মারকুটে ক্রিকেটের জন্য তৈরি তো!|111679|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
মারকুটে ক্রিকেটের জন্য তৈরি তো!
মোহাম্মদ খাইরুল আমিন, সিলেট থেকে

মারকুটে ক্রিকেটের জন্য তৈরি তো!

গতকাল মোস্তাফিজ ও মিরাজ দুজনই পেয়েছেন ক্যারিয়ারসেরা র‌্যাংকিংয়ে ওঠার সুখবর। দুই অনুজের সঙ্গে অনুশীলনে তা নিয়েই কি খুনসুটি করছেন তামিম! -নাজমুল হক, সিলেট থেকে

কখনো উচ্ছ্বাস। কখনো আতঙ্ক। ছড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাস। ওয়াচআউট! এই বুঝি লাগল। মাথা দুই হাতে ঢেকে মুহূর্তে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা। পরে দেখা যায় বলটা মানবলক্ষ্য থেকে কখনো বেশ দূরে, কখনো এই পাশেই।  একেকটা শট খেলেন ব্যাটসম্যান আর কোচ স্টিভ রোডসের চোখেমুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ে। ‘ওয়েলডান’।

নেটের পাশে প্রধান উৎসাহদাতা হিসেবে আছেন ফিজ। ‘মারমার’। কখনোবা বলটা উড়ে যাচ্ছে দেখে ‘হারায়া দে’। অনর্গল শিশুসুলভ আনন্দে ছোট ছোট কথার বোল ফুটছে শিশুসুলভ আনন্দে মেতে ওঠা কাটার মাস্টারের চেহারায়। সতীর্থকে বিরাট এক ছক্কা হাঁকাতে দেখে এগিয়ে এসে মাহমুদউল্লার প্রশ্ন, ‘মাইরের উপর?’ অস্ফুটস্বরে কয়েকজন বাক্য শেষ করেন, ‘ওষুধ নাই।’

এই মাইর বা মার পুরোপুরি ক্রিকেটীয়। সেই মারে গ্যালারির ওপরের ছাদেও বল ওঠে কখনো। গ্যালারি ঘেঁষে নেট। এক-দুটো বল উড়ে স্টেডিয়ামের বাইরে গিয়ে পড়ে। মাইকে হঠাৎ আওয়াজ ওঠে ‘খেলায় কিন্তু বিশৃঙ্খলা হচ্ছে!’

কারো ভাবার কারণ নেই বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের বলা হচ্ছে। লাকাতুরা টি-স্টেটের ভেতরে অবস্থিত সিলেট স্টেডিয়ামের আশপাশেও বিজয় দিবসের নানা উৎসব চলছে। এবং ওখানকার কথাই জানান দিচ্ছে মাইক। কখনোবা ভেসে উঠছে ‘ওরা আসবে চুপি চুপি’ বা ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ কিংবা আরো কিছু। বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের শরীরের সব শক্তি দিয়ে বল পেটানো, উড়িয়ে মারা, মারমার কাটকাট মানসিকতার প্রবল বহিঃপ্রকাশের সঙ্গে কখনো কখনো বিজয়ের গান ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের মতো মিলে যায়!

টি-টুয়েন্টি তো মন খুলে মারার খেলা, খেলার মধ্যে এক ধরনের মুক্তির আনন্দও থাকে বুঝি! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্য দুই সংস্করণে যেসব শট খেলায় হয়তো প্রবল বাধা তারও চেয়ে সৃষ্টিশীল বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের সুযোগ কেবল এই ফরম্যাটেই মেলে! সত্যিকার অর্থে এখনো বাংলাদেশ দল যে সংস্করণের হয়ে উঠতে পারেনি।

কিন্তু শেষ সিরিজটা তো আর সেই কথা বলে না। সকাল থেকেই সিলেটে বিজয় দিনের নানা উৎসবমুখর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। পথেঘাটে লাল-সবুজের সমারোহ। এই মনোহর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে এদিন টিকিটের লাইন বড় বেশি দীর্ঘ। স্বল্প দৈর্ঘ্যরে খেলা। প্রতিমুহূর্তে উত্তেজনার বারুদ। ওই লাইনেও কখনো কখনো আগুন লাগার উপক্রম। আরো আলোচনায় খেলাটা দুবার এগিয়ে আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় চলে আসার খবর। একজনের প্রশ্ন, ‘৪টায় খেলা জেনে আগে টিকিট কেনা কেউ কোনো কারণে বদলানো সময়ের কথা না জানলে কী হবে? সে খেলা মিস করে ফেললে তাকে ক্ষতিপূরণ কে দেবে।’

হঠাৎ কী যেন শোরগোল। এই প্রশ্ন হারিয়ে যায়। তবে সবুজ চা বাগানের মায়াময় পরিবেশে এই সুন্দর স্টেডিয়ামে আসুরিক শক্তিতে মারের অনুশীলন থামে না। মুশফিকুর রহিম যেমন নেটের নির্ধারিত সময়ের পর ড্রেসিংরুমে না ফিরে মাঠেই রয়ে গেলেন। খুব কাছ থেকে বলবয়কে বল ছুড়তে বললেন। আর সেই বলগুলো ৩৬০ ডিগ্রির কথা মাথায় রেখে ব্যাটের আঘাতে মাঠের চারপাশে ছড়াতে থাকে সন্ত্রাস!

টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশ তত বড় সন্ত্রাসী নয় যতটা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল। দুই বছর আগে এই উপমহাদেশ থেকেই টি-টুয়েন্টি বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুটটা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ফাইনালে ওটা ছিল কার্লোস ব্রাফেটের চার বলে প্রয়োজনীয় চার ছক্কার অবিশ্বাস্য উপাখ্যান। যেটা আজ কিংবদন্তি। সঙ্গে খেলোয়াড়ও। আর তিনিই এখন ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক।

তারপরও এই সেদিন ক্যারিবিয়ান ও মার্কিন মুলুকে তাদের ২-১-এ টি-টুয়েন্টি সিরিজটাই হারিয়ে এলো সাকিব আল হাসানের দল। কোনো বড় দলের বিপক্ষে ওটাই টি-টুয়েন্টিতে বাংলাদেশের একমাত্র সিরিজ জয়। সেই সাকিব অবশ্য এদিন অনুশীলনের শুরুতেই পায়ে সামান্য আঘাত পেয়ে ড্রেসিংরুমে বরফ চিকিৎসায় ব্যস্ত হলেন। তারপর আর মাঠেই নামলেন না। সিরিজ ও প্রথম ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনেও নিজে না এসে কোচ স্টিভ রোডসকে পাঠিয়ে দিলেন।

বাংলাদেশের অনুশীলন শেষ হওয়ার ঢের পরেই ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যান-বোলাররা প্রাকটিসে নামেন। স্বাগতিকদের মতো ওখানেও একই মানসিকতা। সেন্টার উইকেট পাশে রেখে মারকুটে শিমরান হেটমায়ার বাতাসে বলকে নিরুদ্দেশের দেশে ভাসিয়ে তার প্রতিভা ও সামর্থ্যরে কথা বলে যাচ্ছিলেন। বাফ্রেট তখন নেটে নিজেদের বোলারকেই করছিলেন ছাতু।

এই যে মারো এবং মারোর অনুশীলন সেটাতে বাংলাদেশের সেশনে কোনো অঘটন না ঘটলেও যা মনে হচ্ছিল তাই হলো শেষে। ক্যারিবিয়ান শক্তিতে হানা আঘাতের এক বল উড়ে এসে মাঠের পাশে থাকা একজনকে কিছুটা আহত করে যায়। বড় আঘাত না হলেও চিকিৎসকদের অবজার্ভেশনে রাখতে হয় তাকে। অন্যরা এবার আরো সতর্ক হওয়ার তাগিদ অনুভব করে। এর মধ্য থেকে দর্শকের জন্য রোমাঞ্চিত হওয়ার এক বার্তাও চলে যায়। মারমার কাটকাট ক্রিকেটের জন্য তৈরি তো?

নেটে নামার কিছুক্ষণ আগে ব্রাফেটই সংবাদ সম্মেলনে হুমকির মতো করে বলে গেছেন টেস্ট বা ওয়ানডে এখন অতীত। দুই সিরিজে হারের ক্ষতে মলম লাগাতে চান তারা যে ফরম্যাটে সেরা সেই খেলায়।

সে কি বাংলাদেশও চায় না? এই বছরের শুরুতেই ভারতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৩-০-তে হোয়াইটওয়াশের শিকার হতে হয়েছে। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম আয়োজনের ৮২ ম্যাচের মাত্র ২৫টিতে জয়, হার ৫৫ খেলাতেই। তার ওপর ভিন্ন দুই সংস্করণের খেলা খেলেই নেমে যেতে হচ্ছে পেশিশক্তির প্রবল প্রকাশের লড়াইয়ে। যে শক্তিতে ক্যারিবিয়ানরা সবদিক দিয়ে এগিয়ে। শারীরিক দিক দিয়ে, বৈশ্বিক খেলার অভিজ্ঞতায়, অর্জনে এমনকি বিশ্ব র‌্যাংকিংয়েও। উইন্ডিজ ৭, বাংলাদেশ ১০। যদিও দুই দুলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ফল হওয়া নয় ম্যাচে এখন চার চারে টাই চলছে। প্রথম ম্যাচটা তাই ওদিকেও এগিয়ে যাওয়ার লড়াই।

কী হবে? এই মাঠে খেলা একমাত্র টি-টুয়েন্টিতে হার। এরপর টেস্টে। মাশরাফীর দল মাঠের ওয়ানডে অভিষেকটা জয়ে রাঙিয়ে জয়ের ধারাটা শুরু করেছে। দুই ফরম্যাটেই নেতৃত্বে মাশরাফীর কাছ থেকে ব্যাটন এখন সাকিবের হাতে। এই মাঠের জয়ের ব্যাটনটাও নিশ্চয়ই সাকিব হাত ফসকাতে চাইবেন না আজ।