সন্তান না হলে তালাক দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়

সন্তান না হওয়া দাম্পত্য জীবনের কঠিন বাস্তবতা। এই কষ্ট স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই। এমন পরিস্থিতিতে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, চিকিৎসা নেওয়া এবং মানসিক শক্তি জোগানোই দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য। অথচ বরিশালের হিজলায় সাত বছরের সংসার ভেঙে যাওয়ার যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা আমাদের সম্পর্কের দায়িত্ববোধ ও ইসলামের শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত থেকে স্বামীকে ফেরাতে তার পা জড়িয়ে ধরে কান্না করছেন স্ত্রী। বারবার অনুরোধ করছেন সংসারটি টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু স্বামী নিজের সিদ্ধান্তে অটল। স্বামীর দাবি, চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার স্ত্রী কখনো মা হতে পারবেন না।

এমন পরিস্থিতিতে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া খুবই অমানবিক। এটা ইসলামের শিক্ষা নয়। একজন নারীর মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা যেমন গভীর, তেমনি সন্তান না হওয়ার কষ্টও তার একার নয়। সন্তান ধারণে অক্ষমতার কারণ নারী কিংবা পুরুষ, উভয়ের ক্ষেত্রেই থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন পারস্পরিক সহযোগিতা ও ধৈর্য। 

পবিত্র কোরআনে হজরত জাকারিয়া (আ.)-এর ঘটনা এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন। তার স্ত্রীও ছিলেন বন্ধ্যা। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন অব্যাহত রেখেছিলেন। সন্তান লাভের আশায় আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন এবং তাকে হজরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর সুসংবাদ দেন।

ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার রব! আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।’ এরপর ফেরেশতারা তাকে ইয়াহইয়া (আ.)-এর সুসংবাদ দেন। হজরত জাকারিয়া (আ.) বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তার বার্ধক্য এসে গেছে এবং তার স্ত্রী বন্ধ্যা। আল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন।’ (সুরা আলে ইমরান ৩৮-৪০)

এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সন্তান দান করা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। মানুষের চিকিৎসা ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, দয়া ও দায়িত্ববোধের গুরুত্বও স্মরণ করা দরকার। আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ভালোবাসা ও দয়ার কথা বলেছেন। (সুরা রুম ২১)

ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমতি রয়েছে। তবে তা নিছক ইচ্ছাপূরণের বিষয় নয়। স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একজন স্ত্রী নিয়েই সংসার করার নির্দেশনা রয়েছে। (সুরা নিসা ৩)

সন্তান না হলে স্ত্রীকে পরিত্যাগ করতেই হবে, এমন কোনো বিধান ইসলামে নেই। আবার দ্বিতীয় বিয়ে করলেই সন্তান হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।

হজরত জাকারিয়া (আ.)-এর ঘটনা জুমার বয়ান ও ওয়াজ-মাহফিলে বেশি বেশি আলোচিত হওয়া প্রয়োজন। সেখানে তার দোয়া ও সন্তান লাভ এবং প্রতিকূলতার মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্কের বাস্তবতাও তুলে ধরা দরকার। এছাড়া বহুবিবাহের বিধান আলোচনার পাশাপাশি এর ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীলতার শর্তও স্পষ্ট করা জরুরি।

সন্তান আল্লাহর দান। কিন্তু সন্তান না হওয়ার কারণে কাউকে অসম্মান করা, তার ভালোবাসা ও দীর্ঘ দিনের সংসারকে মূল্যহীন করে দেওয়া কোনোভাবেই প্রশংসনীয় আচরণ হতে পারে না।

স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নন, তারা জীবনের সহযাত্রী। সুখে-দুঃখে পাশে থাকার অঙ্গীকারই দাম্পত্যের সৌন্দর্য। ইসলামের শিক্ষা সেই অঙ্গীকারকে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে রক্ষা করতে শেখায়।