কার একাত্তর কার ইতিহাস?|112479|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৬:২৯
কার একাত্তর কার ইতিহাস?

কার একাত্তর কার ইতিহাস?

প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে আমরা একাত্তরের ইতিহাস সন্ধান করছি। আমরা যারা একাত্তর পার করেছি তাদের মনে হয় যে দুটো সময় ছিল। এক. যা ঘটেছিল একাত্তরে; দুই. যা ঘটেছিল বলে এখন লোকে ভাবে ও বলে। একাত্তরের ইতিহাস চর্চার চেয়ে এর রাজনীতি নিয়ে চর্চা করা হয় বেশি। মানুষজন জানতে চায় না কী হয়েছিল ওই বছরে? কার অবস্থা কেমন ছিল? মানুষের ত্যাগের সীমানা কত বড় ছিল? সাতচল্লিশ বছর পরও আমরা একাত্তরের ইতিহাস সন্ধান করছি। আর কিছু মানুষ বিশেষ করে ক্ষমতাবানরা সন্ধান করছে কীভাবে এর ইতিহাস কাজে লাগিয়ে আরো ওপরে ওঠা যায়। অনেক সময় মনে হয়, হয়তো আমরা দুটো আলাদা একাত্তরকে নিয়ে কথা বলছি।

দুই.
বিপিন বিহারী দাস থাকতেন মগবাজারে। তিনি ছিলেন আঁকিয়ে, অর্থাৎ পেশায় সাইনবোর্ড শিল্পী। বিপিনবাবুর জীবনে একটাই নেশা ছিল। সেটা হচ্ছে বাংলা মদ খাওয়া। তার দেশের বাড়ি ছিল নরসিংদী। কিন্তু তিনি খুব একটা সেখানে যেতেন না। পুরান ঢাকায় তার একটা ডেরা ছিল, যেখানে তার পরিবার-পরিজন থাকত। মাঝে মাঝে তিনি যেতেন তাদের দেখতে। তবে বেশিরভাগ সময় তার দিনরাত কাটত সাইনবোর্ড আঁকার কাজের ঠিকানায়। এটা তার জন্য খুব সুবিধাজনক ছিল। কারণ এখানে বসে পরিবারের তদারকির বাইরে তিনি নির্বিঘ্নে বাংলা খেতে পারতেন। এভাবেই দিন যেত এই বয়স্ক আধা ঘরছাড়া মাতাল মানুষটির।

তিন.
যে রাতে পাকিস্তানিরা আক্রমণ করে সে রাতের আকাশটার কথা আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। এমন লাল আকাশ আমি কোনোদিন দেখিনি। ওই লাল আকাশের ভেতর দিয়ে তীব্র জ্যোতির ট্রেসার বুলেটগুলো দৌড়াচ্ছে, এই দৃশ্যটা আমার মনে গেঁথে আছে। এরমধ্যে আমরা বাড়ির ছাদে গিয়েছিলাম। আমার বড় ভাই এই গুলিগালার আওয়াজ রেকর্ড করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ওপরে উঠে দেখলাম আকাশের চেয়েও উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে জ্বলছে পালপাড়ার বস্তি। মানুষগুলো দৌড়াদৌড়ি করছে, একটু তাকালে পাকিস্তান আর্মির ট্রাকগুলো দেখা যায়।
সকালবেলা ওই পোড়া বস্তির মানুষগুলো অনেকে আমাদের পাড়ায় এসে আশ্রয় নিয়েছিল। এরমধ্যে কিছু কিছু মানুষ ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে থাকে। কারফিউ উঠে যাওয়ার পর বিপিনবাবুর পরিবারের মানুষরা আসে তার কাছে। সবাই ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে, বিপিনবাবুকে নিতে এসেছে তারা। তিনি সায় দেননি। এটা-সেটা বলে ঢাকা রয়ে গেলেন। তার বাড়ির লোকজন চলে গেল নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। গোটা নয় মাস তিনি ঢাকা ছিলেন। সেটা কি মদের লোভে নাকি কীসের লোভে কে জানে। আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি গেলেন না কেন? তিনি মেজাজ করে উত্তর দিয়েছিলেন, ক্যান যামু ঘর ছাইড়া?

