
২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক-লেখক-কলামনিস্ট ফয়েজ আহমেদ। তিনি ১৯২৮ সালের ২ মে ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগনার বাসাইলভোগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামটি বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত। তার বাবার নাম গোলাম মোস্তফা চৌধুরী এবং মা আরজুদা বানু। মাত্র ১৬ বছর বয়সে সাহিত্যের টানে তিনি কলকাতার সওগাত অফিসে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে পরিচয় হয় বিখ্যাত দুই কবি আহসান হাবীব ও হাবীবুর রহমানের সঙ্গে। তারা আরও লেখার জন্য তাকে উৎসাহিত করেন। দেশভাগের পর ‘সওগাত’ পত্রিকা ঢাকায় চলে আসে। ‘সওগাত’ অফিসেই পত্রিকাটির সম্পাদক নাসিরুদ্দীন সাহেবের সর্বাত্মক সহযোগিতায় প্রগতি ও মুক্তবুদ্ধির ধারক হিসেবে পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের জন্ম হয়। ফয়েজ আহমদ তখন এই সংসদের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঢাকায় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলার প্রয়াস নিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে তার সাংবাদিক জীবনের শুরু। তিনি ইত্তেফাক, সংবাদ, আজাদ ও পরে পূর্বদেশে চিফ রিপোর্টার ছিলেন। ১৯৫০ সালে ‘হুল্লোড়’ এবং ১৯৭১ সালে ‘স্বরাজ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তার চেষ্টায় রেডিও পেইচিংয়ে বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হয়। এ ছাড়া তিনি ঢাকা রেডিওতে ১৯৫২-৫৪ সালে ‘সবুজমেলা’ বিভাগটি পরিচালনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রথম প্রধান সম্পাদক নিযুক্ত হন। শিশুতোষ সাহিত্যিক হিসেবেও তিনি খ্যাতিমান। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে তার প্রখ্যাত কলাম এবং পরবর্তী সময়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ বহুল পঠিত।
পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ) এ এম এ কবীর প্রাদেশিক সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব এ কিউ আনসারিকে যে প্রতিবেদন (ইংরেজিতে লিখিত) প্রেরণ করেন, এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলায় সংক্ষেপে ভাষান্তর করা হলো :
প্রতিবেদনের বিষয় : ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ শহীদ দিবস উদযাপন
১. অন্যান্য বছরের মতো এবারও বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে সম্মিলিতভাবে শহীদ দিবস পালন করছে। বৃহৎ কলেবরে যথারীতি ঢাকাতেই অনুষ্ঠানগুলো হয়েছে, বয়োজ্যেষ্ঠরা সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করেছেন।
২. পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি ১২ জানুয়ারি ১৯৬১ পার্টির কর্মীদের জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে, তাতে শহীদ দিবস উদযাপনের সময় নিম্নবর্ণিত দাবিনামা পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয় :
ক. পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন
খ. সংসদীয় সরকার
গ. শিক্ষার মাধ্যম বাংলা ভাষা
ঘ. ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন
ঙ. শহীদ মিনার নির্মাণ সমাপ্তকরণ
সরকারের বিরোধিতার পরও যদি জনগণকে সংঘবদ্ধ করে সম্মিলিতভাবে শহীদ দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া যায় তাহলে এটি সফল প্রতিরোধ দিবস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে প্রজ্ঞাপনে পরামর্শ দেওয়া হয়। পার্টির ঢাকা জেলা সাংগঠনিক কমিটিও একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ছাত্রদের মাধ্যমে সরকারের কাছে পেশ করার জন্য তিনটি দাবিনামার উল্লেখ করেছে :
ক. ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণা
খ. শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ সমাপ্ত করা
গ. উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে এবং পূর্ব পাকিস্তানে সব দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা চালু করা।
৩. উল্লেখ করা যেতে পারে, ১ জানুয়ারি ১৯৬১ নারায়ণগঞ্জ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি যথাবিহিত মর্যাদার সঙ্গে শহীদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ছাত্রদের কাঁধে না চাপিয়ে যুবক এবং জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৪. ইস্ট পাকিস্তান ইয়ুথ লিগের কর্মীরা ২৭ জানুয়ারি ১৯৬১ শহীদ দিবস মর্যাদার সঙ্গে পালনের উদ্দেশ্যে একটি গোপন বৈঠক করেছেন। তারা শহীদ মিনার সাজানোর জন্য ছাত্রদের কাছে আবেদন জানান এবং বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশের দাবিও করেন।
৫. ক্রোড়পত্র প্রকাশের জন্য সংবাদপত্রের কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তবে ‘ইত্তেফাক’ ও ‘সংবাদ’ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে সংবাদ অসমাপ্ত শহীদ মিনারের ছবিও মুদ্রণ করে। পাকিস্তান অবজার্ভার, ইত্তেফাক এবং সংবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে অফিস বন্ধ রাখলেও পরদিনের পত্রিকা ছাপার আয়োজন করে এবং যথারীতি পত্রিকা বেরোয়।
৬. ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ ডাকসুতে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মূলত প্রধান পদসমূহ দখল করে আছে। তারা এবং বিভিন্ন হলে তাদের সমর্থকরা শহীদ দিবস পালনে প্রস্তুতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
৭. ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্স ইউনিয়ন (এপসু) ১ ফেব্রুয়ারি এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে শহীদ দিবসের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করে। সব হলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জেনারেল সেক্রেটারি এবং ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতাদের নিয়ে আরও একটি বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়; প্যামফ্লেট ও পোস্টার মুদ্রণ, প্রভাতফেরি বের করা ও শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। শহীদ মিনারের কাজ সম্পন্ন করার জন্য ভাইস চ্যান্সেলরকে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। শিক্ষার মাধ্যম বাংলা করার দাবি জানানো হবে এবং সন্ধ্যায় উদ্যোক্তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন।
৮. যথারীতি ছাত্র প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ এপসুর নেত্রী জাহান আরা আকতারের (তিনি তখন ডাকসুর ভিপি) সভাপতিত্বে ডাকসু অফিসে বৈঠক হয়। যদি এপসুই সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা ডানপন্থি সংগঠন এনএসএফ, এসএফ এবং ইপিএসএল প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানান। যথাযথভাবে শহীদ দিবস পালনের জন্য ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ভিপি ও জিএস-এর স্বাক্ষরে বিবৃতি প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়। তাতে ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা, শহীদ মিনার নির্মাণকাজ সমাপ্ত করা ও প্রশাসনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার চালুর দাবি জানানো হবে। প্রভাতফেরি সংগঠিত করাসহ শহীদ দিবসের বিস্তারিত কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়। পরদিন ৯.২.৬১ তা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। মুদ্রিত লিফলেট ছড়িয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। জগন্নাথ কলেজ, কার্জন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গেট, ঢাকা হলের অডিটোরিয়ামে পোস্টার সেঁটে দেওয়া হয়। কিছু বে-নামা পোস্টারও দেখা যায়। রমনা এলাকায় ন্যাশনাল ব্যাংকের দেয়ালে সাঁটানো পোস্টার দেখা যায়।
৯. কর্মসূচি অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা ভোরে স্ব-স্ব হলে জমায়েত হন, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের জন্য মোনাজাত করে যার যার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ইকবাল হল, আবদুর রহমান খান হল এবং জগন্নাথ কলেজ কম্পাউন্ডে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়।
তারপর তারা কালোব্যাজ ধারণ করে নগ্নপদে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আজিমপুর গোরস্তানে গমন করে। কালোব্যাজে এবং সাদা কাপড়ে লেখা ছিল ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’ এবং ‘একুশে ফেব্রুয়ারি জিন্দাবাদ’।
প্রভাফেরিতে আসার পথে শিক্ষার্থীরা সজোরে নিচের সেøাগানগুলো দেন :
১. ২১ ফেব্রুয়ারি জিন্দাবাদ
২. শহীদ স্মৃতি অমর হোক
৩. রোমান হরফে বাংলা লেখা চলবে না
৪. ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণা করো
৫. শহীদ মনুমেন্ট তৈরি করো
৬. ছাত্র-জনতা এক হও ৭. ধোঁকাবাজি চলবে না
১০. আজিমপুর কবরস্থানে পৌঁছে তারা বরকত ও সালামের কবরে পুষ্পস্তবক ও পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণে তারা নিহত হন। বাঁশের খুঁটি গেড়ে লাল কাগজে তাতে টানানো পোস্টারে লেখা হয়েছে :
‘হে আমার দেশ, বন্যার মতো, প্রচন্ড অভিজ্ঞতার পলিমাটিকে সরিয়ে এনে একটি চেতনাকে উর্বর করেছি এখানে আমাদের মৃত্যু ও জীবনের সমাপ্তি।’
ছাত্রদের রেখে যাওয়া অন্য পোস্টারে লেখা হয়েছে :
‘আমার ভাষা বাংলা, আমি বাঙ্গালী, এই মহান বার্তা নিয়ে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছিল বঙ্গজননীর সেই শহীদ প্রিয় সন্তান।’
অন্য একটিতে লেখা হয়েছে :
‘মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করেছে ভাষা বাঁচাবার তরে, আজিকে স্মরিও তারে।’
১১. কবরস্থান থেকে ১০০ ছাত্রীসহ ৩০০ শিক্ষার্থীর দুটি সিঙ্গেল লাইন মিছিল ৭টা ৪৫ মিনিটে শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে যায়, তারা কালো পতাকা বহন করেন এবং প্রচলিত কিছু সেøাগান দেন। একটি কালো ব্যানারে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস সরকারি ছুটি ঘোষণা, শহীদ মিনার নির্মাণ সমাপ্ত করা এবং সর্বস্তরে বাংলা চালুর দাবি মুদ্রিত ছিল। অন্যটিতে শহীদ স্মৃতি অমর হোক। প্রথমটি বহন করেছেন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীরা, দ্বিতীয়টি ঢাকা হলের ছাত্ররা।’
১২. মিছিল ধীরে ধীরে পিলখানা রোড, ফুলার রোড, নীলক্ষেত রোড, ময়মনসিংহ রোড, ওল্ড গভর্নমেন্ট হাউজ রোড, আবদুল গণি রোড, জিন্নাহ অ্যাভিনিউ, রেলওয়ে স্টাফ কোয়ার্টার রোড, সেক্রেটারিয়েট রোড (ঢাকা মেডিকেল কলেজের আগে পর্যন্ত) প্রদক্ষিণ করে সকাল ১০টায় মেডিকেল কলেজ গেটের কাছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষ হয়। শহীদ মিনারের পাদদেশে মিছিলকারীরা পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন এবং সেখানে জড়ো হতে থাকেন।
সমাবেশের সামনে বক্তৃতা দেন ঢাকা হল ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক তাহের উদ্দিন ঠাকুর (এপসু), তিনি ভবিষ্যতেও এই দিনটি উদযাপনের আহ্বান জানান। পুলিশের গুলিতে নিহত হন বরকত, তার বাবার প্রেরিত বার্তা পড়ে শোনান এ কে এম জিয় উদ্দিন (এপসু)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন (ডাকসু) সহসভাপতি জাহান আরা আকতার সিদ্ধান্তসমূহ (দাবিনামা) পাঠ করে শোনান।
ক. শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ সমাপ্ত করা
খ. ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণা
গ. জাতীয় জীবন ও প্রশাসনের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন
ঘ. বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নিতে বাংলা একাডেমির কার্যক্রম জোরদার করা।
সোয়া ১০টার পর থেকে মিছিলে লোক কমতে থাকে।
১৩. ফুল দিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সাজানো হয়। একটি বড় কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। মিনারের মেঝে কালো কাপড়ে ঢাকা থাকে। লাল কাগজের পোস্টারে দাবিনামা লেখা হয়। শহীদ মিনারের পাদদেশে ভাষা দিবসের গুরুত্ব নিয়ে লেখা রচনা দেয়ালপত্র স্থাপন করা হয়। এগুলো হচ্ছে :
ক. চতুষ্কোণ : ঢাকা হল ইউনিয়ন
খ. শিখা : ফজলুল হক মুসলিম হল ইউনিয়ন
গ. পদক্ষেপ : ঢাকা মেডিকেল কলেজ ইউনিয়ন
ঘ. রক্ত অক্ষর : সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ইউনিয়ন
১৪. শহীদ দিবস উদযাপনে যেসব ছাত্র নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা হচ্ছেন :
১. বদরুল হক (এপসু) ইকবাল হল
২. মওদুদ আহমদ (পিএসএফ) ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়
৩. তাহের উদ্দিন ঠাকুর (এপসু) সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা হল ইউনিয়ন
৪. বীরেন্দ্রনাথ হালদার (এপসু সমর্থক) সহসভাপতি জগন্নাথ হল ইউনিয়ন
৫. এ কে এম জিয়া উদ্দিন (এপসু) ঢকা বিশ্ববিদ্যালয়
৬. অমূল্য কুমার রায় (এপসু সমর্থক) সাধারণ সম্পাদক, ডাকসু
৭. জাহান আরা আকতার (এপসু সমর্থক) সহসভাপতি, ডাকসু
৮. এ জেড এনায়েত উল্লাহ খান (এপসু)
৯. আবদুল লতিফ মল্লিক, মেডিকেল কলেজ
১০. জাহাঙ্গির খালিদ (এপসু সমর্থক) সহসভাপতি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
১১. আমিনুল ইসলাম (এপসু) সাবেক সহসভাপতি, ডাকসু
১২. আশরাফ উদ্দিন মঘবুল (এপসু) সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ডাকসু
১৩. এ এন এম শহীদ ওরফে শহীদ সিং (এপসু) সহসভাপতি, ঢাকা হল।
এ আর ইউসুফ একটি মিছিলের সঙ্গে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আসেন।
১৫. এ ছাড়া বাইরের যারা এসেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন : কাজী জহিরুল হক, আবদুর রহমান, মিজানুর রহমান, আবদুর রশীদ, শামছুল আরেফিন, শাহ আজিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ (অধ্যাপক জগন্নাথ কলেজ) এবং আনোয়ার জাহিদ।
১৬. বিকেলে বাংলা একাডেমি, কার্জন হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ফজলুল হক মুসলিম হল, জগন্নাথ হল এবং আরও কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়।
১৭. বাংলা একাডেমির আয়োজনে একাডেমি প্রাঙ্গণে বিকেল ৩:৩০ থেকে ৫টার মধ্যে অনুষ্ঠিত সিম্পোজিয়ামে সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডক্টর সৈয়দ আলী আহসান, সাহিত্যমোদী প্রায় ৬০ জন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বিশিষ্টজনদের মধ্যে বক্তৃতা করেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক আশরাফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক হাসান জামান, অধ্যাপক আবুল কাশেম ও রওশন আরা বেগম। সভাপতি বলেন, যে ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়া হয়েছে, সে ভাষার সমৃদ্ধি ঘটাতে হবে।
১৮. কার্জন হলে বহুল উপস্থিতিতে ডাকসুর একটি সভায় সভাপতিত্ব করেন ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন। ভাইস চ্যান্সেলরও এতে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান (নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সদস্য), সাবেক মন্ত্রী মাহমুদ আলী (নিষিদ্ধ ন্যাপের সদস্য) এবং আরও কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক নেতা উপস্থিত ছিলেন।
জগন্নাথ কলেজের অধ্যাপক অজিত গুহ, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামন, ডক্টর জি সি দেব, বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর নুরুল মোমেন বক্তব্য দেন। তাদের দাবিনামায় তিনটি অতিরিক্ত বিষয় যোগ হয় :
ক. বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য বাংলা একাডেমিকে সক্রিয় করা।
খ. রোমান হরফে বাংলা চালুর চেষ্টা কিংবা অন্য ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা সহ্য করা হবে না।
