রাজনীতিবিদরা এক হলেই পুলিশের দলীয়করণ বন্ধ হবে|112337|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
রাজনীতিবিদরা এক হলেই পুলিশের দলীয়করণ বন্ধ হবে
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজনীতিবিদরা এক হলেই পুলিশের দলীয়করণ বন্ধ হবে

পুলিশ জনগণের বন্ধু- এই স্লোগান এবং বাস্তবতার মধ্যে অমিলই বেশি। এই স্লোগান ফলপ্রসূ করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

পুলিশ জনগণের বন্ধু, এটাই হওয়ার কথা। জনগণের যেকোনো সংকটে পুলিশ পাশে থাকবে, আইনি সহায়তা দেবে। কিন্তু অনেক সময় পুলিশের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব তৈরি হয়। মাঝেমধ্যে কিছু কারণে জনগণ মনে করে পুলিশ তাদের বন্ধু নয়, আবার পুলিশও মনে করে জনগণ তাদের বন্ধু নয়। এই ফারাক দূর করতে হবে।

সুশীলসমাজসহ দেশের জনগণ যদি পুলিশের কাছ থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে মাঝখানে একটি দালাল-শ্রেণি সুযোগটা নিয়ে নেয়।

এই ধরুন, আমি ৯৯৯ করেছি (এটা আমার স্বপ্ন ছিল)। একটা লোক যখন বিপদে পড়ে তখন তো তাৎক্ষণিক পুলিশি সহায়তা পায় না। কিন্তু এটা করার পর এখন সহজেই জনগণ পুলিশের সহায়তা পায়। আমরা সবসময় বলি, পুলিশের সঙ্গে আপনারা সম্পৃক্ত হবেন।

পুলিশের যদি দোষত্রুটি বা ব্যর্থতা থাকে, তা ধরিয়ে দিতে হবে। একইভাবে পুলিশও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

সব সরকারের আমলেই পুলিশে রাজনীতিকরণের অভিযোগ থাকে। পুলিশ আসলে কতটা রাজনীতিকরণ হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

ব্রিটিশ আমল থেকেই পুলিশের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আসছে। রাজনীতিবিদরা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তখন তারা মনে করেন রাষ্ট্রের সব প্রশাসনিক অবকাঠামো তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তাদের কথায় চলবে। পুলিশ তো প্রশাসনিক অবকাঠামো। কমবেশি থাকলেও ক্ষমতাসীন দল পুলিশকে দলীয় বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে।

পুলিশকে আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকেই চলতে হয়। এর বাইরে গিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। এসব অভিযোগ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হচ্ছে- সব রাজনৈতিক দল যদি এক হয়ে বলে, আমরা পুলিশকে আর ব্যবহার করব না; তাহলেই এসব বন্ধ হবে। আর না হয় ওইসব অভিযোগ উঠতেই থাকবে।

টিআইবি প্রায়ই পুলিশকে দুর্নীতিবাজ বলে আখ্যায়িত করে প্রতিবেদন দিচ্ছে? প্রকৃতপক্ষে পুলিশে দুর্নীতি কতটুকু?

দুর্নীতি শুধু পুলিশে হচ্ছে না। পুলিশ তো সমাজেরই অংশ। পুলিশকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে হবে না।

সমাজ, রাষ্ট্র বা প্রশাসনের কোথায় দুর্নীতি হয় না, তা সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। পুলিশকে ঢালাওভাবে দুর্নীতিবাজ বলা ঠিক হবে না। এখনো পুলিশের মধ্যে ভালো ভালো অফিসার রয়েছেন। মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে তাদের ধারেকাছেও যেতে পারবেন না। তবে পুলিশে যে দুর্নীতি নেই, তা আমি বলব না। কমবেশি তো আছে।

দুর্নীতি কমানোর জন্য সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢালাওভাবে অভিযোগ করলে পুলিশের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও বদনাম হয়।

পুলিশ সংস্কার আইন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা হচ্ছে। আপনি আইজিপি থাকাকালে সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েও করতে পারেননি। পুলিশে কি আসলে সংস্কার হবে?
ওয়ান-ইলেভেনের সময় পুলিশ সংস্কারের বিষয়টি অনেক দূর এগিয়েছিল। পুলিশের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তবে একটি গ্রুপ পুলিশে সংস্কার চাচ্ছিল না।

