নির্বাচনী সহিংসতা চলছে, সারা দেশে আহত শতাধিক|111569|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
বিএনপি প্রার্থী খোকন গুলিবিদ্ধ
নির্বাচনী সহিংসতা চলছে, সারা দেশে আহত শতাধিক
রূপান্তর ডেস্ক

নির্বাচনী সহিংসতা চলছে, সারা দেশে আহত শতাধিক

আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর রাজধানীসহ সারা দেশে নির্বাচনী সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল শনিবার বিকেলে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি বাজারে সংঘর্ষের সময় বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে তাকে উদ্ধার করে জেলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় আরো দুজন আহত হয়েছে।

মাহবুব উদ্দিন খোকন নোয়াখালী-১ আসনের বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী। সেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা এইচ এম ইব্রাহিম। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন অভিযোগ করে বলেন, ‘পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে গুলি করেছে।’ তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সোনাইমুড়ি থানার ওসি আবদুল মজিদ বলেন, ‘সংঘর্ষ থামাতে ফাঁকা গুলি ছুড়লেও তা কারও শরীরে বিদ্ধ হয়নি। দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে তিনি আহত হয়েছেন। ’

ওসি আবদুল মজিদ আরো বলেন, ‘বিকেলে সোনাইমুড়ি বাজারে নৌকা ও ধানের শীষের পক্ষে মিছিল বেরোয়। কিছুক্ষণ পর দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলিও হয়। সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ ফাঁকা গুলি করেছে। তবে পুলিশের গুলিতে কেউ আহত হয়নি।’ পুলিশ সুপার ইলিয়াস শরীফ বলেন, ‘সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ছররা গুলি ছোড়ে।’

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিম বলেন, ‘মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ তিনজনকে সন্ধ্যা ৬টার দিকে হাসপাতালে আনা হয়।  খোকনের পিঠে ছররা গুলি লেগেছে। অপর দুজনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে এই গুলি লেগেছে।’

গত ১১ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ১৩ ডিসেম্বর পাবনায় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদের গাড়িবহরে হামলা হয়। সর্বশেষ গত শুক্রবার মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানিয়ে বের হওয়ার সময় কামালের গাড়িবহরে হামলা হয়।

এসব হামলার পর বিএনপিপ্রধান সরকারবিরোধী জোটের অভিযোগ, পুলিশের উপস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই এসব হামলা চালিয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, নির্বাচন বানচাল করার মিশন নিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিএনপিই এসব হামলার নাটক মঞ্চস্থ করছে। এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, সংঘর্ষে শতাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের ওপর হামলা হয়েছে। দেড়টার দিকে পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ গোলাম মাওলা রনির স্ত্রীর ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় গাজীপুর-৪ কাপাসিয়া আসনে বিএনপি প্রার্থী ও প্রয়াত হান্নান শাহের ছেলে শাহ রিয়াজুল হান্নানের ওপর হামলা হয়েছে। সিরাজগঞ্জ শহরের ইবি রোড এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। ঝালকাঠি-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী জীবা আমিনা খানের গাড়িবহরে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শরীয়তপুর-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুর নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। বিস্তারিত বিভিন্ন স্থান থেকে পাঠানো আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে-

মির্জা আব্বাসের ওপর হামলা : গতকাল দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় গণসংযোগ চালানোর সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের ওপর হামলা হয়েছে। এতে প্রায় ৬০ জন আহত হয়েছে। ৩০-৪০ জন হামলাকারীর কাছে লাঠি, লোহার রড, চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলে আহতদের কয়েকজন অভিযোগ করেন।

গতকাল দুপুরে মির্জা আব্বাস তার শাজাহানপুরের বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমাদের নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে আওয়ামী লীগ এভাবে সহিংস আক্রমণ চালাবে আমি ভাবতেও পারিনি। নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগ আমাদের নেতাকর্মীদের বেধড়ক মারপিট করে আহত করে। অন্যদিকে এই আহত নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি সংবাদ সম্মেলনে আহত নেতাকর্মীদের মাথায়, পিঠে, হাতে ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন সাংবাদিকদের দেখান।

মির্জা আব্বাস বলেন, ‘এই হচ্ছে আজকে সারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি। সরকার বলছে, বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবে কি না; আসলে আমাদের শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে রাখবে কি না সেটাই প্রশ্ন। আমরা নির্বাচন করতে পারব কি না এ বিষয়ে দেশের জনগণের মাঝে সন্দেহ রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি সাংবাদিক বন্ধুদের মাধ্যমে জানতে চাই, আসলে সরকার কী চায়? বিএনপিকে নির্বাচন করতে আদৌ দেবে কি দেবে না এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হওয়া উচিত। তফসিল ঘোষণার সময় সরকার বলেছিল, বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে নতুন কোনো মামলা হবে না এবং পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা হবে না। এই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। ’