গ. পুলিশের গুলিতে নিহতদের কবর রাষ্ট্রীয় খরচে পাকা করা।
গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহে ব্যবহৃত ভাষা নিয়ে ডক্টর কাজী মোতাহের হোসেন আপত্তি জানালে হাত তুলে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা সমর্থন জানান। বাংলা ভাষাও এই দিবসের প্রশংসা করে গীত সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।
১৯. সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সিম্পোজিয়ামে সভাপতিত্ব করেন প্রভোস্ট ডক্টর এম হক এবং ফজলুল হক ও জগন্নাথ হলের সভায় সভাপতি ছিলেন সংশ্লিষ্ট হল ইউনিয়নের সহসভাপতি। জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের লেকচার গ্যালারির অনুষ্ঠানে কমিনিউস্ট পার্টির সদস্য এবং সাবেক নিরাপত্তা কারাবন্দি রনেশ দাশ গুপ্ত। তিনি সভায় সভাপতিত্ব করেন। তিনি ছিলেন দৈনিক সংবাদের সহকারী সম্পাদক।
২০. কিছুসংখ্যক ছাত্র সন্ধ্যাবেলায় শহীদ মিনারে মোমবাতি প্রজ্বালিত করে সম্মান জানান।
২১. ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ যে কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছিল তাতে কালো পতাকা উত্তোলন, মিছিল, সেøাগান এবং শহীদ মিনারের সভা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। স্লোগানগুলো নতুন কিছু নয়। গত বছরও তারা একই স্লোগান দিয়েছেন। গত বছরও মিছিল হয়েছে কিন্তু তা শহীদ মিনার থেকে আজিমপুর কবরস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এবার অনেক বড় আকারে মিছিল হয়েছে এবং সচিবালয়ের সামনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা রাস্তায়ও মিছিল চলেছে।
২২. পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত সুপারিনটেনডেন্ট শহীদ মিনারে মিছিল ও মিটিং সামরিক আইনের বরখেলাপ কি না এ নিয়ে পাবলিক প্রসিকিউটরের মতামত গ্রহণ করেছেন। এ মতামত তেমন কোনো কাজে আসেনি।
২৩. ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ ‘দিবস’ পালন-সংক্রান্ত সরকারের নীতিমালা জারি হয়েছে। কোনো রাজনীতিবিদের সক্রিয় অনুপ্রেরণা বা নাশকতামূলক কাজে উৎসাহ প্রদানের প্রমাণ না পাওয়া গেলেও আমি মনে করি শহীদ মিনারের সভায় ও মিছিলে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের নামের তালিকা ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে পাঠানো দরকার, যাতে তিনি তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন।
যদিও বাইরের কাউকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সভায় বা মিছিলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি, আমরা প্রাপ্ত প্রতিবেদনগুলো আরও পরীক্ষা করব। সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী কেউ শনাক্ত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ এম এ কবির
ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ
(ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ)
পূর্ব পাকিস্তান, ঢাকা
পাবলিক প্রসিকিউটরের অভিমত
প্রেরিত কাগজপত্র দেখেছি, গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তার সঙ্গে কথাও বলেছি।
২১ ফেব্রুয়ারির শহীদ দিবসের অনুষ্ঠান রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকা কিছুসংখ্যক ছাত্রের উদ্যোগে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আয়োজন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক কর্মকা- নিষিদ্ধ করেছে। তবে গতকাল (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১) ছাত্রটা যে মিছিল করেছে তার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের কোনো সংস্রব ছিল না। যদি মিছিলে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে না থাকে এবং তা যদি নিহতদের প্রতি তাদের স্বতঃস্ফূর্ত সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশ হয়ে তাকে তাহলে এ মিছিলকে রাজনৈতিক প্রকৃতির বলা যাবে না। আর তা যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তা মার্শাল ল রেগুলেশন নম্বর ৫৫ এ-র আওতায় আসবে।
পুলিশ রিপোর্ট থেকে বোঝা যাচ্ছে, শহীদ মিনারের পাদদেশে একটি সভা হয়েছে, তবে সভায় কেউ সভাপতিত্ব করেননি, কিন্তু জনব্যবহার্য স্থানে একটি সভা হয়েছে, যা বেআইনি এবং এমএলআর ৫৫ এ-র পরিপন্থী।
মুদ্রিত লিফলেট প্রসঙ্গে বলা যায়, এতে শহীদ দিবস উদযাপনের কর্মসূচি লিপিবদ্ধ ছিল। তাদের কিছু অভিযোগ প্রশমনের দাবিদাওয়া এতে ছিল।
মো. আবদুল আলীম
পাবলিক প্রসিকিউটর, ঢাকা
২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১
পাদটীকা :
এ এম এ কবীর হচ্ছেন পরবর্তীকালের পুলিশ ইন্সপেক্টর জেনারেল। তার জন্ম ২৫ নভেম্বর ১৯১১, মৃত্যু ১০ জানুয়ারি ১৯৯৬। তিনি ১৯৩২ সালের ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের বেঙ্গল ক্যাডারে যোগ দেন। ঘাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৯১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকা-ে জড়িত ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তাদকে স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের মধ্যে মওদুদ আহমদ, তাহের উদ্দিন ঠাকুর এবং এ জেড এনায়েতুল্লাহ খান পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
লেখক : সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট
মুচলেকা, নাকে খত, নির্মূল, উৎখাত অথবা হনুমানের ভেংচি বা গাধার হাসি; মোটেই অভিধান বহির্ভূত শব্দ নয়। কাউকে চুবিয়ে-ডুবিয়ে মারা, মাজা ভেঙে দেওয়া, শাড়ি ধরে টেনে নামানো ধরনের শব্দ-বাক্যও আছে বাংলা অভিধানে। তাই বলে যা-তা ভাবে ব্যবহারের শব্দ নয় এগুলো। শুনতে বা লিখতেও কেমন লাগে? এগুলো সচরাচর ভাষার সৌন্দর্য-গাম্ভীর্যের জন্যও মানায় না। কিন্তু, আমরা ব্যবহারের নামে সমানে অপব্যবহার করছি। এমনকি এই ভাষার মাসে কোনো ছাড় দিচ্ছি না। প্রসঙ্গেরও ধার ধারছি না।
কখনো বাতকে বাত, কখনো শালীনতার তোয়াক্কা না করে বা ব্যাকরণের কঠিন বেড়াজালে, কখনো ব্যাকরণ ভেঙেচুরে স্বেচ্ছাচারিতায় প্রকারান্তরে প্রিয় ভাষাটির সর্বনাশ করে ছাড়ছি। বাংলা চর্চায় অতি রক্ষণশীলতা বা উদারতা দুটোই বিপজ্জনক। ক্ষেত্রভেদে হঠকারিতাও। প্রকারান্তরে এটি ভাষার সঙ্গে জবরদস্তি, নাশকতা। তা শব্দ, বানান, বাক্যসহ গোটা বাংলা ভাষাটিরই সাবলীলতা নষ্ট হচ্ছে। একসময় বানান ও বাক্যে ভুলের মহোৎসব দেখা যেত বাস-ট্রাকে। দোকানপাটের সাইনবোর্ডে। ‘ঐ দেকা জায় গুলিস্থান, ব্যভহারে বংসের পরিচয়, ১০০ বা ৫০০ টাকার বাংতি নাই, কিসু পেলে গেলেন কি’Ñ ধরনের বানান ও কথাবার্তা এখন ভরপুর ফেসবুকে। যার মনে যা চায় স্ট্যাটাস লিখছেন। কমেন্টসও আচ্ছা রকমের। দৈনন্দিন যাপিত জীবনেও ভাষার ক্ষেত্রে সবাই এখানে স্বাধীন, সার্বভৌম, মহাপরাক্রমশালী।
বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবিটি সুপরিণতির দিকে নিতে চাইলে দেশে বাংলার চর্চা কোন স্তরে, কোন পর্যায়ে তা ভাবা জরুরি। ভাষার সঠিক চর্চা নিশ্চিতে অভিধানের চেয়েও বেশি শক্তি গণমাধ্যমের। দেশের সব ঘরে অভিধান নেই।
থাকলেও সেটা পড়ে থাকছে শো-পিসের মতো। কিন্তু সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, ফেসবুকের মতো গণমাধ্যম রয়েছে ঘরে ঘরে। এসব গণমাধ্যমে ব্যবহৃত শব্দ, বানান, বাক্যের গতি, শক্তি অভিধানের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু, দুঃখজনকভাবে সেখানেও বিস্তর গোলমাল। অর্থগতভাবে পর্যন্ত ছারখার করে ফেলা হচ্ছে রক্তাার্জিত বাংলাকে। ভুল স্বীকার না হোক, অন্তত শুদ্ধটা জানানোর তাগিদও চোখে পড়ে না। বানানের সঙ্গে বাক্য গঠনেও অরাজকতা। ডায়রিয়ায় ১৭ জন নিহত, বন্যার পানিতে ১৫ জন নিহত, অপুষ্টির অভাবে শিশুর মৃত্যু, নিহত হয়ে চারজনের মৃত্যুবরণ, দ্রব্যমূল্যের দাম আরও বেড়েছে, সিদ্দিকের চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেছে, তাকে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, বাস না পেয়ে পায়ে হাঁটতে হয়েছে পাঁচ মাইল, এইচএসসিতে শতকরা গড় পাসের হার ৬৮.৯১ শতাংশ, পলাতক বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ধরে আনার চেষ্টা চলছেÑ ধরনের বাক্যের অর্থ অডিয়েন্স বুঝে নিচ্ছে সত্য। কিন্তু, বাক্যগুলোর অর্থ-প্রয়োগে বাংলার করুণ দশা স্পষ্ট। কী বলতে গিয়ে কী বলা হচ্ছে? তথ্যই বা কী দাঁড়াচ্ছে? কেউ তা রোখার চেষ্টা করলে যুক্তির তেজে চুপ মেরে যেতে হয়। অর্থ, স্বকীয়তা, বিশেষত্ব ও ভাষা-ব্যাকরণের শুদ্ধরূপের ক্ষতবিক্ষত অবস্থা হজম করা ছাড়া আর গতি থাকে না।
বিশুদ্ধতা ও জাতপাত খোয়ানোর পরও ইংরেজি ভাষা কেন গোটা বিশ্বে প্রতিপত্তি বিস্তার করে চলছেÑ এমন বাঁকা প্রশ্নও ছোড়া হয়? ইংরেজি জানা সারা দুনিয়াতেই স্মার্টনেসের ব্যাপার? বিশ্বের অনেকে বাণিজ্যিক কারণে চীনা ভাষাও শিখছেন। আগে কেবল পণ্ডিতরা শিখতেন, এখন শিখছেন অনেক সাধারণ মানুষও। জাপানিজ, কোরিয়ান ভাষা শেখার পেছনেও বাণিজ্যিক ও কর্মসংস্থান বিষয়ক ঘটনা রয়েছে। হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতির আধিপত্যও এখানে প্রাসঙ্গিক। সেই তুলনায় বাংলার বাজার কেন জমছে না এ প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে। ইতিহাসে ভাষাকে একঘরে হয়ে যাওয়ার বহু তথ্য রয়েছে। সময়-অসময়ে বিভিন্ন ভাষা নেতিয়ে পড়া বা হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস প্রায় একই। কারও কারও মানতে কষ্ট হয়, ভাষার সঙ্গে রুটি-রুজিসহ কর্মজগতের বিশাল সম্পর্কের কথা। মানুষ অজস্র ভাষা সৃষ্টি করতে পারে। আবার পারে অপব্যবহারে, খামখেয়ালিতে ভাষার সর্বনাশ করতেও। কোনো ভাষাকে শক্তিধর রাখতে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক পদক্ষেপ দরকার। বিকৃতি আর শক্তিহীনতার কারণে পৃথিবীর একসময়ের শক্তিধর ভাষাগুলোর কিছু দুর্বল হয়েছে। কিছু হারিয়েই গেছে। বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ভাষায় মেসিডোনিয়ায় আজ কজনে কথা বলে? পৃথিবীর প্রধান তিনটি ধর্মপ্রণেতার অন্যতম যিশুখ্রিস্টের ভাষাও প্রায় বিলুপ্ত। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী, বিশ্ববিজয়ী চেঙ্গিস খানের ভাষা দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোনো ভাষাই শুধু আবেগ, চেতনা আর ভালোবাসার ওপর ভর করে টিকে থাকে না। বাংলা ভাষা মোটেই ধনেজনে দুর্বল নয়। যথেষ্ট সমৃদ্ধÑ সামর্থ্যবান। তার ওপর বাংলার প্রতি আমাদের আবেগ, ভালোবাসা অসীম। কিন্তু খামখেয়ালি, শুধু আবেগ, ভালোবাসা, চেতনায় ভাষা বা কোনো কিছুর শেষরক্ষা হয় না। কারও আদেশ-নির্দেশেও হয় না। বিশ্বব্যাপী ইংরেজির এত চাহিদা কারও হুকুমে হয়নি। এর ভোক্তা বা গ্রহীতা দেশে দেশে। প্রয়োজনেই কোনো কিছুর ব্যবহার বাড়ে। আর ব্যবহার না হলে প্রেম-ভালোবাসাও বাড়ে না। অর্থাৎ চাহিদাই মূল বিষয়। প্রয়োজন প্রশ্নে আমরা পড়ে গেছি ‘লাভ বাংলা, ইউজ ইংরেজি’ থিওরিতে। রিজিকের তাগিদে আমরা ইংরেজিকে ব্যবহার করি। আর ভালোবাসি বাংলাকে। ঘর-সংসারের জন্য উপযুক্ত একজন, ভালোবাসার জন্য আরেকজন।
ভাষা হিসেবে বাংলাকে জীবন-জীবিকার সঙ্গে জোরালোভাবে সম্পর্কিত করার আবশ্যকতা এ কারণেই। বাংলার মধ্যে হরদম ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে কিছুটা প্রয়োজনে। কিছুটা অবচেতনে-অজান্তে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়সহ দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাসের বাংলা বইগুলো এখনো মানে অনেক পিছিয়ে। পেরে উঠছে না ইংরেজি বইয়ের সঙ্গে। নিজ ভাষার সম্মান-ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে ইংরেজির শরণাপন্ন হতেই হচ্ছে। যার জেরে ‘আপ-ডাউন’ ছাড়া দেশে এখন উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমসহ প্রায় সবদিকের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংকের ছড়াছড়ি। এদিক, সেদিক, অন্যদিক কোনো দিকই আর বাদ নেই। আবার রয়েছে দু’দিক মেলানো নামও। নর্থ সাউথ, ইস্ট ওয়েস্ট, সাউথ ইস্ট, নর্দার্ন, সাউদার্ন, ইস্টার্ন নাম ঠেকানো কঠিন। তাচ্ছিল্য করারও অবস্থা নেই। তাছাড়া, বাংলা প্রতিশব্দ সৃষ্টি করতে গিয়ে কখনো কখনো ভুল প্রতিশব্দ জন্ম নিচ্ছে। বাংলা ব্যবহারে ভুলের ছড়াছড়িতে ‘আমি বড় শৃঙ্খলায় পড়ে গেছি, আপনার রান্নাটা বড় জটিল হয়েছে, আপনার জামাটা বেশ অস্থির লাগছে’ ধরনের কথায় কী বোঝাতে কী বলে ফেলা হচ্ছে? বাংলার জন্য তা আতঙ্কের। বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বাড়ানোর কথাকে অন্যদৃষ্টিতে দেখেন কেউ কেউ। ভাষা হিসেবে বাংলা জীবন-জীবিকার সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত? ইংরেজিকে পাস কাটানোর কারণে বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ভালো করে বোঝা সম্ভব নয়। উল্টাপাল্টা বোঝার ঘটনাও ঘটছে। বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার কারণে ইংরেজি শিক্ষা বন্ধের পথে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে ইংরেজি বই পড়তে অনেকের নাকানি-চুবানি ছুটছে। এমনটি মোটেই ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনে কাম্য ছিল না। স্বাধীনতার নামে শব্দ-বাক্যের যাচ্ছেতাই প্রয়োগও নিশ্চয়ই আকাক্সিক্ষত ছিল না। যার ছায়া পড়ছে কবিতা, চিত্রনাট্য, গল্পসহ সৃষ্টিশীলতার মাঝে। ‘খাইয়া ফালামু, তোরে খাইছি, ন্যাংটা করে ক্ষমতা ছাড়া করুম’ ধরনের শব্দ-বাক্য ভাষার জন্য মোটেই মর্যাদার নয়। গল্প, কবিতা, নাটক, ছায়াছবির নামকরণ-সংলাপে এগুলো দেদার ব্যবহার হচ্ছে। বাজারও পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। যার মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে ভাষাকে কদাকার করে দেওয়া হচ্ছে।
বাংলার শব্দ ভা-ার এত দুর্বল নয় যে এগুলোর বিকল্প বা প্রতিশব্দ নেই। এ নোংরামি বছরের পর বছর ধরে চলছে আমাদের জায়গার নামকরণেও। মৌজা, সিএস, আরএস, কাগজে-কলমে, সাইনবোর্ডে বোদা বাংলাদেশের একটি প্রশাসনিক এলাকা। অথচ এ নাম বা শব্দটি কেবল অসুন্দর নয়, অশ্লীলও। কঠিন এ বাস্তবতায় জায়গাটির নাম পরিবর্তনের দাবি উঠেছে অনেকবার। কিন্তু, দাবি জোরালো হয়নি। তবে, ‘মানুষমারা’ জায়গাকে ‘মানুষগড়া’ করার দৃষ্টান্ত আছে। দশ কাজের এক কাজের মতো তা করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীলফামারী সদরের ‘মানুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর নাম পাল্টে নতুন নামকরণ হয়েছে ‘মানুষগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। এ মর্মে প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে শুধু স্কুল নয়, পাল্টে গেল জায়গাটির নামও। এই নাম নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহলের আপত্তি অনেক দিনের। চিত্ত-পিত্ত দুটোই পুড়ছিল তাদের। অবশেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা আমলে নিয়ে বিশ্রি নামটি পাল্টে দিয়েছে। বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রাম এবং অসংখ্য জায়গার মধ্যে ‘মানুষমারা’র চেয়েও উচ্চারণ অযোগ্য বহু নাম রয়েছে। কোনো কোনোটি ভদ্র-শিক্ষিত কারও সামনে উচ্চারণ করা কষ্টকর-লজ্জাকর। রুচিতে বাধলেও নামগুলো দলিল-মৌজা, খতিয়ান এমনকি বইপত্রসহ মুদ্রণে অটুট থাকছে।
কুত্তামারা, সোনাডাংগা, ছাগীপাড়া স্পষ্ট উচ্চারণও বিব্রতকর। হাঁটুভাঙ্গা, ভেড়ামারা, ঘোড়ামারা, ঠেঙ্গামারা, ছাগীপাড়া, ছেঙ্গারচর, কাউয়ারচর, ফাজিলপুর, ভুয়াপুর, ভুরুঙ্গামারী, ধরি কিলা, বলদপুর ধরনের নাম হজম করতে হয় বাধ্য হয়ে। যতই বলা হোক, নামে কিছু যায় আসে না। আসলে নামে অনেক কিছুই যায় আসে। নামটি অবশ্যই একটি ভাষা। এ ভাষাটির মর্যাদা-সৌন্দর্য কি ভাবতে নেই?