মূলত তাদের কারণে সংস্কারের কাজ এগোয়নি। এটি এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিপফ্রিজে আটকে আছে। আসলে পুলিশে সংস্কার হওয়া উচিত। এ জন্য রাজনৈতিক নেতাদের আগ্রহ থাকতে হবে। আমলাদের আগ্রহ থাকতে হবে। পাকিস্তানেও পুলিশে সংস্কার হয়েছে। পারভেজ মোশাররফ ক্ষমতায় থাকাকালে এটি করেছেন। তিনি রাজনৈতিক নেতা বা আমলাদের কোনো পাত্তা দেননি।

এবারই প্রথম নির্বাচনের সময় বৈধ অস্ত্রধারীরা তাদের অস্ত্র জমা দেবেন না। গত দশ বছরে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের কয়েক হাজার নেতা অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছেন। এই অবস্থায় কতটা শঙ্কাহীন পরিস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আপনি মনে করেন? বৈধ অস্ত্রের সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

আগের নির্বাচনগুলোতে বৈধ অস্ত্র জমা দিতে হতো। এবারই প্রথম তা করতে হচ্ছে না। অনেক সময় বৈধ অস্ত্রের অজুহাত দেখিয়ে অবৈধ কাজে ব্যবহৃত হয়। এই নিয়ে প্রশ্ন উঠছে তা সত্য, তবে প্রার্থীরা নিরাপত্তার জন্য বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করতে চান বলে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেছেন। এসব শঙ্কার কারণে কমিশন বৈধ অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ক্রিমিনালরা কিন্তু অস্ত্রের লাইসেন্স পায় না। তবে অপব্যবহার করলে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এই বছর নির্বাচন কমিশন বৈধ অস্ত্রের ব্যবহার টেস্ট কেস হিসেবে নিয়েছে বলে আমার মনে হচ্ছে।

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পুলিশ ৯শ কোটি টাকার বাজেট চেয়েছে। নির্বাচন কমিশন ৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। নির্বাচন কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপে হবে না। যে জনপদে পুলিশ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে, সেখানেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পুলিশ যদি ধারাবাহিকভাবে আইনশৃঙ্খলা সুষ্ঠু রাখতে পারে, তাহলে নির্বাচনের সময় পারবে না কেন। তাছাড়া এই যে সাড়ে সাতশ কোটি টাকা ব্যয় হবে, তার কতটুকু সাসটেইন্যাবল হবে? এই বরাদ্দকে আপনি কীভাবে দেখেন।

নির্বাচন কমিশনের এত টাকা দেওয়ার কথা নয়। নির্বাচনে পুলিশের অনেক কাজ বাড়ে। এক ইউনিট থেকে আরেক ইউনিটে পুলিশ পাঠাতে হয়।

দেশের এক স্থান থেকে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। হাজার হাজার গাড়ি ভাড়া নিতে হয়। তেলের খরচ দিতে হয়। ক্ষতি হলে গাড়ির ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। পুলিশকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই পুলিশের কাজ শুরু হয়। নির্বাচন শেষ হওয়ার ১৫ দিন পরও এই বাজেটের মধ্যে কাজ করতে হয়। পুলিশ যে বাজেট দিয়েছে ওই বাজেটই খরচ হয়। কমিশন যে টাকা দেয়, তা দিয়ে হয় না।

২০০১ সালে ১ হাজার ২০৫ জনের বিপরীতে একজন পুলিশ ছিল। এখন ৮২৮ জনের বিপরীতে একজন পুলিশ। পুলিশ নিয়োগ বৃদ্ধির ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়েছে কি?

জনগণের তুলনায় বাংলাদেশের পুলিশের সংখ্যা কম। ভারত ও পাকিস্তানে পুলিশের অনুপাত আরো বেশি। আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে পুলিশের চাহিদা বেশি।

আপনি মিলাদ মাহফিল করবেন, সেখানেও পুলিশ পাঠাতে হচ্ছে। বিয়ের অনুষ্ঠানেও পুলিশ থাকতে হয়। সবক্ষেত্রেই পুলিশের চাহিদা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ৮০ হাজার পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যার ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। রাজনৈতিক কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া দেশের পরিস্থিতি ভালো। পুলিশের দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে তাদের সক্ষমতা বেড়েছে। জনগণের চাহিদার তুলনায় পুলিশে আরো লোকবল বাড়ানো উচিত।

