
১৯৫২ সালে আমার বড় খালা রওশন আরা বাচ্চু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অন্যতম ‘সিলেটি ছাত্রী’ হিসেবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সংগত কারণে নিজেকে একজন ভাষাসৈনিক পরিবারের সদস্য হিসেবে গৌরবান্বিত মনে করতাম। কিন্তু জানতাম না, আমার ছোটখালা হোসনে আরা বেগম এবং আম্মা ছালেহা বেগমও যে সেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। জানতাম না, আম্মা ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী থাকাকালে সেখানে ভাষা আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং অন্যান্য ছেলেমেয়ের সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সার দেশে শোক প্রকাশ হিসেবে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলনের জন্য জেলা প্রশাসনের নির্দেশে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে চরম শাস্তি দিয়েছিল। সেই শাস্তি ছিল, তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা। আম্মাকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। ফলে তিনি তার শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়েছিলেন।
বহিষ্কৃত হওয়ার পর আম্মা ময়মনসিংহ শহর ত্যাগ করেন এবং ভাষা আন্দোলনে গৌরবময় অবদানের কথা কাউকে না বলে সারা জীবন অপরাধী হিসেবে কাটিয়েছেন। তাকে পারিবারিকভাবে কোরআন শপথের মাধ্যমে বড় বোন ওই শাস্তির কথা কাউকে ঘুণাক্ষরেও যাতে না বলেন, সেই ওয়াদা করিয়েছিলেন। তিনি লজ্জায় ওই শাস্তির কথা জীবদ্দশায় কাউকে বলেননি। তাকে পারিবারিকভাবে অন্য বোনদের আগে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। ওইটুকু পড়াশোনা নিয়েই তিনি স্বামীর কর্মস্থল কুষ্টিয়ার চাঁদ সুলতানা গার্লস হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। ছিলেন কুলাউড়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সহকারী শিক্ষিক। পরে তিনি নিজ উদ্যোগে কিশোরগঞ্জে বয়স্ক নারী শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ২০০৪ সালে ১৯ আগস্ট ইহলোক ত্যাগ করেন। ১৯৫২ সালের তার সেই অনবদ্য সংগ্রামী অভিজ্ঞতা, যা আমাদের পরিবারের সবারই অজানা ছিল।
২০১৯ সালের ৩ ডিসেম্বর আমার বড় খালা রওশন আরা বাচ্চুর জীবনাবসান হয়। এরপর ১৭ ডিসেম্বর তার জন্মদিন উপলক্ষে খালাতো বোনের মিরপুরের বাসায় স্মরণসভার আয়োজন ছিল। ওই সভায় খালাতো বোন তার বক্তব্যে আমন্ত্রিত অতিথি ও সাংবাদিক ভাইদের বলছিলেন, আমার মা-খালা তিন বোনই ভাষাসৈনিক। আমি তখন পাশে বসা ছিলাম, কিছুই বলিনি। অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফেরার মুহূর্তে খালাতো বোন তানভীর ওয়াহেদ তুনা কয়েকটি পেজের ফটোকপি ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘নাও, এগুলো রাখো, এগুলো ডকুমেন্ট, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।’
ফেরার সময় ওই কয়েকটি পাতার লেখা পড়ার পর আম্মার অবদানের কথা স্মরণ করে ছোট বোন সৈয়দা ফরিদা আক্তার সাকীসহ দুই ভাইবোন অটোরিকশায় বসে সারা পথ শুধু কেঁদেছি। বোনের অনুরোধেই পরে আম্মার ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহে ছোটাছুটি করতে থাকি এবং একের পর এক তথ্য পেতে থাকি।
খালাতো বোনের দেওয়া সেদিনের ওই কয়েকটি পাতা পড়ে জানলাম, আম্মার কথা। সেই পাতাগুলো ছিল মুক্তিযুদ্ধ গবেষক তাজুল মোহাম্মদের লেখা ‘সংগ্রামী সাত নারী’ বইয়ের। বইটিতে রওশন আরা বাচ্চুকে নিয়ে লেখা অংশে তার পরিবারের ও অন্য ভাইবোনদের উদ্ধৃতি ছিল, যেখানে বারবার উল্লেখ করা আছে আমার আম্মা ছালেহা বেগমের কথা। কৃতজ্ঞতা জানাই তাজুল মোহাম্মদ ভাইকে, তার ওই লেখার সূত্র ধরেই আমাদের পরবর্তী যাত্রা শুরু। শুরু করলাম তথ্য খোঁজা, গুগল, উইকিপিডিয়া, সিলেটপিডিয়া, পুরনো লেখক, গবেষকদের ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা, বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি, আত্মীয়স্বজনদের কাছে দৌড়ানো ইত্যাদি। সব জায়গাতেই আম্মার ১৯৫২ সালের ওই ঘটনার সত্যতা পাই। একপর্যায়ে ছোট বোনকে নিয়ে ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি গেলাম ময়মনসিংহে। সহযোগিতা পেলাম হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার এবং সাংবাদিক আবু সাইদের ছোট ভাই জনি ও বিপ্লব বর্মণের, ভাতিঝি ডালিসহ অন্য অনেক শুভাকাক্সক্ষীর। তাদের মাধ্যমে পরিচিত হলাম বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আনন্দ মোহন কলেজের প্রাক্তন ছাত্রনেতা কাজী আজাদ শামীমের সঙ্গে। এগিয়ে এলেন তিনি, তাকে নিয়ে গেলাম মুসলিম গার্লস হাইস্কুলে। আমরা ভাষাসৈনিক ছালেহা বেগমের সন্তানেরা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় তার বহিষ্কারাদেশ বাতিল (মরণোত্তর) চেয়ে স্কুলের অধ্যক্ষ এবং স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে স্মারকলিপি দিলাম। সেদিন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আমাদের দাবি গ্রহণ করলেন এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। জানালেন, তিনিও শুনেছেন ছালেহা বেগম ওই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তবে ব্যাপারটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, এ ব্যাপারে এর আগে কেন কেউ কোনো কথা বলেননি বা তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেননি। এ বিষয়টি তিনি আরও অনুসন্ধান করবেন এবং স্কুল কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জহিরুল হক খোকার কাছে উত্থাপন করবেন। প্রধান শিক্ষক আরও জানালেন, যেহেতু ছালেহা বেগম জেলা প্রশাসনের নির্দেশে স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, অতএব যদি তাদের কাছ থেকে কোনো রকম লিখিত নির্দেশ আসে তাহলে তাদের স্কুল কমিটির পক্ষে ভাষাসৈনিক ছালেহা বেগমের বহিষ্কারাদেশ বাতিল করা সহজ হবে।
পরদিন কাজী শামীম ভাইয়ের সহযোগিতায় আমরা স্মারকলিপি নিয়ে জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমানের সঙ্গে দেখা করি। ২০২০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন লেখকের বইপত্র, পেপার কাটিং ইত্যাদি প্রমাণসহ জমা দিই এবং সাক্ষাৎ করি। তিনি আমাদের যেহেতু স্কুলে কোনো রেকর্ড নেই এবং আমরাও সেই আদেশের কোনো কপি দেখাতে পারছি না, তাই ভাষা আন্দোলনের সময়ের কোনো জীবিত লোক বা চাক্ষুস সাক্ষী খুঁজে বের করতে বললেন, যা তার জন্য সহায়ক হবে। তিনিও তার কার্যালয়ের নথি তালাশ করবেন বলে জানান এবং এ ব্যাপারে ওপরমহলের নির্দেশের কথা জানালেন। পরে আমরা আমাদের এক মামা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী, যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন উপদেষ্টা ছিলেন, তার সঙ্গে কথা বলি। তিনি আম্মাকে অনেক শ্রদ্ধা করতেন এবং ভাষার জন্য আম্মার শিক্ষাজীবনের শাহাদাতবরণের বিষয়টি জানতেন। মামা ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসান সাহেবকে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির অনুরোধ করলেন। পরদিন আমরা গেলাম ময়মনসিংহে। ইতিমধ্যে স্থানীয়ভাবে ‘ভাষাসৈনিক ছালেহা বেগম স্মৃতি পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন ও ময়মনসিংহের স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, লেখক, সাংবাদিক, গবেষকসহ এই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে বহু মানুষ সোচ্চার হন। তাদের একাংশকে সঙ্গে নিয়ে ওই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর আমরা ভাইবোন মিলে করোনাকালের দুর্যোগ উপেক্ষা করে স্মারকলিপি নিয়ে গেলাম বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসানের কাছে। তিনিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভাষাসৈনিক ছালেহা বেগমের বহিষ্কারাদেশ বাতিলের বিষয়টি আমলে নিলেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন বলে জানালেন। অল্প কিছুদিন পরেই আমরা ডাকযোগে ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনারের কাছ থেকে একটি চিঠির অনুলিপি পাই। সহকারী কমিশনার রূপম দাস স্বাক্ষরিত চিঠিতে মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সদস্য সচিবকে অনুরোধ করা হয়েছে মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী ছালেহা বেগমের স্কুল থেকে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার ও আইনানুগ নিষ্পত্তির জন্য। এই চিঠির অনুলিপি পেয়ে আমরা যাই স্কুলে এবং দেখা করি প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, তিনিও চিঠিটি পেয়েছেন। তার স্কুল কমিটি সভা করে যে সিদ্ধান্ত নেবে, তিনি সেই সিদ্ধান্ত প্রশাসনকে জানিয়ে দেবেন এবং এও জানালেন যে তাদের পুরনো রেকর্ড ১৯৮৪ সালে উইপোকা খেয়ে ফেলেছে। নষ্ট প্রায় কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। সেদিন অল্প বয়স্ক এক তরুণ ইংরেজির শিক্ষক জানালেন, তিনি ’৪৭ সাল থেকে অদ্যাবধি স্কুল কমিটির যে বৈঠক হয়েছিল সব খুঁজে দেখেছেন; ছালেহা বেগমের নামে কোথাও কোনো সিদ্ধান্তের কপি পাওয়া যায়নি। তবে আরও কিছু পুরনো কাগজপত্র একটি আলমারিতে রাখা আছে, যা খুঁজে দেখা হয়নি। তিনি খুঁজে দেখে ব্যবস্থা নেবেন এবং বিষয়টি তাদের সময়ে নিষ্পত্তি করতে পারলে তা তাদের জন্য এবং স্কুলের জন্য গৌরবের হবে।
ভাষাসৈনিক ছালেহা বেগমের বহিষ্কারাদেশ বাতিলের দাবিতে সোচ্চার হয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক, প্রতিভা মুৎসুদ্দি ও রাজিয়া হোসেইন, অধ্যাপক ড. মন্জুরুল ইসলাম, ড. আতিয়ার রহমান, ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন, ড. এম ইলিয়াস, ড. শাহ এমরান, বুলবুল খান মাহবুব, ফরিদ আহম্মেদ দুলাল, হামিদুল আলম সখা, ইঞ্জিনিয়ার নুরুল আমিন কালাম, কাইয়ুম রেজা চৌধুরী, দীনা হক, চৌধুরী নুরুল হুদা, সৌরভ জাহাংগীর, লতিফুল বারী হামীম, ডা. লিমন প্রমুখ।
দেশভাগের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় মাতৃভাষার জন্য বাঙালিকে রাজপথে নামতে হয়। সাত মাসের মধ্যে ঘটে রক্তপাতের ঘটনা। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রথম রক্তাক্ত হয় পূর্ববঙ্গ বা আজকের বাংলাদেশ। ওই দিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় পালিত হয় প্রথম ধর্মঘট। পুলিশের বর্বর হামলা ও গুলিবর্ষণে সচিবালয়ের সামনের রাস্তা রক্তে ভিজে যায়। কারাগার ভরে যায় তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ সংগ্রামী ছাত্রদের গ্রেপ্তারে। সেদিন প্রতিবাদের যে ভিত রচিত হয় তারই পথ ধরে আসে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। ভাষা আন্দোলনের সেই রক্তঝরা দিন এবং এর আগের-পরের সময়গুলো ক্যামেরায় ধারণ করেন চল্লিশের দশকের শক্তিমান আলোকচিত্রী শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব। তার তোলা ভাষা আন্দোলনের এই দলিলচিত্রগুলো হয়ে ওঠে পাকিস্তানি স্বৈর-সিদ্ধান্তের বিপরীতে প্রতিবাদের হাতিয়ার।
দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তথ্য অধিদপ্তরের [পিআইডি] কার্যালয় খোলা হয়, ইয়াকুব ছিলেন এর প্রথম দিককার ফটোগ্রাফার। সরকারি চাকুরে হয়েও বাঙালির পক্ষে তার এই অবস্থান ছিল শাসকচক্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আটচল্লিশের অগ্নিঝরা সময় যার ক্যামেরায় মূর্ত হয়ে ধরা দিয়েছিল, তার অসীম সাহসিকতার গল্প কোথাও উল্লেখ নেই। ভাষা আন্দোলনের আলোকচিত্রী হিসেবেও তার নামটি এখন পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি কোনো মহলে। ফলে বাংলা ভাষার জন্য তার যে বিশাল অবদান কিংবা ত্যাগের মহিমা, সাধারণ মানুষের কাছে তা অজানা থেকে গেছে।
দৈনিক বাংলার পাতায়