বিভিন্ন স্থানে শতাধিক আহত : গাজীপুর-৪ কাপাসিয়া আসনে বিএনপি প্রার্থী ও প্রয়াত হান্নান শাহের ছেলে শাহ রিয়াজুল হান্নানের নির্বাচনী প্রচার চলাকালে হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার সন্মানিয়া ইউনিয়নের আড়াল বাজারে এ ঘটনা ঘটে। এতে রিয়াজুল হান্নানসহ ১০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়েছে।  

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় যুবলীগ নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে শাহ রিয়াজুল হান্নানের ওপর আক্রমণ করে। তারা তার গায়ের পাঞ্জাবি ছিঁড়ে ফেলে এবং মারাত্মক ভাবে আহত করে। হামলাকারীরা তার গাড়ি ভাঙচুর করে। আড়াল বাজারের তিন স্থানে তিনি হামলার শিকার হন।

পরে শাহ রিয়াজুল হান্নানের নেতৃত্বে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল সহকারী রিটার্নিং ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসমত আরা এবং কাপাসিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকের সঙ্গে দেখা করে লিখিত অভিযোগ করেন।

কাপাসিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক জানান, অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ শহরের ইবি রোড এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ৪ পুলিশসহ বিএনপির ১১ নেতাকর্মী আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৪৭টি রাবার বুলেট ও ৮ রাউন্ড টিআর সেল নিক্ষেপ করেছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে।

আহতদের মধ্যে জেলা বিএনপির সভাপতি ও ধানের শীষের প্রার্থী রুমানা মাহমুদ ও মেরী নামে এক নারী কর্মী রয়েছেন বলে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু জানিয়েছেন।

সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু অভিযোগ করে বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে হোসেনপুর এলাকা থেকে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী রুমানা মাহমুদ দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় ইবি রোডে পৌঁছালে পুলিশ বাধা দেয়। এতে বিএনপির নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশও পাল্টা লাঠিচার্জ, টিআর সেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়।

সিরাজগঞ্জ সদর থানার ওসি মোহাম্মদ দাউদ জানান, সন্ধ্যার দিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা তাদের দলীয় অফিসে যাওয়ার সময় বিনা উসকানিতে পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ঢিল ছোড়ে এবং পুলিশের গাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় ৪ পুলিশ সদস্য আহত হয়। এ ছাড়া পুলিশের একটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঝালকাঠির নলছিটি শহরে উঠান বৈঠক শেষে যাওয়ার পথে ঝালকাঠি-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী জীবা আমিনা খানের গাড়িবহরে হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় বহরের দুটি গাড়ি ও বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। হামলায় ছাত্র ও যুবদলের ১০ নেতাকর্মী আহত হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় শহরের সাথির মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনিসুর রহমান খান হেলালের বাসায় বিকেলে জীবা আমিনা খানের উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে তার গাড়িবহর যাওয়ার পথে শহরের সাথির মোড় এলাকায় দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। হামলায় আহত হয় ছাত্রদল ও যুবদলের ১০ নেতাকর্মী। গাড়ি থেকে নেমে বিএনপি প্রার্থী জীবা আমিনা খান স্থানীয় একটি বাসায় আশ্রয় নেন। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহতরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছে।

ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীরা এ হামলা চালিয়েছে বলে জীবা আমিনা খান অভিযোগ করেছেন। তবে উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি হামলার ঘটনা অস্বীকার করে জানান, নিজেরাই গাড়ি ভাঙচুর করে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

শরীয়তপুর-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুর নির্বাচনী ও উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করে ৯ হাজার পোস্টার ছিনিয়ে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় হামলাকারীরা পোস্টার সাঁটানোর সামগ্রীসহ ৩৬ হাজার নগদ টাকা নিয়ে গেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় শরীয়তপুরের রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করার কথা জানিয়েছেন বিএনপি প্রার্থীর সমর্থকরা। গোসাইরহাট থানার ওসি জানান, তারা এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাননি।

গোসাইরহাট উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক কামরুজ্জামান কামরুল জানান, শরীয়তপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুর নির্বাচনী ও উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে ছাত্রদলের নেতারা বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় পোস্টার পাঠানো ও সাঁটানোর কাজ করছিল। হঠাৎ ৩০-৪০ জনের একটি দল বিএনপি কার্যালয়ে হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীরা জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতিসহ অন্তত ১০ জন নেতাকর্মীকে মারধর করে।

গোসাইরহাট উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মামুন মিয়া বলেন, এ বিষয়ে আমরা গোসাইরহাট থানা পুলিশকে জানানোর পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আমরা আমাদের প্রার্থীর সঙ্গে পরামর্শ করে নির্বাচন কমিশন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করব।

গোসাইরহাট থানা পুলিশের ওসি মো. সেলিম রেজা বলেন, আমরা এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।