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট
আবদুল হাকিম জন্মেছিলেন ১৬২০ সালে। মারা যান ১৬৯০ সালে। লিখে যান ৮টি কাব্যগ্রন্থ। এর একটি ‘নূরনামা কাব্য’। সেখানে তিনি লিখেন, ‘যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’ অন্যদিকে বাংলা পঞ্চকবির একজন অতুল প্রসাদ সেন। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭১ সালে। মারা যান ১৯৩৪ সালে। এ সময়ের মধ্যে গীতিকার, গায়ক, কবি অতুল প্রসাদ লিখে যান অসংখ্য গান। বাংলা সংগীত জগতে, অন্যান্য গানের সঙ্গে আমরা পাই সেই দুর্লভ গানÑ ‘মোদের গরব মোদের আশা, আমরি বাংলা ভাষা’। এরপর আসে পাকিস্তান আমলের নির্মম অত্যাচারের ২৪ বছর।
১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ। ৯ দিনের সফরে পূর্ববঙ্গ আসেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি এবং মুসলিম লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে, যা এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ইংরেজিতে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং অন্য কোনো ভাষা নয়। কেউ যদি আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে তাহলে সে আসলে পাকিস্তানের শত্রু।’
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা কী হবে, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল ভারত-ভাগের আগেই। অবাঙালি মুসলিম রাজনীতিবিদ ও অধ্যাপক-বুদ্ধিজীবীরা বলছিলেন উর্দু ভাষার কথা। অন্যদিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও এনামুল হকের মতো বাঙালি বুদ্ধিজীবী এর প্রতিবাদ করেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের স্বাধীনতা বা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আকাক্সক্ষা অনেক আগেই সৃষ্টি হয়েছিল। এই ধারাবাহিকতারই একটা অংশ হচ্ছে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, বেলা ১১টা ৩০ মিনিট। ১৪৪ ধারা মানেননি ছাত্র-জনতা। ভাষার দাবিতে রাজপথে খণ্ড খণ্ড মিছিল। লাঠি চালায় পুলিশ। আরও বেগবান হয় আন্দোলন, যোগ দেন সাধারণ মানুষ। সবার মুখে একটিই দাবিÑ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। সেই মিছিল ঠেকাতে চলল গুলি। রাজপথে লুটিয়ে পড়লেনÑ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকেই। ২২ ফেব্রুয়ারি হত্যার প্রতিবাদে ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ মিছিল। দাবি ওঠে শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণের। মাত্র এক দিনের প্রস্তুতিতে তৈরি করা হয় শহীদ মিনার। এতে সরকার ভীত হয়ে পড়ে। ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ভেঙে ফেলে শহীদ মিনার।
বর্তমানে আমরা যে শহীদ মিনার দেখছি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এই শহীদ মিনারের স্থপতি হামিদুর রহমান। অমর একুশের গান লিখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী/ আমি কি ভুলিতে পারি’Ñ এই অবিনশ^র গানের প্রথম সুরকার আবদুল লতিফ। পরে সুরারোপ করেন শহীদ আলতাফ মাহমুদ। ১৯৫৪ সাল থেকে, যা আজও চলছে।
মাতৃভাষার এই আন্দোলনেই বীজ বপন হয়েছিল স্বাধীনতার। পাকিস্তান ভেঙে জন্ম নিল পৃথিবীর বুকে ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।
পার হয়েছে সুদীর্ঘকাল। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৩। এই ৫২ বছরে, অনেক ইতিহাস রচিত হয়েছে। স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। বিদেশে থাকার কারণে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান, তার দুই কন্যা। তবু থেমে থাকেনি নরঘাতকের দল। এর পরও চলে হত্যাকা-। জাতীয় চার নেতাসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়। দীর্ঘকাল সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হন বাংলাদেশের নিরীহ মানুষ। একই সঙ্গে চলে দেশকে অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র।
আবার ফিরে আসে নবজাগরণের ইতিহাস। জেগে ওঠে সভ্যতা। দেশের হাল ধরেন স্বাধীনতার সেই মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা। তিনিই আজ ১৪ বছর ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তবু কি দুখিনী বাংলার সাধারণ মানুষের ভাগ্যের বদল হয়েছে? কমেছে কি শাসন-শোষণের পাহাড়সম বৈষম্য?
আমাদের রক্তে নব উদ্যমে কথা বলুক, একুশের চেতনা। মানুষ যেন মানুষের জন্য হয়। বাঙালি চেতনায় জেগে উঠুক বাংলাদেশ।
মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করা কালজয়ী গান ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’-এর স্রষ্টা কবি ও গীতিকার গোবিন্দ হালদার ১৯৩০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার রচিত প্রথম কবিতা ‘আর কতদিন’। তিনি প্রায় সাড়ে তিন হাজার কবিতা ও গান লিখেছেন। তার প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দূর দিগন্ত’। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতারে সম্প্রচারিত তার লেখা গানসমূহ মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করত। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার রচিত উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘লেফট রাইট লেফট রাইট’, ‘হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘চলো বীর সৈনিক’ ও ‘হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার বাংলার মাটি’ অন্যতম। বন্ধু কামাল আহমেদের অনুপ্রেরণায় এবং উৎসাহে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর গান রচনা করেন। কামাল আহমেদ তাকে স্বাধীন বাংলা বেতারের কর্ণধার কামাল লোহানীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তার হাতে ১৫টি গানের একটি খাতা দেন। এ গানগুলোর মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রথম প্রচারিত হয় সমর দাসের সুরারোপিত ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ গানটি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনই তার আরও কিছু গান স্বাধীন বাংলা বেতারে সম্প্রচারিত হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর পাওয়ার পরপরই সন্ধ্যায় ১৬ ডিসেম্বর প্রচারিত হয়Ñ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভুলব না’ গানটি, যা সুর দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী আপেল মাহমুদ এবং মূল কণ্ঠ দিয়েছিলেন স্বপ্না রায়, আপেল মাহমুদ ও সহশিল্পীরা। গোবিন্দ হালদার ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাভাষী জনগণের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার দিন। তাদের চক্ষুষ্মান হওয়ার দিন। বাঙালিরা প্রথমে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার মর্যাদা ও স্বীকৃতির দাবিতে সোচ্চার হয় এ উপলব্ধিতে যে ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। ইতিহাসের সাক্ষ্য এই নিজের ভাষা-সাহিত্য, সংস্কৃতি-কৃষ্টিও ঐতেহ্যের বাঞ্ছিত বিকাশ ছাড়া জাতীয় পরিচয় নির্মল ও নিরাপদ নয়। কোনো জাতিকে পরাভূত করার প্রকৃষ্ট কৌশল হলো তার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে দুর্বল করা বা তার আত্মমর্যাদাবোধকে খর্ব করা। এ ভারতবর্ষের রাষ্ট্রযন্ত্রে মোগল আমলে ফার্সি, ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি এবং তারই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আমলে উর্দুকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস শুরু হয়। আর সেই থেকে বাঙালি জাতির চিন্তা-চেতনায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় চলে আসে। মহান ভাষা আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও এর কার্যক্রমের মূল সুর বা বাণী বা দাবিই ছিল বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। কেননা বাংলা ভাষার যথাযথ স্বীকৃতি ছাড়া অন্য কোনো ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের মৌল উদ্দেশ্যই হবে বাংলাভাষী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন। এটা বাঙালি জাতির জাত্যাভিমানের প্রতি প্রকাশ্য আঘাত। এটা মেনে নেওয়া মানে বাঙালির স্বাধিকার চেতনার মর্মমূলে কুঠারাঘাত এবং প্রকারান্তরে আবহমানকালের সেই পরাধীন পরিবেশে বসবাস। ভাষা আন্দোলনের সৈনিকরা সমগ্র দেশবাসীকে এ সত্যটি উপলব্ধি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে সাতচল্লিশে ভারত বিভাগ ও ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি লাভের পর পর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে মাতৃভাষা, বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা সংগত কারণেই সোচ্চার হয়ে ওঠে। আটচল্লিশের মার্চে জিন্নাহর ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’- এ উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলা ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং তাদের প্রচারণা প্রয়াসে পূর্ববঙ্গের সচেতন ছাত্র-শিক্ষক-জনতা বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি পাওয়ার প্রশ্নে আপসহীন মনোভাব গ্রহণ করে। তাদের দৃঢ়চিত্ত প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞা বাহান্নর ফেব্রুয়ারি মাসের দিনগুলোতে বাংলা ভাষা সংগ্রাম উত্তাল আকার ধারণ করে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বুলেটের আঘাতে বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়ে ভাষা শহীদরা সেই সংগ্রামী প্রত্যয় ও প্রেরণাকে বেগবান করেছিলেন।
কোনো কোনো বিশেষ ঘটনা, কোনো কোনো আত্মত্যাগ আদর্শগত কারণে সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যবহ রূপ লাভ করতে পারে। সেই আত্মত্যাগ যদি হয়ে থাকে মহত্তম কোনো আদর্শের প্রশ্নে, সেই বিশেষ ঘটনায় যদি ঘটে অনির্বাণ আকাক্সক্ষার অয়োময় প্রত্যয়ের প্রতিফলন। স্থান-কাল-পাত্রের সীমানা পেরিয়ে সেই ঘটনা ভিন্নতর প্রেক্ষাপটেও নতুন নতুন চেতনার জন্মদাত্রী হিসেবে প্রতিভাত হয়ে থাকে। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জীবনে তেমনি এক অসীম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা যা আমাদের সার্বিক জাগরণের উৎসমুখও। একুশের চেতনা বারংবার সংকটে দিক-নির্দেশক, বিভ্রান্তিতে মোহজাল ছিন্নকারী এবং আপাত বন্ধ্যত্বে সৃষ্টিমুখরতার দ্যোতক বলে প্রমাণিত হয়েছে।
সাত দশক আগে ১৯৫২-র একুশ ফেব্রুয়ারিতে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের যে প্রেক্ষাপট নির্মিত হয় তার তাৎক্ষণিক তাৎপর্য মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সীমবদ্ধ ছিল। কিন্তু কালপরিক্রমায় এর তাৎপর্যের পরিধি বিস্তৃত হয়। ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগ ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানে এক নতুন প্রত্যয় ও প্রতীতি দান করে। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে একুশের চেতনাই ছিল প্রাণশক্তি।
একুশের চেতনা যে সাংস্কৃতিক চেতনার জন্ম দেয় তার মধ্যে জাতীয়তাবোধের বিকাশমুখী আন্দোলনের একটা সুস্পষ্ট ইঙ্গিতও ছিল। একুশের চেতনা এমনই প্রগতিশীল ছিল, এমনই প্রগাঢ় ছিল যে যার জন্য স্বাধিকার আদায়ের সংগাম তীব্রতর হয়েছিল। একুশের ভাবধারা প্রথম দিকে ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীকালে তাতে দেশের আপামর জনসাধারণও উদ্বুদ্ধ হয় সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে। একুশের মূল্যবোধ যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে, স্বৈরাচারের পতনকার্যে একতাবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করতে, নিপীড়িত জনগণের পাশে এসে দাঁড়াতে এবং সর্বোপরি মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ হতে শিক্ষা দেয়। একুশের চেতনা দেশের সাহিত্যাঙ্গনেও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। জাতীয়তাবোধের উচ্চারণে সমৃদ্ধ সাহিত্যের পাশাপাশি গণমুখী সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন দেশের কবি-সাহিত্যিকরা। সাহিত্যধারায় সূচিত হয় এক নবযুগ।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও তাই একুশের চেতনা গোটা জাতির দীর্ঘ পরাধীনতার অভিশাপপ্রসূত দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে আত্মসম্ভ্রমবোধ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে গঠনমূলক প্রতীতির জন্ম দিয়েছিল। এটা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই একুশের চেতনার সার্থক স্বীকৃতি। স্বাধীনতার স্পর্শে জাতীয় জীবনে নৈতিকতা, পরস্পর শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা, বলিষ্ঠ জাতীয় চরিত্র চেতনার বিকাশ এবং দারিদ্র্য মোচনের দ্বারা স্বনির্ভরশীলতা অর্জনের মধ্যেই একুশের প্রকৃত প্রত্যয় নিহিত।
বাহান্ন সালে ভাষা আন্দোলনের ব্যানারে চলেছিল মূলত বাঙালির আত্মরক্ষার সংগ্রাম আর স্বাধীনতার লাভের পর তা প্রতিভাত হয় আত্মবুদ্ধি ও চেতনা প্রসারের। আবেগের তীব্রতায় একুশের চেতনা স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশে যেভাবে উদ্দীপ্ত ও উজ্জীবিত করেছিল সবাইকে সেখানে মৃত্যুও তুচ্ছ ছিল। স্বাধীনতা-উত্তরকালে আজ সেই চেতনা আমাদের তা সম্মানসহকারে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায় এবং যার জন্য এখন নিছক আবেগ নয়, সার্বিক উন্নয়ন অভীপ্সায় আজ সুষ্ঠু গাণিতিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। সমগ্র ও বিপুলভাবে বাঁচার প্রয়োজনে সমষ্টিগত পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ ও নিরুদ্ধ সাংস্কৃতিক প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ প্রয়োজন।
একুশের চেতনা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জ্ঞানের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি সম্মানবোধকে জাগিয়ে তুলেছিল। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সেই মূল্যবোধের বলিষ্ঠ বিকাশ প্রত্যাশিত রয়ে গেছে আজও। তবে সেই মূল্যবোধের বাঞ্ছিত বিকাশের সুযোগ সুদূর পরাহত নয়। একুশের চেতনা কালপরিক্রমায় সেই মনোভঙ্গি ও দূরদৃষ্টিকে করে সবল ও স্বচ্ছ। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে বাঞ্ছিত লক্ষ্যে আজ এগিয়ে সবাই। এটি একুশের চেতনার অবিনশ্বর অভিযাত্রা।
দেশের বিপুল জনসমষ্টিকে মানবসম্পদে রূপান্তরের মধ্যেই সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তির উপায় নিহিত। স্বনির্ভর অর্থনীতি উৎসারিত আত্মমর্যাদাবোধ জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম রক্ষাকবচ। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে মানব সম্পদের উন্নয়ন আবশ্যক। বলিষ্ঠ চরিত্র চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে এটি এক মুখ্য বিবেচ্য বিষয়। নৈতিকতা, দেশপ্রেম এবং আত্মমর্যাদাবোধের ভিত্তি রচনা করে যে সব চরিত্রচেতনা তার বলিষ্ঠ ও বাঞ্ছিত বিকাশ প্রয়োজন। একুশের চেতনা সেই আকাক্সক্ষাকে অর্থবহ রূপদান করতে পারে। ইতিহাসের বিচিত্র পরিক্রমণে কখনো মানুষের নেতৃত্বে যুগের পরিবর্তন ঘটে, কখনো বা ঘটনার নেতৃত্বাধীনে মানুষ পরিবর্তিত মূল্যবোধে সংস্কৃত হয়ে ওঠে। একুশের চেতনা এ মুহূর্তে দেশবাসীকে সেই প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে এবং জাগাতে পারে শক্তি ও সাহস।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে ছাত্র-জনতার মৃত্যুতে গভীর ক্ষোভে তার কালো আচকান কাঁচি দিয়ে কেটে তার পোশাকের সঙ্গে সেঁটে শোকের ও প্রতিবাদের ভাষা প্রয়োগ করেছিলেন। আরও পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেই ১৯২৬ সাল থেকে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কী হবে কিংবা পূর্ববাংলার জনগণের মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি প্রদান নিয়ে তার সমসাময়িক বিজ্ঞজনদের মতো ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও চিন্তিত ছিলেন, যুক্তি ও সক্রিয় সজ্ঞানে সোচ্চার ছিলেন। বাহান্নর বাষা আন্দোলন কোনো একটি সাধারণ বা সাময়িক ঘটনা ছিল না; এর ছিল সুদীর্ঘ এক পটভূমি। তারও আগে আমরা দেখি ১৯১৮ সালে খানবাহাদুর আহছানউল্লাহ (১৮৭৩-১৯৬৫) বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলার যথার্থ স্বীকৃতি, বিশেষ করে সমকালীন কিছু বিদ্বজ্জনের উর্দুর প্রতি প্রকাশ্য ওকালতির বিরুদ্ধে তিনি আপনার অভিমতকে যুক্তি সহকারে উপস্থাপন করেছিলেন।
