জহির রায়হান আমার চুল ঠিক করে দিলেন: রুনু দাস|112323|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২১:৫৭
জহির রায়হান আমার চুল ঠিক করে দিলেন: রুনু দাস
তামজিদ হাসান

জহির রায়হান আমার চুল ঠিক করে দিলেন: রুনু দাস

ছবি: নূর

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতের টাকি ক্যাম্পে সবচেয়ে কম বয়সী তরুণী হলেন রুনু দাস। তার সুযোগ হয়েছিল জহির রায়হানের ক্যামেরায় কাজ করার। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় তার কিছু ছবি প্রকাশ পায় ‘স্টপ জেনোসাইড, সেভেন ডেইজ ও লেট দেয়ার বি লাইট’ সিনেমায়। জহির রায়হানকে তিনি দেখেছেন খুব কাছ থেকে। বিজয়ের মাসে দেশ রূপান্তরের কথা হয় তার সঙ্গে জহির রায়হান ও তার নির্মিত সিনেমা নিয়ে। 

দেশ রূপান্তর : তার জীবন ও মনন সম্পর্কে আপনার কাছে জানতে চাই...
রুনু দাস : আমি যতটুকু তাকে চিনি তিনি একজন কর্মঠ মানুষ ছিলেন। সারা দিন তিনি মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরতেন, ছবি তুলতেন। তিনি ছিলেন অত্যš— হাস্যোজ্জ্বল মানুষ। 
দেশ রূপান্তর : আপনি জহির রায়হানকে কীভাবে দেখেছেন?
রুনু দাস : আমি জহির রায়হানকে দেখেছি অনেক কাছ থেকে। তখন তার বয়স ছিল ৫৫ কিন্তু তাকে দেখলে মনে হতো তার বয়স ২৫। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভালো মানুষ। মিশুক মানুষ, ক্যাম্পে  ছবি তোলার পাশাপাশি তিনি সবার সাথেই হাসিমুখে কথা বলতেন। আমার তখনকার বয়সে যা মনে হয়েছে তিনি দলমত নির্বিশেষে জনগণের একজন লোক ছিলেন। তার মধ্যে জটিলতা দেখিনি। তিনি অনেক জলি মাইন্ডের মানুষ ছিলেন। সব সময় হাসিখুশি থাকতেন। 
দেশ রূপান্তর : তার করা কাজগুলোর বিষয়ে জানতে চাই...
রুনু দাস : তার কাজগুলো নিয়ে সে সময় আমি বিশেষ কিছু জানতে পারিনি। কারণ তখন তো আমি অনেক ছোট ছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জানতে পারি তার নির্মাণ করা স্টপ জেনোসাইড, সেভেন ডেইজ, লেট দেয়ার বি লাইট ছবিতে আমার ছবি দেখানো হয়েছিল।
দেশ রূপান্তর : জহির রায়হান নাইন মান্থস টু ফ্রিডম প্রামাণ্যচিত্রের সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি রাজনীতিবিদ নই। আপনি এ বিষয়ে কী বলতে চান?
রুনু দাস : জহির রায়হান সম্পর্কে আমি এতটুকু বলতে পারব, তিনি দলমত নির্বিশেষে একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে কাজ করেছিলেন তৎকালীন সময়ে। তার মধ্যে ছিল দেশপ্রেম। তিনি কাজ করেছিলেন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। তিনি ছিলেন দলনিরপেক্ষ।
দেশ রূপান্তর : তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
রুনু দাস : ওনাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তখন আমি আমার বাবাকে বলেছিলাম, বাবা উনি কিন্তু আমাদের বাড়ির ঠিকানা আপনার নাম আমার কাছ থেকে লিখে নিয়েছিলেন। উনি বেঁচে থাকলে হয়তো আমাদের বাড়ি আসতেন। আমি বাবাকে বলছিলাম হয়তো উনি আমাকে সিনেমায় নিয়ে যেতেন ববিতার মতো। বাবা বলছিল ধুর পাগলি মেয়ে আমি তোকে সিনেমায় নিয়ে যেতে দেব নাকি? তুই বাইরে পড়াশুনা করবি। তিনি বেঁচে থাকলে তার সাথে হয়তো আরও ক্লোজলি কথা বলতাম।
দেশ রূপান্তর : আপনার কি কখনো সিনেমায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল?
রুনু দাস : না আমার কখনো সিনেমায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। আমার ইচ্ছে ছিল পড়াশুনা করে ব্যাংকার অথবা ম্যাজিস্ট্রেট হব। আমার দুই জায়গাতে চাকরিও হয়েছিল। মহিলা পরিষদের জন্য যেতে পারিনি।
দেশ রূপান্তর : স্টপ জেনোসাইড প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাণের গল্প সম্পর্কে জানতে চাই...
রুনু দাস : শুটিংয়ের সময় হাসনাবাদ ক্যাম্পের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নোংরা। সে সময় ওই পরিবেশে কাজ করেছিলাম। সারা দিন শুটিং করেছিলেন তিনি। তার দিকনির্দেশনামতো আমি কখনো পিতলের কলস নিয়ে নদীর ধারে পানি নেওয়া আবার কখনো কলস রেখে হাতে স্টেনগান নিয়ে যুদ্ধ করা প্রভৃতি দৃশ্যের শুটিং করেছিলাম সে সময়। 