আটচল্লিশের রক্তাক্ত অধ্যায় যে শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের ফ্রেমে ধরা তার খোঁজ মেলে পুরনো পত্রিকার ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে। তার তোলা তিনটি দুর্লভ ছবি ১৯৭৪ সালের ৭ জুন দৈনিক বাংলার শেষ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়। ছবিগুলোর ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয় শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের নাম। প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল আগে পত্রিকায় ছাপা হওয়া এই ছবিগুলো যেন বাঙালির গৌরবময় ভাষা আন্দোলনের একঝলক। প্রকাশিত একটি ছবি হলো ১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্র-সমাবেশের। ভাষা আন্দোলনের পাটাতন তৈরির সময়ের ছবি বলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। আরেকটি ছবি ১১ মার্চ সচিবালয়ের ১ নম্বর গেটে আহত মোহাম্মদ বায়তুল্লাহকে [যিনি ছিলেন শ্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডেপুটি স্পিকার] ঘিরে বিক্ষুব্ধ ছাত্রনেতাদের। এই দুটি ছবি বর্তমান প্রজন্মের একেবারেই অদেখা। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা শওকত আলীর পাশে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিটি ১১ মার্চ তোলা বলে বিভিন্ন প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ওই দিন শওকত আলী গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হন। আর শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে জেলে বন্দি করা হয়। ১৫ মার্চ শেখ মুজিব মুক্তি পান। পরদিন সুস্থতার ছাড়পত্র পান শওকত আলী। ফলে এ ছবিটি ১৬ মার্চ হাসপাতাল গেটে তোলা বলে গবেষকরা মনে করেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও এর সত্যতা মেলে। বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজে অবস্থিত ভাষা আন্দোলন জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, শহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালায় এই ঐতিহাসিক ছবির একটি খন্ডিত অংশ সংরক্ষিত আছে। কিন্তু প্রদর্শিত ছবিতে আলোকচিত্রীর নাম উল্লেখ নেই। ফলে দৈনিক বাংলায় ছবিগুলো ছাপা না হলে এই কৃতী আলোকচিত্রকরের নাম জানা সম্ভব হতো না।
এত দিন সবাই জানতেন, আটচল্লিশে আ জা ম তকীয়ুল্লাহ এবং বায়ান্নতে আমানুল হক, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, জমিল চৌধুরী আর ডা. আবদুল হাফিজ ছবি তুলেছিলেন। জীবদ্দশায় তকীয়ুল্লাহ, আমানুল হক ও রফিকুল ইসলাম ভাষাসংগ্রাম নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন এবং তাদের তোলা ছবিগুলো চিহ্নিত করে গেছেন। ফলে আটচল্লিশের বাকি যেসব ছবি বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে বেনামে ঘুরে বেড়ায়, সেগুলো কার তোলাÑএই প্রশ্নের উত্তর ছিল অমীমাংসিত। ইয়াকুবের ছবিগুলোর সন্ধান পাওয়ায় অমীমাংসিত বিষয়টির সমাধানের পথ তৈরি হলো। আটচল্লিশের ভাষাসংগ্রামের যে বিস্তৃতি তাতে এই তিনটি ছবি ছাড়াও তার তোলা আরও অনেক ছবি থাকার কথা। সেগুলোর মূল নেগেটিভ এখন কোথায় কিংবা কী অবস্থায় আছে, তা অজানা। নেগেটিভগুলো উদ্ধার করা গেলে ভাষা আন্দোলনের আরও অজানা ইতিহাস প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হতো।
বিশিষ্টজনের মন্তব্য
ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক বলেন, এখন পর্যন্ত ভাষাসংগ্রামের যে লিখিত ইতিহাস, তাতে শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু চুয়াত্তরের পত্রিকায় যেহেতু ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাই তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এখন সময়ের দাবি।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, আমাদের মনোযোগ বায়ান্নর দিকে। কিন্তু আটচল্লিশ আর বায়ান্ন একই সূত্রে গাথা। আটচল্লিশ ছাড়া বায়ান্নকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। আটচল্লিশের ১১ মার্চ বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও কারাবরণের কারণে শেখ মুজিব গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন, যা ইয়াকুবের ক্যামেরায় বন্দি। বায়তুল্লাহর ছবিটি প্রমাণ করে ওই দিনের বিক্ষোভ সমাবেশে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ইয়াকুব শুধু আটচল্লিশেই নয়, ছেচল্লিশের দাঙ্গার ছবি তুলেও দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। ছাত্রজীবনেই বন্ধু হিসেবে শেখ মুজিবের সান্নিধ্য পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠার পেছনে যে কয়েকজন মানুষের নেপথ্য সমর্থন ছিল, ইয়াকুব তাদের অন্যতম। ফলে এই মানুষটি সম্পর্কে আরও বেশি জানা দরকার। এ বিষয়ে যত তথ্য, বিবরণ ও ভাষ্য উঠে আসবে, আমাদের ইতিহাস ততই সমৃদ্ধ হবে।
ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বলেন, আগে ফটোগ্রাফারদের ক্রেডিট দেওয়া হতো না বলে তাদের কথা মানুষ জানত না। অনেক দেরিতে হলেও শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ভাষাসংগ্রামীকে আবিষ্কার করতে পারা এক বিশাল ঘটনা। তার তোলা আমতলার সমাবেশ আর আহত বায়তুল্লাহ্র ছবিটি ইতিহাসের এক নব সংযোজন। ফলে তার ছবির কারণে আমাদের ভাষা আন্দোলনের পরিধিটাও আরও বিস্তৃত হলো। এখন থেকে ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রে তার নাম ব্যবহার করা কর্তব্য বলে মনে করি।
অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে
নিভৃতচারী হওয়ার কারণে একসময়ের শক্তিমান আলোকচিত্রকার শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব কালের আবিলতার আড়ালে চাপা পড়ে যান। সে আবিলতা ঝেড়ে সবার আগে তাকে উজ্জ্বল আলোয় আপন সৌকর্যে তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিব আর ইয়াকুব ছিলেন ঘনিষ্ঠ সহপাঠী। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে তাদের বন্ধুত্ব। একই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন বলে বিভিন্ন মিছিল-মিটিং, আন্দোলন-সংগ্রামে ক্যামেরা কাঁধে বন্ধুর পাশে ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকেছেন ইয়াকুব। ছেচল্লিশের দাঙ্গা নিরসনে তার তোলা মর্মস্পর্শী ছবিগুলো অবিভক্ত বাংলায় কী প্রভাব ফেলেছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে গেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থের ৮১ ও ৮২ নম্বর পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমি আর ইয়াকুব নামে আমার এক ফটোগ্রাফার বন্ধু পরামর্শ করলাম, আজ [১৯ আগস্ট, ১৯৪৬] মহাত্মাজীকে একটা উপহার দিব। ইয়াকুব বলল, তোমার মনে আছে আমি আর তুমি বিহার থেকে দাঙ্গার ফটো তুলেছিলাম? আমি বললাম, হ্যাঁ মনে আছে। ইয়াকুব বলল, সমস্ত কলকাতা ঘুরে আমি ফটো তুলেছি। তুমি জান না তার কপিও করেছি। সেই ছবিগুলি থেকে কিছু ছবি বেছে একটা প্যাকেট করে মহাত্মাজীকে উপহার দিলে কেমন হয়। আমি বললাম, চমৎকার হবে। চল যাই, প্যাকেট করে ফেলি। যেমন কথা তেমন কাজ। দুইজন বসে পড়লাম। তারপর প্যাকেটটা এমনভাবে বাঁধা হল যে, কমপক্ষে দশ মিনিট লাগবে খুলতে। আমরা তাকে উপহার দিয়েই ভাগব। এই ফটোর মধ্যে ছিল মুসলমান মেয়েদের স্তন কাটা, ছোট শিশুদের মাথা নাই, শুধু শরীরটা আছে, বস্তি, মসজিদে আগুন জ¦লছে, রাস্তায় লাশ পড়ে আছে, এমনই আরও অনেক কিছু! মহাত্মাজী দেখুক, কিভাবে তার লোকেরা দাঙ্গাহাঙ্গামা করেছে এবং নিরীহ লোককে হত্যা করেছে। আমরা নারকেলডাঙ্গায় মহাত্মাজীর ওখানে পৌঁছালাম। তার সাথে ঈদের মোলাকাত করব বললাম। আমাদের তখনই তার কামরায় নিয়ে যাওয়া হল। মহাত্মাজী আমাদের কয়েকটা আপেল দিলেন। আমরা মহাত্মাজীকে প্যাকেটটা উপহার দিলাম। তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করলেন। আমরা যে অপরিচিত, সেদিকে তার ভ্রƒক্ষেপ নাই। তবে বুঝতে পারলাম, তার নাতনী মনু গান্ধী আমার চেহারা দেখেছে ব্যারাকপুর সভায়, কারণ আমি শহীদ সাহেবের [হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী] কাছে প্ল্যাটফর্মে বসেছিলাম। আমরা উপহার দিয়ে চলে এলাম তাড়াতাড়ি হেঁটে।...। বন্ধু ইয়াকুবের এই ফটোগুলি যে মহাত্মা গান্ধীর মনে বিরাট দাগ কেটেছিল, তাতে সন্দেহ নাই।’
শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম দিককার ছবিগুলো শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের তোলা বলে ইতিহাসে তার প্রমাণ মেলে। কলকাতার ব্যারাকপুরের জনসভায় মহাত্মা গান্ধীর পাশে ২৭ বছরের তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিটি যে ইয়াকুবের তোলা, অসমাপ্ত আত্মজীবনী পাঠে তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
ব্যক্তিজীবন
শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের জন্ম ১৯১৭ সালে, অবিভক্ত বাংলার কলকাতায়। কলেজে পড়ার সময় এক খ্রিস্টান যুবকের কাছ থেকে বিশ টাকা দিয়ে কোডাকের বি-টু সাইজের ফোল্ডিং ক্যামেরা কিনে ফটোগ্রাফি শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ছবি তুলে বেশ সুনাম অর্জন করেন। ওই সব ছবি দেখে তৎকালীন তথ্য সচিব তাকে কেন্দ্রীয় তথ্য দপ্তরে ফটোগ্রাফার হিসেবে যোগ দিতে বলেন। দেশভাগের সময় তিনি স্থায়ীভাবে পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসে পিআইডিতে যোগদান করেন। তখন মুক্তাঙ্গনের পাশে ছিল পিআইডির কার্যালয়। পিআইডির নিজস্ব ডার্করুম না থাকায় তিনি পুরান ঢাকার ‘স্টুডিও এইচ’ থেকে ছবি প্রিন্ট করতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অকৃতদার ছিলেন। মাকে নিয়ে পল্টনের একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতেন। এ দেশে তার আপন কেউ ছিল না। তাই বঙ্গবন্ধুকেই তিনি অভিভাবক মনে করতেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে খুন হওয়ার পর তিনি সত্যিকার অর্থেই অভিভাবকহীন হলেন। আর পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে অবসর গ্রহণের কিছু দিনের মধ্যে মায়ের মৃত্যুতে একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন তিনি।
জীবনসায়াহ্নে
ইয়াকুবের শেষ জীবনটা ছিল ভীষণ কষ্টের। যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, অর্থের অভাবে সেটিও একসময় ছেড়ে দিতে হয়। ফলে রাতের বেলায় প্রেস ক্লাবের অভ্যর্থনা কক্ষের মেঝেতে কিংবা ফুটপাতে ঘুমাতেন। দিনের বেলায় ঘুরে বেড়াতেন প্রেস ক্লাবের আঙিনায়। ক্যানটিনের এক কোনায় চুপচাপ বসে থাকতেন। অনুজ ফটোসাংবাদিক খালেদ হায়দার আর বুলবুল আহমেদকে কাছে পেলে পুরনো দিনের গল্প বলতেন। জীবনের শেষদিকে শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কেউ কেউ তাকে বোঝাও মনে করতেন। বেশির ভাগ সময় তাকে না খেয়ে থাকতে হতো। বড় অবহেলায় নিঃসঙ্গ ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত।
কবে মারা গেলেন শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব, জানতে প্রেস ক্লাবে গেলাম। কয়েকজন প্রবীণ আলোকচিত্রী তার কথা শুনে স্মৃতিকাতর হলেন। কিন্তু দিনক্ষণ বলতে পারলেন না! প্রেস ক্লাবের রেজিস্ট্রি খাতায়ও তার মৃত্যুর তারিখটি পাওয়া গেল না! কম্পিউটারে সংরক্ষিত তালিকা দেখে একজন বললেন, ‘এই নামে কোনো ফটোসাংবাদিক ছিল বলে জানা নেই!’ পরে বাংলা একাডেমির লাইব্রেরিতে পুরনো পত্রিকার ফাইল ঘেঁটে জানা গেল শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের চলে যাওয়ার দিনটি ছিল বুধবার, ৭ জুন, ১৯৯৫। সেই সময়ের জাতীয় কয়েকটি দৈনিকে কী নিদারুণ দায়সারাভাবে তার মৃত্যুর খবর ছাপে, তা দেখে মনটা ভারাক্রান্ত হলো।
লেখক : দেশ রূপান্তরের আলোকচিত্র সম্পাদক
শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই আমাদের ভূখণ্ডের মানুষের দীর্ঘদিনের। পরাধীনতার সুদীর্ঘ বছরগুলোতে ১৯০ বছর ব্রিটিশ, পরে ২৩ বছর পাকিস্তানিদের আমরা দেখেছিলাম কীভাবে তারা আমাদের শোষণ করেছে। শোষণের প্রয়োজনেই শাসন করা ছিল তাদের কাজ। আমাদের তারা যে পরিমাণ শোষণ করেছে তাদের সমৃদ্ধি ততই বেড়েছে। জনগণ এটা মেনে নিতে চায়নি, তাই ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্তেভেজা এই ভূখণ্ডে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছে। কিন্তু যেকোনো সংগ্রামের একটা সূচনাবিন্দু থাকে, স্বাধীনতার জন্য মরণপণ লড়াইয়েরও তেমনি শুরু খুঁজতে হলে প্রথমেই আসে ৫২ সালের কথা। ৭১-এ অর্জিত এই স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরুটা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ৮ ফাল্গুন বা ২১ ফেব্রুয়ারি যে বেদনা এবং যে চেতনা জাগিয়ে দিয়েছিল তা আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বৈষম্য বেদনা জাগিয়েছিল বলেই মুক্তি-চেতনার জন্ম হয়েছিল। এই বৈষম্য থেকে মুক্তি আন্দোলনে ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রেরণা জোগায়।
কেন ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যেই মুসলমানদের জন্য আলাদা আবাসভূমির আন্দোলনে নিম্নবিত্ত দরিদ্র মুসলমান দলে দলে যুক্ত হয়েছিলেন এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আশা জাগিয়ে তোলা হয়েছিল যে মুসলমানদের আলাদা দেশ পাকিস্তান গঠিত হলে সেখানে কোনো শোষণ থাকবে না। কারণ মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। ভাই কি ভাইকে শোষণ করতে পারে? আর উচ্চবিত্ত ধনী উচ্চশিক্ষিত মুসলমান যুক্ত হয়েছিলেন এই আশায় যে রাষ্ট্রটা হাতে পেলে ক্ষমতার দুধ-মধু সবই তারা খেতে পারবেন। ফলে এই দুই শ্রেণির ছিল দুই আশা কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক, সেটা হলো পাকিস্তান সৃষ্টি। পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথম যে প্রশ্ন এলো এই রাষ্ট্রের সংবিধান কেমন হবে। শুধু মুসলমানদের জন্য কেন, কোনো ধর্মের ভিত্তিতেই কি কোনো দেশ হতে পারে? যদি তাই হতো তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশের অধিবাসীই তো মুসলমান, তাহলে তারা সবাই মিলে একটা দেশ হতে পারে না কেন? আবার এক দেশে বহু ধর্মের মানুষ থাকলে তাদের পরিচয় কী হবে? আবার ভারতে যে মুসলমানরা থেকে গেলেন তাদের পরিচয় কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারা গেলেও আশ্বস্ত করা হয়েছিল এই বলে যে, এক দিন হিন্দু আর হিন্দু হিসেবে নয়, মুসলমান আর মুসলমান হিসেবে নয় তারা সবাই বিবেচিত হবেন পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে। অর্থাৎ ধর্মীয় পরিচয় আর নাগরিক পরিচয় এক হবে না। একেবারে দ্বি-জাতিতত্ত্বের বিপরীতমুখী যাত্রা! তাহলে এত সাম্প্রদায়িক কারণে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু কীসের জন্য? এই টানাপড়েনে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নে তাই দীর্ঘ সময় লেগে গেল। ১৯৪৭ সালে জন্ম নিল পাকিস্তান আর তার ৯ বছর পর ১৯৫৬ সালে প্রণীত হলো সংবিধান। এ সময়টায় সংবিধান না থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্রিটিশ প্রবর্তিত বিধান তো ছিল, তা দিয়েই চলছিল সব। রাষ্ট্রের ধর্ম নিয়ে সমাধানে আসতে না আসতেই প্রশ্ন এলো রাষ্ট্রের ভাষা কী হবে? এক ধর্ম, এক দেশ, এক ভাষা এ ধরনের চিন্তা থেকেই মুসলমান, পাকিস্তান এবং উর্দু ভাষাকে সমার্থক করার আয়োজন চলছিল সর্বত্র। অন্যদিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনে ঢাকা তখন উত্তাল। এ সময় ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় এলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত গণসংবর্ধনায় তিনি বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়। ভাষা আন্দোলনকে তিনি মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যের প্রতিবাদ হয় সমাবেশের মধ্যেই। এরপর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে স্টুডেন্টস রোল ইন নেশন বিল্ডিং শীর্ষক বক্তৃতায় তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি বাতিল করে দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একটি এবং সেটি অবশ্যই উর্দু। কারণ উর্দুই পাকিস্তানের মুসলিম পরিচয় তুলে ধরে। ছাত্ররা সমস্বরে না, না বলে জিন্নাহর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায়। ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার ভাষার দাবিকে তাচ্ছিল্য করে ২৮ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেন জিন্নাহ।
জিন্নাহ চলে গেছেন কিন্তু উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যেতে পারেননি। প্রশ্ন ছিল, উর্দু কি পাকিস্তানের কোনো প্রদেশের ভাষা? সিন্ধু, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ প্রত্যেকেরই তো আলাদা ভাষা। ভাষা দিয়ে কি ধর্মের পরিচয় তুলে ধরা যায়? আরবি ভাষায় কি মুসলমান ছাড়া কেউ কথা বলে না? আরবের খ্রিস্টান, ইহুদি ধর্মাবলম্বী মানুষরাও তো আরবি ভাষায় কথা বলে। এ কথা তো সত্য যে, মানুষ যত দ্রুত ধর্মান্তরিত হতে পারে তত সহজে ভাষান্তরিত হতে পারে না। আরবের মুসলমান আর ইন্দোনেশিয়ার মুসলমান ধর্মে এক হলেও ভাষা এবং সংস্কৃতিতে এক নয়। আর পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কথাও যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে যে ভাষায় ৫৪ শতাংশ মানুষ কথা বলে তাদের দাবি কি অগ্রগণ্য বলে বিবেচিত হবে না?
ভাষা আন্দোলনের মূল সুর ছিল গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক। রাষ্ট্র তার নাগরিককে ধর্মের ভিত্তিতে বিবেচনা করবে না। এই ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া ও বসবাস করা মানুষরা প্রত্যেকেই রাষ্ট্রের নাগরিক। যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যুক্তি হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছিল শহীদ মিনার। তারা জীবন দিয়েছিলেন এই ভূখণ্ডের সব মানুষের মুখের ভাষার জন্য। তাই সব ধর্মের মানুষ যেন শ্রদ্ধা জানাতে পারে সে উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়েছিল শহীদ মিনার।
একুশ শিখিয়েছিল আত্মসমর্পণ নয়, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে। একুশ মানে মাথানত না করা। এটা আমাদের কাছে এখনো একটি প্রেরণাদায়ক কথা। প্রবল শক্তির কাছে বা যুক্তিহীনতার কাছে আত্মসমর্পণ করে প্রাণে বেঁচে থাকা যায় কিন্তু সম্মানের সঙ্গে বাঁচা যায় না। অন্ধত্ব বা অন্ধকার যত প্রবলই হোক না কেন যুক্তি অস্ত্রে তাকে পরাভূত করা সম্ভব যদি ব্যাপক মানুষের মধ্যে সেই যুক্তির আলো পৌঁছে দেওয়া যায়। যুক্তির আলো পথ দেখিয়েছে আমাদের স্বাধীনতার। স্বাধীনতার সঙ্গে মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিল মানুষ তা অর্জন করতে হলেও যুক্তিই হবে অন্যতম হাতিয়ার। ভাষার দাবিতে লড়াই পথ দেখিয়েছে, নাগরিক অধিকার অর্জন করতে হলে ভোটের অধিকার দরকার। বৈষম্য দূর করার প্রথম পদক্ষেপ হলো সবার ভাতের অধিকার। সে কারণেই স্লোগান উঠেছিল কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না। আর এসব দাবিকে একসঙ্গে যুক্ত করেছিল এই ভূখণ্ডকে স্বাধীন করতে হবে। তাই দেখা যায়, ভাষা-ভাত-ভোট-ভূখণ্ড এই চারটি শব্দ, যা ‘ভ’ দিয়েই শুরু তা আমাদের জীবন ও রাজনীতিকে তখন কতটা প্রভাবিত করেছে এবং এখনো করছে।
আন্দোলন থামে না তার পরিণতিতে না যাওয়া পর্যন্ত। তাই ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধ করে স্বাধীন হলাম কিন্তু বন্দি হয়ে গেলাম পুঁজির কাছে। মুখের ভাষায় পড়তে হলে যে শিক্ষা লাগে তা তো আমরা জানি। সেই শিক্ষা ক্রমাগত ব্যয়বহুল পণ্যে পরিণত হচ্ছে, ফলে তা চলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। শিক্ষার ওপর আক্রমণের পাশাপাশি আক্রমণ আসছে সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ওপর। ছাত্রদের ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে অতীতের সংগ্রামের ইতিহাসকে। যেমন : গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণতান্ত্রিক, বিজ্ঞানভিত্তিক সেক্যুলার একই পদ্ধতির শিক্ষানীতির দাবিতে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের জীবন দিতে হয়েছিল তা প্রায় ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে ।
ভাষা চিন্তার বাহন। মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে জীবন দিলেও সে ভাষায় কথা বলতে গেলে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ লাগে, দেশে কি এখন সে অবস্থায় আছে? এই প্রশ্নে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনো উত্তর নেই। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর ভোটের অধিকারের জন্য লড়তে হচ্ছে এখনো। নানা ধরনের কালাকানুন আর সাম্প্রদায়িক বাতাবরণে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে গণতান্ত্রিক পরিবেশ। মাথানত না করার সাহস দিয়েছে একুশ, আর মাথানত করে রাখার পরিবেশ তৈরি করেছে রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্র জনগণের ট্যাক্সে চলে সেই রাষ্ট্র জনগণকে দেখায় ভয়। ফলে দেশ, অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলে বন্ধু-স্বজনরাও পরামর্শ দেয় এবং বলে, বাদ দাও তো এসব, কী দরকার রাজনীতির বিষয়ে মাথা ঘামিয়ে! এই ভয় আর ভরসাহীনতার রাষ্ট্র তো আমরা চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম রাষ্ট্রটা হবে জনগণের এবং জনগণকে ভরসা দেবে।
একুশ যে চেতনা জাগিয়েছিল তার মর্মে ছিল মুক্তির আকুতি। শোষণ থেকে মুক্তি, বৈষম্য থেকে মুক্তি আর মুক্তি অপমান থেকে। এই চেতনা ছড়িয়ে গেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনায়। কোনো মানুষ যেন তার মাতৃভাষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন সেই লড়াইকে এগিয়ে নিতে একুশ যেন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে আরও বহুদিন।
লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট [email protected]
ভাষাশহীদ আবুল বরকত ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পরের বছর তৎকালীন পূর্ববাংলায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করে এমএ শেষ পর্বের ছাত্র ছিলেন। মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে তার জন্ম, ডাকনাম আবাই। শহীদ বরকত সম্পর্কে খুব কমই জানি। আমরা দুজন ২০১৮ সালে ভাষাশহীদ আবুল বরকত সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য তার জন্মস্থানে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। ভাষার মাসকেই বেছে নিই। ২ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় বিমানে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে কলকাতায় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু বিমানবন্দরে পৌঁছাই দুপুর ১২টায়। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সিতে কলকাতার চিতপুর রেলস্টেশনে পৌঁছাই দেড়টা নাগাদ। আমাদের গন্তব্য মুর্শিদাবাদের বহরমপুর। কলকাতা থেকে বহরমপুরের দূরত্ব ২০০ কিমি। সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার ভ্রমণ। ট্রেনের নাম ‘ধনধান্যে’। বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে ট্রেন ছাড়ল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। ট্রেন ও স্টেশনের পর স্টেশন অতিক্রম করে এগোতে লাগল। মাঝেমধ্যে পরিচিত জায়গার নাম চোখে পড়ায় যেন শব্দদূষণের যন্ত্রণা কিছুটা লাঘব হলো। যেমন বারাসাত, রানাঘাট, পলাশী, হুগলী, কৃষ্ণনগর প্রভৃতি। রাত ৯টা বাজার কয়েক মিনিট আগে আমরা বহরমপুর স্টেশনে নামলাম। ‘সোনার বাংলা’ হোটেলে উঠলাম।