বর্তমানে গায়েবি মামলা হচ্ছে। এর শিকার হচ্ছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। এই অবস্থায় নির্বাচনী মাঠ কি লেভেল প্লেয়িং হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

গায়েবি মামলা উচ্চারণটি মিডিয়ার টার্ম। গায়েবি বলে কোনো শব্দ নেই। নির্দোষ ব্যক্তিকে কেন আসামি করা হচ্ছে, তা তদন্ত করা উচিত। কী কারণে এসব মামলা হয়েছে তা খুঁজে বের করতে হবে।

কোনো কর্মকর্তা এসব ঘটনায় জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। গায়েবি মামলার ফলে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। মৃত ব্যক্তি কীভাবে আসামি হচ্ছে, তা হাস্যকর। আমি আশা করব, পুলিশ প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।

সাইবার ক্রাইম, মানি লন্ডারিং, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতিসহ বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ হচ্ছে। অর্থাৎ দিন দিনই অপরাধের ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। এ অবস্থায় ২০২৫ সালে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশের সক্ষমতা আছে কি না, বা কী ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার বলে আপনি মনে করেন।

অপরাধের ধরন যেমন পাল্টেছে পুলিশের দক্ষতাও অনেক বেড়েছে। আমি আইজিপি থাকতে সাইবার ক্রাইম ইউনিট করার চেষ্টা করেছিলাম। ওই ইউনিটটি সিআইডির অধীনে আছে। মানি লন্ডারিং মামলাগুলো সিআইডি ও দুর্নীতি দমন কমিশন দেখছে। ক্রেডিড কার্ড জালিয়াতির বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকও তদন্ত করছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধ করতে পুলিশের ব্যাপক সক্ষমতা রয়েছে। ২০২৫ সালে পুলিশের সক্ষমতা কমবে না বলে আমি বিশ্বাস করি।

বিভিন্ন সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ ওঠে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এসব অপরাধ তদন্তের জন্য স্বাধীন কমিশন থাকে। বাংলাদেশে এ ধরনের সংস্থার অস্তিত্ব নেই। এই অবস্থায় সরকারের করণীয় কী?

পুলিশ সংস্কারের প্রতিবেদনে এই বিষয়টি ছিল। কমপ্লেইন কমিশন করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এটি আলোর মুখ দেখেনি। পুলিশ যেসব তদন্ত করে সেগুলোতে কোনো সমস্যা হয় না। নিরপেক্ষভাবেই তদন্ত করা হয়। বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, পুলিশ যেসব তদন্ত করে সেখানে স্বজনপ্রীতি করা হয় না। পুলিশ সংস্কারটি হয়ে গেলে এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠত না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষকে তুলে নেওয়া হচ্ছে। নিয়মানুসারে আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের আদালতে হাজির করতে হয়। অথচ তাদের মাসের পর মাস আটকে রাখা হচ্ছে। এসব ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা শোনা যায় না। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য কী করা দরকার।

এটা তো বেআইনি কাজ। ধরার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যে কাউকে আদালতে হাজির করতে হয়। এটা যদি কেউ না করে তাহলে সে আইন অমান্য করে। বেআইনি কাজ করতে পারবে না পুলিশ। পুলিশকে জবাবদিহি করতে হবে। যারা এসব কাজ করছে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

মাসের পর মাস ধরে কেউ কাউকে আটক রাখতে পারে না। হয়তো ২-৩ দিন রাখতে পারে। জবাবদিহির বাইরে পুলিশ থাকতেই পারে না। পুলিশকে আইনের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, কর্র্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, আদালতের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। সব ধরনের অপরাধের শাস্তি পেতে হয়।

মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার? কিন্তু পুলিশ-র‌্যাবের অভিযানের মধ্যেই মাদক কারবারিরা সক্রিয়। গডফাদার ও শীর্ষ ব্যবসায়ীরা আছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। দেশকে মাদকমুক্ত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার?

জিরো টলারেন্স নিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমেরিকায় মাদক নিয়ে যুদ্ধ করার পরও মাদক ব্যবহার কমছে না। মাদক নির্মূল করতে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।

পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযান আরো জোরালো করতে হবে। গডফাদার ও শীর্ষ কারবারিদের ধরতে হবে। টেকনাফের এমপি বদির বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। এই কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।