আজকের পত্রিকা

৭১ নতুন স্কুলে বেঞ্চ-টেবিল নেই

  • শরীফুল আলম সুমন    

রাজধানীর আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। পুরনো ভবনে শিক্ষার্থীদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রায় ছয় মাস আগে পাঁচতলা একটি নতুন ভবন হয়েছে। কিন্তু ভবন হলেও সেখানে কোনো আসবাবপত্র সরবরাহ করা হয়নি। আগামী বছরের শুরুতেও সেখানে আসবাবপত্র সরবরাহের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এখনো ভবনটি অব্যবহৃতই আছে।

প্রতিষ্ঠানটির সহকারী প্রধান শিক্ষক গৌতম চন্দ্র পাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ক্লাসরুমের সংকট রয়েছে। ক্যানটিন ও ল্যাবরেটরি করার জন্যও জায়গার প্রয়োজন। এসব আমরা নতুন ভবনে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভবন নির্মাণ শেষ হলেও কোনো আসবাবপত্র দেওয়া হচ্ছে না। সংকটের মধ্য দিয়েই শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।’

জামালপুর, মৌলভীবাজার, দিনাজপুর, রংপুর প্রভৃতি জেলায়ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ শেষ হয়েছে। সেসব স্কুল থেকে প্রতিনিয়ত আসবাবপত্রের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। সেখানকার কর্তৃপক্ষ আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে নতুন ভবনে ক্লাস করতে চায়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৭১টি নতুন ভবনের জন্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেঞ্চ-টেবিলসহ প্রয়োজনীয় ফার্নিচার দেওয়ার কথা। এরপর ভবনের ব্যবহার শুরু হবে। কিন্তু ভবন নির্মাণ ছয় মাস আগে শেষ হলেও আসবাবপত্র সরবরাহ করা হয়নি। অথচ ৭১টি ভবনে সর্বোচ্চ ২৫ কোটি টাকার আসবাবপত্রের প্রয়োজন হতে পারে।

জানা যায়, জেলা পর্যায়ের সরকারি জেলা স্কুলগুলো অনেক পুরনো। অনেক আগে এসব স্কুলে ভবন হলেও নতুন ভবন তেমন একটা হয়নি। সরকারি নতুন স্কুলগুলোতে নতুন নতুন ভবন হলেও জেলা স্কুলগুলো ছিল দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। ফলে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে শ্রেণিকক্ষ সংকট। সে জন্য সরকার ২০১৭ সালে ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে ৩ হাজার ২৮৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়, যার কাজ মূলত ২০১৮ সালে শুরু হয়। এর আওতায় ৩২৩টি স্কুলে নতুন ভবন নির্মাণ, ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, দুর্গম এলাকায় ২৪টি হোস্টেল নির্মাণ, আসবাবপত্র কেনা, কম্পিউটার সামগ্রী ও বই কেনা, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও ক্রীড়াসামগ্রী কেনার কথা রয়েছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৪ হাজার ৬৫৩টি নতুন কক্ষ যুক্ত করার কথা।

সূত্র জানায়, ১০২টি ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণযোগ্য ভবনের মধ্যে গত আগস্টে ৭০টির কাজ শেষ হয়েছে। ৫টি ভবনের নির্মাণকাজ ৮০ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত, চারটি ভবন ৬০ থেকে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত, চারটি ভবন ৪০ থেকে ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত, সাতটি ভবন ২০ থেকে ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত এবং সাতটি ভবনের কাজ ১৯ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে।

আর ৩২০টি নতুন একাডেমিক ভবনের ১৭২টি হবে জেলা পর্যায়ে আর ১৪৮টি হবে উপজেলা পর্যায়ে। জেলা পর্যায়ে ছয়তলা ভবনের বদলে ১০ তলা ভবন করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হওয়ায় ১৬২টি ভবন নির্মাণের কাজ স্থগিত রয়েছে। ১৪৫টির দরপত্র আহ্বান শেষ হয়েছে। প্রক্রিয়াধীন রয়েছে তিনটি ভবনের কাজ। ১৩৭টি চলমান কাজের মধ্যে গত আগস্টে একটি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ৩২টি ভবনের কাজ ৮০ থেকে ৯৯ শতাংশ, ৩৫টির ৬০ থেকে ৭৯ শতাংশ, ২৬টির ৪০ থেকে ৫৯ শতাংশ, ২৪টির ২০ থেকে ৩৯ শতাংশ এবং ১৯টির ১৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর পরিচালক অধ্যাপক মো. নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে ৭০টি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ ও একটি নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে আরও প্রায় ৩৭টি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। শতভাগ কাজ সম্পন্ন হওয়া স্কুলগুলোর প্রধান শিক্ষকরা আসবাবপত্রের জন্য আমাদের ফোন দিচ্ছেন। চলতি অর্থবছরে আসবাবপত্রের জন্য যে বরাদ্দ রয়েছে তাতে আমরা সর্বোচ্চ দুই-তিনটি ভবনের আসবাবপত্র কিনতে পারব। ফলে আগামী অর্থবছরের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।’

অধ্যাপক মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের প্রকল্পের গড় অগ্রগতি ৩০ শতাংশের বেশি। করোনার জন্য গত দুই অর্থবছরে কাজ তেমন এগোয়নি। প্রকল্পটি অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ‘বি’ ক্যাটাগরির ঘোষিত হওয়ায় খাতওয়ারি অর্থছাড় স্থগিত আছে। এটির মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ‘কোনো স্কুল ভবনের নির্মাণকাজ ৫০ শতাংশ শেষ হলেই আসবাবপত্র সরবরাহের দরপত্র প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হয়। কিন্তু এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা দেখা যায়নি। চলতি অর্থবছরেও এসব ভবনের আসবাবের জন্য বরাদ্দ নেই। ফলে এসব ভবন রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।’

জানা যায়, ‘বি’ ক্যাটাগরির হওয়ায় এই প্রকল্পে ২০২২-২৩ অর্থবছরে যা বরাদ্দ রয়েছে সেখান থেকে ৫০ শতাংশ অর্থ ছাড় করা হবে। সে হিসেবে এ অর্থবছরে এই প্রকল্পে খরচ করা যাবে ২০০ কোটি টাকারও কম। এর প্রায় সবটকুই চলমান নির্মাণকাজের বিল পরিশোধে ব্যয় হবে। এর বাইরে দুই-তিনটি স্কুলের আসবাব, খেলাধুলার সামগ্রী কেনাসহ বেশকিছু কাজের পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো উন্নয়নবিষয়ক প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হয় ২০১৭ সালের ২১ মার্চ। পরিকল্পনা কমিশনের প্রশাসনিক আদেশ হয় ২০১৮ সালের ১০ মে। ওই বছরের ২০ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক আদেশ জারি হয়। ২০১৮ সালের ২৪ মে প্রকল্প-পরিচালক নিয়োগ করা হয়। করোনার কারণে ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রকল্পের কাজ খুব একটা এগোয়নি। তাই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে প্রকল্পের অর্থ তেমন ছাড় হচ্ছে না। যতটুকুই কাজ হয়েছে এর সুফলও পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা।

এই পাতার আরো খবর