বাহান্ন পর্যন্ত একুশ ছিল আত্মত্যাগ-পর্বের প্রস্তুতিপর্ব; আর বাহান্নর পরের একুশগুলো ছিল স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা অর্জনে উদ্দীপ্ত হওয়ার পথে প্রেরণার উৎস। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পূরণ হলে একুশের আন্দোলন স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে নিবেদিত হয়। বাষট্টির ছাত্র আন্দোলনে, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও নবজাগরণের প্রতিটি মাইলফলকে ভাষা আন্দোলনের চেতনাই বারবার প্রেরণা, দুরন্ত সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে বাঙালি জাতিকে। এসব প্রয়াস-প্রচেষ্টার পথ ধরেই চূড়ান্তভাবে একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বরে মহান বিজয় সূচিত হয়েছে। জন্ম নিয়েছে ভাষার নামে একটি দেশ, ‘বাংলাদেশ’। পৃথিবীতে এমনভাবে কোনো জাতি-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একমাত্র ব্যতিক্রম। চীনা জাতির ইতিহাসে ৪ মে যেমন, একুশে ফেব্রুয়ারি তেমন বাঙালি জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার চিন্তচেতনা জাগ্রত হওয়ার দিন।
স্বাধীনতা লাভের পরও একুশ বিভিন্ন সংকট সন্ধিক্ষণে, আপাত বন্ধ্যত্বের কালে জাতিকে জাগ্রত করতে চেতনাদাত্রী হিসেবে কাজ করেছে। একুশের বইমেলা সে ধরনের একটি উপায়-উপলক্ষ যা বাঙালি জাতিকে এক অনবদ্য ঐক্যে সৃজনশীল সাংস্কৃতিক আবহে উদ্বুদ্ধ করে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন এখন আর কোনো একপক্ষীয় দাবি বা কর্মসূচি নয়, বাংলা ভাষা এবং এর সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধকরণ সবার সম্মিলিত প্রয়াস-প্রচেষ্টার প্রতিফলনও। একুশের বাণী জাতিকে স্বয়ম্ভর হতেও উদ্বুদ্ধ করে ‘একুশ মানে মাথা নত না করা।’
লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান [email protected]
নওগাঁ শহর থেকে আটকের পর র্যাবের হেফাজতে সুলতানা জেসমিন (৪৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুক্তির মোড় থেকে তাকে আটক করা হয়। এরপর গত শুক্রবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
সুলতানা জেসমিন নওগাঁ সদর উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে অফিস সহকারী পদে চাকরি করতেন। র্যাবের দাবি, প্রতারণার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বুধবার সুলতানা জেসমিনকে আটক করা হয়। আটকের পর অসুস্থ হয়ে তিনি মারা গেছেন। তবে স্বজনদের অভিযোগ, হেফাজতে নির্যাতনের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া সুলতানার মামা এবং নওগাঁ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর নাজমুল হক মন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার ভাগনি বুধবার সকালে অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুক্তির মোড় থেকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে র্যাবের লোকজন সুলতানাকে ধরে নিয়ে গেছে বলে মোবাইল ফোনে কল করে বিভিন্নজন তাকে জানান। একপর্যায়ে দুপুর ১২টার দিকে তার ভাগনি সুলতানা জেসমিনের ছেলে সাহেদ হোসেন সৈকত মোবাইল ফোনে কল করে জানান, তার মাকে র্যাব সদস্যরা ধরে নিয়ে গেছে। এরপর মন্টু তার ভাগনির সন্ধানে থানাসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন। কিন্তু সন্ধান পাননি। পরে বেলা ২টার দিকে সুলতানা জেসমিনের ছেলে তাকে আবার মোবাইল ফোনে কল করে জানান তার মা নওগাঁ সদর হাসপাতালে আছেন। এরপর হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন তার ভাগনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কিন্তু ভেতরে গিয়ে ভাগনির সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলে র্যাব সদস্যরা বাধা দেন বলে অভিযোগ করেন মন্টু। তবে জেসমিনকে র্যাবের কোন ক্যাম্প নেওয়া হয়েছিল তারা তার কিছুই জানতেন না। এর কিছুক্ষণ পর জেসমিনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার সকালে তার মৃত্যু হয়। যদিও লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে গতকাল শনিবার। গতকাল বাদ আসর তার মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
সুলতানা জেসমিনের ছেলে সাহেদ হোসেন সৈকত দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। বিভিন্নভাবে জানতে পারেন তার মাকে র্যাবের সদস্যরা তুলে নিয়ে গেছে। এর পরই তার সন্ধানের চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে জানতে পারেন তার মা নওগাঁ হাসপাতালে রয়েছেন। সেখানে তার মায়ের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল।
সৈকতের দাবি, তার মা চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। র্যাবের হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। যার কারণে মৃত্যু হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাব-৫-এর উপ-অধিনায়ক এএসপি মাসুদ রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে সুলতানা জেসমিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মুক্তির মোড় এলাকা থেকে র্যাবের হেফাজতে নেওয়া হয়। কিন্তু আটকের পরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে দ্রুত তাকে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসকরা তাকে রাজশাহীতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু রাজশাহীতে নেওয়ার পর তার অবস্থা আরও খারাপ হয়। শুক্রবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্ট্রোক করে তিনি মারা যান।’
সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল দুপুরে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয় বলেও জানান এই র্যাব কর্মকর্তা।
নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মৌমিতা জলিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বুধবার দুপুরে সুলতানা জেসমিন নামে এক রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন র্যাবের সদস্যরা। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। হাসপাতালেই সুলতানা জেসমিনের পরিবারের লোকজন র্যাবের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ করেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার ওই রোগী মারা যান বলে জানতে পেরেছি।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এফ এম শামীম আহাম্মদ বলেন, তারা যতটুকু জানতে পেরেছেন, র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদের সময় সুলতানা জেসমিন পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান। তারপর তাকে নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। সিটি স্ক্যান করে তারা জানতে পেরেছেন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে ওই রোগীর মৃত্যু হয়। তার মাথায় ছোট্ট একটি লাল দাগ ছিল। শরীরে অন্য কোথাও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. কফিল উদ্দিন জানান, ময়নাতদন্ত শেষে সুলতানা জেসমিনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে না আসা পর্যন্ত তার মৃত্যুর কারণ বলা সম্ভব নয়।
মেধাতালিকা বাদ দিয়ে নতুন নিয়মে পদোন্নতি দিতে যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। যার ফলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পদোন্নতিযোগ্য সোনালী ব্যাংকের শত শত কর্মী। এত দিন শূন্য পদের ভিত্তিতে মেধাতালিকা থেকে দুজন ও জ্যেষ্ঠতা (সিনিয়রিটি) তালিকা থেকে একজনকে পদোন্নতি দেওয়া হতো। কিন্তু হঠাৎ করেই নতুন নিয়ম চালু হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সবচেয়ে বড় ব্যাংকটিতে। পদোন্নতিতে মৌখিক পরীক্ষার জন্য শুধু জ্যেষ্ঠ তালিকার কর্মকর্তাদের বিবেচনা করা হয়েছে। বিশেষ কিছু ব্যক্তিকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য মেধাবী ও কর্মঠ অফিসারদের বঞ্চিত করার পাঁয়তারা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সোনালী ব্যাংকের কর্মীরা।
ইতিমধ্যে সোনালী ব্যাংকের অফিসার থেকে জিএম পদ পর্যন্ত পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যেখানে লঙ্ঘিত হচ্ছে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড কর্মচারী পদোন্নতি নীতিমালা-২০২২। অনুসরণ করা হচ্ছে পর্ষদের ৮১০তম সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত। এই অনিয়ম বন্ধ ও আগের নিয়মে পদোন্নতির প্রক্রিয়া চালু করার জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর আবেদন জানিয়েছেন সোনালী ব্যাংকের শতাধিক কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সোনালী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি দিলে বেশির ভাগ মেধাবী কর্মকর্তা বঞ্চিত হবেন। এতে কর্মকর্তারা কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এই নীতি বাদ দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই এমডির কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশা করি, তিনি বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, পর্ষদের ৮১০তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘অফিসার/সমমান থেকে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার/সমমান পদ পর্যন্ত পদোন্নতির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য শূন্য পদের চেয়ে পদোন্নতিযোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা তিন গুণের বেশি হলে জ্যেষ্ঠতা তালিকা থেকে প্রতিটি সম্ভাব্য শূন্য পদের বিপরীতে সর্বোচ্চ তিনজন (১:৩) প্রার্থী নির্বাচনী সাক্ষাৎকার/বাছাইয়ের জন্য বিবেচ্য হবেন,’ যা সোনালী ব্যাংক লিমিটেড কর্মচারী পদোন্নতি নীতিমালা-২০২২-এর সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কারণ এর ফলে মেধাতালিকার কর্মীরা পদোন্নতি তো দূরের কথা, সাক্ষাৎকারেও অংশ নিতে পারবেন না।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘সোনালী ব্যাংক লিমিটেড কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ২০২২’-এ পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ বিষয়ের ৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই প্রবিধানমালা মোতাবেক এবং তফসিলে বর্ণিত শর্তাবলী পরিপালন সাপেক্ষে, কোনো কর্মচারীকে পরবর্তী উচ্চতর পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা, কর্মদক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতাকে প্রাধান্য দেওয়া হইবে। কিন্তু কেবল জ্যেষ্ঠতার কারণে কোনো কর্মচারী অধিকার হিসেবে তাহার পদোন্নতি বা পদায়ন দাবি করিতে পারিবেন না।’
এদিকে, ২০২৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকারদের পদোন্নতি বিষয়ক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ‘ব্যাংকের চাকরিতে সিনিয়র অফিসার (জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা) অথবা সমতুল্য পদের পরবর্তী সব পদে পদোন্নতি পেতে হলে ব্যাংকিং ডিপ্লোমার দুই পর্বেই পাস করতে হবে,’ অর্থাৎ সোনালী ব্যাংকের ১:৩ নীতিমালা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
এ বছর সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার থেকে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার থেকে জেনারেল ম্যানেজার পদে পদোন্নতিযোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা যথাক্রমে ৭৫০, ৯১ ও ১৩ জন। এর বিপরীতে সম্ভাব্য পদোন্নতিযোগ্য পদের সংখ্যা যথাক্রমে ৬০, ১৯ ও ৩ জন। কিন্তু জ্যেষ্ঠ বিবেচনায় মৌখিক পরীক্ষার জন্য মনোনীত হবেন ১৮০, ৫৭ ও ৬ জন। এতে বঞ্চিত হবে মেধাতালিকা। সুতরাং আলোচ্য পদোন্নতি নীতিমালা স্ববিরোধী ও চাকরি প্রবিধানমালার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং যেখানে সততা ও ন্যায়ের প্রতিফলন নেই।
সোনালী ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরের তথ্য যাচাই-বাছাই ও গভীর অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে যেখানে দ্রুত পদোন্নতি হয়ে যায়, সেখানে সোনালী ব্যাংকে ব্যক্তি/গোষ্ঠী স্বার্থে প্রতিবার নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা আমদানি করে অনাকাক্সিক্ষত সময়ক্ষেপণ করে একেবারে বছরের শেষে এসে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এভাবে সোনালী ব্যাংকের দক্ষ ও মেধাবী কমকর্তারা এখন সব জায়গায় ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছেন। এমন অবস্থায় সোনালী ব্যাংকে একটি স্থায়ী নীতিমালা করা প্রয়োজন। যেখানে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রাধান্য পাবে না; বরং তা অপরিহার্য পছন্দরূপে সর্বমহলে প্রশংসিত ও গ্রহণযোগ্য হবে। যত দিন না এরূপ নীতিমালা করা সম্ভব, তত দিন কোনো বিতর্কিত নীতিমালা চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত বলে মনে করছেন সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা। কারণ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যদি সততা, দক্ষতা ও মেধার পরিবর্তে কেবল জ্যেষ্ঠতাকেই বেছে নেওয়া হয়, তাহলে মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তারা চ্যালেঞ্জ গ্রহণে আগ্রহ ও উৎসাহ-উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলবেন। চ্যালেঞ্জিং পদগুলো সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তার অভাবে দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী আফজাল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সোনালী ব্যাংকে যেই নীতিমালা রয়েছে, এটি অন্যান্য জায়গায়ও আছে; বিশেষ করে কৃষি ব্যাংক ও হাউজ বিল্ডিংয়েও একই নীতি মেনে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এখানে একজনের বিপরীতে তিনজনকে ডাকা হচ্ছে। তা ছাড়া এটা বোর্ডের সিদ্ধান্ত।
মেধাবীরা বঞ্চিত হবেন কি না এমন প্রশ্নে আফজাল করিম বলেন, ‘পদোন্নতির ক্ষেত্রে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৮৫ হচ্ছে তার অর্জন। বাকি ১৫ নম্বর ভাইভা থেকে পাবেন। এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো বৈষম্য হবে বলে মনে করি না। গত বছর অন্যভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। সে সময়ও কর্মকর্তাদের অনেকেই নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। এটা থাকবেই।’
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ভবনেই গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র (ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট) নেই। বহুতল ভবন নির্মাণের আগে এবং পরে তা বসতের বা ব্যবহারের উপযোগী কি না, তার জন্য দুই প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বা ছাড়পত্র লাগে।
কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলোর জন্য দুই প্রতিষ্ঠানের কোনোটির ছাড়পত্র নেই। অনুমোদন ছাড়াই চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক ও আবাসিক কার্যক্রম।
