দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার নাটক ‘মুল্লুক’|112570|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার নাটক ‘মুল্লুক’
পাভেল রহমান

দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার নাটক ‘মুল্লুক’

ঢাকার মঞ্চে যারা নিয়মিত নাটক দেখেন তাদের কাছে বাকার বকুল নামটি বেশ পরিচিত। এর আগে ‘বনমানুষ’, ‘লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন’, ‘দূর-ঘটনা’ মঞ্চে নির্দেশনা দিয়ে খ্যাতি কুড়িয়েছেন তিনি। নাট্যাঙ্গনের একাধিক পুরস্কারও ঝুলিতে তুলে নিয়েছেন এই তরুণ মেধাবী নির্দেশক। বকুলের নাটক মানেই আঙ্গিক অভিনয়ের অনন্য নৈপুণ্য। সঙ্গে ভাবনা জাগানিয়া কোরিওগ্রাফির সঙ্গে সঙ্গীতের চমৎকার ব্যবহার। গত ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নাট্যশালার স্টুডিও থিয়েটার মিলনায়তন ছিল দর্শক পূর্ণ। সেখানে মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘মুল্লুক’। নাটকের শুরুতেই নজরুল সংগীত- ‘বাজাও প্রভু বাজাও ঘন বাজাওৃ/দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও।’ গানের সঙ্গে কোরিওগ্রাফিতে কিছুটা খটকা লাগতে পারে। নাটকের শুরুতেই যেন দর্শককে এক ধরনের বিপ্লবী আহ্বান। তবে নির্দেশক যে সচেতনভাবেই দর্শককে দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার লড়াইয়ে শামিল হতে আহ্বান জানাচ্ছেন তা স্পষ্ট। শুরু হয় নাটকের মূল গল্প। চা বাগানিয়া নিঃসঙ্গ এক অশীতিপর বৃদ্ধার লড়াই মৃত্যুর সঙ্গে। কত বয়স তার? কথক সংলাপে জানানÑ ‘সত্তর আশি কিংবা শতক নাকি তারও অধিক। অথবা আমরা ধরে নিই প্রত্নবয়সী এই নারী শেকড়ছিন্ন কতিপয় মানুষের সময়-সাক্ষী। মৃত্যুপূর্ব গোঙানি শেষে কখন যেন সে নিস্তেজ। যখন বৃদ্ধার গোঙানি থামে, দীর্ঘ কয়েকদিনের গোঙানিতে অভ্যস্ত হওয়া অন্য বাগানিয়ারা মাটির খোঁড়লঘর থেকে বেরিয়ে আসে মাটি খেয়ে বেঁচে থাকা ঘুঘরি পোকার মতো। কিন্তু তারা নিশ্চিত হতে পারে না যে বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে কি না। সেই ঘন রাতে দৈবলোকের মতো বৃদ্ধার সামনে দৃশ্যমান হতে থাকে তার খ- খ- অতীত। শৈশব চলে যায় ব্রিটিশ শাসনামলের অতীতে ভারতের কুন্দলিকা নদীর পাড়ে। দেশভাগের পর পূর্ববাংলায় (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) দেখে সে যৌবন। বৃদ্ধকালকে বয়ে বেড়ায় বৃদ্ধা বর্তমান সময়ের মাঝে।’ মৃত্যুপথযাত্রী এই বৃদ্ধার চোখ দিয়েই একের পর এক উন্মোচিত হতে থাকে দৃশ্য। দর্শকের সামনে আসে চা-শ্রমিকদের সঙ্গে যুগের পর যুগ ধরে চলমান দাসত্বের শৃঙ্খল, নিপীড়নের চিত্র। নিপীড়িত চা-শ্রমিকদের মাঝে বিদ্রোহের মশাল তুলে ধরে হারিয়ে যাওয়া বীরযোদ্ধা মঙ্গল, গাঙ্গুয়াসহ অনেকে। কিংবা বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রসাদ যে কিনা নিপীড়িত এই চা-শ্রমিকদের একদিন দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সেই বীর যোদ্ধাদের স্বপ্ন পথ ধরে এখনো মাঝে মাঝেই চা-শ্রমিকদের মাঝে মুক্তির স্বপ্ন জাগে, দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার স্বপ্ন জাগে। এমন স্বপ্ন নিয়েই শেষ হয় নাটক ‘মুল্লুক’।

এই আলোচনার শুরুতেই বলা হয়েছে বকুলের নির্দেশনায় নাটক মানেই যেন আঙ্গিক অভিনয়ের অনন্য নৈপুণ্য। এই নাটকেও তারই ধারাবাহিকতা ছিল। অবশ্য এই নাটকের পরবর্তী প্রযোজনা ‘লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন’ নাটকে নিজের প্রচলিত বৃত্ত ভেঙে আঙ্গিক অভিনয়ের চাইতে ইমোশন নিয়েই বেশি নীরিক্ষা করেছেন তিনি। মুল্লুক নাটকের পুরোটা জুড়ে ছিল মুগ্ধকর বেশ কিছু কোরিওগ্রাফি, সঙ্গে সংগীতের অপূর্ব সমন্বয়। তবে শারীরিক অভিনয়ের মাঝে কখনো কখনো অভিনেতারা বাচিক অভিনয়ের ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলেছেন। অভিনয়ের ইমোশনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এমন একটি নাট্যপ্রযোজনা মঞ্চায়নের জন্য যে পরিমাণ মহড়ার দরকার তারও ঘাটতি চোখে পড়েছে। তবে নিরাভরণ মঞ্চে কোরিওগ্রাফির নান্দনিকতা, গল্পের সরল বয়ান, সংগীত ও আলোর পরিমিত ব্যবহার নাটকটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। অভিনয় শিল্পীদের চরিত্রায়নও বেশ গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে নাটকটিকে। একজন একাধিক চরিত্রে অভিনয় করছেন, আবার মিশে যাচ্ছেন কোরিওগ্রাফি দলের সঙ্গে। সবাই মিলে যেন একটা গল্পই উপস্থাপন করছেন। এমন নান্দনিক টিমওয়ার্ক মুগ্ধ করেছে। আঙ্গিক অভিনয়ের পাশাপাশি বাচিক অভিনয়ে শিল্পীরা আরো জোর দিলে নাটকটি আরো বেশি মুগ্ধকর হতে পারে।  ‘মুল্লুক’ রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন বাকার বকুল। আলোক পরিকল্পনা করেছেন আসলাম অরণ্য। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন রবিউল ইসলাম, শশাংক সাহা, রুনা কাঞ্চন, সোহেল মণ্ডল, শারমীন আক্তার শর্মী, শফিকুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, হাফিজা আক্তার ঝুমা, ইন্দ্রানী ঘটক, শামীম শেখ, আকাশ সরকার, তানবীর লিমন, শান স্বপন, শ্রেয়শী প্রমুখ।