ক্যারিবিয়ান ঝড়ে এলোমেলো বাংলাদেশ|111771|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
ক্যারিবিয়ান ঝড়ে এলোমেলো বাংলাদেশ
মোহাম্মদ খাইরুল আমিন, সিলেট থেকে

ক্যারিবিয়ান ঝড়ে এলোমেলো বাংলাদেশ

উইন্ডিজকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়ছেন নিকোলাস পুরান। পাশে বিষন্ন সাকিব হ নাজমুল হক

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ : ১২৯ (১৯ ওভার)

ওয়েস্ট ইন্ডিজ : ১৩০/২ (১০.ওভার)

ফল : ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮ উইকেটে জয়ী।

লক্ষ্য ১৩০। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে খুব বড় নয়। তারপরও তো আশা থাকে। সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অবশ্য বয়ে গেল ক্যারিবিয়ান টর্নেডো। তাতেই এলোমেলো সব। গ্যালারি ছেড়ে তখনই অনেকে বাড়ির পথ ধরেন। কেউ কেউ নিখাদ ক্রিকেটপ্রেমী হয়ে ছক্কায় ছক্কায় বাহবা দিয়ে যান। এখানে তাদের এত সমর্থন জানা ছিল না তো! অতিথি ব্যাটসম্যানরা এমনটা ভেবে থাকলে দোষের কি! সেই উৎসাহেই কি না ৫৫ বল হাতে রেখেই সবাইকে স্যালুট ঠোকে উইন্ডিজ।

বল হাতে শর্ট ও গতিময়তার সাফল্যে শেলডন কটরেল স্যালুটে করেন উৎসব। ম্যাচের সেরা। জ্যামাইকান ডিফেন্সের সৈনিক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অ্যাসাইনমেন্টে এখন। অগ্রবর্তী সেনাকে পরে দায়িত্বে আসা সতীর্থ ছোট করেন কীভাবে! শেই হোপের ব্যাট তরবারি হয়ে উঠে স্বাগতিক বোলারদের তাই কচুকাটা করে। ওখানে ওয়ানডে থেকে বয়ে আনা ফর্ম ও বিশ্বাসের প্রচণ্ড প্রকাশ। এসবের যোগফলে সাকিব আল হাসানের দল তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথমটিতে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত। ঢাকায় যেতে হচ্ছে, বাকি দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ জয়ের কঠিন লক্ষ্য পূরণ করতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে ও আমেরিকায় এই দলকে সেদিন সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের সিরিজ হারিয়ে এসেছেন সাকিবরা। তাদের সামনে এখন যেন আক্ষরিক অর্থেই মূর্তিমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা!

সাকিব টস জিতলে আনন্দ। কিন্তু কে জানত কিছুক্ষণের মধ্যে হতাশা গ্রাস করতে শুরু করবে সমর্থকদের! সবাই আয়েশ করে বসার আগেই ৩ উইকেট নেই। টেস্ট আর ওয়ানডে সিরিজ জয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাস মিলেছে। সেটাকে ব্যাটসম্যানরা কাজে লাগাতে চাইলেন উইকেটে নেমেই। টি-টুয়েন্টিতে সময় নেওয়ার সময় থাকে না। কিন্তু এই সিরিজের গতিতারকা ওশান থমাস আর এই ম্যাচ দিয়েই সব ফরম্যাট মিলে ক্যারিয়ারসেরা বোলিং ফিগার পেয়ে যাওয়া কটরেল তা হতে দিলেন কই!

উইন্ডিজ দল জানে শর্ট বলে সমস্যা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। সঙ্গে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি গতি যোগ হলে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি। আর বাংলাদেশ বুঝে নিয়েছিল, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ থমাস-কটরেলদের শুরুতেই মেরে ঠাণ্ডা করতে হবে। যে অনুশীলন আগের দিনই নেটে খুব করে নেওয়া গেছে নানাভাবে। সেই ভাবনাকে সত্যে রূপ দিতে গিয়ে তামিম ইকবাল, লিটন দাস আর সৌম্য সরকারের মতো ইনফর্ম ব্যাটসম্যান শুরুতেই দলকে বিপদে ফেলেন। জোরের ওপর আসা খাটো বলের উচ্চতার সঙ্গে সময়ের হেরফেরে প্রায় একই রকম শটে তিনজনের বিদায়। ওই শীর্ষ তিনের রানের যোগফল মাত্র ১৬। সাড়ে তিন ওভারের মধ্যে ৩১ রানে তাদের বিদায়।

এমন বিপদে অধিনায়ক সাকিব নেতার মতোই সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান। কিন্তু দেখা যায় সেরা পাঁচের মুশফিক ও মাহমুদউল্লাও ক্যাপ্টেনের পথ ধরে হাঁটতে পারেন না এদিন। একা লড়েন সাকিব। অষ্টম টি-টুয়েন্টি ফিফটির পর ব্যক্তিগত ৬১ রানে বিদায়। শুরুর মতো শেষেও টপাটপ উইকেট পড়ে। ২০ বলে ২৬ রানে ৫ উইকেট!