৩ ফেব্রুয়ারি শনিবার ২০১৮। সকাল ৮টায় ভাষাশহীদ বরকতের নিজগ্রাম বাবলার উদ্দেশে ট্যাক্সিতে রওনা হলাম। শীতের সকাল। শহরের গন্ডি পেরোতেই চারদিকে ঘনকুয়াশা, ডানে-বামে কিছু দেখা যায় না। শহরের বাইরে রঞ্জিত সার্ভিস পেট্রলপাম্প স্টেশন পার হয়ে সামনের মোড় থেকে বামদিকে বাদশাহী রোড ধরে সালার থানা। সালারের বাসিন্দা বরকতের চাচাতো ভাই মানিক মিয়ার ছেলের ঘরের নাতি দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া সামিন। আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে সালার ডিগ্রি কলেজের সামনের মোড়ে অবস্থান করছে। সামিন শহীদ বরকতের তৃতীয় প্রজন্মের সর্বকনিষ্ঠ বংশধর। সামিনদের বাসায় আমাদের প্রথম বিরতি। ঘরে ঢুকতেই দেখা হলো কোটপরা ছয় ফুটের বেশি লম্বা সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের সঙ্গে। চেয়ারে বসা। বুঝতে বাকি রইল না, উনিই বরকতের চাচাতো ভাই ‘মানিক মিয়া’। বরকতকে স্বচক্ষে দেখা একমাত্র জীবিত ব্যক্তি। তার কিছু ছবি তোলা ও বক্তব্য রেকর্ড করার কাজটি দ্রুত সেরে নেওয়া হলো। দুপুর ১২টা বেজে গেছে প্রায়। আমরা দ্রুত সামিন ও মানিক মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বরকতের জন্মভূমি বাবলা গ্রামের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। গাড়িতে মানিক মিয়ার সঙ্গে অনেক কথা হলো বরকত সম্পর্কে। বয়সের ভারে তিনি অনেকটাই ন্যুব্জ, অসুস্থও। বরকতের সঙ্গে তার সর্বশেষ দেখা হয় তার ৯ বছর বয়সে। এর বেশি স্মৃতি তার মনে নেই।
গ্রামের অপ্রশস্ত পথ ধরে এগোলাম। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা চলার পর বাবলা গ্রামে ‘বরকত ভবন’-এর সামনে গাড়ি থামল। আমরা দুজনই খুব পুলকিত। শহীদ বরকতের অনাবিষ্কৃত ইতিহাসের দোরগোড়ায় আমরা এসে গেছি। গাড়ি থেকে নেমে তাকিয়ে দেখি রাস্তার পূর্ব পাশে ‘বরকত ভবন’ নামাঙ্কিত ডুপ্লেক্স ভবন। ভবনের গায়ে লেখা ‘শহীদ আবুল বরকত কেন্দ্র’, স্থাপিত ২০০৫-০৬, বাবলা, রেজি. নং ঝ/১খ/১৭২০৩.১। ঠিক সামনেই রাস্তার দক্ষিণ পাশে ‘শহীদ আবুল বরকত স্মৃতি সংঘ’, স্থাপিত-১৯৯৬, রেজি. নং-ঝ/১খ/১৪১৫০ বাবলা (বরকত নগর); পো. তালিবপুর, জেলা-মুর্শিদাবাদ। ছোট একতলা ভবন। ভবনটির সামনেই একটি ছোট্ট স্ট্যান্ডের ওপর শহীদ বরকতের সোনালি রঙের আবক্ষ মূর্তি। নিচে নেমপ্লেটে লেখা আছে ‘ভাষাশহীদ, শহীদ আবুল বরকত, আবির্ভাব : ১৬ই জুন ১৯২৭, শহীদ : ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, উদ্বোধক মাননীয় সাংসদ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি, শ্রী অধীর রঞ্জন চৌধুরী, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪।’
আশপাশের বাড়ির লোকজন আমাদের আগমন টের পেয়ে কাছে আসতে শুরু করেছে। অনুরোধ করতেই বরকত ভবনটি খুলে দেওয়া হলো। ডুপ্লেক্স ভবন। ভেতরে একাধিক কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কক্ষের সামনে ভাষাশহীদদের নামফলক লাগানো। (১) ভাষাশহীদ সালাম কক্ষ; (২) ভাষাশহীদ রফিক কক্ষ; (৩) ভাষাশহীদ বরকত লাইব্রেরি কক্ষ। ভবনে একটি বড় হলরুম আছে। জানা গেল এখানে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ বরকতের সম্মানে অনুষ্ঠান হয়। রাস্তার উত্তর পাশে বরকত ভবনের ঠিক উল্টো পাশে শহীদ বরকতদের বসতঘর। বাড়িটি অন্য লোকের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। তিনি সেখানে দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। কিন্তু বরকতদের ইটের একতলা ঘরটি, যার দক্ষিণ পাশে দুটি জানালা আছে, স্মৃতি হিসেবে আগের আকৃতিতে রেখে দিয়েছেন। রাস্তার দক্ষিণ পাশে একটি বড় দীঘি আছে। এলাকার লোকজনের ভাষ্য, এ দীঘিটি বরকতের পরিবারের। শহীদ বরকতের বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ গজ পূর্বদিকে রাস্তা ঘেঁষে রয়েছে ‘শহীদ আবুল বরকত স্মৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয়’।
শহীদ আবুল বরকত এ বিদ্যালয়েই প্রাথমিক পাঠ নিয়েছেন। তখন নাম ছিল বাবলা বহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয় ভবনটি দোতলা। ভবনের মাঝখানে অপ্রশস্ত সিঁড়ি, এর দুদিকে ছোট ছোট ক্লাসরুম। কোনো শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের বসার কোনো বেঞ্চের অস্তিত্ব পেলাম না। শিক্ষার্থীরা মেঝেতে বসেই তাদের শিক্ষা কার্যক্রম সারছে। বিদ্যালয়ের সামনের দেয়ালে শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক খাবারের মেন্যু টানানো আছে। জানা গেল, খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় দুপুরের খাবার স্কুলেই মেন্যু অনুযায়ী রান্না হয় এবং শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়। বাবলা গ্রামের এই বিদ্যালয়টির দৈন্যদশা আমাদের ব্যথিত করেছে।
আমরা আবার বরকতের বাড়ির আঙিনায় ফিরে এলাম। কথা হয় বরকতের পড়শি, সম্পর্কে ভাইপো মো. আবদুল্লাহর সঙ্গে। তার বয়স পঞ্চাশের বেশি। তার ভাষ্য, বরকতের সম্পত্তি বাড়িঘর ও ধানিজমি মিলে প্রায় ৪০ বিঘা। সবটাই ওয়াকফ করা আছে আবুল বরকত স্মৃতি সংঘের নামে। এ সম্পত্তির আয় থেকেই প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি পালন, বরকতের নামে অনুষ্ঠান করা এবং বরকতসংক্রান্ত কাজে ব্যয় করার কথা। কিন্তু বরকতের আত্মীয়স্বজনরা খোঁজখবর নেয় না। তাই প্রায় সব সম্পত্তিই দখলদারদের হাতে চলে গেছে। এরপর মিনিট দশেক খোঁজার পর শহীদ আবুল বরকত নামে একটি স্কুল ভবন পাওয়া গেল। বিদ্যালয়টির নাম ‘শহীদ আবু বরকত শিশু শিক্ষা’, স্থাপিত : ২০০৩, গ্রাম : বাবলা, পো. : তালিবপুর, জেলা : মুর্শিদাবাদ, সৌজন্যে : ভরতপুর ১নং পঞ্চায়েত সমিতি। আমরা বাংলাদেশ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাশহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালার জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে এসেছি শুনে প্রধান শিক্ষক খুব খুশি হলেন। তার অনুমতি নিয়ে ক্লাস পরিদর্শনে গেলাম। এখানেও ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের বসার কোনো বেঞ্চ নেই। সবাই মাটিতে বসেই শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। বাবলা গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম তালিবপুর হাই স্কুলের উদ্দেশ্যে। বাবলা থেকে তালিবপুর গাড়িতে প্রায় ২০ মিনিট। তালিবপুর হাই স্কুলে পৌঁছে টের পেলাম সেদিন শনিবার তাই স্কুল বন্ধ। কিছু ছবি তোলা ছাড়া আর কিছু করতে পারলাম না। এ নিয়ে যখন আলোচনা করছি তখন সামিন জানাল, সালার থানার পাশে শহীদ আবুল বরকতের স্মরণে একটি পার্ক তৈরি করা হয়েছে।
ফুলের টব ও উন্মুক্ত চত্বরে সাজানো পার্ক। আমরা কয়েকটি ছবি তুললাম। পার্কে ঢুকতেই গেটের সামনে ডানপাশে শহীদ বরকতের আবক্ষ মূর্তি। মূর্তির নিচে লেখা : ভাষা আন্দোলনের শহীদ, আবুল বরকত সাহেব, জন্ম ১৬ জুন ১৯২৭, মৃত্যু ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২।’ বেদির পাশেই ডানদিকে শ্বেতপাথরের ওপর খোদাই করে লেখা : ‘বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবুল বরকত সাহেবের স্মৃতি উদ্দেশ্য সালার শিশু উদ্যান-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করিলেন ড. রাজেশ কুমার আইপিএস মাননীয় পুলিশ সুপার মুর্শিদাবাদ ৮ই জুলাই ২০০০।’ সালার থানায় এবং অন্যান্য স্থানেও মানিক মিয়ার বেশ কদর। বরকতের ভাই হিসেবে সবাই তাকে শ্রদ্ধা করে।
দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা ২টা ছুঁই ছুঁই। এখনো আমাদের অনেক অনুসন্ধান বাকি। বরকতের আদি বাড়ি ও বহরমপুরে তার কলেজে যেতে হবে। চা-নাশতা সেরে আমরা মানিক মিয়াকে নিয়ে তার আদি বাড়ি ভরতপুর থানার কিসাতপুর গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিলাম। গাড়িতে মানিক মিয়ার সঙ্গে অনেক কথাই হলো। জানা গেল, বরকতের আদি গ্রাম কিসাতপুর। বাবলা তার মামার বাড়ি। তার বাবা শামসুজ্জামান ভোলা মিয়া বিয়ের পর বাবলায় চলে যায়। পরে কিসাতপুরের জায়গা-জমি বিক্রি করে বাবলায় জমি কিনে বাস শুরু করেন। পরে বরকত পড়ালেখার জন্য ঢাকায় তার মামার কাছে চলে যান। এখন বাবলা গ্রামে বরকতের পরিবারের কেউ থাকে না।
সামিন সালারে থেকে যায়। শুধু মানিক মিয়াকে নিয়ে আমরা চলে এসেছিলাম। অনেকটা পথ পেরিয়ে প্রায় দুপুর ৩টা নাগাদ আমরা কিসাতপুর হাজির হয়েছি। এ বাড়িতে মানিক মিয়া তার দুই ছেলে ও নাতি-নাতনিসহ থাকেন। মাটির দোতলা ঘর। বোঝা যাচ্ছে অসচ্ছল পরিবার। আমাদের যে ঘরে বসতে দিল তাতে একটা চৌকি, কাঠের আলনা ও ভাঙাচোরা একটা শোকেস। এখান থেকে বিদায় নিয়ে আমরা বহরমপুরের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজ। হোটেলে পৌঁছতে অন্ধকার হয়ে গেল। কাল সকালে অর্থাৎ ৪ ফেব্রুয়ারি কৃষ্ণনাথ কলেজে বরকতের স্মৃতিসন্ধান করব।
পরদিন সকাল ৮টার মধ্যে ড. দেবরাজ চক্রবর্তীসহ হাজির হলাম কৃষ্ণনাথ কলেজে। ভাগ্য খারাপ, রোববার থাকায় কলেজ ছুটি। গার্ডের তত্ত্বাবধানে কৃষ্ণনাথ কলেজ ঘুরে দেখলাম। মেইন গেটের পর বামদিকে খোলা আকাশের নিচে বরকতের ছোট আবক্ষ মূর্তি। সেখানে লেখা ‘বরকত আমাদের ছাত্র, আমাদের গর্ব আবুল বরকতের স্মরণে
মাতৃভাষার জন্য যারা শহীদ হয়েছেন তাঁদের সকলের প্রতি উৎসর্গ করা হল। ২১ শে ফেব্রুয়ারি ২০১১।’ বরকত এখান থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সিকিউরিটি গার্ড আমাদের একটা কক্ষ তালা খুলে দেখাল। কক্ষটি বরকতের নামে উৎসর্গ করা। ওই ভবনের নিচে একটা মাঝারি সাইজের অডিটরিয়াম। দরজার ওপরে ইংরেজি ও বাংলায় লেখা ‘শহীদ বরকত কক্ষ’। এরপর আমরা মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা দিলাম। একসময়ের সুবে বাংলার রাজধানী। পেছনে রেখে এলাম বরকতের সব স্মৃতি।
আমাদের মন খারাপ। বুকভরা আশা নিয়ে পরিবার-পরিজন, জন্মভূমি ছেড়ে বরকত ঢাকায় এসেছিলেন। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ উৎসর্গ করলেন। তার আত্মত্যাগে আমরা বাংলা ভাষার মর্যাদা পেয়েছি। কিন্তু তিনি তা দেখে যেতে পারেননি।
শহীদ বরকতের নামে বাংলাদেশেও রয়েছে বিভিন্ন স্মারক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাশহীদ আবুল বরকত জাদুঘর ও সংগ্রহশালা ২০১২ সালে স্থাপিত হয়েছে। গাজীপুরে বরকত ভবন নামে একটি বাড়ি আছে। গাজীপুরে রয়েছে শহীদ আবুল বরকত স্টেডিয়াম। ভাষা আন্দোলনে অবদানের স্বীকৃতস্বরূপ আবুল বরকতকে ২০০০ সালে একুশে পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত করা হয়েছে। যুগ যুগ ধরে বাঙালির হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন।
লেখক : আবু মো. দেলোয়ার হোসেন, সভাপতি, ইতিহাস বিভাগ ও পরিচালক, ভাষাশহীদ আবুল বরকত জাদুঘর ও সংগ্রহশালা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বোরহান উদ্দিন ভূঁইয়া, উপাধ্যক্ষ, ন্যাশনাল আইডিয়াল কলেজ, খিলগাঁও
রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন সুলতান মাহমুদ। ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে ধানমন্ডি এলাকায় ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন এ শিক্ষক। এখনো সেই ফ্ল্যাটের ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ হয়নি। সুলতানের ব্যবহৃত ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা দুটি। একটি বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক আর অন্যটি প্রাইম ব্যাংকের।
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সুবিধা জানতে চাইলেন তিনি জানান, ফ্ল্যাটের কিস্তি পরিশোধ, সন্তানদের বেতন আর ফ্যামিলি খরচ পরিশোধ সব মিলিয়ে প্রায় প্রতি মাসের শেষেই আর্থিক সংকট তৈরি হয়। এ সংকট থেকে বাঁচতেই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন। তবে মাসের শুরুতে বেতন পেয়েই পরিশোধ করে দিচ্ছেন ক্রেডিট কার্ডের বিল। এতে অতিরিক্ত সুদও গুনতে হচ্ছে না তাকে।
