আজকের পত্রিকা

সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ও সত্তরের নির্বাচন

  • ড. এম এ মোমেন   

সংরক্ষিত ১৩টি নারী আসনসহ ৩১৩ আসনের জাতীয় পরিষদে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আসনসংখ্যা ১৬০+৭ এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির ৮১+৩; তৃতীয় অবস্থানে ৯ আসন নিয়ে পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাইয়ুম)। এটাই প্রত্যাশিত ছিল আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি বিরোধী দলের আসনে বসবে। ৩০০ আসনের ১৬২টি পাকিস্তানের পূর্বাংশে হওয়ায় পিপিপি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন যে স্বপ্নই থেকে যাবে ১৯৭০ সালের নির্বাচন তা স্পষ্ট করে দিল। পাকিস্তানি লেখক শাকির লাখানি লিখেছেন স্বপ্নপূরণের জন্য ভুট্টোর একটি পথই খোলা ছিল পাকিস্তান ভেঙে শুধু পশ্চিমাংশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া।

১৫ ফেব্রুয়ারি পেশোয়ারে ভুট্টো ঘোষণা দিলেন তিনি এবং তার দলের সদস্যরা জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগ দেবেন না। তার এই ঘোষণার পরই পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের কেউ কেউ তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ করেন। ১৫ মার্চ করাচিতে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি জানিয়ে দিলেন মেজরিটি রুল বা সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতাসীন হওয়া পাকিস্তানের জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি দাবি জানালেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। দাবি না মানলে এমনকি পশ্চিম পাকিস্তান অচল করে দেওয়ার হুমকিও দিলেন।

তার নতুন ক্ষমতা বণ্টনতত্ত্ব কেবল পশ্চিম পাকিস্তানে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তার একটি বিবরণী দেওয়া যেতে পারে। পরদিনই ১৬ মার্চ লাহোরে কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মুমতাজ মোহাম্মদ খান দৌলতানা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এক দেশে কখনো দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থাকতে পারে না।

পাকিস্তান পাঞ্জাব ফ্রন্ট জুলফিকার আলীর নেতৃত্ব অস্বীকার করল। দলনেতা মালিক মোহাম্মদ জিলানি বললেন, ভুট্টো পাঞ্জাবের জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে অমর্যাদাপূর্ণ আচরণ করেছেন, তার ভূমিকা গণতন্ত্রবিরোধী। ভুট্টো পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের সুযোগ নস্যাৎ করে দিচ্ছেন। ভুট্টোর কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে তিনি ভাইমার রিপাবলিকের পার্লামেন্টে আগুন ধরিয়ে হিটলারের অভ্যুত্থান ঘটানোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। লাহোর প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পাকিস্তানের অখন্ডতা ও সংহতির স্বার্থে এখনই শেখ মুজিবুর রহমানকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানো উচিত। ২৩ বছর ধরে পশ্চিম পাকিস্তান শাসন করেছে এবং পূর্ব পাকিস্তানকে অনেক ভুগতে হয়েছে। এখন পূর্ব পাকিস্তান যদি তার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে শাসন করতে যায় আর তাতে যদি পশ্চিম পাকিস্তানকে কিছুটা ভুগতেও হয়, তাতে কী এসে যায়।

জামিয়াতুল উলেমা-ই-ইসলামের নেতা মওলানা গোলাম গাউস হাজারভি বলেছেন, আমরা ভুট্টোর আত্মম্ভরিতার নিন্দা করি। তার মনে রাখা উচিত পশ্চিম পাকিস্তান একটি ইউনিট নয়, চারটি ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশ। ভুট্টোর অনুমতি ছাড়া ঢাকায় জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যাওয়া যাবে না এ দম্ভোক্তি প্রকাশের অধিকার তিনি কোথায় পেলেন? ইউনাইটেড ফ্রন্ট নেত্রী তাহিরা মাকসুদ বলেছেন, ভুট্টোর উসকানিমূলক বক্তব্য এবং অগণতান্ত্রিক মনোভাব দেশকে দুর্গম পরিস্থিতির দিকে নিয়ে এসেছে। এই সংকট সৃষ্টির অপরাধ তারই, ইতিহাস তাকে কখনো ক্ষমা করবে না।

