‘ঝাঁঝালো’ ফাইনাল জিতে আবাহনীর রেকর্ড শিরোপা|110735|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ নভেম্বর, ২০১৮ ২০:৩৫
‘ঝাঁঝালো’ ফাইনাল জিতে আবাহনীর রেকর্ড শিরোপা
আবাহনী ৩-১ বসুন্ধরা কিংস
নিজস্ব প্রতিবেদক

‘ঝাঁঝালো’ ফাইনাল জিতে আবাহনীর রেকর্ড শিরোপা

ফেডারেশন কাপ জয়ী আবাহনী খেলোয়াড়দের উল্লাস। ছবি: নাজমুল হক বাপ্পি

অনেক দিন পর বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ফিরে এলো আবাহনী-মোহামেডান লড়াইয়ের ঝাঁঝ। আবাহনী ছিল স্বমহিমায়। কিন্তু মোহামেডানের রূপ নিয়ে মাঠে হাজির নবাগত বসুন্ধরা কিংস। পরতে পরতে উত্তেজনা ছড়ানো ফেডারেশন কাপের ফাইনালে শেষ পর্যন্ত জয় হলো আবাহনীর।

উড়েনি নতুনের কেতন। জয় হয়েছে ঐতিহ্যের। পিছিয়ে থেকেও শুক্রবার আবাহনী অনেক পাওয়ার ম্যাচটা জিতে নিয়েছে ৩-১ গোলে। এই জয়ের মাহাত্ম অনেক। এই জয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহামেডানকে পেছনে ফেলে রেকর্ড ১১বারের মতো ফেডারেশন কাপ শিরোপা ঘরে তুললো আবাহনী। শুধু তাই নয়, হয়ে গেলো মর্যাদার এই ট্রফি জয়ের হ্যাটট্রিক শিরোপা। আর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি যা হলো, তা হচ্ছে আবাহনীর হাতে উঠে গেলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের পতাকা। ফেডারেশন কাপের এই শিরোপা তাদের নিয়ে গেছে আগামী এএফসি কাপে।

ধারে-ভারে এগিয়ে থাকায় ম্যাচের আগে শিরোপার পাল্লাটা বসুন্ধরা কিংসের দিকেই নুয়ে ছিল। লাল জার্সি গায়ে গ্যালারি ভরে উঠেছিল নতুন দলটির সমর্থকে। পিছপা হননি আবাহনীর সমর্থকরাও। ঐতিহ্যবাহী আবাহনী গ্যালারিপূর্ণ ছিল আকাশি-হলুদের ভক্ততে। গ্যালারির উপস্থিতি দারুণ এক ফাইনালের আবহ তৈরি রেখেছিল শুরু থেকেই।

ফুটবলটা খারাপ হয়নি। তবে ফুটবলের চেয়ে দু’দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে মেজাজ হারানোর লড়াই হয়েছে সমান তালে। খেলার স্বাভাবিক ছন্দে দেখা দিয়েছে ঘাটতি।

ফুটবলের লড়াইয়ের বিশ্লেষণে বসুন্ধরার চেয়ে এগিয়ে রাখতে হবে আবাহনীকেই। দু’দলই নিজেদের সেরাটাই ঢেলে দিতে চেয়েছে। তাতে আবাহনী এগিয়ে ছিল অনেকটাই। খেলায় ছিল পরিকল্পনার ছাপ। সুবাদে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ শুরু থেকেই ছিল তাদের পায়ে। যদিও শুরুতেই গোল হজম করতে হয়েছে আবাহনীকে।

২১ মিনিটে কোস্টারিকা ফরোয়ার্ড দ্যানিয়েল কলিনদ্রেসের ঠাণ্ডা মাথার গোল থমকে দিয়েছিল আবাহনী সমর্থকদের। বাঁ প্রান্ত থেকে আলমগীর কবির রানার ক্রসে ঠিকঠাক ফিস্ট করতে পারেননি আবাহনী গোলরক্ষক শহীদুল আলম সোহেল। বল পেয়ে দু’জন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে কাছের পোস্টে জমা করেন কলিনদ্রেস। ম্যাচে বসুন্ধরার বলার মতো প্রচেষ্টা ছিল এই একটাই। বাকিটা সময় কেবল আবাহনীর আক্রমণ আর সাফল্যের গল্প।

২৬ মিনিটে ওয়ালি ফয়সালের ফ্রি-কিকে ঠিকঠাক হেড নিয়েছিলেন হাইতিয়ান স্ট্রাইকার কারভেন বেলফোর্ড। ডানদিকে ঝাঁপিয়ে সে যাত্রায় দলকে রক্ষা করেন বসুন্ধরা গোলরক্ষক আনিসুর রহমান জিকো।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দারুণ সুযোগ নষ্ট হয় আবাহনীর। ওয়ালির লম্বা বলে বেলফোর্ড হেড করে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড সানডে চিজোবাকে। বক্সের বাঁপ্রান্ত দিয়ে ঢুকে এই স্ট্রাইকারের বাঁপায়ের শট ফিরে আসে ক্রসবারে লেগে। চার মিনিট পর আর হতাশ হতে হয়নি সানডেকে। বাঁপ্রান্ত থেকে রায়হান হাসানের লম্বা থ্রো-ইনে শেষ মুহূর্তে পা ছুঁইয়ে লক্ষ্যভেদ করেন দারুণ ফর্মে থাকা এই মার্কসম্যান।