অনুমোদন তথা ছাড়পত্র না নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও ওয়ার্কস দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান।
অনুমোদন না নিয়ে বিধি অমান্য করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ময়মনসিংহ বিভাগের উপপরিচালক মো. মতিয়ার রহমান।
দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটলে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, সে বিবেচনা থেকেই ভবন নির্মাণ করা হয়। সব ঠিক থাকলেই ছাড়পত্র (ক্লিয়ারেন্স সনদ) দেওয়া হয়। সনদের বাইরে গিয়ে ভবন নির্মাণ এবং ব্যবহারের সুযোগ নেই। অভিযোগ এলে আমরা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় সুরাহা করার চেষ্টা করব। তবে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের কাছ থেকে ক্লিয়ারেন্স নেয়নি।’
ময়মনসিংহ গণপূর্ত দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্কস ও প্ল্যানিং কমিটির সদস্য এ কে এম কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। তারা তাদের মতো সিদ্ধান্ত নেয়। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ক্লিয়ারেন্স নেওয়া দরকার। না নিলে আইন অমান্য করা হয়। আমি উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থাগ্রহণের লক্ষ্যে কাজ করব।’
একদিকে ভবনের অনুমোদন নেই, অন্যদিকে অগ্নিনির্বাপণের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব। দশতলা বঙ্গমাতা ছাত্রী হলে অগ্নিনির্বাপণের জন্য ৬২টি ছোট সিলিন্ডার রয়েছে। এসবের কোনোটিরই মেয়াদ তথা কার্যকারিতা নেই। এ কথা নিশ্চিত করেছেন হলটির প্রাধ্যক্ষ নুসরাত শারমিন তানিয়া।
অগ্নিনির্বাপণের প্রস্তুতি কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা চিন্তিত। বারবার বলেও সমাধান পাইনি। আমাদের কিছু সিলিন্ডার থাকলেও সেগুলোর মেয়াদ নেই। তা ছাড়া এসব কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে কাউকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। মোটকথা, এ ব্যাপারে প্রশিক্ষিত লোকবল নেই। কিছুদিন আগে হলে আগুন লাগার কথা ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়। আমরা নিদানের ব্যবস্থার জন্য প্রকৌশল দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেই যাচ্ছি।’
ফায়ার সার্ভিস ও গণপূর্তের ছাড়পত্রহীন ভবনে হলের কার্যক্রম চলছে কি না জানতে চাইলে নুসরাত শারমিন বলেন, ‘আমাদের ডিপিডি ও প্রকৌশল দপ্তর বলেছে, সব অনুমোদন আছে। তবে তারা আমাদের কোনো ডকুমেন্ট দেয়নি।’
একই চিত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দশতলা বঙ্গবন্ধু হল, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ভবন, কলা ও বিজ্ঞান ভবনসহ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ডরমিটোরি, কোয়ার্টার ও প্রশাসনিক ভবনের। এমনকি নির্মাণাধীন কোনো ভবনের নকশার অনুমোদন নেই।’
আগুন নেভানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫৪টি সিলিন্ডার থাকলেও অধিকাংশের মেয়াদ নেই; এসব ব্যবহারের নিয়মও কেউ জানে না। অগ্নিনির্বাপণের কোনো প্রশিক্ষণের আয়োজনও নেই। ১৫৪টি সিলিন্ডারের মধ্যে বঙ্গমাতা হলে ৬২টি, বঙ্গবন্ধু হলে ২২টি, সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদে ৩০টি করে এবং প্রশাসনিক ভবনে ১০টি সিলিন্ডার রয়েছে বলে জানা গেলেও জায়গামতো সেগুলো দৃশ্যমান নয়।
চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গমাতা হলে আগুন লাগার গুজবে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালেও নিতে হয়েছিল। এরপর প্রশাসন নড়েচড়ে বসলেও অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
৫৭ একরের বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কোনো পানির উৎস নেই। বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে পানির ব্যবস্থা কীভাবে হবে তা নিয়ে শঙ্কিত ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। এত বড় ভবনের আগুন নেভানো তাদের রিজার্ভের পানি দিয়ে সম্ভব নয়।
আগুন নেভানোর সরঞ্জামের ঘাটতি ও ছাড়পত্র না থাকলেও তাদের প্রস্তুতি রয়েছে বলে মনে করেন পরিকল্পনা ও ওয়ার্কস দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান ও ইঞ্জিনিয়ার মাহবুব হোসেন। হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দুটি আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভার রয়েছে। আগুন লাগলে সেখান থেকে পানি সরবরাহ করা যাবে। আর জলাশয় নির্মাণের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে ছাড়পত্রের বিষয়টি দেখা যাবে। আগুন লাগলে সৃষ্টিকর্তা না চাইলে আমাদের প্রস্তুতি দিয়েও লাভ হবে না। যা হয়ে গেছে, তা তো হয়েই গেছে।’
ভবনের গণপূর্ত ও ফায়ার সার্ভিসের সনদ না থাকার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার ধারণা নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তর বলতে পারবে। যদি সেসবের প্রয়োজন থাকে আর আমাদের সেসব না থেকে থাকে, তাহলে আমরা প্রশাসনিকভাবে সেসব নিয়ে কাজ করব। এসব বিষয়ে দ্রুতই চিঠি দেওয়া হবে।’
বঙ্গমাতা হলের শিক্ষার্থী ফাইজাহ ওমর তূর্ণা বলেন, ‘আমরা আতঙ্কে থাকি। সারা দেশে যেভাবে আগুন লাগছে, চিন্তা হয়। আমাদের এত বড় হল, তার আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থা নেই; যা আছে তা ব্যবহার করতেও জানি না আমরা। আগুন লাগলে ভয়েই মরে যাব।’
বঙ্গবন্ধু হলের শিক্ষার্থী ফাহমিদ অর্ক বলেন, ‘আগুন নেভানোর যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই। ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থীরা। সত্বর সুরাহার ব্যবস্থা করা উচিত।’
অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার দুর্দশা নিয়ে চিন্তিত শিক্ষক সমিতির সভাপতি রিয়াদ হাসান। তিনি বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেব।’
রাষ্ট্রায়ত্ত এসেনসিয়াল ড্রাগস সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওষুধের চাহিদার ৭০ শতাংশ পূরণ করে। সাশ্রয়ীমূল্য কিন্তু মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনকারী এ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন অধ্যাপক ডা. এহ্সানুল কবির, যিনি পেশায় একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। আকর্ষণীয় মুনাফা ও নিয়মিত সম্প্রসারণে অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের বিশেষ প্রতিবেদক আলতাফ মাসুদ-এর সঙ্গে।
গভর্নমেন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস ল্যাবরেটরি ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৮৩ সালে এটি এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড নামে পুনঃনামকরণ করা হয়। এ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানসম্মত ওষুধ উৎপাদনের পাশাপাশি নিজস্ব সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে সরকারি স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে তা পৌঁছে দেওয়া। ২০১৪ সালের ২২ অক্টোবর এসেনসিয়াল ড্রাগসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক ডা. এহ্সানুল কবির। এরপর থেকেই পাল্টে যেতে শুরু করে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সাড়ে আট বছরে গতানুগতিক প্রতিষ্ঠানটি আজ সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় অপরিহার্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
এসেনসিয়াল ড্রাগস ইতিমধ্যেই সরকারের একটি ইউনিক কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রতিদিন এক থেকে দেড় কোটি মানুষ এ কোম্পানির উৎপাদিত ওষুধ সেবন করছেন, যা বিনামূল্যে সরকার প্রদান করছে। পরিবার পরিকল্পনায় যেসব ওষুধ প্রয়োজন হয় সেগুলোও উৎপাদন করছে কোম্পানিটি।
দেশ রূপান্তরকে অধ্যাপক ডা. এহ্সানুল কবির জানিয়েছেন, বর্তমানে আমরা ১২৩ ধরনের ওষুধ উৎপাদন করি। এর মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিস্টামিনসহ জেনারেল প্রোডাক্টগুলো উৎপাদন করা হচ্ছে। এর বাইরে কিছু ব্যয়বহুল ওষুধও উৎপাদন করা হচ্ছে। বাইরের কোম্পানির তুলনায় আমরা সরকারকে ১৫-২০ শতাংশ হ্রাসকৃত মূল্যে মানসম্মত ওষুধ দিতে পারছি। আমাদের উৎপাদিত ওষুধের মাধ্যমে প্রতি বছর সরকারের শত শত কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।
২০১৪ সালে এসেনসিয়াল ড্রাগসের বার্ষিক টার্নওভার ছিল প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা, যা এখন ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এহ্সানুল কবির বলেন, সরকার আমাদের উৎপাদিত ওষুধে ৫ থেকে ৭ শতাংশ মুনাফা দেয়। সরকারের কাছে ওষুধ বিক্রির অর্থে উৎপাদনসহ সব খরচ মেটানোর পরও আমরা প্রতি বছর ভালো মুনাফা করছি। সর্বশেষ হিসাববছরে আমাদের প্রতিষ্ঠান ১১০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে।
এসেনসিয়াল ড্রাগসের ওষুধ মানসম্মত ও সাশ্রয়ী হলে বাইরে পাওয়া যায় না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞ এ চিকিৎসক বলেন, আমরা সরকারের চাহিদাই মেটাতে পারছি না। কারণ আমাদের কারখানাগুলো অনেক পুরনো, যার কারণে এর উৎপাদন সক্ষমতা কম ছিল। যখন আমাদের কারখানাগুলো তৈরি হয় তখন সারা দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছিল আটটা। কিন্তু এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭টিতে। কিন্তু এ সময়ে আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা তেমনটা বাড়েনি। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোর ওষুধের কেনার যে বাজেট, তার ৭০ শতাংশ আমরা সরবরাহ করতে পারছি।
কারখানা সম্প্রসারণের বেশ কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকার তেজগাঁওয়ের প্ল্যান্টটা মানিকগঞ্জে স্থানান্তর করা হচ্ছে। মানিকগঞ্জে ৩১ একর জমিতে আপাতত ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে। মানিকগঞ্জের প্ল্যান্ট চালু হলে হাসপাতালগুলোর শতভাগ ওষুধ আমরা সরবরাহ করতে পারব বলে আশা করছি। শুধু তাই নয়, রপ্তানিও করতে পারব।
গোপালগঞ্জে নতুন প্ল্যান্ট করা হয়েছে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, ইনজেকশন, সাল্যাইনসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হবে। দেশে প্রথম ভ্যাকসিন প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগের কথা জানিয়ে এহ্সানুল কবির বলেন, আমাদের গোপালগঞ্জের প্ল্যান্টের পাশে সাড়ে ছয় একর জমি অধিগ্রহণ করেছি, যেখানে ১২টি টিকা উৎপাদন করব। ইনফ্লুয়েঞ্জা, ম্যানিনজাইটিস, করোনা, টিউবারকলোসিসসহ বাংলাদেশে শিশুদের যে ১১টি টিকা দেওয়া হয় সেগুলোর সবই আমদানিনির্ভর, যা আমরা উৎপাদন করব। এর বাইরে করোনার টিকাও উৎপাদন করব। সেখানে উৎপাদন, বোতলজাত ও ভ্যাকসিন ম্যানুফ্যাকচারÑ এ তিন পর্যায়ে উৎপাদন হবে। এ ছাড়া গবেষণা উন্নয়নেও ব্যবস্থা থাকছে। গোপালগঞ্জে ডায়ালাইসিস সøুইড তৈরি হবে, যার ফলে ডায়ালাইসিসের খরচ অনেক কমে যাবে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ইতিমধ্যে এ প্রকল্পে ২৫০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর সরকার দেবে ৫০ কোটি। ইতিমধ্যেই ডিপিপি তৈরি হয়েছে। আগামী জুলাই থেকে কাজ শুরু হবে আশা করছি। কয়েকটি ধাপে প্রকল্পটি সম্পন্ন হতে পাঁচ বছর সময় লাগবে।
তিনি বলেন, বগুড়ায় ২১ বছর আগে একটি প্ল্যান্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যেখানে অবকাঠামো তৈরির আগেই মেশিন কেনা হয়েছিল। বিভিন্ন কারণে সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়নি। আমি সেখানে ভবন তৈরিসহ সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করেছি, যা গত ১৫ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন। বগুড়ার প্ল্যান্টে উন্নতমানের অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন করা হচ্ছে।
এহ্সানুল কবির পেশায় একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, যিনি অবসরে এখনো রোগীদের পরামর্শ সেবা দিয়ে থাকেন। ওষুধ কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় তার মূল পেশা কোনো সহায়ক ভূমিকা পালন করছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলছিলেন, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হওয়ার কারণে কোম্পানি পরিচালনায় অবশ্যই কিছু সুবিধা পেয়েছি। একজন ডাক্তার হওয়ার কারণে আমি বুঝতে পারি কোন ওষুধটি মানুষের বেশি প্রয়োজন। কোন ওষুধটা ডেভেলপ করলে মানুষের সত্যিকারের উপকার হবে সেগুলো আমরা তৈরি করে সাশ্রয়ীমূল্যে সরবরাহ করেছি। তিনি জানান, এসেনসিয়াল ড্রাগসে কাজ শুরুর আগে তিনটি দেশের একাধিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কাজ করতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাও এখানে কাজে লাগছে।
আমি চেষ্টা করছি কর্মিবান্ধব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে। এ জন্য সামর্থ্যরে মধ্য থেকে শ্রমিকদের কী কী সুবিধা দেওয়া যায়, তার পরিকল্পনা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করেছি। আমি যোগ দেওয়ার পর ২০১৫ সালে আমি শ্রমিকদের বেতন দ্বিগুণ করে দিয়েছি। তাদের খাবারের মান উন্নয়ন করেছি। ঢাকার যত শ্রমিক আছে তাদের সবার জন্য বাস সার্ভিস চালু করেছি। মধুপুরে আমাদের একটি কারখানা আছে, যেখানকার শ্রমিকদের জন্য বীরশ্রেষ্ঠদের নামে চারটি ডরমিটরির ব্যবস্থা করে দিয়েছি। কারখানায় ডাক্তারের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আমাদের পাঁচটা প্ল্যান্টে শ্রমিকদের বিনোদনের জন্য বার্ষিক বনভোজনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের কারখানাগুলোতে যেসব অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করেন, তারা কিন্তু আগে ঈদ বোনাস পেত না। আমি তাদের জন্য ঈদ অ্যালাউন্সের ব্যবস্থা করে দিয়েছি, যা দিয়ে তারা নিজেদের পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে পারছেন বলেন এহ্সানুল কবির।
কুড়িগ্রামে নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করতে এবং জানাতে একটি বিলের মাঝে লাল সবুজের রঙে রাঙিয়ে তোলা হয়েছে ব্যতিক্রমী অস্থায়ী ভাসমান এক দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধ।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জেলার রাজারহাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের উদ্যোগে বর্ণিল আলোকসজ্জায় চাকির পশার বিলে স্মৃতিসৌধের আদলে ভাসমান স্মৃতিসৌধটি তৈরি করা হয়।
রবিবার (২৬ মার্চ) রাতে উপজেলার চাকির পশা বিলের মাঝে এ ব্যতিক্রমী স্মৃতিসৌধটির দেখা মেলে। সন্ধ্যার পর থেকে ব্যতিক্রমী এ সৌধের সৌন্দর্য উপভোগ করতে বিলের পারে ভিড় জমান বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজারহাট উপজেলার চেয়ারম্যান জাহিদ ইকবাল সোহরাওয়ার্দী বাপ্পির নিজ অর্থায়নে উপজেলার চাকির পশা বিলে মাঝে ব্যতিক্রমী অস্থায়ী একটি ভাসমান স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হয়েছে। মূলত নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করতে স্মৃতিসৌধেটি লাল সবুজ রঙের আদলে তৈরি করা হয়। দেখলে মন কাড়বে যে কারো। রাতে পানির মাঝে স্মৃতিসৌধের সৌন্দর্য উপভোগ করতে শত শত মানুষ ভিড় করছে চাকির পাশ বিলের পাড়ে। স্মৃতিসৌধটিতে লোহার অ্যাঙ্গেল, রড, লোহার পাতি, কাপড় ও বিভিন্ন রঙের লাইট ব্যবহার করা হয়েছে। এটি লম্বা প্রায় ২১ ফিট।
সবকিছু ঠিকটাক থাকলে স্মৃতিসৌধটি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের জন্য ঈদ পর্যন্ত বিলের মাঝেই রাখা হবে বলে জানা গেছে।