চার.
বছর দশেক ধরে আমরা গবেষণা করছি গ্রামের একাত্তর নিয়ে। প্রান্তিক, গরিব, নিরন্ন মানুষের ইতিহাস জানা সহজ নয়। কারণ তাদের এই ইতিহাস জানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। জাতীয় ইতিহাসে সে অংশগ্রহণ করে তার গ্রামের ইতিহাসের মাধ্যমে। এই ইতিহাস চর্চায় তার কোনো লাভ-লোকসান নেই। এতে না মেলে টাকা-পয়সা, না পাওয়া যায় সম্মান, না দেওয়া যায় বক্তৃতা। এই রকম প্রাপ্তিহীন ইতিহাসে কারো আগ্রহ থাকার কথা নয়। তাই সেই ইতিহাস অনেকটাই অজানা রয়ে গেছে। এরাই কিন্তু বাংলাদেশের পঁচানব্বই ভাগ মানুষ ছিলেন উনিশশো একাত্তর সালে। কিন্তু এদের ইতিহাসটাই আমরা জানার চেষ্টা সবচেয়ে কম করেছি। যাদের কথা জানি সবচেয়ে বেশি সেটি হচ্ছে ক্ষমতাবানদের ইতিহাস। কেন সেটা জানি সেটাই হচ্ছে বিষয়। অর্থাৎ যারা ক্ষমতাবান আর যারা ক্ষমতাহীন তারা কি একই পরিসরে বাস করেন? বা করেছিলেন উনিশশো একাত্তর সালে?

পাঁচ.
গ্রামের রাজনৈতিক কাঠামো অনুসন্ধান করাটা সবচেয়ে জটিল। কারণ কে শত্রু আর কে মিত্র এটা বোঝা সহজ নয়। পরিস্থিতি আর অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এটা পাল্টায়। অতএব কী কারণে শত্রু-মিত্র হচ্ছে সেটা সরলরৈখিক নয়। রাজনৈতিক ভাবনার পরিচয় অনেকগুলোর মধ্যে কেবল একটি সূচক। যে চিত্রটা পাওয়া যায় সেটিও কিন্তু ওপরতলা-নিচুতলা ভিত্তিক। অর্থাৎ গ্রামে যে ক্ষমতাকাঠামো আছে সেটার সঙ্গে একাত্তরের ভূমিকারও সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশের সব গ্রামে খুনখারাবি হয়নি। কিন্তু অনেক গ্রামেই লুটতরাজ হয়েছে। এই লুটটি কিন্তু দুই কিসিমের মানুষ করেছে। একদল হচ্ছে পেশাদার লুটেরা, অন্যরা হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন লুটেরা। দ্বিতীয় দল ছিল শান্তি কমিটির সদস্য। তারা সারাসরি গিয়ে লুট করত না। এই কাজটি হতো রাজাকারদের মাধ্যমে। আজকালকার দিনে সবাইকেই রাজাকার বলা হয়। কিন্তু সেই সময় রাজাকার বলতে গ্রামের নিম্নপদস্থ মানুষকেই বোঝাত, যারা কামাই এবং বিত্তের লোভে এই লুটেরা বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। লুটের সিংহভাগই যেত ক্ষমতাবানদের কাছে। গ্রামের এই ওপরতলার রাজনৈতিক আদর্শ তেমন ছিল না। যেটা ছিল সেটা হচ্ছে লোভ এবং এই লোভের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে তারা খুন হত্যা ধর্ষণ সবই করেছে। আমরা যেটা সবসবময় বলি না, সেটি হচ্ছে গ্রামে লুট-ধর্ষণ কোনোটা বাংলাদেশের মানুষের সহায়তা ছাড়া হয়নি। এই কর্মকাণ্ডগুলো প্রায় কোনোটাই রাজনৈতিক ছিল না। ব্যক্তিগত লোভ-লালসা কোন পর্যায়ে মানুষকে নিয়ে যেতে পারে তার সবচেয়ে বেশি উদাহরণ পাওয়া যায় উনিশশো একাত্তর সালে।

