৭২ কোটি টাকার ৩ জাহাজ নিয়ে বিপাকে চবক|112223|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
৭২ কোটি টাকার ৩ জাহাজ নিয়ে বিপাকে চবক
শামসুল ইসলাম, চট্টগ্রাম

৭২ কোটি টাকার ৩ জাহাজ নিয়ে বিপাকে চবক

পাঁচ বছর আগে কেনা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) কনটেইনারবাহী তিনটি জাহাজ আট মাস ধরে পড়ে আছে। এতে চবক প্রতি মাসে জাহাজগুলো থেকে অন্তত ৪০ লাখ টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর-পানগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) নৌপথে কনটেইনার পরিবহনের জন্য ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে এই তিনটি জাহাজ কেনা হয়েছিল।

প্রথম দুই বছর নিজেরা পরিচালনার পর জাহাজগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপের কাছে মাসিক ৪২ লাখ টাকা ভাড়ায় পাঁচ বছরের পরিচালনা চুক্তিতে ছেড়ে দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এরপর চট্টগ্রাম বন্দর-পানগাঁও পথে দুই বছর দশ মাস কনটেইনার পরিবহন করে আসছিল। কিন্তু আমদানি-রপ্তানিকারকরা জাহাজে এই পথে কনটেইনার পরিবহনে খুব একটা আগ্রহী হননি। এ অবস্থায় ওই পথে জাহাজ পরিচালনা অলাভজনক উল্লেখ করে আট মাস আগে সামিট গ্রুপ জাহাজগুলো পরিচালনায় অপারগতা জানায় এবং বন্দরকে ফেরত দেয়। যা এখন অনেকটা বন্দরের গলায় কাঁটায় পরিণত হয়েছে।  চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সামিট গ্রুপ ফেরত দেওয়ার পর জাহাজ তিনটি নতুন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

দরপত্রে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া না গেলে প্রয়োজনে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে জানান চট্টগ্রাম বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম।

বন্দর সূত্র জানায়, পানগাঁও এক্সপ্রেস, পানগাঁও সাকসেস ও পানগাঁও ভিশন নামে জাহাজ তিনটি চট্টগ্রাম বন্দর-পানগাঁও পথে করটেইনারের পরিবহনের জন্য ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর সামিট গ্রুপের কাছে ভাড়া দ্ওেয়া হয়। প্রতিটি জাহাজের জন্য ১৪ লাখ টাকা হিসাবে তিনটি জাহাজের মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৪২ লাখ টাকা। এ সময় সামিট গ্রুপের সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য ভাড়ার চুক্তি হয়। কিন্তু দুই বছর দশ মাস চালানোর পর অলাভজনক উল্লেখ করে চলতি বছরের এপ্রিলে সামিট গ্রুপ জাহাজগুলো বন্দর কর্তৃপক্ষকে ফেরত দেয়। এর মধ্যে ৭২ কোটি টাকায় কেনা জাহাজগুলোর ভাড়া থেকে উঠে আসে মাত্র ১৫ কোটি টাকা। ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম জানান, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জাহাজগুলো যে অবস্থায় তারা গ্রহণ করেছে ওই অবস্থায় ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো ধরনের মেরামত (ডকিং) ছাড়াই সামিট গ্রুপ এসব জাহাজ ফেরত দিয়েছে। এসব জাহাজ মেরামতের জন্য জাহাজপ্রতি চার কোটি টাকা করে মোট ১২ কোটি টাকা ব্যয় হবে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার পরিবহনে খরচ কমানো এবং সড়ক ও রেলপথের ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জের পানগাঁওয়ে কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৯৩ সালে। বন্দরের অর্থায়নে ৮৮ একর জমির ওপর পানগাঁও আইসিটি (ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল) নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ২০১১ সালে। এ সময় ওই পথে পরিচালনার জন্য সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ৩২টি জাহাজ কেনার অনুমতি নেয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাইসেন্স গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একটি জাহাজও চালু করেনি। এতে ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পানগাঁও টার্মিনাল নিয়ে বিপাকে পড়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় ওই পথে কনটেইনার পরিবহনের জন্য নিজস্ব অর্থায়নে তিনটি জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। ২০১৩ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়ার ফেয়ার সি শিপিং থেকে কেনা জাহাজ তিনটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। এরপর জাহাজ তিনটি দিয়ে এই পথে কনটেইনার পরিবহন শুরু করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় শুরুতেই হোঁচট খায় তারা। এসব জাহাজে দেড় বছরে মাত্র ১ হাজার ২০০ টিইইউস (টুয়েন্টি ফিট ইকুয়াল ইউনিট) কনটেইনার পরিবহন করা হয়। জাহাজগুলো দিনের পর দিন পড়ে থাকার কারণে বিপাকে পড়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাই শেষ পর্যন্ত তা বেসরকারি পর্যায়ে ভাড়ায় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

সামিট গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম মজুমদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে অপারগতা জানান। চট্টগ্রাম বন্দর-পানগাঁও নৌপথে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পানগাঁও আইসিটি এখনো অতটা পরিচিত হয়ে ওঠেনি। যে কারণে এখান থেকে পানগাঁও দিয়ে পণ্য নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁদের এখনো আগ্রহী করে তোলা যায়নি। এ অবস্থায় কেবল আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহনের মাধ্যমে এটি লাভজনক করা সম্ভব নয়।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছে প্রধান বিবেচ্য হচ্ছে সময় ও সার্বিক ব্যয়। চট্টগ্রাম বন্দর-পানগাঁও পথে কনটেইনার পরিবহনে ব্যবসায়ীদের টানতে হলে এ দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।