এয়ার মার্শাল আসগর খান মূলত জুলফিকার আলী ভুট্টোর দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, কতিপয় রাজনীতিবিদ ব্যক্তিস্বার্থে পাকিস্তানকে ভাঙনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ‘আমরা পূর্ব পাকিস্তানের ভাইদের প্রতি অন্যায় আচরণ করে যাচ্ছি।’ জামাত-ই-ইসলামির ভারপ্রাপ্ত আমির মিয়া তোফায়েল মোহাম্মদ (১৯১৪-২০০৯) বলেন, দেশের দুই অংশে দুটো সরকার সৃষ্টি করলে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারকে অস্বীকার করা হবে। অথচ লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার দেশের অখ-তাকে রক্ষা করার জন্যই প্রণয়ন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ভুট্টো সাহেব পশ্চিম পাকিস্তানকে এক ইউনিট বিবেচনা করে কেবল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক হতে চাচ্ছেন। তার এ ধরনের মনোভাবের কারণেই পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

পাঞ্জাব আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল মালিক হামিদ সরফরাজ বললেন, ভুট্টো সাহেবের কথা শুনে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেছি। পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে এত বড় বড় কথা বলে ক্ষমতার জন্য উন্মত্ত হয়ে আসলে তিনি পাকিস্তানের দুই অংশকে বিচ্ছিন্ন করতে চাচ্ছেন। আমি এখন আশা করছি পাকিস্তানের জনগণের কাছে এটা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে বিচ্ছিন্নতার ষড়যন্ত্রের প্রকৃত প্রণেতা কে। আমি বিশ্বাস করি, পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক জনগণ তার এই উদ্যোগ এখনই প্রত্যাখ্যান করবে।

কনভেনশন মুসলিম লীগ রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট সৈয়দ আলী আসগর শাহ বলেছেন, জুলফিকার আলী ভুট্টোর দাবি এটাই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল ক্ষমতা দখলের জন্য লালায়িত। মূল বিষয় ছিল কেমন করে পাকিস্তানকে রক্ষা করা যায়, বাকি সব গৌণ। কিন্তু এখন মনে হয় ক্ষমতা ছাড়া তিনি বেঁচে থাকতে পারবেন না।

বাহাওয়ালপুর ইউনাইটেড ফ্রন্ট নেতা মিয়া নিজামউদ্দিন হায়দার বলেন, পিপিপি প্রধান এখন টু নেশন থিওরি নিয়ে এসেছেন। ভুট্টোর অবিবেচনাপ্রসূত বক্তব্যের কারণে দেশের সংকট এখন ভিন্নদিকে মোড় নিয়েছে। তিনি যা বলছেন তা দায়িত্বজ্ঞানহীনের বক্তব্য।

একটি বিবৃতিতে তিনি বলেন, ভুট্টো শুরু থেকেই ক্ষমতার ভাগ চাচ্ছেন। দুই অংশের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগির একটি মানে দেশ ভাগ। পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান চাচ্ছেন দুটো সংবিধান, দুটো সরকার এবং দুটো দেশ।

কাউন্সিল মুসলিম লীগ রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট খাজা মাহমুদ আহমদ মান্টো হস্তান্তর বিতর্ক ও দেশে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য ভুট্টোকে দায়ী করে এক বিবৃতিতে বলেন, ভুট্টো এমনকি জাতীয় অখন্ডতা জলাঞ্জলি দিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চান।

