জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলে বাড়ছে গর্ভপাত|111303|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলে বাড়ছে গর্ভপাত
দেশ রূপান্তর ডেস্ক

জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলে বাড়ছে গর্ভপাত

বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলের কয়েকটি গ্রামে গর্ভপাতের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে জানিয়ে এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের হাত থাকতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশে (আইসিডিডিআরবি) সাম্প্রতিক এক গবেষণা ও নিজস্ব অনুন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি এক প্রতিবেদনে এতথ্য তুলে ধরেছে বিবিসি।

কক্সবাজারের চকোরিয়ার কয়েকটি গ্রাম ও তুলনামূলক দূরবর্তী উপকূলীয় অঞ্চলে চালানো জরিপে পাওয়া তথ্যের মধ্যে তুলনার ভিত্তিতে গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে নারীদের গর্ভপাত দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি।

চকোরিয়ারই একটি গ্রাম ফাইল্যাপাড়ার বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী আল-মুন্নাহার। তার তিনটি ছেলে সন্তান আছে, কিন্তু একটি মেয়ের জন্য তার যতো হাহাকার। একসময় সন্তানসম্ভবা হলে ওই নারী ভেবেছিলেন, একটি মেয়ে হবে তারা। কিন্তু সে আশার গুঁড়ে বালি দিয়ে তার গর্ভপাত হয়। ওই গ্রামের অনেক নারীর বুকেই আল-মুন্নাহারের মত বেদনা রয়েছে। তিনি বলেন, “মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ভালো। ছেলেরা কথা শুনে না। তারা উদ্ধত। মেয়েরা বিনয়ী।”

গবেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এর ফলে সাগরের পানি প্রবাহিত হয়ে নদী, জলাভূমি ও মাটিতে অতিরিক্ত লবণ জমা হচ্ছে। এমনকি ভূগর্ভস্থ পানিও লবণাক্ত হওয়ায় গভীর নলকূপের পানিতেও প্রচুর লবণ থাকছে।

মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততার ফলে আবাদি জমি চাষাবাদের অনুপযুক্ত হওয়ার পাশাপাশি মানবদেহে নানা ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জমিতে লবণাক্ততার কুফল প্রকাশ্য হলেও মানুষের শরীরে এর প্রভাব বাইরে থেকে দেখা যায় না।

মুন্নাহার বলেন, “এখানে এখন আর কিছু ফলে না।”

অথচ বেশিদিন নয়, ১৯৯০ এর আগেও এখানকার জলাভূমিগুলো ধানক্ষেত ছিল। এখন সামান্য কিছু ধানচাষ ছাড়া বেশিরভাগ জায়গায় চিংড়ি বা লবণ চাষ করা হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশমতে, দিনে ৫ গ্রামের বেশি লবণ খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয়। অথচ চকোরিয়ার উপকূলীয় মানুষরা গড়ে প্রতিদিন ১৬ গ্রাম লবণ খায়। মাত্রাতিরিক্ত লবণ গ্রহণে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও গর্ভপাতের ঝুঁকি রয়েছে বলে যুক্তরাজ্যের মত দেশগুলোতে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রচারঅভিযান চালানো হয়।

২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চকোরিয়ার পাহাড় ও সমতলে ১২ হাজার ৮৬৭ জন গর্ভবতী নারীর ওপর জরিপ চালান আইসিডিডিআরবির গবেষকদল। সমুদ্রসীমা থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে এবং সাত মিটার উঁচু উপকূলীয় সমতলে বসবাসরত নারীদের মধ্যে গর্ভপাত সমতলের নারীদের চেয়ে ১ দশমিক ৩ গুণ বেশি পেয়েছেন তারা।

তারা উপকূলের নিকটবর্তী চকোরিয়ার পাশাপাশি তুলনামূলক দূরবর্তী চাঁদপুরের মতলব এলাকাতেও জরিপ চালিয়ে তারা গর্ভপাতের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখতে পেয়েছেন। মতলবে গর্ভপাতের হার ৮ শতাংশ, চকোরিয়াতে ১১ শতাংশ।

আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. মনজুর হানিফী বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন এর জন্য দায়ী। ভূমিতে যে ক্ষতি হয়, তা আমরা দেখতে পাই। কিন্তু মানবদেহের ক্ষতি দৃশ্যমান নয়।”

মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে ফাইল্লাপাড়ার নলকূপের পানির রঙ লাল। গ্রামটির লোকেরা সেই পানি পান করছে, গোসল করছে, রান্নার কাজে ব্যবহার করছে এবং ধোয়ামোছা করছে।

কিন্তু বাংলাদেশের এসব উপকূলীয় মানুষের লবণাক্ততার ক্ষতিকর সম্পর্কে ভালো ধারণাই নেই, থাকলেও তাদের খুব একটা কিছু করার ছিল না। কারণ তাদের সামনে তেমন কোনো বিকল্প নেই।

ফাইল্লাপাড়ার ৫০ বছর বয়সী জান্নাত আরা নিজেই বললেন, লবণ ফসলের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু তার সামনে তেমন বিকল্প নেই। 

এই গ্রাম ছেড়ে যাবেন কি না জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, “অবশ্যই নয়। আমি সারাজীবন এই গ্রামে কাটিয়েছি। আমরা এখন কোথায় যাবো? আমরা খুবই দরিদ্র।”

#অনিন্দ্য/হুসাইন