে পারবে, নাকি প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়াই সংকট কিছুদিন পিছিয়ে দেবে?

গত ১ নভেম্বর ইরানের জাতীয় গ্যাস কোম্পানির প্রধান সাঈদ তাভাকোলি জানান, চারটি গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনায় হামলার কারণে প্রতিদিন ২৩ কোটি ঘনমিটার গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা কমে গেছে। মেরামতের মাধ্যমে এর মধ্যে ১০ কোটি ঘনমিটারের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে এখনো প্রতিদিন ১৩ কোটি ঘনমিটার গ্যাসের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

তাভাকোলি সতর্ক করে বলেন, শীতকালে গ্যাসের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় প্রতিদিন প্রায় ৪০ কোটি ঘনমিটারের ঘাটতিতে পড়তে পারে ইরান। তবে এটি সারা বছরের ঘাটতির হিসাব নয়। বরং শীতকালে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সম্ভাব্য সংকটের সরকারি পূর্বাভাস।

এরই মধ্যে সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে শিল্প খাতে। শিল্পসংশ্লিষ্ট এক প্রতিনিধির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ অক্টোবর থেকে সিমেন্ট কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে কারখানাগুলো জ্বালানি হিসেবে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাসাবাড়িতে গরম রাখার জন্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলেও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং বায়ুদূষণও তীব্র হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইরান ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করেছে। একই সময়ে দেশটিতে গ্যাসের ব্যবহার ছিল ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের মধ্যে ব্যবধান ছিল খুবই সামান্য। এই হিসাবের আড়ালে শীতকালে আরও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

ইরানে গ্যাসের দাম ব্যাপকভাবে ভর্তুকি দিয়ে কম রাখা হয়েছে। এতে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব, সীমিত মজুত সক্ষমতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি সংগ্রহে বাধা উৎপাদন বাড়ানোর পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। দেশটির বিশাল সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রেও ভূগর্ভস্থ গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার সমস্যা মোকাবিলায় নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে ইরানের নিজস্ব নীতিও সংকটকে আরও বাড়িয়েছে। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ ছাড়াই কম দামের গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে তাপমাত্রা কমলেই অর্থনীতি বড় ধরনের জ্বালানি ঝুঁকিতে পড়ছে।

রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি করলে ইরান সাময়িক স্বস্তি পেতে পারে। তবে এতে দেশটির জ্বালানি ব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর হবে না।

ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে গ্যাস সহযোগিতা নিয়ে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা চলছে। তবে বিভিন্ন সময়ে ঘোষণার তুলনায় বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে কম। ২০২৪ সালের জুনে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম এবং ইরানের জাতীয় গ্যাস কোম্পানি এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে।

এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুতিন প্রাথমিকভাবে বছরে ২০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনার কথা জানান। ভবিষ্যতে এই পরিমাণ বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ কোটি ঘনমিটারে নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়। ২০২৬ সালের অক্টোবরে ইরানি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে আরও অগ্রগতির কথা জানান। তবে বড় পাইপলাইন নির্মাণের অর্থায়ন এবং গ্যাস সরবরাহ শুরুর নির্দিষ্ট সময় এখনো স্পষ্ট নয়।

প্রাথমিকভাবে বছরে ২০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস আমদানি করা হলে দৈনিক গড়ে সরবরাহ দাঁড়াবে প্রায় ৫৫ লাখ ঘনমিটার। ইরানের শীতকালীন সম্ভাব্য দৈনিক ৪০ কোটি ঘনমিটার ঘাটতির তুলনায় এটি ২ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে বছরে ৫ হাজার ৫০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৫ কোটি ১০ লাখ ঘনমিটার গ্যাস পাওয়া যাবে।

তবে এসব হিসাব সরবরাহের সম্ভাব্য পরিমাণ বোঝানোর জন্য। বাস্তবে শীতকালে কতটুকু গ্যাস পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে চুক্তি, পাইপলাইনের সক্ষমতা এবং মৌসুমি চাহিদার ওপর। প্রাথমিক পর্যায়ের আমদানি নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাজে আসতে পারে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের ঘাটতি কমাতে এর প্রভাব হবে সীমিত।

আজারবাইজানের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। তবে বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য পাইপলাইন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিতে ব্যাপক বিনিয়োগ, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তি এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

গ্যাসের দাম ও অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকেও এসব বিষয়ে সমঝোতা হয়নি। পরবর্তী ঘোষণাগুলোতেও বিস্তারিত শর্ত প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যাপক ভর্তুকি দিয়ে গ্যাস বিক্রি করা হয়। ফলে আমদানি করা গ্যাসও একইভাবে বিক্রি করতে হলে সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাও এই উদ্যোগের অর্থায়ন ও অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে। যদিও প্রাকৃতিক গ্যাসের কিছু লেনদেন নির্দিষ্ট কয়েকটি নিষেধাজ্ঞার বাইরে রয়েছে, ব্যাংক, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিধিনিষেধ এড়িয়ে চলতে হবে।

অন্যদিকে রাশিয়ার জন্যও এই চুক্তির যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। ইউরোপে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের বড় বাজার হারানোর পর বিকল্প ক্রেতা খুঁজছে মস্কো। ইরানে বড় ধরনের গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর বাজারেও প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে রাশিয়ার।

তবে এই অংশীদারত্বে দুই দেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা সমান নাও হতে পারে। ইরানের জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস, অবকাঠামো ও অর্থায়ন প্রয়োজন। অন্যদিকে রাশিয়ার হাতে রয়েছে বিক্রির জন্য গ্যাস। ফলে রাশিয়ার যন্ত্রপাতি, অর্থায়ন ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লে ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম এবং চুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনায় ইরানের বিকল্প সীমিত হয়ে যেতে পারে।

এই উদ্যোগের সঙ্গে আঞ্চলিক গ্যাস বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠার ইরানের পরিকল্পনাও জড়িত। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের আগে দেশটিকে একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শীতকালে নিজেদের চাহিদাই যেখানে পূরণ করতে পারছে না, সেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোতে নির্ভরযোগ্যভাবে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা কীভাবে অর্জন করবে ইরান?

রাশিয়ার গ্যাস আমদানি করে আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এতে ইরান নিজেই রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানির একটি পথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সে ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম কিংবা সরবরাহের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ কমে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি ইরানের কারখানাগুলো সচল রাখতে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামত, সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখা এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে ভর্তুকি ব্যবস্থায় সংস্কার আনাও জরুরি।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকা সত্ত্বেও ইরানকে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির কথা ভাবতে হচ্ছে। দেশটির জ্বালানি ব্যবস্থার অবনতির চিত্র বোঝার জন্য এটিই যথেষ্ট। শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি ইরানের জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ তৈরি করবে, নাকি মস্কোর ওপর নির্ভরশীলতা আরও বাড়াবে—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।