সুলতান মাহমুদ বলেন, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার না করলে হয়তো প্রতি মাসেই আমার বিভিন্নজনের কাছ থেকে ধার করে চলতে হতো। এতে সম্মানহানিরও ঝুঁকি থাকে। কিন্তু এখন ব্যাংক থেকে স্বল্প সময়ের জন্য ধার নিয়ে তা আবার ফেরত দিচ্ছি। এতে কারও কাছে হাত পাততে হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, একসময় মানুষ ক্রেডিট কার্ডের প্রতি কম আগ্রহী হলেও বর্তমানে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে দেশের ৩৯টি ব্যাংক কার্ড সেবা দিচ্ছে। গত মার্চ শেষে এসব ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৭৮ হাজারটি। ঠিক চার বছর আগে ২০১৯ সালে মার্চ শেষে এ কার্ডের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৪৯ হাজারটি। অর্থাৎ মাত্র চার বছরের ক্রেডিট কার্ড বেড়েছে ৮ লাখ ২৮ হাজার বা ৬১ দশমিক ৪২ শতাংশ। এই একই সময়ে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। গত মার্চে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের মার্চে এ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ১৪৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
শুধু সুলতানই নন, ব্যবসায়ী আমিরুল, সাংবাদিক আক্তার আর চাকরিজীবী তারিকুলও একই কারণে ব্যবহার করছেন দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ক্রেডিট কার্ড। তাদের মতে, ক্রেডিট কার্ডের কারণে সহজ হয়েছে তাদের জীবনযাত্রা। তবে উল্টো চিত্রও আছে। করোনা মহামারীর সময় চাকরি হারানো আজাদুল ইসলাম ক্রেডিট কার্ডে ধার নিয়ে এখন বিপাকে রয়েছেন। তিনি বলেন, করোনার সময় প্রথম দিকে আমাদের বেতন কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়। সে সময় সংসারের খরচ বহন করতে ক্রেডিট কার্ডের সহায়তা নিয়েছেন। যে ঋণ এখন পর্যন্ত টানতে হচ্ছে তাকে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ হবে বলে আশাবাদী এ গ্রাহক।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ক্রেডিট কার্ড জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে এর ‘ধার’ নেওয়ার পদ্ধতির জন্য। পাশাপাশি পণ্যের দামে ডিসকাউন্টের পাশাপাশি কিস্তিতে পরিশোধের পদ্ধতিও এ ব্যাপ্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। যেটি গ্রাহককে এককালীন বেশি দামের পণ্য কিনতে সহায়তা করে। এবার জেনে নেওয়া যাক ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা-অসুবিধাগুলো।
পণ্য কিনতে কিস্তি সুবিধা : ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কিস্তিতে পণ্য কিনতে একসঙ্গে সব টাকা পরিশোধ করতে হবে না। বিনা সুদে বা নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদে গ্রাহক কয়েক মাসের সমান কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করতে পারবেন। যদিও গ্রাহক তার ক্রেডিট লিমিটের চেয়ে বেশি দামি পণ্য কিনতে পারবেন না। আর কিস্তির টাকাও পরিশোধ করতে হবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। এতে কারও কাছে টাকা ধার করার ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তবে পরিশোধের ক্ষেত্রে সময়সীমা পার হয়ে গেলে জরিমানা গুনতে হতে পারে।
ঋণের সুবিধা : কিছু ক্রেডিট কার্ড, বিশেষ করে বিদেশে শূন্য শতাংশ সুদে ঋণ দেয়। এসব ক্ষেত্রে মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্য পরিশোধ করতে হয়, যা বেশ সুবিধাজনক। আবার কোনো কোনো কার্ডে ঋণে সুদের হার অনেক থাকে। এ ক্ষেত্রেও একটা সুবিধা আছে। বোঝা এড়াতে দ্রুত ঋণ পরিশোধ করা হয়। নিজস্ব ঋণ থাকে না।
পরিবর্তনযোগ্য : এসব ক্ষেত্রে সঠিক কার্ডটি বেছে নিতে পারা জরুরি। একটি ভুল কার্ড দিনের পর দিন ব্যবহার করলে ঋণের বোঝা শুধু বাড়তেই থাকবে। তবে এটা বুঝতে ব্যাংকের পুরো শর্তাবলি মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। যদিও কার্ডের ধরন পরিবর্তন করা যায় খুব সহজে। কারণ প্রতিটি ব্যাংকে বিভিন্ন প্রকারের ক্রেডিট থাকে। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী কার্ড যেমন নিতে পারবেন তেমনি পরবর্তী সময়ে সেটির ধরন পরিবর্তনও করতে পারবেন। আবার নির্দিষ্ট পরিমাণ লেনদেন করলে বাৎসরিক ফি এড়ানো যায়। যেমন অনেক ব্যাংকের কার্ডে অন্তত ১৮ বার কেনাকাটা করলে বাৎসরিক ফি দিতে হয় না। ব্যাংকভেদে এ নিয়মের ভিন্নতা রয়েছে। দেশের বাইরেও ব্যবহার করা যায় : ক্রেডিট কার্ড ইন্টারন্যাশনাল হলে সেটি ব্যবহার করা যাবে বিশ্বের অনেক দেশেই। টাকার পাশাপাশি ডলারও ধার করে ব্যবহার করা যায়। হোটেল বুকিং, বিমানভাড়া, রেস্টুরেন্ট ও কেনাকাটায় মেলে নানা ছাড় ও পয়েন্ট জেতার সুযোগ। বিদেশে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে যা খরচ করবেন, মাস শেষে আপনার সেই পরিমাণ বিল হিসেবে ইস্যু করবে ব্যাংক। তারপর সুদ বা জরিমানা এড়াতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই বিল পরিশোধ করতে হবে।
অফারের ছড়াছড়ি
বিভিন্ন সময়ে ক্রেডিট কার্ডে বিভিন্ন অফার দেওয়া হয়। যেমন ‘ক্যাশ ব্যাক অফার’, ‘স্পেশাল ডিসকাউন্ট’। দেশের বাইরে বেড়াতে গেলে, হোটেলে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারে অনেক সময়ই মূল্যছাড় দেওয়া হয়। প্লেনের টিকিট কাটতেও অনেক সময় পাওয়া যায় বিশেষ মূল্যছাড়। আর অনলাইন কেনাকাটার জন্যও এখন ক্রেডিট কার্ড বেশ জনপ্রিয়। বিভিন্ন সময়ে দেখা যায়, নামিদামি হোটেল ও রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়ায় ছাড় এবং অফার দিয়ে থাকে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। আবাসিক হোটেলগুলোও ক্রেডিট কার্ডে বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে থাকে। একটি কিনলে একটি ফ্রি (বাই ওয়ান গেট ওয়ান) অফারও দেওয়া হয়। এ ছাড়া রয়েছে মূল্যছাড়সহ নানা অফার। অনেকেই পরিবার নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে ঘুরতে যান। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও হোটেলের নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে হোটেল বুক করা যায়। এ ক্ষেত্রেও আপনি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে পারেন। তবে বিদেশে হোটেল বুকিংয়ের টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে ডুয়েল কারেন্সি ক্রেডিট কার্ড প্রয়োজন হবে।
অসুবিধা
ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা যেমন রয়েছে, তেমনি অসুবিধাও কম নয়। এজন্য বেশ সতর্ক হতে হবে গ্রাহককে। একটু বেখেয়ালি হলেই পড়তে পারেন ঋণের ফাঁদে।
ঋণের ফাঁদ
ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার সবসময়ই একটি ঋণ নেওয়ার মাধ্যম। মনে রাখতে হবে অর্থ খরচের ৪৫ দিনের মধ্যে সেটি পরিশোধ করতেই হবে। অন্যথায় ঋণের ওপর সুদ শুরু হবে। যা ঋণের পরিমাণ প্রতিদিন বাড়িয়ে দেবে। তাই কিছুটা ঝুঁকি থেকেই যায়।
লুক্কায়িত ব্যয়
সুদের হার পরিশোধই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের একমাত্র ব্যয় নয়। সময়মতো মাসিক বিল পরিশোধ না করলে গ্রাহককে জরিমানা গুনতে হতে পারে। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে নগদ অর্থ তুলতে এর জন্য নির্দিষ্ট হারে ফি দিতে হতে পারে। সরাসরি বুথ থেকে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে নগদ অর্থ উত্তোলন করতে গেলে বাড়তি ফি এবং ওইদিন থেকেই (এ ক্ষেত্রে ৪৫ দিন সময় দেওয়া হয় না) সুদ গণনা শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে চেক দিয়ে টাকা সঞ্চয় হিসেবে স্থানান্তর করে তারপর সেটি নগদায়ন করলে ৪৫ দিন সময় পাওয়া যাবে।
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলতে নেমে হিটস্ট্রোকে মাঠেই রিয়া আক্তার (১০) নামের এক ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার দুপুরে উপজেলার সহদেবপুর ইউনিয়নের দ্বীমুখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
এদিকে মঙ্গলবারের (৩০ মে) খেলায় সদর উপজেলার এক ছাত্রী মাঠে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
নিহত রিয়া আক্তার কালিহাতীর ছুনুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী এবং একই গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে।
ছুনুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের সঙ্গে দ্বীমুখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলা ছিল। রিয়া মাঠে খেলতে নেমে হঠাৎ মাটিতে পড়ে যায়। পরে তাকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোঘণা করেন।
প্রধান শিক্ষক বলেন, মরদেহ সোমবারই দাফন করা হয়েছে। আমরা রিয়ার বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা প্রকাশ করছি।
টাঙ্গাইল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রচণ্ড গরমে খেলতে গিয়ে মেয়েটি মারা গেছে। মঙ্গলবারের খেলায় সদর উপজেলার একটি মেয়ে মাঠে বমি করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টটি আগামী ১২ জুনের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে।
প্রচণ্ড রোদে ছাত্রীদের খেলতে অসুবিধার বিষয়টি আমরা ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাকে অবগত করেছি।
রিয়া আক্তারকে খেলতে নামতে বাধ্য করা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি অস্বীকার করেছেন।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সুজা উদ্দিন তালুকদার বলেন, এখনকার বাচ্চারা রোদের মধ্যে এ ধরনের খেলায় অভ্যস্ত নয়। প্রচণ্ড রোদে হঠাৎ করে মাঠে খেলতে নামলে তাদের জীবন ঝুঁকি থাকে। রোদের তাপে অতিরিক্ত ঘাম, ডিহাইড্রেশন এমনকি হিটস্ট্রোকে তাৎক্ষণিক মৃত্যু হতে পারে। তাই রোদের মধ্যে এভাবে বাচ্চাদের দিয়ে খেলানো উচিত নয়। বিষয়টি নীতি নির্ধারকদের বিবেচনা করা দরকার।
মহামারী করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্বের প্রায় সব দেশই অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে জনসাধারণকে কিছুটা স্বস্তি দিতে ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়াসহ নীতিনির্ধারণী নানা ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে। বাংলাদেশও এমন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। বিদেশি মুদ্রার সংকটসহ মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে ধার নেওয়া ছাড়াও আমদানি ব্যয় কমিয়ে আনার পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এখনো এর সুফল মেলেনি। এমন সংকটের মধ্যেই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বাজেট উপস্থাপন হতে যাচ্ছে।
এবারের বাজেট সব দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সামনে নির্বাচন, অন্যদিকে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক চাপে চিড়েচেপ্টা দেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দাম, আইএমএফের শর্তের জাল নানান বাস্তবতার মধ্যে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য বরাদ্দ করা অর্থ পুরোপুরি খরচ করতে না পারার শঙ্কার মধ্যেই আরও বড় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১ লাখ ১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা বেশি। যদিও অর্থনীতিবিদরা এ বাজেটকে বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন।
এবারের বাজেটের স্লোগান ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। এটি মুস্তফা কামালের দায়িত্বকালে পঞ্চম, আওয়ামী লীগ সরকারের ২৩তম ও বাংলাদেশের ৫২তম বাজেট। ১ জুন সংসদে বাজেট প্রস্তাব পেশ করার কথা রয়েছে অর্থমন্ত্রীর। আজ বুধবার থেকে বাজেট অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে।
