সবচেয়ে দামি ও দুষ্প্রাপ্য সুতো|112565|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
সবচেয়ে দামি ও দুষ্প্রাপ্য সুতো
পরাগ মাঝি

সবচেয়ে দামি ও দুষ্প্রাপ্য সুতো

আন্দিজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ পবিত্র প্রাণী ভিসুনা। এর পশম দিয়েই তৈরি হয় বিশে^র সবচেয়ে দামি সূতা

পেরুর আন্দিজ পর্বতমালাই পৃথিবীর সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য সুতোর আঁতুড়ঘর। পাহাড়ি উপত্যকায় মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায় পবিত্র প্রাণী ভিসুনা। এই প্রাণীগুলোর সোনালি পশম থেকেই তৈরি হয় বহুমূল্যবান সুতো। এই সুতো একসময় পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে বসেছিল। কিন্তু কালক্রমে আবার স্বমহিমায় নিজের অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছে সুতোটি। সুতোর উত্থান-পতনের সঙ্গেই মিশে আছে ভিসুনাদের করুণ ইতিহাস আর টিকে থাকার গল্প।

সোনালি পশম

দক্ষিণ আমেরিকার বিশেষ জন্তু লামার একটি ছোট প্রজাতিই হলো ভিসুনা। পেরুর প্রাণকেন্দ্রে একটি বিশেষ এলাকাজুড়ে বিচরণ করে এই ভিসুনা। এটি পেরুর জাতীয় প্রাণী। দেশটির জাতীয় পতাকা, অস্ত্র ও পয়সার মধ্যেও এই প্রাণীর অস্তিত্ব দেখা যায়। ইনকা সভ্যতার সময় পেরু থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত আন্দিজ পর্বতমালার জনশূন্য এবং বাতাসপ্রবণ এলাকায় ঘুরে বেড়াত প্রায় ২০ লাখ ভিসুনা।

ইনকারা বিশ^াস করত, ভিসুনাদের বিশেষ ক্ষমতা আছে। তাদের হত্যা করা নিষিদ্ধ ছিল। ইনকা সভ্যতার অভিজাত শ্রেণিই শুধু ভিসুনার পশম দিয়ে তৈরি দারুচিনি রঙের পোশাক পরিধান করতে পারত। এই পোশাক তৈরির সোনালি পশম কয়েক শতাব্দী ধরে মানুষের কাছে চরম আরাধ্য পণ্য।

কোমল কিন্তু কঠিন

ভিসুনা প্রাণীদের খুব নিরীহ দেখা গেলেও, এরা পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচুতে বসবাসকারী। এদের শরীরে প্রবাহিত গাঢ় লাল রক্তের কণাগুলো প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন তৈরি করতে সক্ষম। পাহাড়ি উপত্যকার কঠিন পরিবেশে সামান্য ঘাস খেয়েও বিশেষ পরিপাকতন্ত্রের কারণে এরা টিকে থাকে। ভিসুনাদের সোনালি পশম থেকে ১২-১৪ মাইক্রন ব্যসের তন্তু পাওয়া যায়, যা পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট তন্তু। বিশ^ বস্ত্রশিল্পে কোমল এই তন্তুটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দামি। একে তো ভিসুনার পশম খুব ধীরে ধীরে বাড়ে, তার ওপর একটি কঠিন প্রক্রিয়ায় এই লোমকে সুতো তৈরির উপযোগী করতে হয়। তাই এই সুতোটিই সবচেয়ে আরাধ্য এবং ব্যয়বহুলও। অন্য কোনো কাপড়ের চেয়ে ভিসুনার পশম দিয়ে তৈরি পণ্য অন্তত পাঁচ গুণ বেশি দামি।

জীববিজ্ঞানী সান্তিয়াগো পারেদেস গুয়েরারো বলেন, ‘প্রকৃতি ভিসুনাদের এত নিখুঁতভাবে তৈরি করেছে যে, তাদের পশমগুলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পশম।’

মানবিক উৎসবে বিদেশিদের কালো হাত

ইনকাদের সময়ে ভিসুনাদের শরীর থেকে প্রতি চার বছর অন্তর পশম সংগ্রহ করা হতো। এই পশম সংগ্রহকে কেন্দ্র করে ‘চাচু’ নামে এক উৎসবের আয়োজন করত তারা। সে সময় ভিসুনার পালকে দলবেঁধে ধরা হতো। পরে তাদের পশম কামিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো। এই পশম থেকে তৈরি কাপড়গুলো ছিল স্বর্ণের মতোই দামি এবং এগুলোকে রাজ্যের সুরক্ষিত গুদামে রাখা হতো।

১৫৩২ সালে পেরুতে পা রাখে স্প্যানিশরা। বলা হয়ে থাকে, আন্দিজ উপত্যকায় স্প্যানিশদের সবচেয়ে বেশি নির্মমতার শিকার হয়েছিল নিরীহ প্রাণী ভিসুনা। তারা ভিসুনাদের বন্দুক দিয়ে শিকার করা শুরু করে। কয়েক শতাব্দী ধরে চলে এই নিধনযজ্ঞ। বিংশ শতকের মাঝামাঝিতে ইউরোপ এবং আমেরিকার বাজারে ভিসুনার পশম ব্যবহার করে বানানো পোশাক উচ্চ দামে বিক্রি হতে শুরু করে। কিন্তু ততদিনে ভিসুনাদের সংখ্যা ২০ লাখ থেকে নেমে গেছে মাত্র ১০ হাজারে। ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে হাঁটছিল প্রাণীটি।