সুযোগটা ভালো। উইন্ডিজ ভাবল কেন তারা এই সংস্করণের বিশ্বসেরা তা চোখে আঙুল দিয়েই বিশ্বকে আরেকবার দেখিয়ে দেওয়া যাক। ইনফর্ম ওপেনার হোপ দ্বিতীয় ওভারেই তিন ছক্কায় বিপর্যয়ে ফেলেন তরুণ তারকা মেহেদী হাসান মিরাজকে। প্রত্যেকটাই বড়। ওই ওভারে ২৩। বিপজ্জনক এভিন লুইসও সেই পথে হেঁটে ১৮ রানে বিদায় নেন। তাতে ক্ষতি কিছু হয়নি হোপদের। তিন ওভার শেষে ৪৫। ছয় ওভারের পর ৯১/১। হোপ থামেন না। প্রথম পাঁচ ওভারে ভিন্ন পাঁচ বোলার ব্যবহার করেন সাকিব। লাভ হয় না। ষষ্ঠ ওভারে মিরাজ ফিরলে হোপ তাকে আরো দুটি ছক্কা ও একটি চারে স্বাগত জানান। প্রিয় বোলাররা নির্মম প্রহারের শিকার। দল হারছে। স্বাগতিক দর্শকদের এরপর হয় চলে যাওয়া নয় খাঁটি ক্রিকেটপ্রেমী হয়ে উঠে খেলার রস আস্বাদন করা ছাড়া উপায় থাকে না কোনো! মাঠের ঠিক বাইরের টিলাটা বিনা টিকিটের দর্শকে টইটুম্বুর হলেও দেখতে না দেখতে ওখানেও ভাটার টান।

হোপ ক্যারিয়ারের ছয় ম্যাচে মোটে ৫৯ রান করেছেন। সর্বোচ্চ ২৪। বাংলাদেশে তিন ওয়ানডেতে ২৯৭ রান করার পর এবার ১৬ বলেই ফিফটি। ছুঁয়ে ফেলেন টি-টুয়েন্টির তৃতীয় দ্রুততম হাফসেঞ্চুরির রেকর্ড। শেষে ২৩ বলে ৫৫ রানে শেষ হয় তার ৩ চার ও ৬ ছক্কার বিধ্বংসী ইনিংস। কিমো পল ২০০ স্ট্রাইকরেটে ২৮ রানে অপরাজিত। ছক্কার মার ৩টি। ১৬ বলে ২৩ রানে অপরাজিত নিকোলাস পুরানও নির্ভরতার গল্প লিখে গেছেন।

মাত্র ১০.৫ ওভার বল করার সুযোগ মিলেছে। বোলার ছয়জন। সবচেয়ে দুর্ভাগা মিরাজ দুই ওভারে ৩৭ রান দিয়ে উইকেটশূন্য। সবচেয়ে বেশি ওভার সাকিবের, ৩.৫। রান ৩২। একটি ওভার পেয়ে ১৫ করে খরচা দুই বিশেষজ্ঞ মোস্তাফিজুর রহমান আর আবু হায়দার রনির। পেস ও স্পিনÑ কোনোদিকেই স্বস্তি মেলেনি।

গত জুলাই থেকে এ পর্যন্ত উইন্ডিজের বিপক্ষে টানা চারটি সিরিজ জয়ের রেকর্ড বাংলাদেশের। কিন্তু যে ফরম্যাটে সেরা সেটাতেই শুরুতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিল এবার ক্যারিবিয়ানরা। স্বাগতিকদের সামনে তুলে দিল আরেকবার পা ফসকালেই সিরিজ হারানো হুমকি। সিলেটে খেলা দুই টি-টুয়েন্টির দুটিতেই হারল বাংলাদেশ। এখানেই এলোমেলো ব্যাটিং-বোলিং। অস্বস্তির কাঁটা নিয়ে সাকিবদের সামনে চলে এলো ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লেখার চ্যালেঞ্জ।