র‌্যাকেট-ফেদারে বিবর্ণ বাংলাদেশ|111604|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
র‌্যাকেট-ফেদারে বিবর্ণ বাংলাদেশ
সুদীপ্ত আনন্দ

র‌্যাকেট-ফেদারে বিবর্ণ বাংলাদেশ

ইউনেক্স-সানরাইজ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ব্যাডমিন্টন চ্যালেঞ্জে অ্যাকশনে এলিনা (বাঁয়ে) ও শাপলা -সৌজন্য

মেয়েদের ডাবলসে সেমিফাইনাল। গতকাল শেষ হওয়া ইউনেক্স-সানরাইজ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ব্যাডমিন্টন চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের প্রাপ্তি বলতে এতটুকুই। অন্য ইভেন্টগুলোতে চোখ ফেরালে শুধুই হতাশা। দেশের মাটিতে, পরিচিত পরিবেশেও অসহায় স্বাগতিক শাটলাররা। অথচ পাশের দেশগুলোর শাটলাররা নিয়মিতই পাচ্ছেন সাফল্য। পেছনের কারণ জানতে চাইতেই হতাশার সুর শাটলারদের কণ্ঠে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলার সুযোগ, নড়বড়ে ঘরোয়া অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা কোনোটাই নেই তাদের জন্য। তাদের জন্য বরাদ্দ শুধুই হতাশা।

এবারের আসরে ১৩টি দেশের শাটলারে মুখরিত হয়েছিল শহীদ তাজউদ্দীন ইনডোর স্টেডিয়ামে। ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ছাড়াও এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার শাটলাররা। প্রতিটি ইভেন্টের শ্রেষ্ঠত্বও ভাগাভাগি করে নিয়ে গেছেন তারা। ইন্দোনেশিয়া সাফল্য পাওয়া দেশগুলোর একটি। সেই দেশের কোচ জেবর রোসোভিনের কথাতেই শুনুন তাদের সাফল্যের পেছনের রহস্য, ‘ব্যাডমিন্টন আমাদের দেশে অনেক জনপ্রিয়। আমাদের দেশে অনেক খেলোয়াড় এবং অ্যাকাডেমি আছে যেখানে শতশত শাটলার নিয়মিত অনুশীলন করে। তবে সেরার লড়াইটা হয় র‌্যাংকিংয়ের সেরা ৩০ জনের মধ্যে।’ শুধু অ্যাকাডেমি গড়েই সাফল্য পায়নি ইন্দোনেশিয়ার শাটলাররা। এর পেছনে আরো ছিল অবাধ খেলার সুযোগ এবং জিম সুবিধা। ‘সপ্তাহে পাঁচ দিন সব খেলোয়াড় গড়ে পাঁচ ঘণ্টা করে ফিটনেস ট্রেনিং ও শাটল প্রাকটিস করে। ফলে তাদের টেকনিকেরও উন্নতি হয়। হয়তো দেখেছেন আমাদের টেকনিক আলাদা। এটা একদিনে শেখার জিনিস নয়, দিনের পর দিন প্রাকটিসের সুফল হলো আমাদের সাফল্য।’

রোসোভিন নিজেই ইন্দোনেশিয়ার ব্যাডমিন্টন উন্নয়নে কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। এই কাজে তিনি পাচ্ছেন সরকারি এবং বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, ‘আমাদের পেশাদার শাটলারদের আয় অনেক। বিভিন্ন টুর্নামেন্ট খেলেই তারা এটা আয় করে। সারা বছর দেশ-বিদেশে অনেক প্রতিযোগিতায় তারা অংশ নেয়। ফলে তাদের দেখে তরুণরাও আগ্রহী হয়।’

অথচ এসব চিন্তা করাই পাপ বাংলাদেশের শাটলারদের। এক আজব নিয়মের খাঁড়ায় পড়ে এবার ১৮ থেকে ১৯ জন শাটলার দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত চেষ্টায়। পাননি কোনো আর্থিক সহায়তা। এমনকি হাতখরচও নয়। এদের দলে আছেন গত জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ সালমান খানও। এদেশে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপকে র‌্যাংকিং নির্ধারণী টুর্নামেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয় না। এ ক্ষেত্রে সামার ওপেনই একমাত্র র‌্যাংকিং টুর্নামেন্ট। যেখানে ভালো না করায় জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েও তিনি পক্ষপাতিত্বের শিকার। সালমানের র‌্যাংকিং ১১। বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন র‌্যাংকিংয়ের সেরা আটজনকে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট চলাকালে রেখেছে আবাসিক হোটেলে, দিয়েছে খাবার এবং হাতখরচ। অথচ সালমানের মতো প্রতিভাকে এই আসরে অংশ নিতে সব খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়েছে, ‘জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করেও কিছু পাই না। কেন এই খেলাটা খেলব বলেন। জাতীয় চ্যাম্পিয়নের ফেডারেশনের কাছে কোনো মূল্য নেই। অথচ দেখেন ছেলেদের মধ্যে আমার পারফরম্যান্সই সবচেয়ে ভালো। সিঙ্গেলসে আমি এবং বর্তমান এক নম্বর র‌্যাংকধারী গৌরব (সিং) প্রিকোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যেতে পারি। ডাবলসে এনাম (এনামুল হক) ভাইকে সঙ্গী করে খেলেছি কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত। অথচ এমন পারফরম্যান্সের পরও ফেডারেশন থেকে পাইনি কানাকড়ি।’ তারপরও এই শীতের মৌসুমে ছেলে শাটলারদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় খ্যাপ খেলে কিছু আয় রোজগারের সুযোগ আছে। যে সুযোগ নেই মেয়েদের জন্য। অথচ সেই মেয়েদের হাত ধরেই এসেছে একটি ব্রোঞ্জপদক।

মেয়েদের র‌্যাংকিংয়ে এক নম্বর এলিনা সুলতানা ডাবলসে একমাত্র পদকটি এনে দেন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন শাপলা আক্তারের সঙ্গে জুটি গড়ে। দীর্ঘ ক্যারিয়ার থেকে এলিনার অনুধাবনটা এমন, ‘এখানে যারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তাদের চেয়ে আমরা অনেক অনেক পিছিয়ে। এটা লুকানোর কোনো উপায় নেই। কারণ দীর্ঘদিনের ট্রেনিং-প্রাকটিসের সুবাদেই ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা ভিয়েতনামের খেলোয়াড়রা স্কিলে অনেক এগিয়ে থাকে।’

শাপলা আক্তার আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক সমর্থন না পাওয়াটা মেয়েদের আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, ‘এই খেলাটা খেলে কোনো আর্থিক লাভ নেই আমাদের। কারণ ছেলেদের মতো আমাদের পক্ষে শীত মৌসুমে খ্যাপ খেলা সম্ভব নয়। তাছাড়া ফেডারেশন থেকেও তেমন কোনো সমর্থন আমরা পাই না। খেলারও সুযোগ খুব কম। সুতরাং ভালো কিছু আশা না করাই উত্তম।’

দেশের ব্যাডমিন্টনে মরচে ধরেছে। ফেদারের পালকগুলোও বিবর্ণ। খাদের কিনারে পৌঁছে যাওয়া খেলাটার এখন এদেশে বেঁচে থাকাই দায়।