৭৯ মিনিটে ফের গোল করে আবাহনীকে এগিয়ে নেন সানডে। তবে এই গোলের মূল নায়ক সোহেল রানা। প্রায় মাঠ থেকে বল নিয়ে তিনজনকে কাটিয়ে পাস বাড়ান সানডেকে। চলন্ত বলে ডানপায়ের দারুণ প্লেসিং-এ বসুন্ধরা কিংস গোলকিপারকে বোকা বানান এই নাইজেরিয়ান। ৫৩ মিনিটে জয় অনেকটাই নিশ্চিত হয় আবাহনীর। এবার ওয়ালি ফয়সালের কর্নারে বেলফোর্ডের নিখুঁত ঠিকানা খুঁজে নিলে বলতে গেলে খেলা থেকেই ছিটকে যায় বসুন্ধরা কিংস।

ম্যাচের শেষভাগে নাটক কম হয়নি। সেই নাটকে ফুটবল যতটুকু না ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল দু’দলের খেলোয়াড়দের মেজাজ হারানোর উত্তাপ। তাতে বাজে ট্যাকলিং-এর শিকার হয়ে যেমন মাঠ ছাড়তে হয়েছে সানডেকে, তেমনই হাতাহাতি-মারামারিতে জড়িয়ে সরাসরি লালকার্ড দেখতে হয়েছে দু’দলের দু’জন করে খেলোয়াড়কে। ৭ মিনিটের ইনজুরি টাইমে মেজাজ হারিয়ে প্রথমে বাজে ট্যাকলিং-এর শিকার হয়ে বসুন্ধরার ডিফেন্ডার সুশান্ত ত্রিপুরাকে চর মেরে বসেন মাত্রই মাঠে আসা আবাহনী স্ট্রাইকার নাবিব নেওয়াজ। তার জবাবে সুশান্ত লাথি মেরে বসেন জীবনকে। আর দু’জনের সংঘর্ষে মেজাজ খুইয়ে সুশান্তকে আবাহনী ডিফেন্ডার পেছন থেকে ফ্লাইং কিক দিলে উত্তপ্ত হয়ে উঠে মাঠের পরিস্থিতি। সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে মামুন মিয়াকে মারতে তেড়ে গিয়েছিলেন তৌহিদুল আলম সবুজ। এত সব কাণ্ডের পরিণতি- রেফারি একই সঙ্গে সুশান্ত, সবুজ, মামুন এবং জীবনকে দেখান লালকার্ড।

পরের সময়টায় ৯ জনের দু’দলের খেলায় মন ছিল খুব কম। আর শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য আবাহনী দর্শকের মাঠে ঢুকে উদযাপন যেন ঢাকার ফুটবলকে সেই আশির দশকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অনেক দিন বাদে।

ম্যাচে তিনি গোল করেননি। করিয়েছেন মাত্র একটি। কিন্তু পুরোটা ম্যাচ দূর্দান্ত খেলে ফাইনালের সেরা আবাহনীর মিডফিল্ডার সোহেল রানা। টুর্নামেন্টে ৬ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং টুর্নামেন্ট সেরার স্বীকৃতি পেয়েছেন সানডে।

হাজারো সমর্থকের ভীড়ে আবাহনীর সাফল্যের অন্যতম কারিগর অন্তবর্তীকালীন কোচ জাকারিয়া বাবুকে খুঁজে পাওয়া ছিল দায়। যখন দেখা মিলল তখন তাঁর চোখে আনন্দাশ্রু।

“আমি জানি না কেন এ কান্না এল, আনন্দেই হয়তো কেঁদে ফেলেছি। আমি বরাবরই বলেছি দলের আত্মবিশ্বাস আছে। বলেছি গোল খেয়েও ঘুরে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস আছে। বিরতির সময় ছেলেদের সেই বিশ্বাসটাই রাখতে বলেছিলাম। তার প্রতিদান ছেলেরা এভাবে দেবে ভাবিনি।”

বসুন্ধরার স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজন এই হারে দলের পারফরমেন্সের ঘাটতিকেই দায়ী করেন।

“আমরা নিজেদের সেরা খেলাটা আসল ম্যাচে খেলতে পারিনি। দ্বিতীয়ার্ধে ওরাই (আবাহনী) বেশি সুযোগ তৈরী করেছে। কোন অযুহাত নয়, তবে মনে হয়েছে রেফারির বাঁশিও ওদের পক্ষেই বেশি বেঁজেছে।”