ছয়.
যুদ্ধের পরে গ্রামের মানুষ আরেক নতুন ক্ষমতাবান শ্রেণির সম্মুখীন হয়। তাদের সহায়তায় এবং গ্রামের মানুষের ইচ্ছা অনুযায়ী নির্যাতনকারীদের শাস্তি দেওয়া হয়। এটি ছিল সামাজিক বিচার, আইনি নয়। অত্যাচারী রাজাকারকে মেরে ফেলা হয়। এর চেয়ে কম যারা করেছে তাদের প্রহার করে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর যারা কিছু করেনি তাদের কিছু বলা হয়নি। এই সব রাজাকার এখনো আছে। তাদের অবস্থা যে কোনো হতদরিদ্র মানুষের মতোই। গ্রাম তাদের নিয়ে ভাবে না। কিন্তু যেটা লক্ষণীয় সেটি হচ্ছে শান্তি কমিটির অনেকেই বেঁচে যায়। বিভিন্ন পদ্ধতিতে তাদের অবস্থান তারা রক্ষা করে, তার মধ্যে বড় একটি হচ্ছে- নতুন ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সম্পদের ভাগাভাগি। স্বাধীন দেশের জন্য সংগ্রামের বয়সের চেয়ে এই লুটেরাদের এমন সম্পদ আহরণের বয়স অনেক বেশি দীর্ঘ।

স্বাধীনতার পর মানুষের অবস্থা এত নাজুক ছিল যে, বিচার সালিশের কথার চেয়ে সে রুজি-আহার সংগ্রহে বেশি ব্যস্ত ছিল। পাকিস্তানিরা দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়ে নির্যাতনের পরিসরকে দীর্ঘদিনের জন্য প্রতিষ্ঠিত করে যায়। যার আঘাত বাংলাদেশর ওপর বহুদিন পর্যন্ত ছিল। সামাজিক বিচার বা বিচার না হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যে কারণে এমন চর্চার সংস্কৃতিকে আঘাত করা প্রায় অসম্ভব। ব্যাংক লুট, গৃহস্থের বাড়ি লুট, ঘরের সোনাদানা লুট, শরণার্থীর সম্পদ লুট, সবই লুট। কোনোটি করে মহালোভী আর কোনোটি করে নিম্নপদস্থ রাজাকার।

আমরা একাত্তরের ইতিহাস চর্চায় এই বাস্তবতাগুলোকে উপেক্ষা করে গেছি। আমরা ভুলে গেছি সাধারণ মানুষের কাছে এই নির্যাতন বড় স্মৃতি হয়ে রয়েছে। আমরা সংখ্যা আর রাজনীতির পরিচয় খুঁজেছি, কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকে অনেকটাই এড়িয়ে চলেছি।

সাত.
আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটা জানা। এটা প্রয়োজন নিজের টিকে থাকার তাগিদে। কারণ সেই সময়টি আমাদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সময়। এটা এই কারণে নয় যে আমরা গোলাগুলি করেছি, যুদ্ধ করেছি বরং এই কারণে যে শত বিপদের মধ্যেও এদেশের অগুনতি মানুষ তার মানবতাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছিল। একজন সন্ধানকারী হিসেবে প্রতিদিনকার এমন নতুন অভিজ্ঞাতর সামনাসামনি হয়ে আমি স্তম্ভিত হই। একাত্তর যেন মানুষের ত্যাগের মহিমার সময়। অথচ আমাদের ইতিহাসে এসব খুব কম আসে। হয়তো এই কারণে যে, যারা এটা করেছিল তারা ছিল সাধারণ মানুষ। আজকের যে ওপরতলার মানুষ তারা সাধারণ না। তারা যে সাধারণ মানুষের ইতিহাসের ব্যাপারে আগ্রহ দেখাবেন না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের জন্মসূত্র একাত্তর- ভালো আর মন্দ মিলিয়েই। ওই না জানার কারণেই আমরা এখনো বাংলাদেশ নিয়ে সংশয়ে পড়ে আছি। আসলে এটা কার দেশ?

আট.
মুক্তিযুদ্ধের সময় যেই বিপিনবাবু ঢাকা ছেড়ে নরসিংদী যাননি প্রাণ বাঁচাতে, তিনি নানা কারণে টিকতে না পেরে পরিবারের সঙ্গে ভারতে চলে গেলেন।  দেশত্যাগের এই সিদ্ধান্ত তার ভীষণ অপছন্দ ছিল, কিন্তু তার আর কোনো উপায় ছিল না। স্বাধীনতার দু’তিন বছর পর, তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল মগবাজারেই। হঠাৎ করে একদিন দেখি আমাদের বাড়ির দেয়ালের পাশে বসে আছেন হাতে মদের বোতল নিয়ে। আধা অন্ধকারে বসে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মন দিয়ে বোতল থেকে বাংলা খাচ্ছেন। আমাকে দেখে মাথাটা তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী খবর আপনাদের বাংলাদেশের?’ তারপর আবার বোতলে ফেরত গেলেন।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, কলামনিস্ট