স্মৃতিসৌধটি দেখতে আসা রানা নামের একজন বলেন, বিলের মাঝে স্মৃতিসৌধ। আবার লাল সবুজের রঙের রাঙিয়ে তোলা হয়েছে। যা দেখতে অসাধারণ। আমি ফেসবুকে স্মৃতিসৌধটি সৌন্দর্য দেখতে পেয়ে চলে আসলাম। আসলেই অসাধারণ, নিজ চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না এর সৌন্দর্য।
স্মৃতিসৌধেটির তৈরির উদ্যোক্তা ও রাজারহাট উপজেলার চেয়ারম্যান জাহিদ ইকবাল সোহরাওয়ার্দী বাপ্পির বলেন, ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে চাকির পশা বিলের মাঝে অস্থায়ী দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত এবং জানাতে মূলত স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করা হয়েছে। গত ১৫ দিন থেকে প্রস্তুতি নিয়ে এ কাজটি করেছি আমরা। দেখবেন নিজের ছবি নদীর মাঝে দেখতে কিন্তু ভালো লাগে। ঠিক তার চেয়েও সুন্দর লাগছে স্মৃতিসৌধটি পানিতে দেখতে। এর সৌন্দর্য রাতে উপভোগ করার মতো। দিনে এটি ভালো লাগবে না। মূলত রাতের জন্য তৈরি করা হয়েছে। আমরা স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের বলব, তারা যেন এটি দেখতে আসে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের এক নেতাকে রড দিয়ে পিটিয়ে মাথা ফাটানোর অভিযোগে পাঁচ নেতাকর্মীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
বহিষ্কৃতরা হলেন আইন ও বিচার বিভাগের ইমরুল হাসান অমি, বাংলা বিভাগের আহমেদ গালিব, দর্শন বিভাগের কাইয়ূম হাসান ও আরিফুল ইসলাম এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তানভিরুল ইসলাম। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং মীর মশাররফ হোসেন হলে থাকেন।
এদের মধ্যে অমি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের উপ-আইনবিষয়ক সম্পাদক, গালিব ও কাইয়ূম সহসম্পাদক, আরিফুল ইসলাম কার্যকরী সদস্য এবং তানভিরুল কর্মী বলে পরিচিত। বহিষ্কৃতরা হলে অবস্থান করতে পারবে না বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ শীর্ষক আলোচনা সভা শেষে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলামকে রড দিয়ে পেটানো হয়। আহত সাইফুলকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
সাইফুলের মাথায় তিনটি সেলাই দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডিউটি ম্যানেজার পলাশ চন্দ্র দাশ।
ভুক্তভোগী সাইফুল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
জানা গেছে, এ মারধরের ঘটনার পাশাপাশি গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় মীর মশাররফ হোসেন হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন, প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ কমিটি গত রোববার (১৯ মার্চ) সাভারের একটি রেস্টুরেন্টে বসাকে কেন্দ্র করে মীর মশাররফ হোসেন হল ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের ছাত্রলীগের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দুটি মারধরের ঘটনারও তদন্ত করবে।
তদন্ত কমিটির প্রধান হলেন ১৯ নম্বর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শফি মুহাম্মদ তারেক। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আলবেরুনী হলের প্রাধ্যক্ষ সিকদার মোহাম্মদ জুলকারনাইন, শহীদ রফিক-জব্বার হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শাহেদ রানা, জাহানারা ইমাম হলের প্রাধ্যক্ষ মোরশেদা বেগম এবং সদস্যসচিব ডেপুটি রেজিস্ট্রার মাহতাব উজ জাহিদ।
শৃঙ্খলা কমিটির সভা শেষে রাত ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান সাংবাদিকদের বলেন, মারধর এবং সাম্প্রতিক ঘটনা বিবেচনায় চিহ্নিত পাঁচজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ‘সততার বুলি’ আওড়ান। অনলাইন প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো বদলি হয় না এ কথাই জোর দিয়ে বলেন তারা।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বদলির বিষয়ে জানা গেছে ভয়ংকর তথ্য। ২০২০ সালের মার্চ মাসের পর অনলাইন-বদলির সুযোগ না থাকলেও, টাকা হলেই বদলি হওয়া যায়। আগের কোনো তারিখে বদলির অনুমোদন দেখিয়ে জারি করা হচ্ছে আদেশ। এসব আদেশ অবশ্য ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত হয় না। নিয়মিত রাজধানীসহ সারা দেশে শিক্ষক বদলি করা হচ্ছে। তারা যোগদানও করেছেন। অনলাইন প্রক্রিয়ার বাইরেই এসব হচ্ছে।
গত তিন মাসে অনলাইন-ছাড়াই শতাধিক শিক্ষক বদলি হয়েছেন। এমন আটটি বদলির আদেশের কপি দেশ রূপান্তরের হাতে রয়েছে। কয়েকজনের যোগদানপত্রও দেশ রূপান্তরের কাছে আছে। বদলির এসব আদেশের বেশিরভাগ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পলিসি অ্যান্ড অপারেশন) মনীষ চাকমা স্বাক্ষরিত। কোনো কারণে তার ছুটিতে থাকার সময় দায়িত্বে থাকা পরিচালক মো. হামিদুল হক স্বাক্ষরিত কিছু আদেশও রয়েছে।
যেহেতু অনলাইন ছাড়া শিক্ষক বদলি বন্ধ, তাই আগের কোনো তারিখে বদলির অনুমোদন দেখিয়ে এখন শুধু আদেশ জারি করা হচ্ছে। বদলির আদেশ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। গত তিন মাসের কোনো বদলির আদেশ ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়নি। যারা বদলি হচ্ছেন তারা সশরীরে অধিদপ্তরে এসে আদেশপত্র নিয়ে যাচ্ছেন। সরাসরি বদলির আদেশ জারির বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ফরিদ আহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কাছেও কিছু আদেশের কপি এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আমাকে জানিয়েছেন, এসব বদলির আদেশ গত বছর ২২ ডিসেম্বর সংশোধিত বদলির নির্দেশিকা জারির আগেই অনুমোদন করানো ছিল। পরে বদলির আদেশ জারি হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, আদেশের সংখ্যা বেশি নয়। ১০-২০টি হতে পারে। সংশোধিত নির্দেশিকা জারির পর সরাসরি নতুন কোনো বদলির ফাইল অনুমোদনের সুযোগ নেই। এখন বদলি করতে হলে অনলাইন আদেশের মাধ্যমেই করতে হবে।’
সচিব বলেন, ‘অনলাইনে গত ১৫ সেপ্টেম্বর বদলি শুরু হলেও তাতে কিছু সমস্যা ছিল। সমস্যা কাটিয়ে গত ২২ ডিসেম্বর সংশোধিত বদলির নির্দেশিকা জারি হয়েছে। এরপর আর অনলাইনের বাইরে বদলির সুযোগ নেই।’
গাজীপুরের কাপাসিয়ার ঝাউয়াদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান ফরহাদের বদলির আদেশ জারি হয় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি। তিনি একই উপজেলার উত্তর পেলাইদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়েছেন। তার বদলির আদেশটি মনীষ চাকমা স্বাক্ষরিত। ২৮ ফেব্রুয়ারি যোগদানও করেছেন তিনি। আগে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মূলাইদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। গত ৮ ডিসেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক আদেশে সব সংযুক্তির আদেশ বাতিল হয়। তিনি অনলাইন-ছাড়াই বদলির আদেশ করিয়ে নিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদ লুৎফর রহমান ফরহাদ গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অন্যতম সহযোগী। স্কুলে তেমন ক্লাস নেন না। সারাক্ষণ ডিপিইওর অফিসে থাকেন। শিক্ষক নেতার পরিচয়ে তদবিরবাণিজ্য করেন। জেলার আট-নয় হাজার শিক্ষকের কাছ থেকে নানা অজুহাতে প্রায়ই চাঁদা আদায় করেন। সহকারী শিক্ষক হয়েও মাসে তার আয় কয়েক লাখ টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর চাচাতো ভাই পরিচয়দানকারী হাসান আলীর মাধ্যমে তার বদলির আদেশ করিয়েছেন বলে গল্প করেন। এ কাজে তিন-চার লাখ টাকার লেনদেনের কথাও বলেন। হাসান আলীকে প্রায়ই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেখা যায়। তিনি মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের আশপাশেই থাকেন।
গত ১৩ মার্চ চাঁদপুরের কচুয়ার নোয়ার্দ্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে রাজধানীর সূত্রাপুরের শহীদ নবী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে এসেছেন সহকারী শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌসী। তার সরাসরি বদলির আদেশে স্বাক্ষর করেছেন মনীষ চাকমা। সম্প্রতি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের দিগচাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফাতেমা বেগমও রাজধানীর মিরপুরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে এসেছেন।
গত ১৭ জানুয়ারি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার বোররচর বনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে একই উপজেলার সানকিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হন সহকারী শিক্ষক খাদিজা আক্তার। তার বদলির আদেশে স্বাক্ষর রয়েছে মো. হামিদুল হকের।
সানকিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খাদিজা আক্তার আমার স্কুলে ১৯ মার্চ যোগ দিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, অনলাইনে আগে আবেদন করা ছিল। পরে অধিদপ্তর থেকে সরাসরি বদলির আদেশ করিয়ে নিয়ে এসেছেন।’
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার তিলকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোসাফিকুর রহমান গত ১০ মার্চ বদলি হয়ে যান একই জেলার সদর উপজেলার সেনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তার আদেশটিও মনীষ চাকমা স্বাক্ষরিত।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হন সহকারী শিক্ষক তাসমিনা নার্গিস। একই তারিখে স্বাক্ষরিত আরেকটি আদেশে সহকারী শিক্ষক জেসমিন আক্তার ময়মনসিংহের নান্দাইলের গলগ-া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চকনজু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হন। এসব বদলির আদেশ মো. হামিদুল হক স্বাক্ষরিত।
গত ১ জানুয়ারি ময়মনসিংহ সদরের কুঠুরাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে একই উপজেলার গাঙ্গিনার পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন সহকারী শিক্ষক আবিদা সুলতানা। আদেশটিতে স্বাক্ষর করেছেন মনীষ চাকমা।
গাঙ্গিনার পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাকলী গোস্বামী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কীভাবে বদলি হয়েছে বলতে পারব না। তবে আবিদা সুলতানা বলেছে, অনলাইনে হয়েছে। আমার স্কুলে তিনি ২ জানুয়ারি যোগ দিয়েছেন।’
ময়মনসিংহের সদর উপজেলার রাজাগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে গত ২৮ ডিসেম্বর সহকারী শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন একই উপজেলার বড় বিলারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হন। আদেশটিতে স্বাক্ষর করেন মনীষ চাকমা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কুমার ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কীভাবে বদলি হয়েছে, তা বলতে পারব না। তবে সাবিনা ইয়াসমিন যোগ দিয়েছেন।’
দেশের কোনো জায়গা থেকে রাজধানীতে প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলি খুবই কঠিন। রাজধানীতে বদলির জন্য শিক্ষকরা ছয়-সাত লাখ টাকা খরচ করতেও দ্বিধা করেন না। আর অনলাইন প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর দেশের অন্য জায়গায়ও বদলির রেট বেড়ে গেছে। এ জন্য তিন-চার লাখ টাকার লেনদেন হয় বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে সারা দেশে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ রাখা হয় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলিও। এরপর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো গত বছর ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত একই জেলার মধ্যে বদলির জন্য অনলাইনে আবেদন গ্রহণ শুরু করে। ঘোষণা দেওয়া হয়, অনলাইনের বাইরে কোনো ধরনের বদলি কার্যক্রম চলবে না। ওই সময়ে অনলাইনের মাধ্যমে বদলি হওয়া শিক্ষকদের সবাই অক্টোবরের মধ্যে বদলিকৃত স্কুলে যোগদান শেষ করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম দফায় বদলি হওয়া শিক্ষকদের সবাই যেহেতু অক্টোবরের মধ্যে যোগদান শেষ করেছেন, অতঃপর গত ফেব্রুয়ারির আগে আর কোনো বদলির আবেদনের সুযোগ ছিল না। দ্বিতীয় দফায় ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত একই জেলার মধ্যে বদলির আবেদন নেওয়া হয়। কারা বদলি হলেন তা প্রকাশ করা হয় ৯ মার্চ। গত ১৪ ও ১৫ মার্চ একই বিভাগের মধ্যে বদলির জন্য অনলাইন আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। আর এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে অনলাইনে বদলির আবেদন গ্রহণ এখনো শুরু হয়নি। মন্ত্রণালয় বলেছে, শিগগির তা শুরু হবে। ফলে এসবের বাইরে যে বদলি হয়েছে সেসব কোনোভাবেই অনলাইন বদলির মধ্যে পড়ে না।
অনলাইন বদলির আদেশের একাধিক কপিও দেশ রূপান্তরের কাছে রয়েছে। একই উপজেলার মধ্যে বদলির আদেশ উপজেলা শিক্ষা অফিসার স্বাক্ষরিত। আর একই জেলার মধ্যে বদলির আদেশ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বাক্ষরিত। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে যেসব বদলির আদেশ জারি হয়েছে সেসব ‘অনলাইন বদলি’ নয়। মন্ত্রণালয় নির্দেশিকা জারি করে অনলাইনের বাইরে বদলি বন্ধ করেছে।
এ ব্যাপারে জানার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াত ও পরিচালক (পলিসি অ্যান্ড অপারেশন) মনীষ চাকমাকে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার একাধিকবার ফোন দিয়ে এবং এসএমএস করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলির কাজ হবে পুরোপুরি অনলাইনে। বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষক অনলাইনে আবেদন করার পর সেটি প্রাথমিকভাবে যাচাই করবেন সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে যাচাই করে আবেদনটি পাঠাবেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে। তিনি যাচাই করে পাঠাবেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে। এরপর সফটওয়্যারের মাধ্যমে বদলি নির্ধারণ করা হবে। এরপর আবার ডিপিইও সেটি মঞ্জুর করে পাঠাবেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে। তিনি তখন বদলির আদেশ জারি করবেন এবং শিক্ষক সেটি অনলাইনেই জেনে যাবেন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয় উপজেলাভিত্তিক। তাই সাধারণ নিয়মে উপজেলার মধ্যেই শিক্ষকদের বদলি হতে হবে। বিশেষ কারণে উপজেলা বা জেলা পরিবর্তনেরও সুযোগ আছে।
রংপুরের জেলা প্রশাসককে 'স্যার ডাকতে বাধ্য করার' অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক।
বুধবার (২২ মার্চ) রাত ৮টা থেকে তিনি প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে অবস্থান শুরু করেন বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি একটি জেলার ডিসিকে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ‘স্যার’ সম্বোধন না করা নিয়ে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই বিতর্ক আজও চলছে। যদিও দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়। প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিদের কেউ কেউ বিভিন্ন সময় জনসাধারণের কাছ থেকে স্যার ডাক শুনতে চেয়েছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা ঘটনা-বিতর্কের জন্মও হয়েছে।
তবে এবারের ঘটনাকে কিছুটা ব্যতিক্রম বলতে হয়। খোদ একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে ডিসি প্রশ্ন করেন তাকে কেন ‘স্যার’ ডাকা হলো না। আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা হলো শিক্ষককে সবাই স্যার ডাকবেন; তিনি আরেকজন শিক্ষক ব্যতীত কাউকে স্যার ডাকবেন না।
প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের জনসাধারণ স্যার ডাকতে বাধ্য নন। সেখানে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককেই কি না জিজ্ঞেস করা হলো ডিসিকে কেন স্যার ডাকা হলো না!
