বরগুনার তালতলীতে টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ঝড়ে পড়া গাছ সংগ্রহে নিলামের আড়ালে অর্ধশতাধিক জীবিত গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। শুধু গাছ কেটেই ক্ষান্ত হননি তারা। অভিযোগ রয়েছে, কাটার আলামত মুছে ফেলতে গাছের গোড়া আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনায় বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের অধীন আমতলী রেঞ্জে (তালতলী) ঝড়ে পড়া গাছ আহরণের অনুমতি দেওয়া হয়। গত ১ জুলাই বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. জাহিদুর রহমান মিয়া স্বাক্ষরিত আদেশে এ কার্যাদেশ দেওয়া হয়। নিলামে ৭৪ হাজার টাকা পরিশোধ করে দুটি লট ক্রয় করেন স্থানীয় সোহেল রানা।
কার্যাদেশ অনুযায়ী, দুই লটে ২৫টি করে মোট ৫০টি গাছ অন্তর্ভুক্ত ছিল। গাছগুলো নলবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পের চর রতনের পূর্ব পাশের বাগান এলাকায় অবস্থিত। নথি অনুযায়ী, গত ১ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে গাছ কাটার মেয়াদ নির্ধারিত থাকলেও ক্রেতা সোহেল রানা গত ১০ অক্টোবর গাছ কাটেন। পরে ১২ অক্টোবর অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্র উত্তাল থাকার কারণ দেখিয়ে সময় বাড়ানোর আবেদন করেন তিনি। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ অক্টোবর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার আদেশে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করা হয়।
তবে গত ৬ নভেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিলামকৃত ঝড়ে পড়া গাছের বাইরে বিভিন্ন প্রজাতির জীবিত গাছ কেটে ট্রলারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই আকাশমণি, ঝাউ, বাবলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির অর্ধশতাধিক জীবিত গাছ কাটা হয়েছে। এ সময় অনেক গাছে বন বিভাগের নির্ধারিত মার্ক বা সিল পাওয়া যায়নি। কোথাও কোথাও একই ক্রমিক নম্বর একাধিক গাছে ব্যবহার করার চিত্রও দেখা যায়। এমনকি কাটা গাছের আলামত নষ্ট করতে কয়েকটি গাছের গোড়ায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাও চোখে পড়ে। খবর পেয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গেলেও একাধিক গাছ কাটার আলামত থাকার পর মাত্র একটি গাছের চারটি খ- জব্দ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলামের যোগসাজশে নিলাম ক্রেতা নির্ধারিত সীমার বাইরে জীবিত গাছ কাটার সুযোগ পেয়েছেন। এমনকি ঘটনাস্থলে গিয়েও রহস্যজনক কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাদের দাবি।
নলবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত বিট কর্মকর্তা জহিরুল হক বলেন, ‘আগের বিট কর্মকর্তা চলে যাওয়ার পর আমি কিছুদিন আগে দায়িত্ব নিয়েছি। একই ক্রমিক নম্বর একাধিক গাছে থাকার বিষয়টি যিনি মার্ক করেছেন, তার ভুল ছিল।’ তবে বর্তমানে কতটি গাছ কাটা হয়েছে এবং কতটি নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান।
অভিযোগ অস্বীকার করে আমতলী রেঞ্জের (তালতলী) রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখানে যোগদানের আগেই গাছের নিলাম কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তাই এ ঘটনায় আমার কোনো সুবিধা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’ তবে জীবিত গাছ কাটা ও বনে আগুন দেওয়ার ঘটনা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে আকাশমণি গাছের চারটি খ- উদ্ধার করা হয়েছে। বনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ে বন বিভাগের বরগুনা কার্যালয়ের সহকারী বন সংরক্ষক মোজাম্মেল হোসেন ভূঞা বলেন, ‘নলবুনিয়া ক্যাম্পে অনুমোদিত দুটি লটের আওতায় মোট ৫০টি গাছ আহরণের কার্যক্রম চলমান ছিল। এর বাইরে অতিরিক্ত একটি আকাশমণি গাছ অবৈধভাবে কাটার বিষয়টি ধরা পড়েছে। প্রাথমিকভাবে এ ঘটনায় নলবুনিয়া ক্যাম্পের একজন কর্মচারীর সরাসরি যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া গেছে।’