ইশতেহার যেন না হয় কথার কথা|112028|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
ইশতেহার যেন না হয় কথার কথা
রূপান্তর ডেস্ক

ইশতেহার যেন না হয় কথার কথা

মানুষ কাকে ভোট দেবে তা ঠিক করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলগুলোর মূল রাজনৈতিক কর্মসূচি আর রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা থাকে ইশতেহারে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইশতেহার দায়সারা বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে ঘোষণা করা ইশতেহার না সাধারণ ভোটারের কাছে পৌঁছায়, না ভোটাররা ইশতেহার বিচার করে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া, নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করা রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক জোট ইশতেহার অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে কি না, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সেই ওয়াদা পূরণ করছে কি না তা নিয়ে জবাবদিহি নেই বললেই চলে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র বারো দিন আগে গত মঙ্গলবার নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে ১০ বছর ধরে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের ‘দিনবদলের সনদ’, ২০১৪ সালের ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ এর পর এবারের ইশতেহারের শিরোনাম ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’। ৮০ পৃষ্ঠার এ ইশতেহারে ২১টি বিশেষ রাজনৈতিক অঙ্গীকার করেছে আওয়ামী লীগ। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে আগামী ৫ বছরে জিডিপি ১০ শতাংশে উন্নীত করা, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনকালে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা এবং ২০৩০ সালে মাথাপিছু আয় ৫ হাজার ৪৭৯ ডলারে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে দলটি।

একইদিনে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে ১২ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার বিধান, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, গণভোট পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তন, দুই কক্ষের সংসদ প্রতিষ্ঠা,  বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ, ন্যায়পাল নিয়োগ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট বাতিল, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিল ও বেকার ভাতা দেওয়াসহ ১৯ দফা অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। এদিকে, আগের দিন সোমবার আলাদাভাবে ইশতেহার ঘোষণা করে বিএনপিসহ অন্য কয়েকটি দল ও জোটকে নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সম্প্রতি আলোচনায় আসা কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত এই জোটের ইশতেহারে ১৪টি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার ও বিএনপির ইশতেহার প্রায় একইরকম। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার বিধান প্রশ্নেও একই অবস্থানে থাকলেও নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরাসরি কিছু জানায়নি ঐক্যফ্রন্ট। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ক্ষমতার নেপথ্য শক্তির মদদে যে তথাকথিত রাজনীতি সংস্কার কর্মসূচির প্রচার ছিল বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। কিন্তু চলমান যুদ্ধাপরাধের বিচার অব্যাহত রাখা প্রসঙ্গে ইশতেহারে নীরব থেকেছে বিএনপি। এছাড়া ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা তুলে দেওয়ার ঘোষণাটি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার কেবল প্রতিশ্রুতি আর প্রচারসর্বস্ব বুলির সমাহার না হয়ে আরো বেশি সুচিন্তিত রাজনৈতিক কর্মসূচি-নির্ভর হওয়া প্রয়োজন। ইশতেহারের প্রতিপাদ্য বিষয়গুলো নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ-বিতর্কের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করে নাগরিকদের জন্য নানা পর্যায়ে উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করতে পারে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারের নানা পর্যালোচনা প্রকাশে সংবাদ মাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকাও অত্যন্ত জরুরি। এই সবকিছুর জন্যই নির্বাচনের উত্তুঙ্গ ডামাডোলের বেশ আগেই ইশতেহার ঘোষণা করা এবং দেশের জনগণের কাছে যথাযথভাবে তা পৌঁছে দেওয়াটা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব।

রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহারকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্ত করার পথকে প্রসারিত করতে পারে। সে জন্য অবশ্যই নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে ক্ষমতায় যাওয়ার পর নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দল বা জোটের সাফল্য এবং ব্যর্থতার মূল্যায়ন আর জবাবদিহি নিয়ে নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলার সংস্কৃতিতে আসতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।