প্রয়োজন প্রতিরক্ষা

স্রোতের বিপরীতে দাঁড় টানার মতো ১৯৬৭ সালে ভিসুনাদের রক্ষায় আইন জারি করে পেরুর সরকার। দেশটির পর্বতময় লুকানা প্রদেশে ১৬ হাজার একর জমিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় পাম্পা গালেরাস ন্যাশনাল রিজার্ভ নামে একটি ভিসুনা সংরক্ষণ কেন্দ্র। দুই বছর পর ভিসুনাজাত যে কোনো পণ্য কেনা-বেচা নিষিদ্ধ করে পেরু। ১৯৭৫ সালে ‘কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন ইনডেঞ্জার্ড স্পেসিস’-এ ভিসুনাকে পৃথিবীর অন্যতম বিপন্ন প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করে এবং এখান থেকেও ভিসুনার পশম থেকে তৈরি যে কোনো পণ্য কেনা-বেচায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু কালোবাজারে চোরাকারবারিরা অনেক বেশি দামে ভিসুনার পশম বিক্রি শুরু করে। সে সময় তারা ১ কেজি পশম প্রায় ১ হাজার ডলারে বিক্রি করত। এক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ প্রায় অসম্ভব ছিল। কারণ ভিসুনাদের বিচরণ ভূমি ছিল বিশাল। আর এই বিশাল এলাকা নজরদারি মধ্যে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। অনেক চেষ্টার পরও ধীরে ধীরে কমেই যাচ্ছিল ভিসুনাদের সংখ্যা।

অবিস্মরণীয় ফিরে আসা

কর্তৃপক্ষ এবং সংরক্ষণকারীরা ভালো করেই জানত যে, ভিসুনাদের রক্ষা করতে চাইলে অনেক বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। তারা ভাবলেন, কেমন হবে যদি ‘চাচু’ নামে ইনকাদের সময়ে ভিসুনাকেন্দ্রিক যে উৎসব হতো তা ফিরিয়ে আনা যায়? কেমন হয়, যেসব অঞ্চলে ভিসুনা প্রাণীটি বাস করে, সেই অঞ্চলের গরীব মানুষদের মধ্যে ভিসুনাকেন্দ্রিক বাণিজ্যে লভ্যাংশের ভাগ দিলে? কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হয়। দেখা গেল, যখন সাধারণ মানুষ ভিসুনার পশম বিক্রির লভ্যাংশ পাওয়া শুরু করল, তখন তারা নিজেদের উদ্যোগেই চোরাকারীদের হাত থেকে ওই সমস্ত প্রাণীদের রক্ষা করতে শুরু করল। ফলপ্রসূ পরিকল্পনায় ক্রমেই ভিসুনাদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। ১৯৯৪ সালে ভিসুনাজাত পণ্য কেনা-বেচায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। ২০০৮ সালে বিপন্ন প্রাণীর তালিকা থেকে ভিসুনার নামটি তুলে নেওয়া হয়। ভিসুনা পৃথিবীর অন্যতম বিরল প্রাণী যে কি-না বিপন্নের তালিকা থেকে ফিরে এসেছে। বর্তমানে পেরুতে প্রায় ২ লাখেরও বেশি ভিসুনা রয়েছে।

ফিরেছে ঐতিহ্যও

ইনকাদের সেই পুরোনো ঐতিহ্য ‘চাচু’ আবার ফিরে এসেছে পেরুর মাটিতে। প্রতি বছরের ২৪ জুন এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় পাম্পা গেলারেস বারবারা ডি’আচিল্লে ন্যাশনাল রিজার্ভ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। নেচে গেয়ে পালন করা হয় উৎসব। এমনকি এই উৎসবে ইনকাদের সময়ের বিভিন্ন সাজসরঞ্জামও চোখে পড়ে। উৎসব চলাকালে কিছু কিছু বাস কোম্পানি পর্যটকদের জন্য শুকনো পাহাড়ি রাস্তা ধরে সংরক্ষিত এলাকায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভ্রমণ আয়োজন করে। স্বাধীন পর্যটকরা ইচ্ছা করলে ওইসব এলাকার গ্রামীণ পরিবেশে থাকারও ব্যবস্থা করে নিতে পারে।     বিবিসি অবলম্বনে

বর্তমানে ‘চাচু’ উৎসবের মধ্য দিয়ে যে পরিমাণ পশম সংগৃহীত হয় তার কিছু অংশ পেরুতে রেখে বাকিটা বহির্বিশে^ রপ্তানি করে দেওয়া হয়। ইতালির অভিজাত পণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠান ‘লরো পিয়ানা’র মাধ্যমেই সারা পৃথিবীতে যায় ভিসুনার পশম কিংবা এ থেকে তৈরি সুতা। কারণ পেরু সরকার যখন ভিসুনাদের সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল তখন তাদের সাহায্যেও হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ‘লরো পিয়ানা’। ভিসুনার পশম থেকে পাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য সুতো দিয়ে তৈরি ‘লরো পিয়ানো’র একটি মাফলার কিংবা স্কার্ফের দাম ৩ হাজার ১৯৫ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় আড়াই লাখের কাছাকাছি। একটি জাম্ফারের দাম পড়বে ৪ হাজার ৭৯৫ ডলার বা ৪ লাখ টাকা। আর একটি কম্বলের দাম পড়বে ১৮ হাজার ৫৯৫ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টাকারও বেশি!