কামালের জামায়াত ডিলেমা|112385|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
কামালের জামায়াত ডিলেমা
সাইফুর রহমান তপন

কামালের জামায়াত ডিলেমা

গত ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন অন্য কোনো দল করবে কি না তিনি জানেন না, তবে জামায়াত থাকলে তার দল কোনো ঐক্য প্রক্রিয়ায় যাবে না। সম্ভবত ঘোষণাটি বিশ্বাসযোগ্য করতেই তিনি আরো বলেছিলেন, ‘সারা জীবনে করিনি, শেষ জীবনে করতে যাব কেন? ওরা তো এখন দল না। নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।’ কিন্তু তাকে কে কী বোঝাল, কিছুদিন পরই বিএনপি যখন তার দিকে এক হাত বাড়িয়ে দিল তিনি তা ধরলেন, যদিও তখন বিএনপির আরেক হাত ছিল জামায়াতের হাতে।

 

শুধু তা-ই নয়, বিকল্প ধারার সভাপতি বি. চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে গত সাত বছরে অন্তত পাঁচবার জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন কামাল। বি. চৌধুরীর সঙ্গে মিলেই জামায়াতকে বাদ দিয়ে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করবেন বলেও আগস্ট মাসের শেষ দিকে ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। তাকেও একপ্রকার অপমানজনকভাবে বাদ দিয়েই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করলেন কামাল হোসেন। বি চৌধুরীর অপরাধ ছিল, বিএনপিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে নেওয়ার ব্যাপারে তিনি একটা শর্ত দিয়েছিলেন যে, ‘স্বাধীনতাবিরোধী কোনো দল বা ব্যক্তিকে শরিক রাখলে বিএনপিকে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা যাবে না’।

 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, সংক্ষেপে যাকে সবাই জামাত বলে ডাকে, দলগতভাবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত। একই অভিযোগে আদালত কর্র্তৃক দণ্ডিত হয়ে এর শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই হয় ফাঁসিতে ঝুলেছেন অথবা কারাগারে আছেন। দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়েছে এর গঠনতন্ত্র দেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে। এত কিছুর পরও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শুধু জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সহাবস্থানকেই নয়, দেশের জন্মের বিরোধিতাকারী এ দলটির নেতাদের ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করাকেও মেনে নিয়েছে।

এ ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের অন্তত একটা অংশের মাঝে আজীবন ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির পক্ষে থাকা কামাল হোসেনের একটা উদারনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে; অন্যদিকে, জামাতকে সবাই চেনে একটা ফ্যাসিস্ট শক্তি হিসেবে, এদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে।

 

সম্ভবত, জামায়াত প্রশ্নে নিজের এ স্ববিরোধিতা কামালের মধ্যে ভীষণ একটা অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। আর এ কারণেই তিনি এ বিষয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দিতে অপ্রস্তুত বোধ করছেন। শুধু তা-ই নয়, কেউ এ ধরনের প্রশ্ন করলে তাকে রীতিমতো বকাবাদ্য করছেন। এমনকি গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ভুলে, তিনি যাদেরকে রুগ্ণ রাজনীতির ধারক-বাহক বলে গত কয়েক বছর ধরে বলে আসছেন তাদের মতো করে, প্রশ্নকারীকে ‘দেখে নেব’ বলে হুমকিও দিচ্ছেন।

সত্যিই, গত ১৪ই ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে, মিরপুরের বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে, চলমান নির্বাচনে জামাতের ২২ জন প্রার্থীর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মার্কা ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করা প্রসঙ্গে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়ায় ড. কামাল যেভাবে সাংবাদিকদের আক্রমণ করেছেন তা সচেতন সব মানুষকেই বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে যারা তাকে এদেশে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে সোচ্চার থাকতে দেখেছেন, তারা এ ঘটনায় খুব হতবাক হয়েছেন। এটা ঠিক যে বিব্রতকর প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে তিনি বহু কসরত করেছিলেন, আর সাংবাদিকরা তা বুঝতে পেরে প্রশ্নটা নিয়ে তাকে আরো চেপে ধরেছিল। এ কারণেই তিনি মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু এসব ব্যাখ্যার কোনোটাই তার ওই অস্বাভাবিক আচরণকে যৌক্তিক প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। বিষয়টা, সম্ভবত, তিনি নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন। তাই ঘটনা ঘটার পরদিনই বিবৃতি দিয়ে এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