তিনি বলেন, জাতীয় পরিষদ নির্বাচন সারা দেশের জন্য অনুষ্ঠিত হয়েছে, আর তাতে সারা দেশের জন্য একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আবির্ভূত হয়েছে। কাজেই আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংকুচিত করে কেবল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ বলার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, করাচির বক্তব্যে ভুট্টো নিজেকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ফেলেছেন। দেশকে খন্ডিত করার যে ভয়ংকর পরিকল্পনা পিপিপি গ্রহণ করেছে জনগণের কাছে এখন তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। দেশপ্রেমিক মানুষ পিপলস পার্টিকে দেশের সংহতি বিপন্ন করতে দেবে না।

নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ মাহমুদ বললেন, পিপলস পার্টির কথামতো পাঞ্জাবের মানুষের এক পাকিস্তান চাই না দুই পাকিস্তান সে সিদ্ধান্ত পাঞ্জাবের মানুষ নেবে। পাঞ্জাবের মানুষ এক পাকিস্তানের জন্য ভুট্টোকে সমর্থন করেছিল। এখনো তারা যদি এক পাকিস্তান চায় তাহলে সমর্থন প্রত্যাহার করেও নিতে পারবে।

তিনি তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, ভুট্টো এখন পুরো ধরা পড়ে গেছেন, তেমনি আবদুল কাইয়ুম খান, দুজনই জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে অন্তরায়। সংবিধান প্রণয়নে সমর্থন দেওয়ার আগে দুজনই তাদের ক্ষমতার ভাগ নিয়ে নিশ্চিত হতে চান।

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ওয়ালী) সেক্রেটারি জেনারেল মাহমুদুল হক ওসমানি বলেন, এ মুহূর্তে কেন্দ্রে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাই ঠিক করবেন অন্তর্বর্তীকালে জাতীয় পরিষদের কোন কোন সদস্যকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ সময়ের উদ্ভূত সমস্যাগুলোর সমাধান করবে।

পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী ফয়েজ মোহাম্মদ বলেন, পিপিপি প্রধান করাচির সংবাদ সম্মেলনে যা বলেছেন তা সত্য ও মিথ্যায় মেশানো পরস্পর বিরোধিতায় পরিপূর্ণ এক বক্তব্য।

জামাত-ই-ইসলামি থেকে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য অধ্যাপক গফুর আহমেদ বলেছেন, পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান পশ্চিমাংশের ক্ষমতা দখল করার জন্য পাকিস্তান ভেঙে দুই টুকরো করতে চান। কাউন্সিল মুসলিম লীগ পাঞ্জাব অঞ্চলের সেক্রেটারি জেনারেল খাজা মোহাম্মদ সাফদার ভুট্টোর সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিরোধী তত্ত্বের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তিনি রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে দেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। 

পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির পশ্চিম পাকিস্তান উইংয়ের প্রেসিডেন্ট নবাবজাদা নসরুল্লাহ বলেন, ভুট্টোর প্রস্তাবিত ক্ষমতা হস্তান্তর ফর্মুলা পূর্বে একজন, পশ্চিমে একজন গণতান্ত্রিক নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি আরও বললেন, এ ধরনের প্রস্তাবে দেশপ্রেমিক জনগণের বিচলিত হওয়ার কারণ রয়েছে।

রাওয়ালপিন্ডি আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল এ আর শামসুদ দোহা বলেন, দেশের অখ-তা বিপন্নকারী ভুট্টোর উদ্যোগকে তার দল প্রতিহত করবে। নবাবজাদা শের আলী খান বলেন, যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধানের কাছেই ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, ভুট্টো চাচ্ছেন পাকিস্তান দু’ভাগ হয়ে যাক আর এর পরিণতি পলাশী ও সেরিঙ্গাপট্টম যুদ্ধের পরাজয়ের মতোই ট্র্যাজিক হবে ১৯৬৫-তে যে শত্রুরা পাকিস্তানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল, সেই শত্রুরাই এতে বেশি খুশি হবে। আমি আশা করব আমি যা শুনেছি, ভুল শুনেছি।

লেখক সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট

momen98765@gmail.com  

এই পাতার আরো খবর