পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ শতকোটি ডলার|112611|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ শতকোটি ডলার
আলতাফ মাসুদ

পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ শতকোটি ডলার

২০১০ সালের পর দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশিদের মধ্যে বিনিয়োগের প্রবণতা বেড়ে যায়। কম দামে শেয়ার কিনতে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা অন্তত সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। চলতি বছর নিট বিনিয়োগের কিছু অংশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও সব মিলে বিদেশি বিনিয়োগ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় ২০০৪ সাল থেকে। এর আগে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কর্মকর্তাদের ধারণা।

ডিএসই থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পুঁজিবাজারে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ ছিল ৮ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। আর চলতি বছর নভেম্বর পর্যন্ত ৪৯৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তারা। সব মিলে বর্তমানে পুঁজিবাজারে প্রায় শতকোটি (৯৪ কোটি ৩৭ লাখ) ডলারের নিট বিনিয়োগ রয়েছে বিদেশিদের।

পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, অর্থনীতির নানা সূচকে বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় অগ্রগতির খবর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অজানা নয়। বিশ্বের খ্যাতনামা বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী।

তবে ভালো শেয়ারের অভাবে ইচ্ছা থাকলেও তারা বেশি বিনিয়োগ করতে পারছেন না। ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বছর বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ না হওয়ার নেপথ্যে নির্বাচন একটি বড় কারণ। পরবর্তী সরকারের বিনিয়োগনীতি, নির্বাচনের পরে ক্যাপিটাল মার্কেটের প্রতি সরকারের আচরণ ইত্যাদি পর্যালোচনা করে আবার তারা বিনিয়োগে ফিরে আসবেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বন্ডের সুদহার কিছুটা বেড়েছে, যার কারণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিনিয়োগ কিছুটা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংক ও বহুজাতিক কোম্পানিসহ সুখ্যাতি রয়েছে, এমন স্থানীয় কোম্পানিতে বিদেশিরা সাধারণত শেয়ারে বিনিয়োগ করে থাকেন। এগুলোর অধিকাংশের শেয়ার এখন যৌক্তিক মূল্যে অবস্থান করছে। এই সময়টা তাদের জন্য বিনিয়োগের অনুকূল। যেসব বিদেশি দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছেন, তাদের সিংহভাগই ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর বিনিয়োগ কোম্পানি। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর, দুবাইভিত্তিক কিছু বিনিয়োগ কোম্পানিরও বিনিয়োগ রয়েছে। নরডিক দেশগুলোর ব্যবসায়ীদের সমন্বিত বিনিয়োগ কোম্পানি ব্রামার্স অ্যান্ড পার্টনারস দেশের শেয়ারবাজারের প্রায় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সালের বাজার ধসের পরের বছর থেকে বিদেশি বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে। ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিট বিনিয়োগে ইতিবাচক ধারা ছিল। এ সময় টানা সাত বছরে বিদেশিরা ৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা নিট বিনিয়োগ করেছেন। চলতি বছরে এসে নভেম্বর পর্যন্ত তারা ৪৯৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেন, যার সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক দেখছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে ব্র্যাক ইপিএল ব্রোকারেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শরীফ এম এ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনের কারণেই বিদেশিদের মধ্যে শেয়ার বিক্রির প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে যেভাবে পাশের দেশগুলো থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা হয়েছে, বাংলাদেশে তেমনটা হয়নি। বরং নির্বাচনের সময়টাতেও তারা শেয়ার কিনেছেন। নির্বাচন হয়ে গেলে তাদের বিনিয়োগ আরো বাড়বে।

ডিএসইর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংক কোম্পানির মধ্যে সিটি, মার্কেন্টাইল, ওয়ান, প্রাইম ব্যাংক, আল-আরাফা ও এক্সিম ব্যাংক লিমিটেডে এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জিএসপি ফাইন্যান্স, ডিবিএইচ, আইডিএলসিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে বিদেশিদের। এ ছাড়া সিঙ্গার বাংলাদেশ, ইফাদ অটোস, বেক্সিমকো ফার্মা, স্কয়ার ফার্মা ও রেকিট বেনকিজারেও তাদের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। এর বাইরে জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগ খাতেও বড় বিনিয়োগ রয়েছে তাদের।

শরীফ বলেন, ‘বিদেশিরা আমাদের বাজারে অংশীদারত্ব বাড়াতে আগ্রহী। ওদের সক্ষমতাও বেশি। কিন্তু আমাদের ভালো ও বড় মূলধনের শেয়ারের অভাব। ফ্রন্টিয়ার মার্কেট নিয়ে তাদের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা এসব দেশের পলিটিক্যাল ইস্যু বিবেচনায় নিচ্ছে না। কারণ এখানে গ্রোথ পারসপেক্টিভ (পরিপ্রেক্ষিত) অনেক বেশি। ওরা এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

২০১৮ সালে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সঙ্গে নির্বাচনের সংযোগ ছাড়াও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের ঝুঁকির বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলো ছাড়াও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর অধিকাংশই স্থানীয় মুদ্রার মান কমিয়েছে বা অবমূল্যায়ন করেছে। তবে বাংলাদেশ এখনো বিদেশি মুদ্রার বিপরীতে টাকার শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। গত সাত বছরে ভারত ও পাকিস্তান তাদের নিজস্ব মুদ্রার ৫০ শতাংশের বেশি অবমূল্যায়ন করেছে। বিদেশিদের ধারণা, বাংলাদেশও তার মুদ্রার অবমূল্যায়ন করতে বাধ্য হবে। এটি হয়ে গেলেই তারা আরো বেশি বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।

শাকিল বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যেভাবে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে বিদেশি বিনিয়োগের সুবিধা নিয়েছে, আমাদেরও সেভাবে চিন্তা করা উচিত। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের পুঁজিবাজারের মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) কম থাকায় বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।’