মানুষ পায় না দেখা সত্য শঙ্খনদী তীর|112434|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
মানুষ পায় না দেখা সত্য শঙ্খনদী তীর
প্রতিদিন ডেস্ক

মানুষ পায় না দেখা সত্য শঙ্খনদী তীর

পাভেল রহমান সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার মঞ্চনাটকে সাহিত্য অনুপস্থিত, কমে গেছে মৌলিক নাটকের সংখ্যা। এখন মঞ্চে অনুবাদ-রূপান্তর নাটকের সংখ্যা বেশি। এমন নানা কথা প্রচলিত রয়েছে। ঠিক সেই সময়ে ‘রুধিররঙ্গিণী’ নিঃসন্দেহে ভিন্নতর সংযোজন। চলতি বছরের মাঝামাঝি নতুন রেপার্টরি নাট্যদল ‘হৃৎমঞ্চ’ এই নাটকটি মঞ্চে এনেছে। শুভাশিস সিনহার লেখা ও নির্দেশনায় নাটকটিতে অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের তিন গুণী অভিনয় শিল্পী রোকেয়া রফিক বেবী, আজাদ আবুল কালাম ও জ্যোতি সিনহা। নাট্যকার আগেই উল্লেখ করেছেন, ‘রুধিররঙ্গিণী বাংলার ওলটপরাণ’। এই কথাটি যে সাহিত্য অঙ্গনে তুমুল আলোচনা তৈরি করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুভাশিস সিনহা মূলত কবি। গল্পকার, ঔপন্যাসিক হিসেবেও তার খ্যাতি রয়েছে। তবে নাট্যকার, নির্দেশক ও সংগঠক হিসেবেই সম্ভবত তিনি সব শ্রেণির মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন বেশি। ‘রুধিররঙ্গিণী’ তার লেখা নতুন নাটক। এই নাট্যসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় অনলাইনভিত্তিক সাহিত্য পত্রিকা ‘পরস্পর’র মাধ্যমে। সেখানেই নাটকটি প্রকাশিত হয়। সেই সূত্রে নাটকটি মঞ্চে আসার আগেই পাঠের অভিজ্ঞতা নেওয়া। পাঠের পর কিছুটা কৌতূহল তৈরি হলো এটা কি নাটক নাকি কবিতা? এর সুরাহা হয়তো সাহিত্য সমালোচকরা করবেন। তার আগ পর্যন্ত আলোচনা হোক হৃৎমঞ্চ প্রযোজিত নাটক ‘রুধিররঙ্গিণী’ নিয়ে। এটি মূলত এক নারীর প্রেম ও হৃদয়ের আখ্যান। সামাজিক নানা বাধাকে পাশ কাটিয়ে বারবার যে সমর্পিত হয় প্রেমের কাছে। কিন্তু বঞ্চনা নিয়েই ফিরতে হয়। এই নারীর বিয়ের পর স্বামী অপঘাতে মারা যায়। দুইবার স্বামী হারানোর পর মায়ের নির্দেশ অমান্য করে আবারো সাড়া দিতে চায় প্রেমের ডাকে। বাঁশিওয়ালার কাছে নিজেকে সমর্পণ করার জন্য মাকে ছেড়ে যায় মেয়েটি। এই বাঁশিওয়ালা থাকে শঙ্খনদী তীরে। সেই বাঁশিতেই মুগ্ধ হয় মেয়েটি, ধরতে চায় পুরুষের হাত। কিন্তু সেই পুরুষও এক ভাগ্য বিড়ম্বিত। কোনো এক পুরুষের কাম বাসনায় আরেক নারীর ঔরসজাত হয়ে পৃথিবীতে এসেছে সে। যাকে পিতা বলে স্বীকৃতি দিতে চায় না বাঁশিওয়ালা।

‘সে আমার পিতা নয়, ঔরস কেবল। জগতে এ রকম শত শত পিতা টেনে আনে বীজের চক্রের নানা প্যাঁচ থেকে আমার মতো পরিচয় হারানো সন্তান (বাঁশিওয়ালার সংলাপ)।’ ভাগ্য বিড়ম্বিত সেই বাঁশিওয়ালা নিজ হাতে হত্যা করেছে তার আপন পিতাকে। আর সেই আত্মদহনে দগ্ধ হয়ে চলেছে নিজে। মেয়েটি যখন বলে- ‘জীবনে পুরুষ পুরোটা পাইনি টের আমার শিরায়। তুমিই জগতে শেষ পুরুষ আমার।’ তখন বাঁশিওয়ালা মেয়েটিকে ফিরে যেতে বলে। নিয়তির কাছে সে হেরে গেছে। আপন পিতাকে হত্যার দাগ মুছতে পারে না সে কিছুতেই। উন্মাদের মতো সে বলতে থাকে- ‘শঙ্খনদী বলেছে আমারে চুপি চুপি, ঢেউয়ে ঢেউয়ে সখি। আমার ভেতরে যার বেড়ে ওঠা, আমি যার বীজের বিস্তার। তারে আমি কিসে করি খুন। সেকি! খুন হয়, সে তো বাঁচে রক্তে রক্তে মাংসে মাংসে মজ্জায় মজ্জায়।’ এক সময় বাঁশিওয়ালার হাতের বাঁশি হয়ে যায় ছুরি। সেটা দিয়েই আত্মহত্যা করে বাঁশিওয়ালা। প্রেমের মায়ায় মেয়েটি পারে না বাঁচাতে বাঁশিওয়ালাকে। এ যেন নিয়তির কাছে হেরে যাওয়া। এ যেন মানবজীবনের চিরায়ত ট্র্যাজেডিÑ ‘মানুষ পায় না দেখা সত্য শঙ্খনদী তীর’। ‘রুধিররঙ্গিণী’ নাটকের মঞ্চ-আলো-সংগীত-পরিকল্পনা করেছেন শুভাশিস  সিনহা। মঞ্চ নির্মাণ করেছেন শাহনাজ জাহান, হাসান আলী, সাকিল সিদ্ধার্থ, আসফিকুর রহমান। পোশাক পরিকল্পনা করেছেন জ্যোতি সিনহা ও শাহনাজ জাহান।