দেশের অর্থনীতি যখন চাপের মুখে, তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে ঋণ চেয়েছিল বাংলাদেশ। নানান চড়াই-উতরাই শেষে গত ৩০ জানুয়ারি ৪৭ কোটি ডলার ছাড়ও করে ঋণদাতা সংস্থাটি। কিন্তু ঋণ দেওয়ার আগে নানান শর্ত জুড়ে দেয় তারা। এর মধ্যে ‘দুর্বল’ এনবিআরকে সবল করার বিশেষ শর্ত ছিল। জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের কর আদায়ের হার ৯ শতাংশের মধ্যে। ৩৮টি শর্তের মধ্যে কর আদায় বাড়ানোর অন্যতম শর্ত ছিল তাদের। এবারের বাজেটেও কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই কর আদায়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আদতে কতটুকু বাস্তবসম্মত তা নিয়েও সন্দিহান তারা।
বাজেটের আয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজস্ব থেকে আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ কোটি টাকা। বৈদেশিক অনুদানসহ এর আকার দাঁড়াবে ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। রাজস্ব বোর্ডের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রতি বছরের মতো এবারও বাড়ছে। এবারের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।
এনবিআরবহির্র্ভূত কর ২০ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কর ব্যতীত অন্য আয় হবে ৫০ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক অনুদানের লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজেটের যে লক্ষ্যমাত্রার হিসাব ধারা হয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয়। গত বছরের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল সেটি থেকে বাড়িয়ে তারা বাজেট ধরছে। তবে আমি মনে করি, বাজেটে পাস হওয়ার পর তা কতটুকু কার্যকর হয়েছে সেই হিসাবে লক্ষ্যমাত্রা হওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রার কতটা আদায় হয়েছে তা বিবেচনা করে নতুন করে বেশি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়। সম্পদ আছে মনে করে যদি ব্যয় কাঠামো তৈরি করা হয়, তাহলে যে অর্থ নেই তাকে ব্যয় মনে করে দেখানো হবে। তার মানে হলো, সম্পদ না থাকলে ব্যয়ও হবে না।’
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘এই মুহূর্তে লোক দেখানোর মতো একটা হিসাব দেখা যায়। আয়ও হবে না, ব্যয়ও হবে না। আমার ভাষায় এটি পরাবাস্তব বাজেট।’
ব্যয়ের খাত : অন্যান্য বারের মতো এবারও আয়ের তুলনায় ব্যয়ের খাত বেশি হচ্ছে। এবারের ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। বাজেটে পরিচালন ব্যয় অর্থাৎ আবর্তক ব্যয়, মূলধন ব্যয়, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ও বৈদেশিক ঋণের সুদসহ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। তাছাড়া এবারের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের (এডিপি) ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এডিপিবহির্ভূত বিশেষ প্রকল্পগুলোর ব্যয় ৭ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় অনুদানসহ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।
ঘাটতি মেটানো হবে যেভাবে : বাজেটের ঘাটতি মেটানো হবে মূলত অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে। এবারের বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা প্রথমবারের মতো ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিদেশিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে ঋণ আনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।
অভ্যন্তরীণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের ভরসা এবারও ব্যাংক খাত। বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই নেওয়া হবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকার ঋণ। ব্যাংক থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেবে ৮৬ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেবে ৪৫ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা।
তাছাড়া ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও এবারের বাজেটে ব্যাংকবহির্ভূত ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। এবারের ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে সরকার ঋণ নেবে ২৩ হাজার কোটি টাকা। গত বছরও এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। এবারের সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ নেবে ১৮ হাজার কোটি টাকা, আগের অর্থবছরে যা ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা।
জিডিপি : আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটে সংশোধিত জিডিপির চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির আকার ৪৪ লাখ ৩৯ কোটি ২৭৩ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ আর ভোক্তা মূল্যসূচক বা মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতিতে জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আগামী অর্থবছরের বাজেট সরকারের জন্য সব দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইএমএফের যে ৩৮টি শর্ত রয়েছে, অর্ধেকের বেশিই বাস্তবায়ন করতে হবে এ অর্থবছরে। সরকারকে বেঁধে দেওয়া শর্তগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রিজার্ভের যথাযথ গণনা পদ্ধতি প্রণয়ন, প্রতি তিন মাস অন্তর জিডিপির হার নির্ধারণ, সুদের হারে করিডোর পদ্ধতি তৈরি, মুদ্রা বিনিময় হারের একটি দর রাখাসহ কয়েকটি শর্ত পূরণের দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলোর কিছু বাস্তবায়নের ঘোষণা আসবে আগামী জুন মাসে মুদ্রানীতি ঘোষণার সময়, কিছু আসবে জুলাইয়ে। আইএমএফের চাওয়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ।
আকাশযাত্রা নিরাপদ ও শান্তিময় করাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কেবিন ক্রুদের একমাত্র ব্রত। ফ্লাইট ছাড়ার পর মধ্য আকাশে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে যিনি স্মিত হেসে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেন, স্যার আপনার সিট বেল্ট বাঁধতে হবে। এর কিছুক্ষণ পর আরেকজন এসে বলবেন, চা কফি, কিংবা অন্য কিছু? এরপর যারা খাবার দেবেন, আবার সুনিপুণভাবে সেগুলো গুছিয়ে নিয়ে যাবেন, আপনার ঘুম পাড়ানোর জন্য পরিবেশ নিশ্চিত করবেন, সেটাই কেবিন ক্রুদের পেশা।
তারাই কেবিন ক্রু। যারা উড্ডয়ন থেকে অবতরণ পর্যন্ত সময়টুকু সার্বক্ষণিক সেবা শুশ্রূষা নিশ্চিত করেন। ছোটখাটো অসুখ-বিসুখ করলে কিংবা ঘরে অসুস্থ স্বজন রেখে আসলেও আপনার সামনে হাসিমুখে দাঁড়াতে হয়। এটাই তাদের মূল দায়িত্ব। বিশ্বব্যাপী এটাকে বলা হয় ‘গ্লামার জব ইন দ্য স্কাই‘।
আজ ৩১ মে আন্তর্জাতিক কেবিন ক্রু দিবস। কানাডা ইউনিয়নের উদ্যোগে ২০১৫ সালে বিশ্বে প্রথম কেবিন ক্রু দিবস পালন করা হয়। প্রথম ৪৮০ জন কেবিন ক্রু নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি উদযাপন করা হয়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স একমাত্র রাষ্ট্রীয় বিমান সেবা প্রতিষ্ঠান- যেখানে কাজ করছেন এক ঝাঁক অভিজ্ঞ ও নবীন কেবিন ক্রু। যারা পরিবার আত্মীস্বজনকে দূরে রেখে বিভিন্ন উৎসব, ছুটি ও বিশেষ দিনেও নিজেদের আনন্দকে বিসর্জন দিয়ে সাধারণ কর্মঘণ্টার বিপরীতে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই যাত্রীসেবা নিশ্চিত করে যাচ্ছেন।
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী উড়োজাহাজ নিয়ে দেশ বিদেশে বিভিন্ন গন্তব্যে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সাহসিকতার স্বাক্ষর রাখছেন প্রতিনিয়ত। অতীতে বিমানের দেশে ও দেশের বাইরে জরুরি অবতরণে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ক্রুদের প্রচেষ্টায় সকল যাত্রীদের নিরাপদে রাখা সম্ভব হয়েছে।
সম্প্রতি বিমান ছিনতাই ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধেও বিমান কেবিন ক্রুরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়া অসুস্থ যাত্রীদের বিশেষ সেবা প্রদান, আকাশপথে প্রসূতি যাত্রীদের সন্তান প্রসবে সহযোগিতা ও গুরুতর আহত যাত্রীদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতার স্বাক্ষর তারা রেখেছেন। আকাশপথে কেবিন ক্রুদের নিবিড় সেবায় অসংখ্যা অসুস্থ যাত্রী সুস্থতার সঙ্গে তাদের গন্তব্যে অবতরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য কেবিন ক্রু একটি অনন্য সাধারণ পেশা হিসেবে পরিচিত।
দিবসটি উপলক্ষে আজ সীমিত পরিসরে বিশেষ আয়োজন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কেবিন ক্রু অ্যাসোসিয়েন। এবার হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকায় তারা সীমিত করেছে সব কর্মসূচি। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ গোলাম দস্তগীর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের সমস্ত কেবিন ক্রুকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, এ উপলক্ষে আজ বুধবার কেবিন ক্রু অ্যাসোসিয়েশন অফিসে একটি কেক কেটে সব সদস্যকে শুভ্চ্ছো জানানো হবে। দিবসটিতে তাৎপর্য নিয়ে মতবিনিময় ও সবার কুশলাদি বিনিময় করে করোনার মাঝেও এই কঠিন দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে সবাইকে ব্রতী হওয়ার আহ্বান জানানো হবে। পেশা আকর্ষণীয় ও সম্মানজনক হিসেবে বিবেচিত।
সুশিক্ষিত ও আলট্রা মডার্ন তরুণ-তরুণীদের পছন্দের শীর্ষে থাকা এই পেশার প্রতি সাধারণ মানুষের কৌতূহলও লক্ষ্যণীয়। বিমানে কেবিন ক্রুদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে দস্তগীর বলেন, বিশ্বব্যাপী এটা অবশ্যই মর্যাদাসম্পন্ন পেশা। বিমান সেই মর্যাদা সমুন্নত রেখেছে। এখন আমাদের দাবি ২০১৮ সালের এডমিন অর্ডার অনুযায়ী আমাদের সকল সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি প্রদান করা হোক।
কেবিন ক্রুদের পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে গোলাম দস্তগীর জানান, কেবিন ক্রুদের দুইভাবে চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত ফেস অব দ্য এয়ারলাইন হিসেবে। কারণ কেবিন ক্রুদের আচরণ ও পেশাদারিত্বই এয়ারলাইনসগুলোর যাত্রী ধরে রাখা এবং নতুন যাত্রীদের আকৃষ্ট করা। দ্বিতীয়ত, লাস্ট লাইন অব দ্য ডিফেন্স হিসেবে। কারণ আকাশে উড্ডয়নের পরে যে কোনো জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য কেবিন ক্রু ছাড়া আর কোনো সিকিউরিটি পার্সোনাল থাকেন না। সমগ্র পৃথিবীতে ঝুঁকিপূর্ণ যেসব পেশা রয়েছে তন্মধ্যে কেবিন ক্রু অন্যতম। বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ক্রুরা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪৩ হাজার ফুট উচ্চতায় স্বল্প সুবিধা সংবলিত পরিবেশে কেবিন ক্রুরা তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
একজন ভ্রমণকারীর ভ্রমণকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিরাপদ করে তোলাই কেবিন ক্রুদের মূল কর্তব্য। প্রতিটি সফল উড্ডয়ন ও অবতরণ একজন কেবিন ক্রুকে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবীতে ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়িক ভ্রমণ, রাজনৈতিক ভ্রমণ, চিকিৎসার জন্য ভ্রমণ, আনন্দ ভ্রমণ ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে আকাশযাত্রা বেড়েই চলেছে। শিশু থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ সবাই থাকেন কেবিন ক্রুদের ভ্রমণসঙ্গী। কেবিন ক্রুদের বলা হয়, ফার্স্ট রেসপনডার।
