খেলাপি ঋণে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ|112041|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
খেলাপি ঋণে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ
আলতাফ মাসুদ

খেলাপি ঋণে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ

মন্দঋণের কবলে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো হাবুডুবু খাচ্ছে; বিপুল পরিমাণ অর্থ সঞ্চিতি হিসেবে সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এর প্রভাবে ব্যাংক খাতে নিট মুনাফা কমেছে; কোনো কোনো ব্যাংক পড়েছে লোকসানে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে নয় মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকায়।

২০১৭ সাল শেষে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ ছিল মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়। ব্যাংকগুলোর অবলোপন করা প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করা হলে বাংলাদেশের প্রকৃত খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় এক লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের অনুপাত মোট বিতরণ করা ঋণের ২ শতাংশের মধ্যে রাখতে হয়, যা বাংলাদেশ কখনোই অর্জন করতে পারেনি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাাতিক মানদণ্ড বজায় রেখেছে শুধু নেপাল। দেশটির খেলাপি ঋণ মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ। আইন ও নীতির কঠোর বাস্তবায়ন করে দ্রুত খেলাপি ঋণ কমিয়েছে শ্রীলঙ্কাও। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারত খেলাপি ঋণে বাংলাদেশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। আর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তানের অবস্থান রয়েছে বাংলাদেশের পরেই। এ দেশটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১২ দশমিক ২ শতাংশ।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও বেসরকারি ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক সময় প্রকৃতিগতভাবে কিছু ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ে। আবার ব্যবসায়ে লোকসান ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও কিছু খেলাপি হয়। তবে ব্যাংক খাতে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের নিয়ে। এদের বিরুদ্ধে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না। এই ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারায় অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছেন। এই খেলাপিদের আইনগতভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যে যদি আনা যায়, তাহলে খেলাপি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।’

আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে তারা রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ক্ষমতাহীন করে রাখা হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংক লোপাটের পর বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর অপসারণ চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর সরকারকে চিঠি দিলেও তা মানা হয়নি। তার মানে হচ্ছে, সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে এই কাজগুলো হতে পারে না। সোনালী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকে যা কিছু হয়েছে, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় আমানত সংগ্রহ ও ঋণ দেওয়ায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। ২০১৭ সাল শেষে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার দাঁড়ায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি ডলারে, যেখানে এখন ৫৮টি ব্যাংক রয়েছে। মালয়েশিয়ার জিডিপি বাংলাদেশের কাছাকাছি হলেও সেখানে ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র ২৬টি। সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি ডলারের জিডিপির দেশ থাইল্যান্ডে ব্যাংকের সংখ্যা ২২টি। আর বাংলাদেশের চেয়ে ১০ গুণ বড় অর্থনীতির দেশ ভারতে ব্যাংকের সংখ্যা ৫৩টি।

ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘সরকার বাংলাদেশ ব্যাংককে আইন অনুযায়ী চলতে দেয় না।

কোনো ব্যাংককে লাইসেন্স দেওয়ার এখতিয়ার সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকের। এ বিষয়ে সরকারের কোনো সুপারিশের কথা আইনে নাই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আপত্তি জানানোর পরেও প্রতিষ্ঠানটিকে বাধ্য করা হয়েছে নতুন ব্যাংক দেওয়ার জন্য।’

বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, খেলাপি ঋণের অনুপাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বা এর কাছাকাছি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে এশিয়ার কয়েকটি দেশ রয়েছে। মালয়েশিয়ায় ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ গ্রাহকরা দেশ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি পায় না। থাইল্যান্ড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (এএমসি) গঠন করে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে সফলতা পেয়েছে। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা রক্ষণশীল হয়ে উঠছে।

১৯৯৯ সালে শ্রীলঙ্কায় খেলাপি ঋণের হার ছিল মোট ঋণের ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০১৭ সাল শেষে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে।

খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। দেশটিতে খেলাপিদের ওপর উড়োজাহাজ ও উচ্চগতির ট্রেনের টিকিট ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। করপোরেট সংস্থার নির্বাহী কিংবা প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করতে পারেন না খেলাপিরা। এমনকি খেলাপিরা ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কোনো হোটেল সুবিধা নিতে পারেন না, রিয়েল এস্টেট কিনতে পারেন না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। আর সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। সরকার কঠোর হলে খেলাপি ঋণ কমে আসবে দ্রুত। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো শক্তিশালী করতে হবে।