ঘটনাটা রংপুরের হলেও সুদূর ঢাকা থেকে যতটা বোঝা যায়, এখানে একটা জেন্ডার ইস্যু আছে। এ ঘটনায় দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত সংবাদে ওই নারী ডিসির মন্তব্য হলো, তিনি জানতে চেয়েছেন একজন পুরুষ হলে কি স্যার না ডেকে ভাই ডাকতেন?
এ প্রশ্ন গুরুতর। আমাদের সমাজের জন্য স্বাভাবিক। তারপরও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের জাজমেন্টাল না হয়ে স্বাভাবিক কাজ করে যাওয়াটাই প্রাথমিক দায়িত্ব।
একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নে আলোচনা হচ্ছে এবারের বিতর্ক নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় বা যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের যে শিক্ষার্থীরা ‘স্যার’ ডাকে-তা কতটা যৌক্তিক কিংবা গ্রহণযোগ্য।
বেশ কয়েকজন পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মত দিয়েছেন স্যার ডাকা জরুরি না। তারা স্যার ডাকতে নিরুৎসাহিত করেন।
এ বিষয়ে শুক্রবার (২৪ মার্চ) দেশ রূপান্তরে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটি কয়েকজন শিক্ষকের ফেসবুক মন্তব্য নিয়ে তৈরি করা। তাদের মন্তব্যের সূত্র ধরে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আরো কয়েকজন শিক্ষকের কাছে জানতে চাওয়া হয়।
তাদের কাছে প্রশ্ন ছিল, আমাদের সাহিত্যে বা সমাজের ইতিহাসে দেখেছি যে যারা শিক্ষাদান করেন বা পাঠদান করেন, তাদের পণ্ডিত, মাস্টার মশাই, ওস্তাদ, হুজুর এসব নামে সম্বোধন করা হতো, সেটা হঠাৎ স্যার হয়ে গেল কেন?
এ ছাড়া বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘স্যার’ শব্দটি কোন কোন ক্ষমতা বা অর্থকে তার নিজের সঙ্গে ধারণ করে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘স্যার’ সম্বোধন কোন তাৎপর্য বহন করে?
এসব বিষয়ে শিক্ষকেরা ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তবে তাদের কথায় মিলও আছে।
যেমন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক স্বাধীন সেন বলেছেন, ‘স্যার সম্বোধন ঐতিহাসিকভাবেই আমরা ঔপনিবেশিক ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্য দিয়ে পেয়েছি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে স্যার সম্বোধন শোনা বা স্যার সম্বোধনে কাউকে ডাকা ততক্ষণ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ না যতক্ষণ পর্যন্ত সেই সম্বোধন প্রভুত্ব, উচ্চমন্যতা ও ক্ষমতার স্তরবিন্যাসকে প্রকাশ না করে। ভাষা, বিশেষ করে সম্বোধন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণি, লিঙ্গ, ক্ষমতার সম্পর্ক সম্বোধনের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত হতে পারে, হয়। স্যার ডাকা কিংবা স্যার ডাক শোনার বাসনা আমাদের দেশে নিতান্তেই নৈমিত্তিক ও স্বাভাবিক হিসেবে পরিগণিত হয়।
কারণ প্রভুত্ব ও দাসত্বের যে অদৃশ্য সম্পর্ক তার মধ্য থেকে ‘স্যার’ সম্বোধন দাপট আর আনুগত্যের প্রচ্ছন্ন সম্পর্ককে জারি রাখে, প্রকাশ করে আর প্রতিষ্ঠিত করে। স্যার ডাক শুনতে চাওয়ার বাসনাকে তাই ক্ষমতা সম্পর্কের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।
আবার ভাষা ব্যবস্থায় জুতসই শব্দ ব্যবহারের রীতি ও অভ্যাস না থাকায় আধিপত্যবাদী ভাষা দিয়ে আধিপত্য প্রতিরোধের চেষ্টা করি। পদমর্যাদায় ওপরে থাকা নারীদের পুরুষেরা আপা বা ম্যাডাম ডেকে তথাকথিত নৈকট্যের নামে অনেকে হেনস্তা করতে পারে, নির্দেশনা অমান্য করতে পারে, সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে ফেলতে পারে। তখন লিঙ্গ নিরপেক্ষভাবে স্যার সম্বোধনটি তাৎক্ষণিকভাবে আপৎকালীন মোকাবিলার জন্য ব্যবহার হয় অনেক ক্ষেত্রে।
কিন্তু পরিশেষে, স্যার সম্বোধনটি আধিপত্য ও অধীনস্থতার সম্পর্ক থেকে মুক্ত থাকতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘উপনিবেশ পূর্বকালেও আধিপত্য বা উচ্চ মর্যাদা বা দরবারি কেতা হিসেবে নানা ধরনের সম্ভাষণ, রীতি ও এমনকি শরীরী অভিব্যক্তি প্রচলিত ছিল। কিন্তু সেই প্রচলন সর্বজনীন যেমন ছিল না, তেমনই সুনির্দিষ্টভাবে মেনে চলাও হতো না। রাজা বা সম্রাট বা অভিজাতবর্গকে লিখিত দলিলে বা দরবারি রীতিনীতির লিখিত রূপে যেভাবে সম্ভাষণ করা হতো, বাস্তব জনপরিসরে সেই সম্ভাষণ অনেক পরিবর্তনশীল ও নমনীয় ছিল।
তার বক্তব্য, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আইডিয়া সেখানে বৈষম্য ও পদমর্যাদার প্রসঙ্গটি গৌণ হওয়ার কথা ছিল। অন্ততপক্ষে স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। একটি সাংগঠনিক কাঠামো বা ব্যবস্থাতে উচ্চ ও নিচ পদ থাকে। সেই পদাধিকারীগণ নানাভাবে নানা কাজে নিয়োজিত থাকেন। কিন্তু এখনকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগে আমলাতান্ত্রিক করণ কেবল স্বাভাবিক বিবেচিত হয় না, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ তেমন স্তরবিন্যাস ও পদানুক্রম প্রত্যাশা করেন।
তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর সবচেয়ে আরাধ্য চাকরি হলো সিভিল সার্ভিস। তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কেন সরকারি চাকরিজীবী হতে চান তার পেছনে নিশ্চয়ই কারণ রয়েছে। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা যে কেরানি তৈরির প্রকল্প নিয়েছিল বা যে প্রজা উৎপাদনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছিল, যে প্রজাগণ মনেপ্রাণে ব্রিটিশ হবে, সেই শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো ও বৈশিষ্ট্যাবলি আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুসরণ করছি। তাহলে স্যার সম্বোধনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা স্তরে প্রভুত্ব বা উচ্চ মর্যাদা প্রকাশ করার জন্য ব্যবহৃত হওয়াটা বিস্ময়কর কিছু না।
স্বাধীন সেন দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত পরিবর্তন না করে, অনুগত অনুসারী শিক্ষক তৈরির কারখানা হিসেবে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বা ‘ভাই’ - যেকোনো সম্বোধনই দাপট, দম্ভ, প্রভুত্বর অভিব্যক্তি হয়ে উঠতে পারে। আমি মনে করি, মার্কিন দেশীয় কিংবা ইউরোপীয় তরিকায় অধ্যাপক অমুক বা তমুক সম্বোধন, বা কেবল নাম ধরে শিক্ষককে সম্বোধন করাটা তখনই ক্ষমতা সম্পর্ককে প্রতিনিয়ত নমনীয় রাখতে পারে যখন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিতামূলক এবং অব্যাহতভাবে আত্মসমালোচনামূলক ব্যবস্থা জারি থাকে।
তার কথায়, পরীক্ষা পদ্ধতি, শ্রেণি কক্ষে পাঠদানের পদ্ধতি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যোগাযোগের ধরন ও প্রকৃতি যদি প্রতিনিয়ত আত্মসমালোচনা করে স্বাধীনভাবে চিন্তার উপযুক্ত করার পরিসর নির্মাণের উদ্দেশ্যে পরিচালিত না হয় তাহলে যেকোনো সম্বোধনই নিপীড়নমূলক ও প্রভুত্বকামী হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন দুনিয়াতেও এমন বৈষম্য ও অসমতার উদাহরণ কম নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেমন পরিবারের ধারণাটি বেশ জনপ্রিয়। শিক্ষকগণ নিজেদের শিক্ষার্থীদের বাবা, মা বা অভিবাবক হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। একটি সংহতি মূলত পরিচয়বাদী বয়ানে আমরা অমুক বিভাগ পরিবার, তমুক হল পরিবার, অমুক ব্যাচের পরিবার ইত্যাদি অভিধা অহরহ শুনতে পাই।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন শিক্ষার্থীরা রিকশাচালক, দোকানদার, বা অন্যান্য পেশাজীবীদের মামা বা খালা সম্বোধনে ডাকেন। এসব ডাকের মধ্যে অবশ্যই একটা পর্যায় পর্যন্ত মানবিক একটা করুণা ও ভালোবাসার অনুভূতি থাকে। কিন্তু যেকোনো সময় এই জ্ঞাতি সম্পর্কসূচক পদাবলি নিপীড়ন, আনুগত্য নিশ্চিতকরণ, অন্যায় আড়ালকরণ বা মর্যাদা জোরজবরদস্তিমূলকভাবে চাপিয়ে দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। মনে রাখা জরুরি যে, অনেক সময় প্রভু ও দাসের সম্পর্কও মানবিক হয়ে উঠতে পারে, রাজা ও প্রজার সম্পর্কও মানবিক হয়ে উঠতে পারে। দাস বা প্রজা সামান্য দয়া, বা মানবিকতায় তার আনুগত্য নিশ্চিত করতে পারেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বা যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শিক্ষককে’ স্যার সম্বোধন বাধ্যবাধকতামূলক হওয়ার কোনো কারণ নাই। একটা সময় গুরুমুখী শিক্ষাও কিন্তু যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণমূলক আর অধিপতিশীল ছিল, তা যতই আমরা ঐতিহ্যের বড়াই করি না কেন। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে আর সর্বক্ষেত্রে শিক্ষকদের প্রশ্ন করতে না-পারেন সেই বিদ্যায়তন তো বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত না। শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থী বাহাজ করবেন, মতান্তর হবে। নিরন্তর একে অপরের চিন্তা করার সামর্থ্যকে সমতার ভিত্তিতে প্রসারিত করতে থাকবেন। পরীক্ষার নম্বরের ভয় থাকবে না। কারণ পরীক্ষার পদ্ধতি বা মূল্যায়নের পদ্ধতির সংস্কার করা হবে। শিক্ষককে শিক্ষার্থী চোখে চোখ রেখে বলতে পারবেন যে, স্যার বা অধ্যাপক অমুক, আপনি ভুল বলছেন। আপনার মতামতের বা তথ্যের সঙ্গে আমি একমত না। এই অনুশীলন যেকোনো সম্বোধন বজায় রেখেই চলতে পারে। সম্বোধন ছাড়া কেবল নাম ধরে ডেকেও চলতে পারে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ শিক্ষক হিসেবে আমার অনুভব এমনই। আমি এমন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ও পড়ানোর স্বপ্ন দেখি।
তিনি বলেন, স্যার সম্বোধনটির ঐতিহাসিক ও জন্মগত আধিপত্য ও প্রভুত্বের সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনা করে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার সম্বোধনটি বিলুপ্ত করা হোক।
স্বাধীন সেন বলেন, স্যারের সঙ্গে একই পাটাতনে দাঁড়িয়ে তর্ক করা, দ্বিমত করা আর পরীক্ষার খাতায় স্যারের মতামতের সমালোচনা লিখে ভালো নম্বর পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যের মধ্যেই তৈরি হয়। অবশ্য, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আদৌ জ্ঞানচর্চা হয় কিনা সেটা একটা বড় প্রশ্ন।
এ বিষয়ে দেশ রূপান্তর যোগাযোগ করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষক বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসেন তার সঙ্গে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক। তিনি শিক্ষকদের স্যার ডাকার প্রসঙ্গকে ভিন্ন খাতে ঘটনাটিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা বলে মনে করেন।
তার বক্তব্য, ‘শিক্ষার্থীরা আমাদের দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য থেকে ক্লাসরুমে শিক্ষকদের স্যার বলে ডাকে। আমার জানামতে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি স্কুল পর্যায়ে স্যার ডাকতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হয় না। এখন যে বিষয়ে কোনো বাধ্য করার বিষয় নেই, বিতর্ক নেই সেই বিষয়ে কথা বলে আমরা মূল বিষয়টা হালকা করে ফেলছি কি না সেটাও ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, আমাকে যদি ক্লাসে কোনো শিক্ষার্থীর স্যার ডাকতে ইচ্ছে হয় ডাকবে, ডাকতে ইচ্ছে না হলে ডাকবে না। শিক্ষার্থীরা কী বলে শিক্ষকদের ডাকবে সেটা নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই। তারা যা বলে সম্বোধন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে আমাকে তাই বলে ডাকবে।
ওমর ফারুকের বক্তব্য, শিক্ষকদের স্যার ডাকা নিয়ে যদি কোন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তাহলে সমাজের মানুষ, রাষ্ট্র, আইন ঠিক করবে কি করা উচিৎ। কিন্তু এ বিষয়ে তো কোন দ্বন্দ্ব নেই। যেটা নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব নেই সেটা নিয়ে আমরা কেন দ্বন্দ্ব তৈরি করছি। আর এটা করতে গিয়ে আমরা কি মূল বিষয় থেকে সরে যাচ্ছি না।
ওমর ফারুক এখানে মূল বিষয় বলতে বুঝিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্যার ডাকতে সেবাগ্রহিতাদের বাধ্য করেন তা। তবে আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল শিক্ষকদের স্যার ডাকা নিয়ে বিতর্ক অনুসন্ধান করা।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও অর্থনীতির শিক্ষক আনু মুহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে জানান, শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসরে চলে গেলেও তাকে স্যার ডাকেন অনেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও অনেকে তাকে স্যার ডাকেন।
তিনি বলেন, স্যার ডাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাইতে বাইরের মানুষদের সংখ্যাই বেশি হবে। তবে ভাই ডাকও আমি অনেক শুনি। এগুলোতে আমার কোনো সমস্যা নাই। ‘আনু স্যার’ যেভাবে ডাকে অনেকে সেটা নাম ধরে ডাকাই মনে হয়। তবে আমি আমার শিক্ষকদের স্যারই বলি, শুধু শিক্ষকদেরই, স্যার বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এই স্যার বস নয়, শিক্ষক।
তার মন্তব্য, সবাই নাম ধরে ডাকলে ভালোই লাগবে। অনেক বাচ্চা ছেলেমেয়েরা এখনও ডাকে।