দস্তগীর বলেন, কেবিন ক্রুদের হার্টঅ্যাটাক, হাইপোক্সিয়া, হাইপারভেন্টিলেশন, হাইপোগ্লাসেমিয়া, হাইপারগ্লোসিমায়, চকিং, নোজ ব্লিডিং এবং প্রেগন্যান্ট ডেলিভারির দায়িত্বও পালন করতে হয় অনেক ক্ষেত্রে। পেশাদারিত্বের এই দক্ষতায় সত্যিকার অর্থেই আকাশ হয়ে উঠুক শান্তির নীড়। বিমান আকাশে ওড়ার একঘণ্টা আগে ক্যাপ্টেন কেবিন ক্রুদের আবহাওয়া ও অন্যান্য বিষয় সংক্রান্ত তথ্য জানিয়ে দেয়।
এছাড়া পরিচ্ছন্নতা, সি পকেট সংক্রান্ত তথ্য, খাবার-দাবারের সরঞ্জাম পৌঁছানো, জরুরি ইক্যুইপমেন্ট, ফার্স্ট এইড প্রভৃতি ঠিকঠাক আছে কিনা এসব কেবিন ক্রুদের দেখে নিতে হয়।
বিমানে ওঠার পর যাত্রীদের টিকিট মিলিয়ে দেখা, কেবিন লাগেজ সিটে পৌঁছাতে সহায়তা করা, যাত্রীদের সিট দেখিয়ে দেওয়া এবং বিমান আকাশে ওড়ার আগে যাত্রীদের সিট বেল্ট লাগাতে বলাও কেবিন ক্রুদের কাজের পর্যায়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, বিমান ওঠানামা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় পাইলটের হয় কেবিন ক্রুদের বলতে হয়। এই পেশার যে লাইফ স্টাইল এবং রোমাঞ্চকর অনুভূতি।
দুই দশকেরও বেশি ক্যারিয়ারে অসংখ্য নাটক-টেলিছবি নির্মাণ করেছেন শিহাব শাহীন, উপহার দিয়েছেন হিট প্রোডাকশন। নিজেকে শুধু রোমান্টিক জনরায় আটকে না রেখে কাজ করেছেন বহুমাত্রিক ঘরানায়। নিজেকে প্রমাণ করেছেন সব্যসাচী নির্মাতা হিসেবে। নিজেকে শুধু টেলিভিশনেই আটকে রাখেননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও পাল্টেছেন প্লাটফর্ম এবং সেখানেও দেখিয়েছেন নিজের মুন্সিয়ানা।
সর্বশেষ গেল ঈদে তুমুল সাড়া ফেলেছে তার নির্মিত স্পিন অফ সিরিজ ‘মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন’। সাফল্যের পর কিছুদিন আগেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এর সাকসেস পার্টি যেখানে উপস্থিত ছিলেন টিমের কলাকুশলী থেকে শুরু করে অন্যান্য নির্মাতা ও শিল্পীরা। সেই ধারাবাহিকতায় এবার তিনি নিয়ে আসছেন সিরিজটির সিক্যুয়াল। শুধু তাই নয়, একসঙ্গে একাধিক সিরিজ ও ফিল্ম নিয়ে আসছেন জনপ্রিয় নির্মাতা।
শিহাব শাহীন বলেন, ‘মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন’ নিয়ে এতটা প্রত্যাশা ছিল না কিন্তু সে সাড়া পেয়েছি তা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। দর্শকরাই কাজটিকে গ্রহণ করেছেন আর তাই এখন এর সিক্যুয়াল নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছি। স্পিন অফে দেখিয়েছি অ্যালেন স্বপনের পেছনের গল্প। সিন্ডিকেটে তাকে আমরা দেখিয়েছিলাম ২০২২ সালে, সে ঢাকায় আসার পর এর মাঝের সময়টার গল্পই থাকবে সিক্যুয়ালে। যেটার সংযোগ থাকতে পারে ‘সিন্ডিকেট ২’-তে। ঈদের পরপর এটার শুট করার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সিক্যুয়াল ছাড়াও আরও বেশ কিছু সিরিজ ও ফিল্ম নিয়ে সবকিছু চূড়ান্ত হয়েছে বলেও জানান এ নির্মাতা। তিনি বলেন, মোস্তফা সরয়ার ফারুকির তত্ত্বাবধানে ওটিটি প্লাটফর্ম চরকির ‘মিনিস্ট্রি অফ লাভ’ সিরিজের একটা কনটেন্ট করবো। এখনও কাস্টিং চূড়ান্ত হয়নি। এছাড়া হইচইয়ের একটি সিরিজ ও একটি ফিল্ম করা হবে। নাম চূড়ান্ত হয়নি। তবে দুটোতেই জিয়াউল ফারুক অপূর্ব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাঝে শোনা গিয়েছিল, আফরান নিশোকে নিয়ে ‘সিন্ডিকেট ২’ নাকি হবে না, এটা কতটুকু সত্য? এমন প্রশ্নে শিহাব শাহীন বলেন, এটা ভূয়া তথ্য। ডিসেম্বরের শেষ দিকে ‘সিন্ডিকেট ২’ করবো তার আগে সেপ্টেম্বরে শুরু করবো ‘রসু খাঁ’।
জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমাচ্ছেন শিহাব শাহীন। দেশে ফিরবেন মাসের শেষ নাগাদ এরপর কাজে নামবেন।
গাজীপুরের দ্বিধা-বিভক্ত রাজনীতি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই দফায় আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খানকে ভোটে পরাজিত করে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্যাগী, দক্ষ, মেধাবী ও ভাবমূর্তি সম্পন্ন আজমত উল্লাকে বরং আরও ওপরে রাখতে চেষ্টা করছেন। দলীয় সভাপতি টের পেয়েছেন মেয়র প্রার্থী আজমত হারেননি, তাকে গাজীপুরের দলীয় রাজনীতিতে জোর করে হারানো হয়েছে।
গতকাল রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরাজিত মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লাকে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে ডেকে পাঠান। আজমতের সঙ্গে গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন চক্রান্তের ব্যাপারগুলো শেখ হাসিনা জানেন এবং জানান। গণভবনে পরাজিত প্রার্থী আজমতকে বোঝান পরাজয়ের কারণ আমরাই। বিএনপি-জামায়াত তাদের প্রার্থী দেয়নি গাজীপুরের সিটি ভোটে। তারা নৌকা হারাতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে জাহাঙ্গীর আলম। এর সঙ্গে দলেরও কেউ কেউ রসদ জুগিয়েছে। এতে রাজনীতি শেষ হয়ে গেছে এমন নয়।
গণভবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজমত উল্লা খানকে ঢাকা-১৭ আসনে উপনির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। ওই আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আকবর হোসেন পাঠান (নায়ক ফারুক) গত ১৫ মে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় ওই শূন্য আসনে আজমতকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে।
এই নিয়ে ঘনিষ্ঠ অনেকের কাছে জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ভিন্ন কোনো জটিলতার সৃষ্টি হলে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে গাজীপুরের যেকোনো আসন থেকে মনোনয়ন পাবেন তিনি। সে ক্ষেত্রে গাজীপুর সিটির ভোটে যে সংসদ সদস্য দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করার তথ্য মিলবে তাকেই বাদ দেওয়া হবে। এ সিটি ভোটে হারের কারণ জানতে প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব একটি সংস্থাকে নির্ভুল তথ্য দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
নির্বাচনকালীন সরকারে মন্ত্রীর দায়িত্বও পেতে পারেন আজমত, ওই সূত্র দাবি করে। সূত্রটি আরও জানায়, প্রধানমন্ত্রী যার ওপর ক্ষুব্ধ হন তার যেমন শাস্তি দেন যার ওপর সন্তুষ্ট ও যিনি ধৈর্য ধারণ করেন তাকে একই সঙ্গে সব দেন। গত ১৫ বছরে বহুজন এর উদাহরণ। গাজীপুরে মেয়র পদে আজমতকে হারা বা হারানোয়, প্রধানমন্ত্রী ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা জাহাঙ্গীরের ভোটকে ঘিরে যে নাটকীয় আচরণ করেছেন সে সম্পর্কে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। গাজীপুরের আওয়ামী লীগের রাজনীতি আজমতকে নিয়ে যে খেলাধুলায় মেতেছে সে আজমতকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ভাবছেন আরও ওপরে।
প্রয়াত সংসদ সদস্য নায়ক ফারুক গাজীপুরের কালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। যদিও ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। আজমতও টঙ্গী কালিগঞ্জের। তা ছাড়া ঢাকা লাগোয়া এই জেলার বাসিন্দা আজমত। গাজীপুরের অনেক মানুষ ওই আসনে বসবাসও করেন। এসব মিলিয়ে আজমত প্রায়োরিটি পেতে যাচ্ছেন ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে।
আজমতের বিভিন্ন ঘনিষ্ঠজনেরা এসব তথ্য দিলেও আজমত উল্লা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব ব্যাপারে তার কোনো কিছুই জানা নেই। চিন্তাও করেন না তিনি।
নানা অব্যবস্থাপনায় এগোচ্ছে না প্রাথমিক শিক্ষা। প্রায় শতভাগ শিশু ভর্তির আওতায় এসেছে অনেক আগে। এরপর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতের কাজ অনেকটাই আটকে আছে। খোদ সরকারি সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে প্রাথমিকে চরম দুরবস্থার কথা। গবেষয়ণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাক্সিক্ষত মানের চেয়ে শিশুরা অনেক পিছিয়ে আছে। কিছু শিক্ষক এবং মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা স্বউদ্যোগে কিছু কাজ করার চেষ্টা করলেও কথায় কথায় তাদের ওপর নেমে আসছে শাস্তির খড়গ। মানের উন্নয়ন না হলেও ঠিকই অধিদপ্তরে বসে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন কর্মকর্তারা।
প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় সম্প্রতি এই গবেষণা করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। সেখানে দেখা যায়, করোনা সংক্রমণের আগে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গড়ে ইংরেজি বিষয়ে যতটা শিখত, করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে তা সাড়ে ১২ শতাংশ কমে গেছে। একই শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে শিখন অর্জনের হার কমেছে প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ। আর তৃতীয় শ্রেণির বাংলায় কমেছে ১৫ শতাংশের মতো।
গবেষণার তথ্য বলছে, করোনার আগে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে শিখন অর্জনের গড় হার ছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ। করোনাকালে বন্ধের প্রভাবে এই হার কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশ। একই শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ^পরিচয় বিষয়ে শিখন অর্জনের গড় হার ৫১ শতাংশের বেশি, যা আগে ছিল ৬৮ শতাংশের মতো। পঞ্চম শ্রেণির বাংলা, গণিত ও বিজ্ঞানেও ক্ষতি বেড়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষার ঘাটতি পূরণে এ ধরনের গবেষণার দরকার ছিল। আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রেখেই তা করা হয়েছে। আমরা এই গবেষণা প্রতিবেদন দু-এক দিনের মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। আমরা অন্তত এক বছরের জন্য রেমিডিয়াল ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছি। মন্ত্রণালয় সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষা দিন দিন পিছিয়ে পড়লেও সেদিকে তেমন একটা নজর নেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের। তারা ব্যস্ত আছে লাখ লাখ শিক্ষক এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়ন নিয়ে। কেউ কথা বললেই তার ওপর নেমে আসছে শাস্তি। ফলে শিক্ষকরাও দিন দিন তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন; কোনো রকমে দিন পার করছেন।
জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষায় উদ্ভাবনী ও অনন্য অবদানের জন্য ২০১৯ সালে সারা দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন রাজবাড়ী জেলার স্বাবলম্বী ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম। একই বছর রাজধানীর মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক খায়রুন নাহার লিপি শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষিক নির্বাচিত হন। সাধারণত আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী এসব শিক্ষকের হাতে পদক তুলে দেন। শিক্ষকদের পাশাপাশি সেরা শিক্ষার্থীদের পদক দেওয়া হয় একই অনুষ্ঠানে। কিন্তু করোনাকালে তাদের হাতে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষক পদক তুলে দেওয়া যায়নি। গত ১২ মার্চ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে তাদের হাতে এ পদক তুলে দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। তাই অনুষ্ঠানের কয়েক দিন আগে স্বাভাবিকভাবে তারা দাবি তুলেছিলেন, দেরি হলেও প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তারা পদক নেবেন; যা তাদের সারা জীবনের স্বপ্ন পূরণ করবে। কিন্তু সেটা না হওয়ায় তারা প্রতিমন্ত্রীর হাত থেকে ঠিকই পদক নেন। তবে এর ৬৮ দিনের মাথায় এই শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পদক নেওয়ার দাবি তোলায় চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। একই ঘটনায় জয়পুরহাটের হিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মাহবুবুর রহমানকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কারণ তার বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী এ পদক নিতে ১১ মার্চ ঢাকা এসেছিল। ওই শিক্ষকও প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পদক নেওয়ার দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও তাদের কাউকে শোকজ করা হয়নি; যা বিধিবহির্ভূত বলছেন শিক্ষকরা।
