 টেকনাফে অপরাধ

চাই নিরাপদ পর্যটনের পরিবেশ

সীমান্তবর্তী টেকনাফ ভৌগোলিক কারণে স্পর্শকাতর এলাকা। পাহাড়, নদী ও সাগরের সংযোগ থাকায় মানব পাচার এবং মিয়ানমার থেকে আসা মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয় এলাকাটি। সেখানে বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেন হয় বলে অপহরণ ও খুনসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা ঘটছে না। দেশের ভেতরে তো বটেই, মিয়ানমারের প্রভাবশালী মহলও মারাত্মক এসব অপরাধ চক্রে জড়িত। জড়িত বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনেকে। পরিস্থিতি এত খারাপ হয়েছে, অপরাধ চক্রগুলো এখন বেপরোয়া। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানকেও তারা চ্যালেঞ্জ করে। এমন এক অভিযানে তাদের গুলিতে সম্প্রতি নিহত হয়েছেন তরুণ সেনাসদস্য তিতাস শেখ। 

অপরাধ চক্রগুলো বেপরোয়া হঠাৎ হয়েছে, তা নয়। তারা যে শুধু টেকনাফেই সক্রিয়, তাও নয়। আশপাশে চকরিয়াসহ পুরো পর্যটন জেলা কক্সবাজারে বছরের পর বছর ধরে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ২৩ সেপ্টেম্বর (২০২৪) রাতে চকরিয়ায় ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার। এই হত্যা মামলায় চারজনের মৃত্যুদ- ও নয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান বিশেষ কাজে টেকনাফ গিয়ে নিহত হন মেরিন ড্রাইভের শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে, ৩১ জুলাই (২০২০) রাতে। টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া ক্যাম্প পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে তিনি খুন হন, এমন প্রমাণ পাওয়ায় দুজনেরই মৃত্যুদ- হয়। হাইকোর্টও রায়টি বহাল রাখে। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান, আদালতের রায়ে মৃত্যুদ- ও যাবজ্জীবন জেল হওয়াসহ কিছুতেই থামছে না অপরাধীরা। ভৌগোলিক অবস্থান এবং রোহিঙ্গা সংকটকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে তারা পুরো অঞ্চল অপরাধের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারী অস্ত্র আছে তাদের। দুর্গম পাহাড় ও বনাঞ্চলের আস্তানায় স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পবাসীকে অপহরণ করে; নেয় মুক্তিপণ। নাফ নদ ও সাগর পথে মানুষ পাচার করে। পাচার হওয়া অনেকে নির্যাতনের শিকার হয়; মারাও যায়। সব মিলিয়ে স্থানীয়দের কাছে পুরো এলাকাটি আতঙ্কের এক জনপদ। একই সঙ্গে কক্সবাজারসহ ওই অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটন ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি তৈরি হয়েছে।

ভয়ে অনেক পর্যটক টেকনাফ না যাওয়ায় পর্যটন-অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চক্রগুলো মাদক ও মানব পাচারের প্রচুর টাকা বিদেশে পাচার করে, যা দেশের ওপর বড় অর্থনৈতিক আঘাত। সব মিলিয়ে টেকনাফ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তির সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে, যা বৈদেশিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।

মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব দিয়েছে চীন। কক্সবাজার অঞ্চল এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ হাব হতে পারে।

আমরা মনে করি, টেকনাফের ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্ত, রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা আশ্রয়-শিবিরের অবস্থানের কারণে সৃষ্ট জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। মানব পাচার ও মাদক পাচার বন্ধ করতেই হবে। এটা করা গেলে খুন-অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় কমবে। স্থল ও নৌ উভয়ক্ষেত্রে সীমান্ত-নজরদারি বাড়াতে হবে। কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করতে হবে। বিজিবি, কোস্ট গার্ডের তৎপরতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে টাস্কফোর্স করা যেতে পারে। থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা, ড্রোন ও নাইট ভিশন গগলসহ ২৪ ঘণ্টা নিবিড় নজরদারি করতে হবে। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরেও সারাক্ষণ কড়া নজরদারি প্রয়োজন। নাফ নদ, সাগর ও উপকূলে ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় নিয়মিত চিরুনি অভিযান করতে হবে। রাজনৈতিক-সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে মাদক ও মানব পাচারের গডফাদার ও স্থানীয় দালালদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সাক্ষী সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা নির্ভয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিতে পারে। স্থানীয় মানুষের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, যাতে তারা অর্থাভাবে এসব অপরাধে না জড়ায়। আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক কারিগরি ও অন্যান্য সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

আমরা চাই, বর্তমানে অপরাধীদের অভয়ারণ্য টেকনাফসহ পুরো কক্সবাজার হোক আন্তর্জাতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ হাব, নিরাপদ পর্যটনের স্বর্গ।