আজকের পত্রিকা

সারা দেশের কারাগারে হঠাৎ বন্দির চাপ

  • সরোয়ার আলম   

বিএনপির ১০ ডিসেম্বর ঢাকার সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজনীতির উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। সমাবেশের স্থান নির্ধারণ নিয়ে পুলিশ ও বিএনপির মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা চলছে। এরই মধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে চলছে মামলা ও ধরপাকড়। এরই প্রেক্ষাপটে দেশের সবকটি কারাগারে বন্দির তথ্য চেয়ে কারা প্রশাসনে চিঠি দিয়েছে পুলিশ। প্রশাসন জানিয়েছে, গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে বন্দির সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। গত এক সপ্তাহে অন্তত সাত হাজার বন্দি এসেছে নতুন করে।

কারাগারের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে কী ধরনের বন্দি আছে। আগের চেয়ে বন্দি বেশি আসছে বলে আমরা জানিয়েছি। এভাবে বন্দির সংখ্যা বাড়তে থাকলে কারাগারে তাদের ঠাঁই দেওয়া কঠিন হবে। আমরা সারা দেশের কারাগারগুলোর বর্তমান ফিরিস্তি দেওয়া চেষ্টা করছি। গত এক সপ্তাহেই সাত হাজারের বেশি নতুন বন্দি কারাগারে এসেছে। তার মধ্যে ঢাকায় আটক বন্দির সংখ্যা বেশি।

এদিকে সমাবেশের উত্তাপ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরে পুলিশের সবকটি ইউনিট প্রধানদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক। বেলা ৩টা থেকে শুরু হওয়া বৈঠকটি শেষ হয় সন্ধ্যায়। বৈঠক থেকে বলা হয়েছে, যেকোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধ করতে পুলিশ ও র‌্যাবকে সতর্ক থাকতে হবে। ঢাকায় প্রবেশের রাস্তাগুলোতে চেকপোস্ট বাড়াতেও বলা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামীর যেসব নেতা জামিনে আছেন, তাদেরও তালিকা করতে বলা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, বিএনপি বা তৃতীয়পক্ষ রাজধানীতে নাশকতা, জ্বালাও-পোড়াও ভাঙচুরসহ নৈরাজ্য করার আশঙ্কা গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। ফলে ঢাকাবাসী ও মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে নিরাপদ রাখতে মহাপরিকল্পনা করেছে পুলিশ। এ নিয়ে পুলিশ ও র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করে করণীয় নির্ধারণ করছেন। প্রস্তুত রাখা হয়েছে র‌্যাব, বিজিবি, এপিবিএন, বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, স্পেশাল ফোর্স, স্পেশাল ডগ স্কোয়াড, হেলিকপ্টার ইউনিট। বাড়ানো হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি। অনলাইনে অপপ্রচার কিংবা গুজব ছড়িয়ে কেউ যেন কোনো ধরনের স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সে বিষয়েও বিভিন্ন ইউনিট তৎপর আছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, সম্প্রতি রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন মামলায় পুলিশ ও র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বিএনপি নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছে। গত ২৯ নভেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ১৫ দিনব্যাপী বিশেষ অভিযানের নির্দেশনা দেয়। সে নির্দেশনা অনুযায়ী ১ ডিসেম্বর অভিযান শুরু হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে গ্রেপ্তারদের বিভিন্ন কারাগারে পাঠানো হচ্ছে।

জানা গেছে, দেশের ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার ও ৫৫টি জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ৪২ হাজার ৬২৬ জন। তার মধ্যে পুরুষ বন্দি ৪০ হাজার ৬৯৭ এবং মহিলা বন্দি ১ হাজার ৯২৯ জন। বর্তমানে ৮৪ হাজার ১১৫ জন বন্দি রয়েছে বিভিন্ন কারাগারে। বিদেশি বন্দি আছে ৪৭২, শিশু ৩৪১, যুদ্ধাপরাধী ১২৫ এবং জেএমবি ৫৭৪ জন। এর মধ্যে খুলনা কারাগারের ধারণক্ষমতা ৬৭৮ জনের বিপরীতে ১ হাজার ২১৪, বাগেরহাট কারাগারে ৫৬৫ জনের বিপরীতে ৬১৪, সাতক্ষীরা কারাগারে ৪০০ জনের বিপরীতে ৫৮০, সিলেট কারাগারের দুই হাজারের বিপরীতে ২ হাজার ৬০০ জন বন্দি আছে।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মোহাম্মদ এমরান হোসেন মিঞা জানিয়েছেন, কারাগারে ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৪৯ জন হলেও এখন পাঁচ হাজারের বেশি বন্দি আছে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের আরেক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রতিদিন যেসংখ্যক আসামি আদালতের মাধ্যমে কারাগারে আসে, সমানসংখ্যক আসামি জামিনেও মুক্তি পাচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন মামলায় আসামির সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু সেই অনুযায়ী জামিন হচ্ছে না। ফলে কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছেই।

জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, মিছিল-সমাবেশের নামে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করলে কঠোরভাবে দমন করা হবে। শান্তিপূর্ণভাবে যেকোনো ধরনের কর্মসূচি পালন করলে পুলিশ সহায়তা করবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাস্তায় কোনো ধরনের সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। সোহরাওয়ার্দীতে বিএনপি কেন সমাবেশ করতে চাচ্ছে না তা আমাদের মাথায় আসছে না। তাদের কোনো উদ্দেশ্য আছে বলেই সেখানে সমাবেশ করবে না বলে জানান দিচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা বেশ শক্ত অবস্থানে আছি। স্থান নির্ধারণ বা সমাবেশ নিয়ে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করলে কঠোরভাবে তাদের দমন করা হবে। ঢাকার প্রবেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছে। সন্দেহজনক হলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিনা কারণে কাউকে ঢাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। 

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধী ধরতে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। এ নিয়ে বিএনপি যে অভিযোগ করছে তা সত্য নয়। আমরা তাদের কোনো ধরনের হয়রানি করছি না। নিরপরাধ কাউকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা অনেকটা নিশ্চিত হয়েছি, সমাবেশের নামে বিএনপি অরাজকতা সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি জামায়াত ইসলামীর নেতাকর্মীরা বিএনপিকে সহায়তা করবে। গত শনিবার থেকে সারা দেশেই পুলিশের বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে।

এই পাতার আরো খবর