 

মনে রাখতে হবে, ড. কামাল প্রথমদিকে, বিশেষ করে সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করার সময়ে, ধানের শীষ নিয়ে জামায়াত-প্রার্থীদের নির্বাচন করার বিষয়টা তিনি জানেন না বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি, ওই একই সময়ে একটা টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি এমনও বলেছিলেন যে, যদি জামায়াতের ওই নেতাদের তালিকা তাকে দেওয়া হয় তাহলে তিনি তা বাতিলের উদ্যোগ নেবেন!

আসলে তিনি ভালো করে জানেন, বিএনপি-জামায়াতের গাঁটছড়া ভাঙা তার পক্ষে সম্ভব নয়; আবার এ নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে তা পরিষ্কার করার কোনো উপায়ও তার জানা নেই। কথাটা এ কারণে বলা হলো যে, ড. কামালের সমর্থকরা যতই দাবি করুন, তারা বিএনপির কাছে ঐক্যের জন্য ধরনা দেননি, বিএনপিই এসেছে তাদের কাছে, ভোটের মাঠে বিএনপির কাছে তাদের চেয়ে জামায়াতের গুরুত্ব বেশি। মনে রাখতে হবে, এবারের নির্বাচনে বিএনপি ড. কামাল ও তার সহযোগী রব-মান্না-কাদের সিদ্দিকীর জন্য মাত্র ১৯টি আসন ছাড়লেও শুধু জামাতের জন্যই ছেড়েছে ২২টি আসন। উপরন্তু, জামাতকে বিএনপি ২২টি আসন ছেড়েছে এমন এক সময়ে যখন দলটি যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে প্রায় বিপর্যস্ত, জনগণের একটা বিরাট অংশের কাছে নিন্দিত। এটা ঠিক যে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধের বিচার অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আবার এটাও ঠিক যে বিএনপির নিজের ইশতেহারে এটা রাখা হয়নি। আর কে অস্বীকার করবে যে, ঐক্যফ্রন্ট যদি ক্ষমতায় যায়ও ভোটের শক্তিতে বিএনপি ও জামায়াতসহ তার পুরোনো মিত্রদের কাছে ড. কামাল ও তার উদারনৈতিক সহযোগীরা কোনো পাত্তাই পাবেন না।

প্রশ্ন হতে পারে, ড. কামাল জামায়াতের বিষয়টা আগেভাগে ফয়সালা করে বিএনপির সঙ্গে জোট করলেন না কেন? এক কথায় এর উত্তর হলো, এ রকম কিছু করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। কারণ বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করার প্রয়োজন তাদের দিক থেকেও কম ছিল না। ড. কামাল এবং তার সহযোগীদের প্রায় সবাই একসময়ে আওয়ামী লীগ করলেও দিনে দিনে দলটির সঙ্গে নানা কারণে তাদের বৈরিতা বেড়েছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরে তাদের পর্বতের মতো মনে হলেও, বাস্তবে মূষিক প্রসবেরও সামর্থ্য তাদের নেই।

২০০৭-০৮ সালে ১/১১-এর সময়ে মাইনাস টু ফর্মুলা (অনেকের মতে, যা ছিল মূলত শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে বিদায় করার ষড়যন্ত্র) বাস্তবায়নে তারা যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তার কারণও এর মাঝে নিহিত। স্বাধীনতার আগে থেকেই এদেশের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে; এখনো মুক্তিযুদ্ধ মানেই আওয়ামী লীগ আর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মানে প্রধানত জামায়াত। তাই কেউ যদি অন্ধভাবে আওয়ামী লীগ বিরোধিতা করতে যায় তাকে একসময় জামায়াতের খপ্পরে পড়তে হয়, যেমনটা পড়েছেন ড. কামাল ও তার সঙ্গী-সাথীরা। তিনি যতদিন এ পাঁকে ডুবে থাকবেন ততদিন জামায়াত প্রশ্ন তাকে তাড়া করে ফিরবেই।