দেশ রূপান্তর : আপনি কখন আপনার করা কাজগুলো দেখেছিলেন? 
রুনু দাস : ১৯৭২-এ আমি যখন দেশে ফিরলাম, ফিরে জানতে পারলাম আমার টিম লিডারকে তার স্বামী বলেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’-এ আমার ছবি আছে। আমি তখন ইন্টার পরীক্ষা দেব। পরে আর ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবিটি দেখতে পারিনি। তারপর তারা ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ ও ‘সেভেন ডেইজ’ ছবিতেও নাকি আমার ছবি দেখেছে।
তবে অনেক পরে ঢাকায় ফিরে আমি আমার করা কাজগুলো দেখেছি। 
দেশ রূপান্তর : সে সময়ের কোনো স্মরণীয় ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাই...
রুনু দাস : স্মরণীয় ঘটনা বলতে, আমার একসময় অনেক বড় চুল ছিল। ট্রেনিংয়ের সময় আমরা টাইট করে চুল বেঁধে যেতাম। উনি একবার বলেছিলেন সব মেয়ের চুল খুলতে হবে, মানে উনি একটা ছবি নেবেন। সব থেকে বড় চুল ছিল আমার। আমি চুল ঝাড়িওনি, তখন মনে হলো তিনি আমার চুল ঠিক করে দিলেন (এটা কিন্তু কোনো লেখার বিষয় না আমার মনে হয়েছিল)। তবে আমার ভালোমতো মনে আছে  আমি ওনার ডায়েরিতে আমার বাড়ির ঠিকানা, আমার বাবার নাম লিখে দিয়েছিলাম।
দেশ রূপান্তর : আপনি কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন?
রুনু দাস : এত কম বয়সে ট্রেনিংয়ে যাচ্ছি। যুদ্ধ করব, সোনার বাংলা গড়ব। আমার কিন্তু খুব ইচ্ছে ছিল আমার সোনার বাংলায় বাস করব। সেটা কি আমরা পেরেছি? মনে হয় তো না।
দেশ রূপান্তর : তিনি কীভাবে কাজ করেছিলেন?
রুনু দাস : তিনি ক্যাম্পে আসা সবার সাথে কথা বলেছেন। তবে আমার সাথে বেশি কথা বলেছেন। সবার কাছে জানতে চেয়েছেন আমাদের ট্রেনিং করতে কেমন লাগছে? মা-বাবা কোথায়? তাদের কথা মনে পড়ছে কি না? আমরা ট্রেনিংয়ে নিজ ইচ্ছায় আসলাম কি না? 
আমার যতটা মনে পড়ে আমি ট্রেনিংয়ে খুব বেশি মনোযোগী ছিলাম। তার (জহির রায়হান) সাথে কথা বলতাম আর ভাবতাম ট্রেনিংয়ের অনেক কিছু মিস করলাম। আমি চেষ্টা করতাম ট্রেনিংয়ের সবকিছু শেখার যাতে করে আমি পরে সে বিষয়গুলোকে কাজে লাগাতে পারি।
তবে তিনি ক্যাম্পে সব সময় বেশি আমার সাথে কথা বলতেন, দেখতেন আমি কীভাবে কাজ করছি, কীভাবে স্টেনগানটা ধরছি, ক্রলিং করছি? উনি সবকিছুরই ছবি তুলে রাখতেন।
দেশ রূপান্তর : তিনি কেন এটা করতে করতে যাচ্ছেন এ ব্যাপারে কিছু বলেছিলেন?
রুনু দাস : না উনি এ ব্যাপারে আমাকে কিছু বলেননি। আমি তখন পোলাপান মানুষ। হয়তো বা আমার টিম লিডারকে বলেছিলেন। আমি তার অত ঘনিষ্ঠ ছিলাম না। বাবা নেই মা নেই। আমি একজন ছোট মামুষ, কী প্রশ্ন করবে কী উত্তর দেব, সব সময় একট ভীতি কাজ করত। 
আমার মনে হয়েছিল উনি একবার বললেন, উনি সারা দিনের ছবি দিয়ে আমাকে নিয়েই একটা ছবি বানাবেন। হাছনাবাদ এলাকায় পিতলের কলসি দিয়ে জল তুলছি, যুদ্ধ করছি, উনি সবকিছুর ছবি নিলেন। তবে সারা দিন শাড়ি পরে থাকা কষ্টকর ছিল।
দেশ রূপান্তর : তাকে নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী ছিল?
রুনু দাস : উনি যখন আমাদের ট্রেনিংয়ের ছবি নিচ্ছেন, তখন উনি আমাকে বললেন, তোমার বাবার নামসহ তোমার বাড়ির ঠিকানা দাও। তখন আমি ভাবলাম কেন উনি আমার বাড়ির ঠিকানা চাচ্ছেন? ওইটুকু সময়ের মধ্যে আমি ধারণা করে নিলাম হয়তো বা স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে উনি আমার বাড়িতে গিয়ে আমাকে খুঁজবেন। হয়তো বা আমায় কিছু উপহারও দিতে পারেন। কারণ আমি তার মাঝে দেখেছি মানুষের জন্য আবেগ আর ভালোবাসা ।
দেশ রূপান্তর : মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত ছবিগুলো সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন...
রুনু দাস : মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি তৈরি হচ্ছে তবে কোথায় যেন একটা গ্যাপ রয়েছে।  ওনাদের মতো মানুষ থাকলে সিনেমা জগৎকে তারা অন্যরকম করে দাঁড় করাতেন। জহির রায়হানের মতো মানুষের বেঁচে থাকা দরকার ছিল। এসব ক্ষতি কোনো দিন পূরণ হবে না। তিনি ববিতা, সুচন্দা তৈরি করেছেন।