জানতে চাইলে ঢাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আবদুল আজিজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাময়িক বরখাস্তের পরবর্তী যে প্রক্রিয়া আছে, সেদিকেই আমরা যাব।’ এর বেশি কিছু তিনি বলতে রাজি হননি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াতের সঙ্গে এসব ব্যাপারে কথা বলার জন্য গতকাল একাধিকবার চেষ্টা করলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদের সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক নেওয়া একজন শিক্ষকের জীবনে সেরা প্রাপ্তি। এ জন্য শিক্ষকদের দাবি থাকতেই পারে, প্রত্যাশা থাকতেই পারে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না। শিক্ষকদের যেভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, তা মোটেও ঠিক হয়নি বলে আমার মনে হয়। এর প্রভাব অন্যান্য শিক্ষকের মধ্যেও পড়বে, এটাই স্বাভাবিক।’
শুধু তা-ই নয়, করোনাকালে বন্ধ থাকা প্রাথমিক শিক্ষা চালু রাখতে কিছু শিক্ষক ও মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা স্বউদ্যোগে কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেন; যাতে অনলাইন ক্লাস, শিক্ষকদের মধ্যে আলোচনাসহ নানা কাজ করা হয়। এতে প্রতিটি ফেসবুক গ্রুপে লাখ থেকে হাজারো শিক্ষক যুক্ত হয়েছেন। এখনো সেসব গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু সেই গ্রুপগুলোকেই এখন শায়েস্তা করার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের অজুহাত দেখিয়ে অনলাইনে যুক্ত থাকা অনেক শিক্ষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাকেই দেওয়া হচ্ছে কারণ দর্শানো নোটিস (শোকজ)। সরকার যেখানে শিক্ষকদের ডিজিটালি আপডেট হওয়ার কথা বলছে, সেখানে প্রায় অনেকটাই উল্টো পথে হাঁটছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
শিক্ষকরা জানান, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে আসন গেড়ে বসেছেন কিছু কর্মকর্তা। অনেকেই ৬ থেকে ১২ বছর ধরে একই দপ্তরে চাকরি করছেন। তাদের যে দায়িত্বই থাক না কেন যত লাভজনক কাজ আছে, সেগুলোতেই তারা হাত দিচ্ছেন। যোগ্য কর্মকর্তাকে অধিদপ্তরে আনলে তাদের সরে যেতে হবে, এ জন্য তারা নানাভাবে ঊর্ধ্বতনদের ভুল বুঝিয়ে মাঠপর্যায়ে শাস্তি দিয়ে সবাইকে ভীত করে তুলছেন। এতে পিছিয়ে পড়ছে প্রাথমিক শিক্ষার মান।
প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর গত মার্চ-এপ্রিলে অনলাইনে প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলি করা হয়। যদিও নিয়ম ছিল, অনলাইনে নির্দিষ্ট মানদন্ড পূরণ ছাড়া কেউ বদলি হতে পারবেন না। কিন্তু তা মানেনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে নিয়ম ভেঙে কয়েক শো শিক্ষকের বদলির আদেশ জারি করা হয়। আর এই বদলি-পদায়নে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে দাবি শিক্ষকদের; যা ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে। আবার অনেক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও থানা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বদলিতেও সমন্বয়হীনতা দেখা দিচ্ছে। কাউকে ক্ষোভের বশবর্তী হয়েও অনেক দূরে বদলি করে দেওয়া হচ্ছে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন।
জানা যায়, চলতি বছর থেকে প্রথম শ্রেণিতে চালু হয়েছে নতুন শিক্ষাক্রম। আর আগামী বছর থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে এবং ২০২৫ সাল থেকে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে। কিন্তু তা পড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেই অধিদপ্তরের। শিক্ষকদের নামমাত্র প্রশিক্ষণেই দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে। আসলে এই শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীরা কতটুকু আত্মস্থ করতে পারছে বা এ জন্য আর কী করা প্রয়োজন, সে ব্যাপারে তেমন নজর নেই।
এ ছাড়া এখনো প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা বেতন পান ১১তম গ্রেডে ও সহকারী শিক্ষকরা পান ১৩তম গ্রেডে। দুই ধরনের প্রায় চার লাখ শিক্ষকই ১০ম গ্রেডে বেতনের দাবি করে আসছেন। এ ছাড়া সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারাও দীর্ঘদিন ধরে নবম গ্রেডের দাবি করছেন। আর মাঠে কাজ করা এসব শিক্ষক ও কর্মকর্তার পদোন্নতিও নেই বললেই চলে। কিন্তু এগুলো সমাধানেও তেমন কোনো উদ্যোগ নেই মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের; যা প্রাথমিকের মান উন্নীতের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রবীণ শিক্ষক নেতা মো. সিদ্দিকুর রহমান আরও বলেন, ‘এখনো মফস্বলে বা দুর্গম অঞ্চলের অনেক স্কুলেই এক-দুজন শিক্ষক। অনেক স্কুলে শিক্ষকের পদ তিন-চার বছর ধরে শূন্য। শিক্ষক না থাকলে এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়ে। এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিকে সাধারণত দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা আসে। তাদের একটু আলাদা যতœ নেওয়া প্রয়োজন। সেগুলোও হচ্ছে না। শিক্ষকরাও তাদের বেতন-ভাতায় সন্তুষ্ট নন। সব মিলিয়ে আমরা প্রাথমিক শিক্ষায় কাক্সিক্ষত মান অর্জন করতে পারছি না।’
ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে হেরে যাওয়া প্রার্থী আজমত উল্লা খানকে।
গণভবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজমত উল্লা খানকে ঢাকা-১৭ আসনে উপনির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। ওই আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আকবর হোসেন পাঠান (নায়ক ফারুক) গত ১৫ মে থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় ওই শূন্য আসনে আজমতকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে।
গাজীপুরের দ্বিধা-বিভক্ত রাজনীতি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই দফায় আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খানকে ভোটে পরাজিত করে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্যাগী, দক্ষ, মেধাবী ও ভাবমূর্তি সম্পন্ন আজমত উল্লাকে বরং আরও ওপরে রাখতে চেষ্টা করছেন। দলীয় সভাপতি টের পেয়েছেন মেয়র প্রার্থী আজমত হারেননি, তাকে গাজীপুরের দলীয় রাজনীতি জোর করে হারানো হয়েছে।
গত রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরাজিত মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লাকে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে ডেকে পাঠান। আজমতের সঙ্গে গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন চক্রান্তের ব্যাপারগুলো শেখ হাসিনা জানেন এবং জানান। গণভবনে পরাজিত প্রার্থী আজমতকে বোঝান পরাজয়ের কারণ আমরাই। বিএনপি-জামায়াত তাদের প্রার্থী দেয়নি গাজীপুরের সিটি ভোটে। তারা নৌকা হারাতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে জাহাঙ্গীর আলম। এর সঙ্গে দলেরও কেউ কেউ রসদ জুগিয়েছে। এতে রাজনীতি শেষ হয়ে গেছে এমন নয়।
সূত্রটি আরও জানায়, প্রধানমন্ত্রী যার ওপর ক্ষুব্ধ হন তার যেমন শাস্তি দেন তেমনি যার ওপর সন্তুষ্ট ও যিনি ধৈর্য ধারণ করেন তাকে একই সঙ্গে সব দেন। গত ১৫ বছরে বহুজন এর উদাহরণ। গাজীপুরে মেয়র পদে আজমতকে হারা বা হারানোয়, প্রধানমন্ত্রী ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা জাহাঙ্গীরের ভোটকে ঘিরে যে নাটকীয় আচরণ করেছেন সে সম্পর্কে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। গাজীপুরের আওয়ামী লীগের রাজনীতি আজমতকে নিয়ে যে খেলাধুলায় মেতেছে সে আজমতকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ভাবছেন আরও ওপরে।
প্রয়াত সংসদ সদস্য নায়ক ফারুক গাজীপুরের কালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। যদিও ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। আজমতও টঙ্গী কালিগঞ্জের। তা ছাড়া ঢাকা লাগোয়া এই জেলার বাসিন্দা আজমত। গাজীপুরের অনেক মানুষ ওই আসনে বসবাসও করেন। এসব মিলিয়ে আজমত প্রায়োরিটি পেতে যাচ্ছেন ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে।
আজমতের বিভিন্ন ঘনিষ্ঠজনেরা এসব তথ্য দিলেও আজমত উল্লা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব ব্যাপারে তার কোনো কিছুই জানা নেই। চিন্তাও করেন না তিনি।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন জায়েদা খাতুন।
তিনি ঘড়ি প্রতীকে মোট ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম আওয়ামী লীগ মনোনিত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আজমত উল্লা খান পেয়েছেন ২ লাখ ২২ হাজার ৭৩৭ ভোট।
বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় এ সিটির ৪৮০টি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণ শুরু হয়, যা একটানা বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে।
বৃহস্পতিবার (২৫ মে) রাতে রির্টানিং কর্মকর্তা স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করেন।
নির্বাচনের অন্য মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম এম নিয়াজ উদ্দিন ১৬ হাজার ৩৬২ ভোট, গোলাপ ফুল প্রতীকে জাকের পার্টির মো. রাজু আহাম্মেদ ৭ হাজার ২০৬ ভোট, মাছ প্রতীকে গণফ্রন্টের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম ১৬ হাজার ৯৭৪ ভোট, স্বতন্ত্রপ্রার্থী ঘোড়া প্রতীকের মো. হারুন-অর-রশীদ ২ হাজার ৪২৬ ভোট এবং হাতি প্রতীকের সরকার শাহনূর ইসলাম ২৩ হাজার ২৬৫ ভোট পেয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, গাজীপুর সিটিতে মোট ভোটার ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৭৬ জন। তাদের মধ্যে ৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৬২ জন পুরুষ, ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৬৯৬ জন নারী ও ১৮ জন হিজড়া। এই সিটিতে ৫৭টি সাধারণ ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড আছে। মোট ভোটকেন্দ্র ৪৮০টি, মোট ভোটকক্ষ ৩ হাজার ৪৯৭টি।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) নির্মিত হয়েছে বিশেষ কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান ‘ও ভোরের পাখি’। ঈমাম হোসাইনের প্রযোজনায় এটি উপস্থাপনা করেছেন তামান্ন তিথি। অনুষ্ঠানটিতে আবৃত্তি করেছেন আশরাফুল আলম, মীর বরকত, রফিকুল ইসলাম, পলি পারভিন, শাকিলা মতিন মৃদুলা, মাসকুর-এ সাত্তার কল্লোল, আসলাম শিশির, সংগীতা চৌধুরী, আহসান উল্লাহ তমাল। প্রচারিত হয় ২৫ মে সকাল সাড়ে ৯টায়।
এছাড়াও নির্মিত হয়েছে বিশেষ অনুষ্ঠান ‘আমারে দেবো না ভুলিতে’। অনুষ্ঠানটিতে গান, কবিতা ও আলোচনার সমন্বয়ে কবিকে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও বাচিকশিল্পীদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিতে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। ইয়াসমিন মুসতারী, সালাউদ্দিন আহমেদ, শেলু বড়ুয়া, ছন্দা চক্রবর্ত্তী ও ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছেন প্রফেসর মুন্সী আবু সাইফ। মনিরুল হাসানের প্রযোজনায় অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হচ্ছে ২৫ মে দুপুর ১ টা ০৫ মিনিটে। আরও প্রচারিত হবে সংগীতানুষ্ঠান ‘দোলনচাঁপা’ ও ‘সন্ধ্যামালতী’। রাত ৯টায় প্রচারিত হবে নাটক ‘বনের পাপিয়া’ (পুনপ্রচার)।