নৃবিজ্ঞানী ও লেখক সায়েমা খাতুন অবশ্য ইতিহাসের গোড়া ধরেই টান দিয়েছেন। তিনি স্যার অথবা পণ্ডিত যা-ই ডাকা হোক না কেন তাকে পুরুষতান্ত্রিক হিসেবে বোঝাতে চেয়েছেন।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেহেতু ভাষা বাস্তবতা তৈরি করে, আমাদের কলোনিয়াল লিগেসির বাস্তবতায় স্যার বা ম্যাডাম শ্রেণি ক্ষমতা ও পদমর্যাদার প্রকাশক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষমতা সম্পর্কের সঙ্গেই এটা চলবে বা বদলাবে। নারী শিক্ষক পণ্ডিত মশাই, ওস্তাদ, হুজুর, মাস্টার বলে সম্বোধিত হয় নাই। কেননা নারীকে শিক্ষক বা পণ্ডিত বলে গ্রহণে সমাজ প্রস্তুত ছিল না। সেই প্রস্তুতির সঙ্গে ভাষাও প্রস্তুত করতে হবে আমাদের।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক এবং বুদ্ধিজীবী আ-আল মামুনের কাছেও এ প্রতিবেদক বিষয়টি জানতে চেয়েছেন।
তিনি বলেছেন, এটা পরিষ্কার শিক্ষকদের ওস্তাদজি, গুরুজি, গুরু এগুলো বলার একটা অভ্যাস ছিল। খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, উপনিবেশ শাসনের আগে উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা এমন ছিল যে এখানে যারা শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিত ছিলেন তারা এর বিনিময়ে কোনো টাকা নিতেন না। সমাজ তাকে যেভাবে আশ্রয় দিত, তিনি বা তারা সেভাবে থাকতেন। লেনদেন বা টাকা দিয়ে পড়ানোর বিষয়টা তখন একদম ছিল না। ফলে সে সমাজ ব্যবস্থায় গুরুজি, ওস্তাদজিদের একটা আলাদা সম্মান ছিল। উপনিবেশ যুগে এসে স্যার শব্দটা আসলো বটে, কিন্ত স্যার শব্দটা এমনভাবে আসলো যে এটা ক্ষমতা কাঠামোর একটা অংশে পরিণত হলো।
তিনি বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে দেখেছি, সেখানে জুনিয়ররা অনেকে হয়তো স্যার বলে কিন্ত সেখানে সেখানে শিক্ষকদের দাদা বা দিদি বলাটা বহুল প্রচলিত। কলকাতায় শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক যতটা সহজ বাংলাদেশে কিন্ত সম্পর্ক টা ততটা সহজ না।
শিক্ষকদের স্যার বলা না বলায় কিছু যায় আসে না। তবে না বলাই ভালো বলে মনে করেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যদি ওই রকম একতা সম্পর্কের ভেতর যেতে পারে, যেখানে উপনিবেশ আমলের স্যার শব্দটা থেকে বেরিয়ে আসা যায়, তাহলে তো খুব ভালো হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ক্ষমতার পরিমাপ হিসেবে যেখানে স্যার ব্যবহার হয়, শিক্ষকদের সেখান থেকে বের হয়ে আসা উচিত। শিক্ষকরা যদি বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারেন তাহলে খুব ভালো হয়।
আ-আল মামুন বলেন, আপনি দেখবেন শিক্ষকদের সঙ্গে এখন শিক্ষার্থীদের সহজ সম্পর্ক নেই। এখন অনেকটা প্রভু বা আনুগত্যের একটা সম্পর্কে এসে এটা দাঁড়িয়েছে। যেটা গ্রহণযোগ্য নয়। আমি যেমন অনেক সহজে মিশি স্টুডেন্টদের সাথে। ওরা কি বলল না বলল সেটা নিয়ে আমি চিন্তা করি না। বরং তাদের সাথে বন্ধুর মতো মিশি। এর ফলে আমাদের সম্পর্কটা অনেক সহজ থাকে।
কেবল স্যার বাদ দিয়ে অন্য কোন কিছু দিয়ে সম্বোধন করলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে আ-আল মামুন বলেন, মূল বিষয়টা বুঝতে হবে। বিষয়টা এমন নয় যে স্যার বললেই কেবল দূরত্ব থাকে আর দাদা ভাই বা মিস্টার বললেই সব সংকট দূর হয়ে যাবে। কেবল স্যার না বললেই যে ছাত্র-শিক্ষকের প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক সেটা শেষ হয়ে যাবে বিষয়টা এমন নয়। এখন ইস্যুটি ভাইরাল হওয়ার ফলে শিক্ষকরা উৎসাহের সাথে ফেসবুকে 'শিক্ষার্থীদের স্যার ডাকতে নিরুৎসাহিত করছি' বললেই ক্ষমতা কাঠামোকে অস্বীকার করা হয়ে যাবে না। এই পপুলারিজম থেকেও বের হয়ে আসতে হবে। যারা ফেসবুকে লিখছেন তাদের কেউ কিন্তু এটা বলছেন না যে তারা ক্ষমতাকাঠামো পুরোপুরি অস্বীকার করছেন। তারা কিন্তু ক্ষমতার চর্চা ঠিকই করেন।
তিনি বলেন, ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয়ে কারা পড়তে আসে, যারা পরবর্তীতে শিক্ষা নিয়ে কাজ করবে, বা অন্য কোন বিশেষ শাখা নিয়ে গবেষণা করতে চান কেবল তারা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসেন। আর যারা এমনিতে পড়াশোনা করবে তারা বিভিন্ন ধরনের প্রফেশনাল ট্রেনিং নেন, কোর্স করেন তারা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন না বা যেতে হচ্ছে না। এর ঠিক বিপরীত সিস্টেম বাংলাদেশে। এখানে যেটা ঘটে তা পুরো গোলমেলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় , আমাদের দেশের সাংবাদিকতা বিভাগের বিষয়ে সবার ধারণা আমাদের প্রধান কাজ মনে হয় সাংবাদিক তৈরি করা। এমনকি সরকার ও তাই মনে করছে। কিন্তু আমাদের তো মূল কাজ হওয়া উচিত মিডিয়াকে স্টাডি করা, তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, মিডিয়া নিয়ে গবেষণা করা। সরকার মনে করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশকে কর্মী সরবরাহ করা হবে।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসব শিক্ষক ক্ষমতার চর্চা, বিশেষ করে শিক্ষক রাজনীতি বা অন্য কোন ক্ষমতার চর্চা করেন, তারা প্রত্যাশা করেন যে জুনিয়র শিক্ষকেরা তাদের স্যার ডাকবে। শিক্ষকদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেক জুনিয়র শিক্ষক হয়তো জানেন ই না যে একজন শিক্ষক হিসেবে তার কি কি অধিকার আছে। তিনি অন্য যে কোন শিক্ষকের সমান এটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় একজন শিক্ষক বুঝতেও দেওয়া হয় না। জুনিয়র যদি সম্মান না করে সিনিয়র শিক্ষকেরা তাদের বিভিন্ন সমস্যায় ফেলে দেন। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেওয়া, দুর্নাম রটনা করা ও মিটিংয়ে হয়রানি করা হয়। আমাদের দেশে আলোকিত শিক্ষক কম। সবাই তথাকথিত শিক্ষক অনেকটা সরকারি আমলাদের মতো। আমলাদের যেমন ক্ষমতার চর্চা ও প্রয়োগ করার মানসিকতা তেমনি শিক্ষকরাও একই চিন্তা বহন করছেন। ফলে এই স্যার ডাক শোনার বাসনা তাদের মনে কাজ করে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অধীনতার দাবি করে। আমাকে স্যার বা ভাই বলুক এতে শিক্ষার্থীদের সাথে বা অন্য কোন শিক্ষকের সাথে সম্পর্কের কোন তফাত হয় না।
তিনি বলেন, আমি ক্ষমতা কাঠামোকে অস্বীকার করে তাদের সাথে বন্ধুর মত মিশি। আমার বাসায় নিয়ে আসি এবং বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে চাই। বর্তমান এই ভাইরাল ইস্যুর জন্য অনেকেই হয়তো স্যারের পরিবর্তে ভাই ডাকতে বলবে, আবার ক্ষমতার চর্চা করবে। যা বিপরীতমুখী এবং এর ফলে ক্ষমতা কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। ফলে এখন এটা ভাবতে হবে, ক্ষমতার চর্চার মানসিকতা থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসা যায়।
তিনি কথা শেষ করেন এই বলে, এখন আমাদের সমাজে তথাকথিত ভিআইপির সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। এটা এমন মহামারি আকার ধারণ করছে যে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও এই তথাকথিত ভিআইপিদের ছড়াছড়ি। তাদেরকে প্রোটোকল দেওয়া হয়। এই যে একটা মোহ এখান থেকে কেউ বের হতে চান না। অথচ একটা দেশে ভিআইপি বলে কেউ থাকতে পারে না। আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো ও আমলাতন্ত্র এ প্রবণতাকে টিকিয়ে রাখছে। গত ১০/১২ বছরে আমাদের সমাজে স্যার শুনতে চাওয়ার মানসিকতার লোকের সংখ্যা কিন্তু কয়েকগুণ বেড়েছে। এই প্রাদুর্ভাব আগে এত ছিল না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্যার বলার মধ্যে দিয়ে আমরা নিজেদের এক্সক্লুসিভ কোনো প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করতে চাই। সেই প্রবণতা থেকে স্যার ডাক শুনে একটা দাপট বোঝাতে চাই। এটা পুরোপুরি ঔপনিবেশিক চর্চা। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসকেরা চলে গেলেও, আমাদের মাথার মধ্যে সেই শাসনের বৈশিষ্ট্যগুলো পুরো মাত্রায় বিদ্যমান।
তার মতে, এটাকে আমরা আধিপত্যের প্রতীকে পরিণত করেছি। ব্রিটিশরা নিজেরা স্যার না বললেও তারা যেখানে শাসন করেছে, আধিপত্য দেখিয়েছে, সেখানে তারা স্যার বলাটা অভ্যাস হিসেবে তৈরি করে দিয়ে গেছে। আমি ব্রিটেনে পড়াশোনাকালীন শিক্ষার্থীদের কখনো কোনো শিক্ষককে স্যার বলতে শুনিনি বা দেখিনি। তারা মি. প্রফেসর বা নাম ধরেই ডাকতো।
তানজিম উদ্দিন বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমলাতন্ত্র। আমাদের আমলাতন্ত্র কিন্তু পুরোপুরি ঔপনিবেশিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। শাসক এবং শোষিতের যে কাঠামো এখনো তাই রয়ে গেছে। স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষের যে মানসিকতা থাকা উচিত আমাদের কিন্তু তা গড়ে ওঠেনি। আমাদের মধ্যে ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি আমলের আমলাতন্ত্র একইভাবে, একই পদ্ধতিতে এখনো রয়ে গেছে। কেবল আমলাতন্ত্র নয় সামাজিক অবস্থানেও স্যার বলা দিয়ে একটা আধিপত্য দেখানো হয়। স্যার দিয়ে আমি যে অধিপতি সেটা বোঝাতে চাই।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এটা থেকে কোনোভাবে মুক্ত নয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় তো সমাজ ব্যবস্থার অংশ। আর এই সংকটটা বর্তমানে পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো মনে করি না স্যার বলাটা একান্ত জরুরি। বরং আমার শিক্ষার্থীরা যদি আমাকে প্রফেসর তানজিম বলে ডাকেন এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। বরং আমি উৎসাহ দেব।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন দেশ রূপান্তরের সহসম্পাদক আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল।)
রাজধানীর মিরপুরের একটি মাধ্যমিক-সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে সিফাত। একই এলাকায় বসবাসকারী তার বন্ধু সিয়াম পড়ে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে। সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবার থেকে রোজার ছুটি। আর সরকারি প্রাথমিকে ছুটি ১৫ রোজা অর্থাৎ ৭ এপ্রিল থেকে।
এক দেশে একই শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ভিন্ন নিয়মে ছুটি পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে লেখাপড়ায় কেউ এগিয়ে যাবে, আবার কেউ পিছিয়ে পড়বে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সৈয়দ মামুনুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার বা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিলে ভেবেচিন্তেই নেয়। তবে সব ধরনের স্কুলে একটা কো-অর্ডিনেশন থাকলে ভালো হয়। আমরা ছুটির ব্যাপারে আরও আলাপ-আলোচনা করব।’
জানা গেছে, চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে আগামী শুক্রবার শুরু হতে পারে রমজান মাস। বছরের শুরুতেই স্কুলগুলোর ছুটির তালিকা অনুমোদন করা হয়। সে অনুযায়ী পবিত্র রমজান, স্বাধীনতা দিবস, ইস্টার সানডে, বৈসাবি, নববর্ষ ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ২৩ মার্চ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি, বেসরকারি মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছুটি ঘোষণা করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি কলেজ, আলিয়া মাদ্রাসা ও টিটি (টিচার্স ট্রেনিং) কলেজেও একই সময়ে ছুটির ঘোষণা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের।
তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছুটির তালিকা ভিন্ন। তারা পবিত্র রমজান, ইস্টার সানডে, চৈত্র-সংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আগামী ৭ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ প্রায় ১৫ রমজান পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা থাকবে।
রাজধানীসহ বড় বড় শহরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিকের মতোই তাদের ছুটি থাকবে ২৩ মার্চ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রোজার ছুটিও একই। তবে মাদ্রাসায় রোজার ছুটি শুরু এক দিন আগেই অর্থাৎ আজ বুধবার, ২২ মার্চ।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান। তাই বুধবার ক্লাস করে বৃহস্পতিবার রোজার ছুটি শুরু হবে। তবে সব স্কুলে একই ধরনের ছুটি থাকা জরুরি। এতে একই সময়ে সিলেবাস শেষ করা যাবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও সন্তুষ্ট থাকবে।’
রমজানে মাধ্যমিকে স্কুল বন্ধ আর প্রাথমিকে খোলা রাখায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চার লাখ শিক্ষকের মধ্যে। তারা বলছেন, যেসব অভিভাবকের সন্তান প্রাথমিক ও মাধ্যমিক দুই স্কুলেই পড়ে তাদের সমস্যা হবে। রমজান মাসে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। প্রাথমিকের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরাও রোজা রাখেন। তাই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে মিল রেখে প্রাথমিকের ছুটি নির্ধারণ করা যৌক্তিক হবে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাংগাঠনিক সম্পাদক জুলফিকার আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বছর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সরকারি ছুটি ৭৬ দিন, কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ৫৪ দিন। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিন্ন ছুটি নির্ধারণের যুক্তি তুলে ধরে আমরা ইতিমধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে আবেদন করেছি। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো সাড়া পাইনি।’